শিক্ষক অভিভাবক শিক্ষা কর্তৃপক্ষের করণীয়

আগের সংবাদ

এবার পদত্যাগ করছেন হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ

পরের সংবাদ

অরিত্রীর আত্মহত্যা এবং অসংখ্য প্রশ্ন

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৭, ২০১৮ , ৯:১৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: ডিসেম্বর ৭, ২০১৮, ৯:১৩ অপরাহ্ণ

বিভুরঞ্জন সরকার

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

প্রশিক্ষণ এবং কাউন্সেলিংয়ের একটা বিশাল শূন্যস্থান এখানে সুস্পষ্টভাবেই পরিলক্ষিত। শিক্ষকের এই ভুল নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু ভিকারুননিসা আসবে কেন? এটা তো আমাদের দেশীয় সমস্যা। শিক্ষাব্যবস্থায় ত্রুটি আমাদের জাতীয় সমস্যা। পরিবারকে বাদ দিয়ে এই আলোচনা সম্মুখে যায় কি করে? একজন সন্তানকে মানবিক করে গড়ে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা তো পরিবারের। সেখানেও তো বড় রকমের একটা ফাঁকা গর্ত।

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যা এবং তার পরবর্তী ঘটাবলি আমাদের চেখে আঙুল দিয়ে কতগুলো জিনিস দেখিয়ে দিয়েছে। আমাদের অনেক কিছুই বদলাতে হবে। বাইরে থেকে যেগুলোকে আমরা ঠিক বলে মনে করছি, ভেতর থেকে সেগুলো আসলে ঠিক নেই। আমরা পাপোসের নিচে ময়লা জমিয়ে ঘর পরিষ্কার দেখানোর চেষ্টা করছি। আমাদের অনেক কিছুই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এগুলো মেরামত নয় পূণনির্মাণ প্রয়োজন।

এর মধ্যে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত শিক্ষার প্রতি। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তাহলে বলতেই হবে যে আমাদের মেরুদণ্ডে ভয়াবহ ক্ষয়রোগ ধরেছে। ভিকারুননিসার মতো নামি প্রতিষ্ঠানের ভেতরের যেসব খবর পাওয়া যাচ্ছে তা খুবই লজ্জার। ভালো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি একেকটি করপোরেট হাউসের মতো হয়ে পড়ে তাহলে আমরা তো মানবিক গুণসম্পন্ন, হৃদয়বৃত্তিসম্পন্ন মানুষ আর খুঁজে পাব না। অরিত্রী নামের মেয়েটি আত্মহত্যা করে তার মা-বাবাকে যেমন অনন্ত শোক সাগরে ভাসিয়ে গেল, তেমনি আমাদেরও অসংখ্য প্রশ্নের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। আমরা যদি এই প্রশ্নগুলোর জবাব অনুসন্ধান না করি তাহলে আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে ভয়াবহ পরিণতি।

গত কয়দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিকারুননিসা স্কুল নিয়ে অনেক ধরনের মতামত প্রকাশ হচ্ছে। দুঃখ, বেদনা, ক্ষোভ, হতাশা, কী করা উচিত, রোগ কোথায়, চিকিৎসা কী তাও অনেকেই ব্যক্ত করেছেন। এখানে আমি দুজনের তিনটি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া উদ্ধৃত করতে চাই। এ থেকে ভাবনার ভিন্নতা ও বহুমাত্রিকতা সম্পর্কে পাঠক কিছু ধারণা পাবেন।

শফিকুল ইসলাম তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন : দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ করায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকেই ধন্যবাদ। তবে অত্র প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে চলমান আরো কিছু অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবকদের পক্ষ থেকে অনেক অভিযোগ উঠে আসছে। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের গৌরব ও সুনাম সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সেগুলোর সমাধানও জরুরি।

টাকার বিনিময়ে অতিরিক্ত ছাত্রী ভর্তি, কমিটির দুর্নীতি, ফান্ডের অপচয়, অত্যধিক অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ, কোচিং থেকে সরকার নির্ধারিত ১০ শতাংশ ছাড়াও শাখা প্রধান ও অধ্যক্ষের জন্য অতিরিক্ত আলাদা অর্থ গ্রহণ, মেয়েদের স্কুল হলেও অতীতের ধারা বাদ দিয়ে মহিলা শাখা প্রধানের পরিবর্তে বর্তমান কমিটি তিনটি শাখাতেই পুরুষ শাখা প্রধান নিয়োগ (অভিযোগ আছে, এসব পুরুষ শাখা প্রধান নিয়মবহির্ভূতভাবে মহিলা শিক্ষক ও ছাত্রীদের প্রাইভেসি নষ্ট করে আলোচিত হয়েছেন), নামিদামি স্কুলের দোহাই দিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে হরহামেশায় অপমানজনক আচরণ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা ইত্যাদি নিয়মিত বিষয় হয়েছে। আবার এসব ক্ষেত্রে অন্য কোনো নামিদামি স্কুলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো ইন্ধন আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখতে বলছেন কিছু অভিভাবক। এমন নানাবিধ অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার মাধ্যমেই ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের গৌরব ও সুনাম অক্ষুণ্ন থাকবে বলে আশা করছি।

খুবই যৌক্তিক বক্তব্য। একটি ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটলে সেটা নিয়ে আমরা কয়দিন হৈচৈ, মাতামাত করি, তারপর আবার যে সেই। এই ‘দিন ভিক্ষা, তনু রক্ষার’ নীতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এখন নির্বাচনের ডামাডোল। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যারা জনগণকে ‘সেবা’ দিতে আসবেন তারা একটু জনসংবেদনশীল হলে হয়তো আমরা সত্যিকার পরিবর্তনের পথে চোখ ফেরাতে পারব।

ফেসবুকে অনেকের লেখা, প্রতিক্রিয়া, পরামর্শই আমার ভালো লেগেছে। তার মধ্য থেকে মকসুদুল হামিদের লেখাটি আমি উদ্ধৃত করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। একটু বড় উদ্ধৃতি, তবে বিরক্তিকর বলে মনে হবে না বলেই আমার বিশ্বাস।

তিনি লিখেছেন : ‘আমার দুই ভাতিজা, একজন পড়া শেষ করে এসেছে, ছোটজন চালিয়ে যাচ্ছে মালয়েশিয়ার ক্রিয়েটিভিটি নামক বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে কোনো প্রথাগত পরীক্ষা নেই। সৃজনশীল টার্ম পেপার প্রণয়ণই পরীক্ষা দেয়া। শিক্ষকদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হয় প্রতিটি শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত মেধা বিকাশের মাধ্যমে কাজটি শেষ করতে হয়। অধিকাংশ কাজই পেটেন্ট হয়। তাহলে কী দরকার বাপু পরীক্ষা নামক এমন বিপত্তিকর কার্যক্রমের, মানে মানে বিদায় করা সমীচীন মনে করি। শুনুন তাহলে

আমার খোলামেলা মতামত :
আমার মাথায় অনেকদিন থেকেই একটা নেগেটিভ চিন্তা ঘুরছে, যেমন ধরুন ‘পরীক্ষা’ শব্দটাকে দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ এবং এর ব্যবহার উচ্ছেদ করলে কেমন হয়?

ধরে নেই আর পরীক্ষা নেবো না। তবে শিক্ষার্থীরা শিখছে কিনা জানব কেমন করে? তাদের জন্য প্রচলন করা হবে প্রধানত স্বমূল্যায়ন (Self Assessment), তারপর হতে পারে সাথী মূল্যায়ন (Pair Assessment then Assessment by Teacher/School)। আমাদের উদ্দেশ্য হলো শিখলফল অর্জিত হয়েছে কিনা তা জানা। এখন প্রতিটি বিষয়ে এসব স্পষ্ট ভাষায় Action Verb-G-এ এসব লেখা থাকে। প্রতিটি পাঠ বুঝিয়ে দেয়ার পর শ্রেণিতে অবশ্যই যাচাই করতে হবে প্রত্যেকে তা পারছে কিনা। না পারলে শিখিয়ে দেয়া। সেটা যে পারল সে অন্যকে বুঝিয়ে দিল সবাই একে অপরের সহায়তাকারী (facilitator) হলে শ্রেণিতে ঘুচে যায়, পড়া যেমন open book পড়া যাচাইও বই খোলা রেখেই চলুক না, ক্ষতি কিসে। কিন্তু আমাদের সে পরিমাণ শিক্ষক নেই। বাংলাদেশে বর্তমানে মাধ্যমিকে শিক্ষক প্রতি ৪২ শিক্ষার্থী। কিন্তু এটা গড় হিসাব। কোনো স্কুলে ১:১০ আবার কোথাও ১:৮০/৯০। তাদের পেশাগত প্রশিক্ষণ তেমন কার্যকর নয়।

তারপরও এ পর্যায়ে কেন্দ্রীয়ভাবে এমন পরীক্ষা নেয়ার কি দরকার? স্কুলের হাতে ছেড়ে দেই। বলবেন অসৎ পথে পাস করে দেবে? সে পাস নিয়ে অন্তত উচ্চ শিক্ষা হবে না। সেখানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা জানিয়ে দেবে কোনো স্কুলে ভালো শেখানো/পড়ানো হয়। আমাদের চোখের সামনে ঘটছে নামকরা স্কুলের গোল্ডেন এ পাওয়া শিক্ষার্থী যেখানে শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না সেখানে নটরডেম কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থী দেশে বিদেশে অনায়াসে ভর্তি হয়ে সম্মানের সঙ্গে শেষও করে আসছে। নটরডেম আমার জানা উদাহরণ। আমি নিজে ওর চত্বরেও পা ফেলিনি, নটরডেমের প্রচারও করছি না। আমার বিষয় হলো- সারা বছর লেখাপড়া হলো শিক্ষক পড়ালেন শিখালেন তাহলে শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হবে কেন?

আমরা লেখাপড়া ছেড়ে পরীক্ষা নেয়া/দেয়ায় মাত্রাতিরিক্ত মনোযোগী হয়ে পড়েছি। এ রাস্তা বদলানো জরুরি হয়ে পড়েছে। আমাদের অধিক পড়া, শেখা, করে অভিজ্ঞতা লাভের সময়ে এ+ তকমা লাগানোয় অধিকতর ব্যস্ত হয়ে নিজেদের সন্তানদের সর্বনাশ করছি।

এ কথা মনে রাখা দরকার কেন্দ্রীয়ভাবে পরীক্ষা হলে স্কুলের পড়ায় গুরুত্ব কমবে কোচিংয়ের মাহাত্ম বৃদ্ধি পাবে। স্কুলে স্কুলে লেখাপড়া যাচাই-বাছাই হলে ওসব আলগা ব্যবসায় আর চলার কথা নয়। সব কিছুই কেন্দ্রীয়করণের বেলায় পরীক্ষাকে বিকেন্দ্রীকরণের পর শিক্ষার্থী কর্তৃক স্বমূল্যায়নের কথা আমাদের কর্তাব্যক্তিদের মনে যে ধরবে না সেকথা আর নাই বা বললাম।
লেখাপড়া, শিক্ষণ আর প্রতিযোগিতার বিষয় নেই এ যুগে, তাই প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় অর্থহীন হতে আর দেরি নেই। আমাদের শিশুদের/তাদের অবুঝ অভিভাবকদের আজ বোঝানো দরকার শিক্ষণে প্রতিযোগিতা নিজের সঙ্গে, প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। শিক্ষক; নির্ভর শিক্ষাকে শিক্ষার্থী-নির্ভর করতে পারলে, শিক্ষার্থী বাঞ্ছিত উন্নতি না করলে শিক্ষককে জবাবদিহি করতে হলে শিক্ষার চাকা সচল হওয়ার পথ পাবে।

তবে তেমন শিখন-শেখানোতে পারদর্শী শিক্ষক তৈরিতে আমাদের যে ব্যাপক ঘাটতি আছে তা বলাই বাহুল্য। শিক্ষকদের চাকরি পূর্ব শিক্ষা নিয়োগ প্রক্রিয়া, পদায়ন, সমযোগ্যতার অন্যদের সমমান প্রদান, চাকরিতে উন্নতি, বদলি, চাকরিকালীন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নিয়মিত পরিবীক্ষণ, মূল্যায়নসহ যত্নসহকারে মনিটরিং ব্যবস্থা ব্যতিরেকে মানুষ গড়ার উপযুক্ত শিক্ষক পাওয়া দুষ্কর। তাই আমাদের তৈরি করতে হবে নেতৃত্ব দেয়ার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রধান শিক্ষক। এখনো আমাদের দেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণ এডহক/ প্রকল্পভিত্তিক বা উন্নয়ন বাজেট নির্ভর, কোনোভাবেই নিয়মিত বা রাজস্ব খাতের কাজ হয়ে ওঠেনি তাই এর জবাবদিহির তেমন বালাই নেই, উল্টো প্রকল্পের বরাদ্দ বছর শেষে নিঃশেষ করা যতটা না লক্ষ্য থাকে তারচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয় শিক্ষকদের উপযুক্ত করে তোলার মুখ্য উদ্দেশ্য।

তাই এখনই সময় আমাদের প্যারাডাইম শিফট করা, নইলে আমাদের সন্তানরা বহির্বিশ্বে কর্মবাজারে নিজের স্থান দখলে বারে বারে হোঁচট খাবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার মতো অবস্থা আমাদের নীতিনির্ধারকদের আছে কি? আমরা উন্নতি করছি। আমাদের জাতীয় আয় বাড়ছে। আমাদের দেশ সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা কিসের ইঙ্গিতবহ?

আমি আমার আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই ডা. পুষ্পিতা রায়ের লেখার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে। তিনি ভিকারুননিসার ছাত্রী ছিলেন। তাই তার লেখায় আবেগ ও যুক্তি দুটোই আছে।

পুষ্পিতা লিখছেন : পৃথিবী প্রতিদিন এগোচ্ছে। পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা দিয়ে প্রজন্ম বদলে যাবে। এটাই স্বাভাবিক। তবে এভাবে কেন! আমিও এই ভিকারুননিসারই ছাত্রী ছিলাম এবং এই প্রতিষ্ঠান থেকে যেদিন বেরিয়ে এসেছি সেদিনের পর থেকে প্রতিদিন এটাই ভেবে আসছি এই প্রতিষ্ঠানকে রিপ্রেজেন্ট করা আমার দায়িত্ব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ভিকারুননিসার আভিজাত্য আর ঐতিহ্য আমাদের বাংলাদেশের বহুদিনের ইতিহাসে একটা তাৎপর্যপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। দেশ সেরা প্রতিষ্ঠান একদিনে হওয়া যায় না। এই বটবৃক্ষের ছায়ায় বেড়ে ওঠা হাজার হাজার মেয়েরা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশ এবং দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক ময়দানে তাদের অভিনব যোগ্যতা আর পারদর্শিতার যথাযথ প্রয়োগ দিয়ে এই প্রতিষ্ঠান এবং এই দেশকে পরিচিতি দিয়ে আসছে। খারাপও অবশ্যই ছিল। ভিকারুননিসার মতো একটা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভালো খারাপের পরিসংখ্যান বিবেচনায় আনা একান্তই হাস্যকর ব্যাপার। সূর্যের মতো ঔজ্জ্বল্য ছড়াতে হলে তোমাকে সূর্যের মতো পুড়তেও হবে। ভিকারুননিসার ইতিহাসে অনেক আলোচিত ঘটনা ঘটে গেছে আজ পর্যন্ত। এবং এটা খুবই স্বাভাবিক। একটা প্রতিষ্ঠানকে এত উপরে উঠতে হলে ছোট-বড় অনেক সমালোচনার ঝড় সামলে নিতে হবে। এবং সেই ঝড়গুলোও ভিকারুননিসা তার মর্যাদা সমুন্নত রেখেই সামলে নিয়েছে এবং নিচ্ছে। এ ছাড়া একটা প্রতিষ্ঠানের সব সদস্য থেকে আপনি কখনো একই রকম আচরণ, নীতি, দায়িত্বশীলতা আশা করতে পারেন না। আমাদের মতো দেশে তো অবশ্যই না।

যে প্রসঙ্গে লিখতে যাচ্ছি সেটা হলো প্রজন্ম বার্তা। আমরা যখন ছাত্রী ছিলাম আমাদের শিক্ষকদের দূর থেকে দেখলেও থেমে যেতাম। মাথানত রেখে শ্রদ্ধা নিবেদন করতাম। শিক্ষকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ যদি হয় মানুষ গড়া তবে মানবিক ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করা এবং সেই ব্যাপারে যতœ নেয়া কিন্তু শিক্ষকদের গুরুদায়িত্ব। অরিত্রীর কাছে মোবাইল পেয়ে, নকল ধরে শিক্ষক তাকে শাসন করেছেন। তার বাবা-মাকে বলেছেন। অরিত্রী আত্মহত্যা করেছে। এবার শুরু হলো আন্দোলন। মেনে নিলাম শিক্ষকের ব্যাপারটা নিয়ে আগানোর পদ্ধতিতে ভুল ছিল, সঠিক ছিল না। কিন্তু আপনাদের মধ্যে কজন বলতে পারবেন অরিত্রী ভুল করেনি? কজন বলতে পারবেন অরিত্রীকে শাসন করা ভুল হয়েছে? কজন বলতে পারবেন এ ব্যাপারে শিক্ষকের পদক্ষেপ নেয়া উচিত হয়নি?

নবম শ্রেণির ক’জন ছাত্রের হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে অভিভাবকরা কি ঠিক কাজ করেছিলেন? মেডিকেলে চান্স পাওয়ার পর প্রথম মোবাইল কিনেছিলাম বাবা-মাকে নিয়ে। পড়ালেখার বাইরে যে অন্য একটা পৃথিবী আছে সেই পৃথিবীর সঙ্গে পরিচিত হতে আরো অনেক বছর লেগেছে। আর এখনকার ছেলেমেয়েরা তো স্কুল জীবনে প্রবেশের আগে থেকেই জানে রিলেশনশিপ কি। এখন বিভিন্ন সমীক্ষায় ডিপ্রেশনের কারণ খুঁজতে গিয়ে পাওয়া যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। আমাদের ওই বয়সটাতে পড়ালেখা ছাড়া কোনো ডিপ্রেশন ছিল না। ঘুরেফিরে পরিবার, পড়ালেখা অর্থাৎ একাডেমিক আর সাংস্কৃতিক জগৎ নিয়েই ভাবনা। অবশ্যই সমাজ, দেশ, পৃথিবী বাদ দিয়ে নয়। সবকিছু মিলিয়ে একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়েই এসেছি। কিন্তু আমরা যদি পিছিয়ে না থাকি ওরা কি খুব এগিয়ে যাচ্ছে? প্রজন্মের এভাবে এগিয়ে যাওয়া সমাজকে কতটা ইতিবাচক দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে? তারা ভবিষ্যতে দেশকে কীভাবে পরিচিত করবে পৃথিবীর কাছে? ডিজিটালাইজেশনের প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়াতে প্রজন্ম এভাবে বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। আমরা আধুনিক হব।

তবে নিজস্বতার বিসর্জনে ডিজিটালাইজেশনকে স্বাগতম জানানো ভয়াবহ। তাই নিয়ন্ত্রণ আবশ্যিক। এই নিয়ন্ত্রণ রাখাটাও একটা শিক্ষণীয় ব্যাপার। এই শিক্ষাটা ওদের দেয়ার দায়িত্ব কার?

শিক্ষকের ত্রুটি তো ছিলই। একজন শিক্ষার্থীর ত্রুটিকে তার নিজের কাছে এবং মা-বাবার কাছে প্রতিষ্ঠিত করার অবশ্যই একটা সংযত পদ্ধতি আছে। প্রশিক্ষণ এবং কাউন্সেলিংয়ের একটা বিশাল শূন্যস্থান এখানে সুস্পষ্টভাবেই পরিলক্ষিত। শিক্ষকের এই ভুল নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু ভিকারুননিসা আসবে কেন? এটা তো আমাদের দেশীয় সমস্যা। শিক্ষাব্যবস্থায় ত্রুটি আমাদের জাতীয় সমস্যা। পরিবারকে বাদ দিয়ে এই আলোচনা সম্মুখে যায় কি করে? একজন সন্তানকে মানবিক করে গড়ে তুলতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা তো পরিবারের। সেখানেও তো বড় রকমের একটা ফাঁকা গর্ত।

আমরা সামনে-পেছনে অসংখ্য গর্ত রেখে সামনে আগানোর চেষ্টা করছি। এটা ভালো লক্ষণ নয়। আমাদের সময় থাকতেই সাবধান হতে হবে।

বিভুরঞ্জন সরকার : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।