৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দিন

আগের সংবাদ

ইউরোপজুড়ে মাফিয়া ধরার অভিযান, আটক ৯০

পরের সংবাদ

সামনে নির্বাচন: বুক বাঁধছে জনগণ

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৫, ২০১৮ , ৮:৩৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: ডিসেম্বর ৫, ২০১৮, ৮:৩৫ অপরাহ্ণ

কামাল লোহানী

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

আমরা জনগণ ভোটার মাত্রই আশাবাদী। দেশে ভালো নির্বাচন হবে, প্রতিনিধিরা সবাই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে বিজয়ী হবেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ যারা তারা সরকার বাঁধবেন। আর তারপর আমরা আশা করব দুর্নীতি ও দুঃশাসন ব্যতিরেকে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।….আমাদের এ আশা কি পূরণ হবে? এটাই দেখব নতুন ইংরেজি বছরে। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত থাকুক এই শুভ কামনা রইল। কারণ যুদ্ধাপরাধী প্রভাবিত রাজনৈতিক শক্তির হাতে ক্ষমতা গেলে যে কি হয় তার হদিস এ দেশের মানুষ খুব ভালো করেই জানেন।

সামনে যে একাদশ জাতীয় নির্বাচন, তাই নিয়ে কথা বলছিলাম, নির্বাচনকে উপলক্ষ করে যেসব রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেনি এমনকি বিএনপিও পর্যন্ত তাদের বিশ দল নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারেনি কেবলই ঘরে বসে হুমকি-ধমকি দিয়েছে এবং মাঝেমধ্যে মানববন্ধন করেছে কিংবা প্রেসক্লাবের ব্যয়বহুল মিলনায়তনে বসে তত্ত্ব আওড়েছে, তাতে সরকারের কিচ্ছু আসে যায়নি, এরা ভবিষ্যতে তাহলে কী করবে? অথচ আজ কেন গণফোরাম জাসদ রব আর মান্নার নাগরিক ঐক্য আর বি চৌধুরীর বিকল্পধারা এক হয়ে ‘রা’ করে উঠল। আবার এদের মধ্যেই ভাঙন দেখা দিল বি চৌধুরী চলে গেলেন, কাদের সিদ্দিকী এসে যোগ দিলেন কামাল হোসেনদের সঙ্গে।

এখন প্রশ্ন হলো- গত দশ বছরে এরা যাই করুক না কেন এখন অন্তত জেগে উঠেছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে, তাতে তাদের সাধুবাদ জানাই। কিন্তু আপনাদের দলে ক’জন লোক আছেন আর ক’টাই বা আসন পেতে পারবেন? আবার তাই নিয়ে আসন ভাগাভাগির লড়াই চলছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের একজন হিসেবে বিএনপি সবচেয়ে বড় দল। স্বাভাবিকভাবেই তারাই বৃহদাংশ দাবি করবেন, করছেনও। বিএনপির ভেতর নানা অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে জামায়াতকে নিয়ে এবং সংগঠনহীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অংশীদারদের নিয়ে।

এ কথা ঠিক নাগরিক ঐক্য, জাসদ রব, কাদের সিদ্দিকীর কৃষক-জনতা লীগ এবং কামাল হোসেনের গণফোরাম, যারা যে ক’টা আসনই পান না কেন তাদের বিএনপি-জামায়াতের সমর্থন নিয়েই শেয়ালের মতো আঙ্গুর ফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে অনেকে অনেক কথা বলছেন। দক্ষতা, যোগ্যতা, পারদর্শিতা ইত্যাদি নিয়ে নানা সময়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করছেন।

আর নির্বাচন কমিশনও মাঝেমধ্যে অদ্ভুত আচরণ করে মানুষের মনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক করছেন। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান হয়ে নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ ব্যক্তি যদি মাঝেমধ্যেই কথার ব্যত্যয় ঘটান তাহলে তো প্রশ্ন উঠতেই থাকবে। তিনি এমন একটি অবস্থানে রয়েছেন যেখানে থেকে তাকে ভেবেচিন্তে প্রতিটি শব্দ ব্যবহার এবং বাক্য নির্মাণ করতে হবে।

যদিও এ পর্যন্ত আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশন একটি সুস্থ ও সুষ্ঠু প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারেনি, তাতে নির্বাচনে যারা অংশগ্রহণ করছেন তাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না, দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে দেশের নাগরিক এবং ভোটারদের। দলীয় সরকারের প্রাসঙ্গিকতা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনই দেশের প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলাসহ প্রাসঙ্গিক সব বিষয়ের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করার কথা।

কিন্তু আমার মনে হয়, বর্তমান নির্বাচন কমিশন কি সে দায়িত্বটি গ্রহণ করতে পেরেছেন? মনে হয় না। যার কারণে বিএনপির মতো দল হরহামেশাই গ্রেপ্তারের কথা বলছে, মুখে লাখ লাখ বললেও কাগজে কলমে শত শত গ্রেপ্তার হওয়ার খবর নির্বাচন কমিশনকে জানাচ্ছে। আজো পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন তাদের কর্তৃত্ব পুলিশ প্রশাসনের ওপর ফলাতে পারেনি বলেই মনে হচ্ছে।

আমার আরেকটি কথা মনে হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত বা তাদের নির্বাচনী সময়সূচি নির্বাচনের তারিখ ইত্যাদি সম্পর্কে সবার সঙ্গে আলোচনা করেই তারা তারিখ ঘোষণা করবেন। কিন্তু তাদের প্রতিনিধি না করে আমরা প্রায়ই দেখছি একটি দলীয় কর্মকর্তা এ জাতীয় কথাগুলো আগাম বলে ফেলছেন।

এতে করে নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে মানুষের সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে। আবার ইলেকশন কমিশন নিজেদের মধ্যেও ঐকমত্য হতে পারছেন না কখনো কখনো। তারও যে বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে জনসাধারণ্যে, তাতে করেও মানুষ অনেকটা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। কমিশনের নিজেদের মধ্যে বিরোধ থাকলে তা প্রকাশ্যে আসা উচিত নয়, এই নীতি তাদেরও মানতে হবে। নীতিমালা ভঙ্গ করার বিষয়ে অন্যদের সতর্ক করে যদি নিজেরাই সেই অপরাধ করেন, তাহলে কি প্রার্থীদের মধ্যে নীতিমালা ভঙ্গের প্রবণতা বেড়ে যাবে না।

নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অথবা অন্য কোনো কমিশনার অথবা সচিব যখন কথা বলবেন তাদের উচিত একমত হওয়ার পর সেই বিষয়টি প্রয়োজন হলে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করবেন। এর ব্যত্যয় ঘটলে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সন্দিহান হয়ে পড়েন যে জাতীয় নির্বাচনের মতন এত বড় একটি ঘটনা আদৌ কি তারা পরিচালনা করতে পারবেন? এটা হতে দেয়া কোনোক্রমেই কমিশনের জন্য ভালো নয়। ইভিএম ও সেনাবাহিনী তলব করার ব্যাপারে দীর্ঘদিন থেকে তর্ক-বিতর্ক শেষে এতদিনে কমিশন সিদ্ধান্ত নিলেন সীমিত আকারে কয়েকটি জায়গায় এটি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হবে। আর সেনাবাহিনী মোতায়েন করার ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত নিলেন স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নির্বাচনের ১৫ দিন আগে এবং নির্বাচনের ১৫ দিন পর পর্যন্ত তারা দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা সম্পর্কে দেখভাল করবেন। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে নির্বাচন কমিশন দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে থাকার কারণে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছিলেন না, তাই তাদের মধ্যে হয়তো টানাপড়েন ছিল।

অবশেষে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন এটি রাজনৈতিক দল ও নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর তাদের অধিকারকে ব্যবহার করে, তারা মাত্র পাঁচজন একমত হতে নিশ্চয়ই পারতেন কিন্তু যে সিদ্ধান্তহীনতা আমরা লক্ষ করলাম তাতে মনে হলো নির্বাচন কমিশন কারো দিকে তাকিয়ে ছিল। নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা নিয়েও অস্থিরতা দেখা গেল। একটা শিডিউল ঘোষণা করলেন, তারপর বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঘোরতর আপত্তি জানিয়ে এক মাস পেছানোর সোচ্চার দাবি উত্থাপন করলেন। কমিশন তাকেও মেনে নিয়ে এক মাসের পরিবর্তে এক সপ্তাহ সময় বাড়িয়ে দিলেন। বিরোধীদের একগুয়ে কতগুলো দাবি, যা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয় তাও কমিশন দেখলাম শেষ পর্যন্ত ভেবেচিন্তে সাশ্রয় করলেন। তাতেও অবশ্য বিএনপি এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতার বেশ গর্জন করলেন।

অবশেষে ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ জাতীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হলো। শিডিউল অনুযায়ী সবাই মনোনয়নপত্র কেনা, জমা দেয়া এবং অপেক্ষা করা, সবই করলেন কিন্তু দেখা গেল বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়নপত্র অনেক বাতিল হয়ে গেল। সে জন্য আপিলও করা যাবে কিন্তু কতটা ফল হবে আর কেনইবা এতগুলো বাতিল হলো সাধারণ্যে এ নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে। যাকগে সেসব কথা, ফয়সালা তো হবেই এবং নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। অবশ্য এসব অনাচারের জন্য বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জনের হুমকি দিয়েছে, আমার মনে হয়, অসাড়ের তর্জন-গর্জনই সার এ কথা তো বলা যাবে না তবে এটুকু বলতে পারি এ ধরনের রাজনীতিতে অবস্থার উত্থান-পতন অথবা দলগুলোর ভূমিকায় হেরফের তো হয়ই।

অবশ্য বিএনপি যতই তর্জন-গর্জন করুক না কেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কারণেই নয় নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে এবং জামায়াতকে খুশি রাখার কারণে তারা নির্বাচন অবশ্যই করবে। বিএনপি অবশ্য আগাগোড়াই স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে বলে আসছিল এবং যে দফাওয়ারি দাবি উত্থাপন করেছিল, তার মধ্যে দলীয় চেয়ারম্যান খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক জিয়ার দ- মওকুফের দাবিও উত্থাপন করেছিল।

এ ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবেন না নেতারা সেটাও বলেছিলেন। কিন্তু কি জানি কোনো জাদুতে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে ওই দাবিগুলো আপাতত বিসর্জন দিয়ে শেখ হাসিনার সংলাপের মাধ্যমে কথোপকথন শেষে নির্বাচনে আসতে রাজি হয়েছেন। এখান থেকে ওরা ফিরতে পারবেন না। যদি ফেরেন তবে ভোটার তথা সাধারণ মানুষের কাছে বিএনপির চরিত্র উন্মোচিত হয়ে যাবে অর্থাৎ তারা নিশ্চয়ই কোনো চক্রান্তের জাল ফেঁদেছিলেন কামাল হোসেনদের নিয়ে সেটি কার্যকর হচ্ছে না। বলতে গেলে অনেক কথাই আসবে কারণ বিএনপি ইতোমধ্যে কত যে ভোল পাল্টেছে তার কোনো হিসাব আমার কাছে নেই। এদিকে নির্বাচনে থাকলে বিএনপির মতো বড় একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনাকে নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আসন সংখ্যা নিজেদের হাতে রাখা উচিত। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করার কারণে তা কতটা পারবেন সেটাও বিবেচ্য। অবশ্য জামায়াতের সঙ্গে তাদের যে গাটছড়া তা বজায় রাখার জন্য নিবন্ধনহীন জামায়াতের প্রার্থীদের বিএনপির টোপর পরিয়ে ধানের শীষে নির্বাচনের সুযোগ করে দিচ্ছে মোট ২৫ জনকে।

আর ২২ জনকে স্বতন্ত্র দাঁড় করিয়ে তাদের সমর্থন দেয়ার ব্যবস্থা করছে। সাধারণ মানুষ এই হিসাব-নিকাশগুলো ভালোভাবেই জানেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ তার চৌদ্দ দল ও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে মহাজোট প্রার্থিতা নির্ধারণ প্রায় ঠিক করে ফেলেছে। আওয়ামী লীগ কিন্তু তার শরিকদের এবং জাতীয় পার্টিকে হিসাব করেই আসন দিয়েছে কারণ নিজের আসন সংখ্যা এমনভাবে নির্ধারণ করেছে, যাতে অন্য কেউ জিতুক না জিতুক তার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাখতে পারে।

অবশ্য জাতীয় পার্টি স্থানীয়ভাবে এরশাদের যে জনপ্রিয়তা তা থেকে রংপুরে এবং সিলেটে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর শরিক যারা রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, দিলীপ বড়–য়া এরাও দু-চারটি করে আসন পেয়েছেন, এই আসনগুলোর পরিণতি কি হবে বলা মুশকিল।

ওদিকে গণতান্ত্রিক বাম জোট প্রায় দেড়শ আসনে প্রার্থী নির্বাচন করেছে। এদের মধ্যে দুয়েকজন যদি ঘটনাচক্রে জিতেই যান তবে সবাই বিস্মিত হবে। জনগণের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক থাকে না তারা নির্বাচনের সময় যতই ভালো কথা বলুন না কেন, ভোটার তাকে কেন জানি না নির্বাচিত করতে চান না।

তবে হ্যাঁ ইতোপূর্বে নির্বাচনে দাঁড়ানো বাম প্রার্থীদের দুয়েকজনের ব্যাপারে জানি, তাদের ভোটাররা বলেছেন, ‘আপনারা ভালো মানুষ, আপনাদের নির্বাচিত করলে ওই নষ্ট রাজনীতির কুশীলবদের সঙ্গে অগণতান্ত্রিক, দুর্নীতিবাজ তথা এ ধরনের নানা কাজ কি করতে পারবেন? লোকে জানে আপনারা সেটা করতে পারবেন না। তাই আপনাদের কেউ ভোট দেবে না’।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হঠাৎ যে সংলাপ করলেন তা থেকে কিন্তু তারা অনেক ছাড় পেয়েছেন। যেমন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান খুলে দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘প্রয়োজন হলে আমি ওখানে একটি মঞ্চ তৈরি করে দেব যার জন্য সামান্য ভাড়াও দিতে হবে’।

অথচ এই ছাড় পাওয়ার পর বিএনপি এককভাবে নয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে একটি জনসমাবেশ করেছে। তাতে ওনারা বলছেন লাখেরও বেশি মানুষ হয়েছিল কিন্তু সাংবাদিক বা সাধারণ শ্রোতা যারা তারা বিশ-পঁচিশ হাজারের ওপরে বলতে চান না। যাকগে সেগুলো ওদের মাথাব্যথা।

আমাদের মাথাব্যথা একটাই যেন নির্বাচনটা স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক হয়। বিদেশিদের চাহিদা পূরণের জন্য নয়, কোনো প্রভুকে খুশি করার জন্যও নয়, এটি প্রয়োজন আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ চলার পথকে সুগম করার জন্য। সে জন্য আমাদের সজাগ থাকতে হবে যেন নির্বাচন বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকে। আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশন তাদের জেলা-উপজেলা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। শুনেছি পুলিশ প্রশাসনও নিয়মানুযায়ী নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আর্মি এলেও তারা তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। এত শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে লেজেগোবরে না করে ফেলেন সেই ভয়টা আমাদের শঙ্কিত করছে বৈকি। তবে আশা তো থাকবে ভালো নির্বাচন হবে। আমরা সবাই সাধারণ মানুষ দিন গুনছি কবে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে আদতেই নিজের ভোটটা দিতে পারব।

আবার গিয়ে না দেখি আমার ভোট দেয়া হয়ে গেছে। এই শঙ্কাতেই বুঝি ড. কামাল হোসেন নেতাকর্মীদের কেন্দ্র পাহারা দিতে বলেছেন। যেখানে সামরিক বাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ, আনসার ইত্যাদি সবাই থাকবে, তারপরও ড. কামাল হোসেন নেতাকর্মীদের কেন্দ্র পাহারা দেয়ার কথা বললেন কেন? তবে কি তিনি বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট বা এ ধরনের ভোট জালিয়াতির কথা চিন্তা করছেন? ড. কামাল হোসেন যাদের সঙ্গে গাটছড়া বেঁধেছেন, জানেন কি তাদের চরিত্র? ড. কামালদের নয়া দোস্ত বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে কি সব কাণ্ড করে ভোটে জেতে এবং জেতার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কি ধরনের নির্যাতন, নিপীড়ন চলে। বলছি না আওয়ামী লীগ এ ধরনের আচরণ করে না। কিন্তু এত হুমকি-ধমকি, আলাপ-আলোচনা, জোট বাঁধা, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপ করা এত কিছুর পর ভোট বর্জনের কথা কেন তার দোসররা বলছেন।

তবে কি সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পার থেকে আসা চক্রান্তের বলির পাঁঠা বানিয়ে ড. কামাল, রব, মান্নাকে জলে ভাসিয়ে বিএনপি কোনো নয়া ফাঁদ ভাবছে? বিরোধীরা যেমন জনগণের দোহাই দিচ্ছে সব কথাতেই কিন্তু ময়দানে দেখাতে পারছে না, সে দিক থেকে আওয়ামী জোট অনেকটাই পরিপুষ্ট। আর তাদের আমলে এই দশ বছরে উন্নয়ন যে হয়েছে সে কথা অস্বীকার করা যাবে না। তাই যাদের সঙ্গে কেয়ামত পর্যন্ত সংলাপের কোনো সুযোগ ছিল না, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হঠাৎ করেই তাদের সঙ্গে সংলাপে বসলেন।

তবে কি তিনি আশ্বস্ত না হয়েই এমন বাজি ধরলেন? আমরা জনগণ ভোটার মাত্রই আশাবাদী। দেশে ভালো নির্বাচন হবে, প্রতিনিধিরা সবাই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে বিজয়ী হবেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ যারা তারা সরকার বাঁধবেন। আর তারপর আমরা আশা করব দুর্নীতি ও দুঃশাসন ব্যতিরেকে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।….আমাদের এ আশা কি পূরণ হবে? এটাই দেখব নতুন ইংরেজি বছরে।

তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত থাকুক এই শুভ কামনা রইল। কারণ যুদ্ধাপরাধী প্রভাবিত রাজনৈতিক শক্তির হাতে ক্ষমতা গেলে যে কি হয় তার হদিস এ দেশের মানুষ খুব ভালো করেই জানেন।

কামাল লোহানী : বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।