নির্বাচনে লড়তে চান গ্রেনেড মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পিন্টুও

আগের সংবাদ

আয়কর মেলায় করদাতাদের উপচে পড়া ভিড়

পরের সংবাদ

আ.লীগ চায় ধরে রাখতে, বিএনপির চেষ্টা পুনরুদ্ধার

প্রকাশিত হয়েছে: নভেম্বর ১৫, ২০১৮ , ৩:৪২ অপরাহ্ণ | আপডেট: নভেম্বর ১৫, ২০১৮, ৩:৪২ অপরাহ্ণ

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে ঝিনাইদহ-২ আসন। গ্রামগঞ্জ, হাটবাজার ছেয়ে গেছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের পোস্টার ও ডিজিটাল ব্যানারে। যদিও এগুলো সরানোর নির্দেশ রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। একসময় আসনটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত থাকলেও ২০০৮ সালের পর থেকে এটি আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা এবং হরিণাকুণ্ড উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসন। এখানে বর্তমান সংসদ সদস্য হিসেবে আছেন আওয়ামী লীগের তাহজীব আলম সিদ্দিকী সমি। তিনি ছাড়াও এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক প্রার্থী প্রচারণায় রয়েছেন।
আওয়ামী লীগের যেসব প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন- বর্তমান সংসদ সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী সমি, সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সফিকুল ইসলাম অপু, ঝিনাইদহ পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু এবং শিল্পপতি নাসের শাহরিয়ার জাহেদী। অপরদিকে বিএনপি থেকে যাদের নাম পাওয়া গেছে ও নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে রয়েছেন তারা হলেন- ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা মসিউর রহমান, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও হরিণাকুণ্ড উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এডভোকেট এম এ মজিদ ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর রবিউল ইসলাম লাবলু।
ঝিনাইদহ আসনটিতে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মসিউর রহমান বিজয়ী হয়েছিলেন। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে সফিকুল ইসলাম অপু এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাহজীব আলম সিদ্দিকী সমি নির্বাচিত হন। পরে সমি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আওয়ামী লীগের যে ৪ প্রার্থী এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন তাদের সম্পর্কে দলীয় ভোটাররা জানান, সফিকুল ইসলাম অপু বিএনপির
শক্তিশালী প্রার্থী মসিউর রহমানকে পরাজিত করেছেন। কিন্তু ঝিনাইদহের রাজনীতিতে ৭ বছর সময় পেয়েও তিনি তার গ্রহণযোগ্যতা ও কর্মী সৃষ্টি এবং তাদের নিজের বলয়ে রাখতে ব্যর্থ বলে দলের অনেকে মন্তব্য করেন। বর্তমান সংসদ সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী সমির বিষয়ে বলেন, তিনি বর্তমান সংসদ সদস্য হিসেবে রয়েছেন। তবে তিনি নির্বাচন করেছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে।
ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরে আলম সিদ্দিকী ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেছিলেন। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে সফিকুল ইসলাম অপু এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাহজীব আলম সিদ্দিকী সমি নির্বাচিত হন। ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাইদুল করিম মিন্টু সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর ঝিনাইদহে আওয়ামী লীগের রাজনীতির চিত্র বদলে যায়। তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি, গত ৪ বছরে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন। প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সহযোগী সংগঠনকে সুসংগঠিত করেছেন তিনি। তা ছাড়া বিগত ৪ বছরে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা মিন্টুর জনপ্রিয়তা আরো বেড়েছে। মেয়র মিন্টু সদর হরিণাকুণ্ড উপজেলা ও পৌর কাউন্সিল করে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করে রেখেছেন।
অপরদিকে প্রায় ৩৩ বছর পর ফিরে পাওয়া ঝিনাইদহ-২ আসনটি আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে ধরে রাখতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু মাঠপর্যায়ে ব্যাপক কাজ করছেন। সবপর্যায়ের মানুষের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি সভা, সেমিনার, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন তিনি। ধরতে গেলে তিনি এখন ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির নীতিনির্ধারকের ভ‚মিকায় রয়েছেন।
এ ছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী সাইদুল করিম মিন্টু একেবারেই তৃণমূল থেকে উঠে আসা, অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, জেল-জুলুম-হুলিয়া মাথায় নিয়ে রাজপথে থেকে যিনি রাজনীতি করে আজ পর্যন্ত জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। তরুণ ও পরিশ্রমী আওয়ামী লীগ নেতা সাইদুল করিম মিন্টু সম্পর্কে দলীয় নেতারা বলেন, তরুণ এই নেতা পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয়ে পৌর এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, ড্রেন, আধুনিক মানের মার্কেট তৈরি, পার্ক নির্মাণ, গরিব-অসহায় ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় সহযোগিতা করাসহ সব নাগরিকের সমস্যার সমাধান করছেন। ঝিনাইদহ পৌরসভাকে ডিজিটালে রূপান্তরিত করেছেন। বাংলাদেশের মধ্যে ঝিনাইদহ পৌরসভাকে একটি আধুনিক ও একটি মডেল পৌরসভায় রূপান্তরিত করেছেন। এ ছাড়া তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে যেতে পেরেছেন।
বর্তমান সরকারের আমলে ঝিনাইদহ পৌরসভাতে অভ‚তপূর্ব উন্নয়ন করেছেন সাইদুল করিম মিন্টু। এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। ঝিনাইদহ জেলার রাজনৈতিক মাঠ এখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দখলে। কোনো ষড়যন্ত্র জাতির উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। দল মনোনয়ন দিলে অব্যাহত উন্নয়নে ঝিনাইদহবাসীর পাশেই থাকবেন বলে জানান সাইদুল করিম মিন্টু।
আওয়ামী লীগের আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী শিল্পপতি নাসের শাহরিয়ার জাহেদী সম্পর্কে ভোটাররা জানান, তিনি এলাকার অসহায় গরিব ও দুস্থ মানুষের সহায়তা করেন প্রতিনিয়ত। তার বাবা ঝিনাইদহের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, ভাষাসৈনিক জাহিদ হোসেন মুসা মিয়া। তার অবস্থানও বেশ ভালো। তবে তিনি দলীয় মনোনয়ন পেতে এখন পর্যন্ত কোনো লবিংয়ে জড়াননি বলে জানা গেছে।
অপরদিকে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা মসিউর রহমানের বিকল্প তেমন কোনো প্রার্থী নেই বলে দলীয় নেতাকর্মীরা জানান। কারণ তিনি এ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ৩ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ঝিনাইদহ-২ আসনে তিনি ব্যাপক উন্নয়ন করেছিলেন। তবে ২০১৭ সালে ২৫ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশনের করা একটি মামলায় আদালত মসিউর রহমানকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন। তবে তিনি ওই মামলায় বর্তমানে জামিনে আছেন। এ অবস্থায় মসিউর রহমান নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কিনা এ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন নেতাকর্মীরা। আর এই সুযোগটি বা বিকল্প প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট এম এ মজিদ ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির মীর রবিউল ইসলাম লাভলু। তারা এ আসন থেকে প্রচারণায় রয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, ঝিনাইদহ সদর ও হরিণাকুণ্ডর উপজেলার ২টি পৌরসভা, ২১টি ইউনিয়ন নিয়ে ঝিনাইদহ ২ আসন গঠিত। এ আসনে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭৩৯ জন ভোটার। এর মধ্যে মহিলা ভোটার ১ লাখ ৯৬ হাজার ১৯৬ এবং পুরুষ ১ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৩ জন।
নির্বাচনের এক জরিপে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ১ লাখ ৬২ হাজার ৪৬৪ ভোটের মধ্যে বিএনপির প্রার্থী মসিউর রহমান পান ৭৬ হাজার ০১ ভোট। তার নিটকতম প্রার্থী আওয়ামী লীগের মতিয়ার রহমান পান ৩৭ হাজার ১৬৬ ভোট। আর এ আসন থেকে জামায়াতের আবুল কাশেম পান ৩৩ হাজার ৯৭৫ ভোট। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির মসিয়ার রহমান পান ৮৩ হাজার ৯৬৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী আওয়ামী লীগের নূর-ই-আলম সিদ্দিকী পান ৬৯ হাজার ৩৫৩ ভোট, জায়ামাতের নূর মোহাম্মদ পান ৪১ হাজার ২৪৭ ভোট। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নূর-ই-আলম সিদ্দিকী পান ১ লাখ ১৭ হাজার ৭০৬ ভোট এবং বিএনপির মসিউর রহমান পান ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫১ ভোট। এ আসনে বিএনপির মসিউর রহমান নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের সফিকুল ইসলাম অপু নৌকা প্রতীকে পান ১ লাখ ৬১ হাজার ৬২ ভোট। তার নিকটতম প্রার্থী বিএনপির মসিউর রহমান পান ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৩৬ ভোট। সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সফিকুল ইসলাম অপু পান ৫১ হাজার ২৪৪ ভোট। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাহজীব আলম সিদ্দিকী সমি পান ৬৭ হাজার ৯৮৪ ভোট। তাহজীব আলম সিদ্দিকী এ আসন থেকে নির্বাচিত হন।