অর্থবহ সংলাপ ও আগামী সাধারণ নির্বাচন

আগের সংবাদ

বাবার মৃত্যুর ১২ দিন পর ছেলের মৃত্যু

পরের সংবাদ

নৈতিক চেতনা: ধর্ম ও আদর্শ

প্রকাশিত হয়েছে: নভেম্বর ৭, ২০১৮ , ৮:২২ অপরাহ্ণ | আপডেট: নভেম্বর ৭, ২০১৮, ৮:২২ অপরাহ্ণ

আবুল কাসেম ফজলুল হক

প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনের নামে, নারীবাদী আন্দোলনের নামে সাধারণ মানুষের ধর্মবোধকে আঘাত করা- ক্রমাগত আঘাত করা কি ঠিক হয়েছে? এই আঘাত করার এবং গণতন্ত্রকে ব্যর্থ করে চলার ফল কী হয়েছে? জীবন, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব কি কখনো শান্তি-সুখের স্থান হয়ে উঠতে পারে সুস্থ নৈতিক চেতনা, সুষ্ঠু নীতি, উৎকৃষ্ট আইন ও উন্নত সরকারের অবলম্বন ছাড়া? স্বার্থঘটিত বিরোধের মীমাংসা তো মানুষকেই করে চলতে হবে।

বাংলাদেশের এবং অন্য সব দেশের অধিকাংশ লোকই এমনো মনে করে থাকে যে নীতির উৎস ধর্ম, ভালো-মন্দ নির্ণয় করতে হলে এবং ভালো জীবনযাপন করতে হলে অবশ্যই ধর্ম অবলম্বন করে চলতে হবে, ধর্মে ভালো-মন্দ নির্দেশিত আছে। তারা মনে করে, স্বার্থগত বিরোধের সর্বোৎকৃষ্ট মীমাংসার জন্যও ধর্ম অপরিহার্য।

তাদের মতে, একমাত্র ধর্মীয় নীতি অবলম্বন করে ন্যায় স্বার্থ ও হীন স্বার্থের পার্থক্য বোঝা যায়। তারা মনে করে ভালো জীবনযাপনের উপায় কেবল ধর্মেই নির্দেশিত আছে। ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায় বিচারের প্রয়োজনে, নীতির ও নৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজনে তারা ধর্মগ্রন্থ, ধর্ম প্রবর্তকের জীবনের ঘটনাবলি ও বাণী ইত্যাদিকে পথপ্রদর্শক রূপে অবলম্বন করে।

বাস্তবে দেখা যায়, যে ব্যক্তি যে ধর্মে জন্মগ্রহণ করে অর্থাৎ যার যেটি পৈতৃক ধর্ম- উত্তরাধিকার সূত্রে সে সেই ধর্মেরই অনুসারী হয় এবং কেবল সেই ধর্মের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ও ধর্মভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে, এমন লোকের সংখ্যা আজো পৃথিবীতে বিপুল।

সাধারণত নৈতিক সমস্যাকে- ভালো-মন্দ বিচারের এবং ভালোকে অবলম্বন করে জীবনযাপনের সমস্যাকে তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করে। ধর্মের আওতার বাইরে গিয়ে বিকাশশীল জীবনধারা ও প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে মানুষের ওপর আস্থা রেখে মানবীয় বিচারবুদ্ধি দিয়ে তারা নৈতিক বিষয়াদিকে স্বার্থঘটিত সমস্যাবলিকে বিচার করার ও সমাধান করার কথা ভাবতে পারে না। তারা ঈশ্বর প্রদত্ত বিধানের কাজ মানবসৃষ্ট বিধান দ্বারা সম্ভবপর বলে মনে করে না।

অবশ্য প্রবৃত্তির তাড়নায় তারা ধর্মের নীতিকে লঙ্ঘনও করে। মানুষ সব সময় নিজের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে না। মানুষ নীতি ও আইন মেনে চলে, আবার লঙ্ঘনও করে।

কোনো ধর্মের স্বরূপ বুঝতে হলে সেই ধর্মের প্রবর্তকের জীবন, দেশ-কালের চাহিদা, প্রচারিত বিষয় ও তার ঐতিহাসিক ভূমিকা- তার প্রচারিত ধর্মের উদ্ভব, বিকাশ ও পরিণতি বিচার করে বুঝতে হয়। কোনো ধর্মের ভূমিকাই সেই ধর্মের বিস্তার ও বিকাশের সব পর্যায়ে এক রকম থাকে না।

ইসলামকে বুঝতে হলে হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর জীবন, তখনকার আরবের অবস্থা ও ঐতিহাসিক পটভূমি, প্রচলিত অন্যান্য ধর্ম, দেশ-কালের বৈশিষ্ট্য ও চাহিদা, ইসলামের শিক্ষা, স্বার্থগত বিরোধ মীমাংসায় ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, আর্থ-সামাজিক, রাষ্ট্রিক বিষয়াদি নিয়ে ইসলামের ব্যবস্থা- ইসলামের উদ্ভব, বিকাশ ও বিস্তার ইত্যাদি কারণকার্য সূত্র ধরে গভীরভাবে বুঝতে হবে। অন্যান্য ধর্মকেও একইভাবে বুঝতে হবে। বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে তুলনামূলক বিচারও প্রাসঙ্গিক।

প্রত্যেক ধর্মেই একই সঙ্গে জাগতিক ও লৌকিক বিষয় এবং অজাগতিক ও অলৌকিক বিষয় আছে। দুই ধারার ব্যাপারগুলোকেই কারণকার্য সূত্র অবলম্বন করে বিচার করতে হবে। অলৌকিক বিষয়গুলোকে বুদ্ধি-বিচার-বিজ্ঞান দিয়ে বোঝা যায় না, সেগুলো নিতান্তই বিশ্বাসের ব্যাপার- বিচার-বিবেচনাহীন বিশ্বাস। কেউ অন্ধভাবে বিশ্বাস করবেন কি করবেন না- সেটা ব্যক্তির বিবেচনার ওপরই ছেড়ে দেয়া উচিত।

এ ক্ষেত্রে কোনো পক্ষ থেকেই কোনো প্রকার জবরদস্তি, শক্তি প্রয়োগ কিংবা বাধ্যবাধকতার অনুকূলে কোনো নীতি কিংবা আইন কিংবা প্রথা থাকা উচিত নয়। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্নে যে কোনো দিক থেকে শক্তি প্রয়োগ ও জবরদস্তিকে দমন করার জন্য প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই অবশ্যই কার্যকর আইন রাখতে হবে।

ধর্মের জাগতিক ও লৌকিক ব্যাপারাদি বিচার করতে গেলে দেখা যায়, প্রত্যেক ধর্মেরই উদ্ভব, প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের মূলে রয়েছে নৈতিক চেতনা। ধর্মপ্রবর্তক ও ধর্মপ্রচারকরা চালিত হয়েছেন নৈতিক চেতনা বা নৈতিক তাড়না দ্বারা আর লোকে নতুন ধর্ম গ্রহণও করেছে নৈতিক ক্ষুধার তাড়নায়। মানব স্বভাবের স্বরূপ অনুধাবন করে তারা চেষ্টা করেছেন জনগণের বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত নৈতিক বোধ ও চিন্তাকে সমন্বিত করে যুগোপযোগী নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে এবং নতুন নীতি ও আইন প্রণয়ন করতে।

মনে রাখতে হবে নৈতিক বিবেচনা এবং নীতি ও আইনের সঙ্গে সব সময়ই স্বার্থের ব্যাপার জড়িত থাকে। নীতি ও আইন দ্বারা আসলে স্বার্থের সমস্যারই সমাধান করা হয়। ধর্ম প্রবর্তকরা সন্ধান করছেন জীবনযাত্রার জন্য চিরন্তন নীতি, ধর্মের অনুসারীরাও চেয়েছেন চিরন্তন নীতি। কিন্তু কোনো নীতিই চিরন্তন হতে পারে না। কোনো নীতি সাময়িক, কোনোটি দীর্ঘস্থায়ী, কোনোটি আরো দীর্ঘস্থায়ী- কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়। প্রকৃতি বিকাশশীল, মানবজাতিও বিকাশশীল।

এ জন্যই কালে কালে নতুন নতুন অবস্থায় নতুন নতুন ধর্মের উদ্ভব ঘটেছে। প্রায় প্রত্যেক ধর্ম প্রবর্তকই প্রচলিত ধর্মকে বাতিল করে নতুন ধর্ম প্রবর্তন করেছেন। সেকালে ধর্মগ্রন্থ, ধর্ম প্রবর্তকদের প্রচারিত নীতি ও আইন অবলম্বন করে ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন ও রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে।

এ কালে তার স্থান দখল করেছে আইনসভা, জাতীয় সংসদ, বিধানসভা, লোকসভা, রাজ্যসভা ইত্যাদি দ্বারা প্রবর্তিত আইন ও সরকারি বিধিবিধান। মূল্যবোধের ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থা, প্রচার মাধ্যম, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদি এবং সাহিত্য ও শিল্পকলাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে বিবাহ ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে আজো ধর্মীয় আইন প্রচলিত আছে- অন্য সব ক্ষেত্রে মানবীয় আইন।

ধর্মকে মানবীয় ব্যাপার হিসেবে মানবীয় বিচার-বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে চাইলেই ভালো করে বোঝা যায়, তাতে ধর্মের অন্তর্গত নৈতিক ব্যাপারসমূহের স্বরূপও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধর্মীয় নীতির সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ নীতির তুলনা করে কারণকার্য বুঝতে চাইলেও ধর্মের ও নীতির স্বরূপ স্পষ্টতই হয়।

তবে ধর্মের অলৌকিক ব্যাপারগুলোকে মানবীয় বিচার-বুদ্ধির আওতায় আনলে সেগুলোর সভ্যতা স্বীকার করার কারণ পাওয়া যায় না। সেগুলো নিতান্তই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ব্যাপার। তবে সেগুলো নিয়ে বাস্তবসম্মত অনুসন্ধানের সুযোগ আছে।

মূল্যবোধ ও নৈতিক চেতনা ধর্মের ওপর নির্ভরশীল নয়, ধর্মই মূল্যবোধ ও নৈতিক চেতনার ওপর নির্ভরশীল। নৈতিক চেতনা থেকেই ধর্মের উৎপত্তি। ধর্ম থেকে নীতিকে আলাদা করে নিলে ধর্মে কি সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মনে আবেদন সৃষ্টি করার মতো কিছু অবশিষ্ট থাকে? রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে বাদ দিতে হলে মানুষের নৈতিক সমস্যার সমাধানের কার্যকর উপায় রাষ্ট্রব্যবস্থার অভ্যন্তরে গড়ে তুলতে হবে। তা না করা হলে ধর্মীয় শক্তির কর্তৃত্ব থেকে এবং রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার রাষ্ট্র মুক্তি পাবে না। বাংলাদেশ ‘মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলন’ ও ‘নারীবাদী আন্দোলন’ করতে করতে এখন ধর্মের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে দরকার ছিল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক নৈতিক চেতনা, গণতান্ত্রিক নীতি ও গণতান্ত্রিক আইন উদ্ভাবন করা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থায়, জাতীয় জীবনে ও জনজীবনে সেগুলো প্রয়োগ করা। মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনের নামে, নারীবাদী আন্দোলনের নামে সাধারণ মানুষের ধর্মবোধকে আঘাত করা- ক্রমাগত আঘাত করা কি ঠিক হয়েছে? এই আঘাত করার এবং গণতন্ত্রকে ব্যর্থ করে চলার ফল কী হয়েছে? জীবন, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব কি কখনো শান্তি-সুখের স্থান হয়ে উঠতে পারে সুস্থ নৈতিক চেতনা, সুষ্ঠু নীতি, উৎকৃষ্ট আইন ও উন্নত সরকারের অবলম্বন ছাড়া? স্বার্থঘটিত বিরোধের মীমাংসা তো মানুষকেই করে চলতে হবে। মানুষকেই তো ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত চেষ্টায় গড়ে তুলতে হবে শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ সুন্দর উন্নত পৃথিবী। পৃথিবীকেই পরিণত করা যাবে স্বর্গে। তার জন্য উন্নততর রাষ্ট্রীয় ও আন্তঃরাষ্ট্রিক আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতি প্রতিষ্ঠা করে চলতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় ও আন্তঃরাষ্ট্রিক নতুন নতুন সংঘ, সংস্থা, সংবিধান ইত্যাদি গঠন করতে হবে। রাজনীতি, রাজনৈতিক দল ও সরকারের বিকল্প নেই। এগুলোকে কী করে উন্নত চরিত্র দেয়া যাবে, সেটাই প্রশ্ন।

নৈতিক চেতনার সঙ্গে আদর্শের প্রশ্নও যুক্ত। আদর্শ কী? মানুষ ইতিহাসের ধারায় ও উত্তরাধিকার সূত্রে জীবনযাপনের জন্য যে অবস্থা লাভ করে, তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে না। সে চায় আরো উন্নত, আরো সমৃদ্ধ, আরো সুন্দর ও সুখকর অবস্থা। প্রকৃতির রহস্য সে জানতে চায়। সে কামনা করে সম্ভবপর সর্বোৎকৃষ্ট অবস্থা। চিন্তা ও কল্পনার সাহায্যে সে অভীষ্ট আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক ও সাংস্কৃতিক সর্বোৎকৃষ্ট অবস্থার রূপ ও প্রকৃতি নির্ণয় করে এবং সাধনা ও সংগ্রামের মাধ্যমে সেই অভীপ্সিত কল্পিত অবস্থায় উত্তীর্ণ হতে চায়। এই রকম কল্পিত সম্ভাব্য বাস্তবই আদর্শ।

মানুষ যেহেতু সামাজিক জীব, সে জন্য আদর্শের পরিকল্পনায় সমাজ ও সম্মিলিত প্রয়াস বিবেচিত হয়। মানববাদ (humanism), উপযোগবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদি এমনই আদর্শ। আদর্শকে বাস্তবায়িত করতে হয় আদর্শ-অভিমুখী কর্মসূচি ও কর্মপন্থা অবলম্বন করে। অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, আদর্শের মূলেও কাজ করে মানুষের স্বার্থবুদ্ধি এবং মূল্যবোধ ও নৈতিক চেতনা।

আধুনিক যুগে- ইউরোপের রেনেসাঁসের সময় থেকে- বিভিন্ন মানবীয় আদর্শ ক্রমিক গতিতে ধর্মের স্থান দখল করে নিয়েছে। তবে ধর্ম বিলুপ্ত হয়নি। বহুজনের ক্ষুদ্র-বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা, চিন্তা, আশা ও কামনা-বাসনাকে সমন্বিত করে আদর্শ-প্রবর্তকরা নিজেদের আদর্শকে রূপ দিয়েছেন। পর্যায়ক্রমিক সক্রিয় কর্মসূচি ও কর্মনীতির আশ্রয়েই আদর্শ জীবন্ত থাকে। আদর্শকে যদি বিকাশশীল রাখা হয় তাহলেই তা কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। আদর্শকে যদি ধর্মের মতো অপরিবর্তনীয় চিরন্তন নীতির সমষ্টিকে পরিণত করা হয় তাহলে কিছুকালের মধ্যেই তা অকেজো হয়ে পড়ে। মার্কসবাদের ক্ষেত্রে এটাই হয়েছে। কারণ কার্য সূত্রের ধারায় আদর্শকে যদি তার পটভূমি এবং উদ্ভব, বিকাশ ও পরিণতির মধ্য দিয়ে দেখা হয় তাহলেই আদর্শের স্বরূপ বোঝা সম্ভব হয়। ধর্ম কিংবা আদর্শ ছাড়া সমাজে, রাষ্ট্রে, যৌথ জীবনে মানুষ আশাবাদী কিংবা শুভবাদী থাকতে পারে না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মধ্যযুগেই ধর্ম প্রবর্তনের মাধ্যমে এবং আধুনিক যুগে আদর্শ প্রবর্তনের মাধ্যমে মনীষীরা উন্নততর নতুন পৃথিবী সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। বর্তমানে বিজ্ঞানের আবিষ্কার-উদ্ভাবনের যে অপব্যবহার হচ্ছে, তাতে পৃথিবীব্যাপী মানুষের নৈতিক চেতনাকে বিকারপ্রাপ্ত ও বিপর্যস্ত দেখা যাচ্ছে। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশ কায়েমি-স্বার্থবাদীদের বাদ দিলে বাকি পঁচানব্বই শতাংশ মানুষের চোখে উন্নত ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন নেই, কল্পনা নেই, আদর্শ নেই, আশা নেই।

এমনি এক অবস্থা চলছে এখন। কায়েমি-স্বার্থবাদীরা মূল ভোগসর্বস্ব জীবনযাত্রায় নিজেদের অপচিত করছে। তাদের মধ্যে সৃজনশক্তির কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। যেসব নীতি নিয়ে তারা চলছে সেগুলোকে বলা যায় সুবিধাবাদ, মুনাফেকি ও ভোগবাদ। মানুষের স্বার্থবুদ্ধি, মূল্যবোধ ও নৈতিক চেতনাকে সুস্থ করে তুলে, মানুষের সৃজন সামর্থ্যকে উদ্দীপ্ত করে, কল্পনা ও আশাকে জাগ্রত করে এবং নতুন আদর্শ অবলম্বন করে সম্ভব হবে উন্নতর নতুন পৃথিবী ও নতুন জীবন প্রতিষ্ঠা করা। জীবন পরিবেশের স্বরূপকে সমগ্রতার ও অন্তর্গত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বুঝতে পারলেই উন্নত জীবন প্রতিষ্ঠার উপায় করা যাবে। বাংলাদেশ ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। পৃথিবী ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। এই বাস্তবকে ওল্টাতে হবে। দুনিয়াব্যাপী জনসাধারণকে পথ ও বিপথের পার্থক্য বুঝতে হবে এবং বিপথ ছেড়ে পথে চলতে হবে। অপসংস্কৃতি ও অপশক্তির রাজত্ব চলছে। সংস্কৃতি ও শুভশক্তিকে জাগাতে হবে, জয়ী করতে ও জয়ী রাখতে হবে।

আবুল কাসেম ফজলুল হক : প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।