তারেক রহমানের ফাঁসি চান জজ মিয়া

আগের সংবাদ

রায়ে সন্তুষ্ট নন নিহতদের স্বজন ও আহতরা

পরের সংবাদ

সরবরাহ করেন মাওলানা তাজউদ্দিন

গ্রেনেডের উৎস পাকিস্তান

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১১, ২০১৮ , ১:০৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১১, ২০১৮, ১:০৭ অপরাহ্ণ

২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ঘটনার পর ‘আর্জেস গ্রেনেডের’ উৎস নিয়ে সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্য ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছিল। সবার জিজ্ঞাসা ছিল হামলার জন্য বিপুলসংখ্যক আর্জেস গ্রেনেড কারা সংগ্রহ করেছে? কিভাবে এবং কোন দেশ থেকে সংগ্রহ করেছে? ঘটনার ১৪ বছর পরও এই প্রশ্নগুলো সবার মুখে মুখে ঘুরছে। তবে তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি ও পুলিশের দফায় দফায় তদন্তের পর সব রহস্য বের হয়ে আসে। এই হামলার পেছনে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতা, মন্ত্রী, ঊধ্বর্তন পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা, দেশি ও বিদেশি জঙ্গি নেতারা সরাসরি জড়িত ছিল। গ্রেপ্তারকৃতরা তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে পুরো পরিকল্পনা ও হামলার অপারেশনাল কার্যক্রমের বর্ণনা দিয়েছে। হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেডের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছে। স্মরণকালের জঘন্য এই হামলায় ব্যবহৃত সব গ্রেনেড মাওলানা তাজউদ্দিন সরবরাহ করেছেন বলে সাক্ষী ও আসামিরা স্বীকার করেছে। ২১ আগস্টের হামলাসহ ওই সময় সংঘটিত সবগুলো হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেড পাকিস্তান থেকে সংগ্রহ করে ঢাকায় আনা হয়। তদন্তের পর সিআইডি পুলিশ সাক্ষীদের জবানবন্দি ও গ্রেপ্তারকৃতদের স্বীকারোক্তির আলোকেই অভিযোগপত্র তৈরির পর আদালতে দাখিল করেন। এই অভিযোগপত্রের আলোকেই বিচারকাজ সম্পন্ন হচ্ছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘সাক্ষীদের জবানবন্দি ও আসামিদের স্বীকারোক্তিতে প্রকাশ পায় যে, আসামি মুফতি আব্দুল হান্নান, আব্দুল মাজেদ ভাট, আব্দুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ জিএম ও মাওলানা আব্দুস সালাম ২০০৩ সালে ছিলেন কাশ্মীরভিত্তিক
সংগঠন হিজবুল মুজাহিদীনের নেতা। আসামি ও পাকিস্তানি নাগরিক আব্দুল মাজেদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট ও তেহরিক-ই-জিহাদিল ইসলামী (টিজেআই) নেতা মুজাফফর শাহ্ মাওলানা তাজউদ্দিন ও মুফতি হান্নানের সহায়তায় তাদের জঙ্গি কার্যক্রম বাংলাদেশে চালানোর জন্য পাকিস্তান থেকে গ্রেনেড ও গুলি নিয়ে আসে। এই গ্রেনেডের কিছু অংশ মুফতি হান্নান তার সহযোগীর মাধ্যমে ভারতে পাঠায় এবং কিছু গ্রেনেড মুফতি হান্নান ও মাওলানা তাজউদ্দিন তাদের কাছে রেখে দেন। ওই সময় আসামি মাওলানা আব্দুস সালাম, মাওলানা তাজউদ্দিন, মুফতি হান্নান, মাওলানা আব্দুর রউফ ও আব্দুল মাজেদ ভাট রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সাত মসজিদে বসে ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠক করেন। বৈঠকে তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, বাংলাদেশে তাদের জঙ্গি তৎপরতা চালানোর ‘প্রধান বাধা’ আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের হত্যা করা হলে আর কোনো বাধা থাকবে না। তখন বিএনপির নেতৃত্বে জোট সরকার ক্ষমতায় থাকায় তারা কুমিল্লার মুরাদনগরের এমপি মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের সঙ্গে আলাপ করেন। এরপর তারা কায়কোবাদের সহযোগিতায় ২০০৪ সালের প্রথম দিকে বনানীর ‘হাওয়া ভবনে’ যান এবং তারেক রহমান ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেন। মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীরা এ সময় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যা করা এবং বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রম চালানোর জন্য তাদের সহযোগিতা চান। তারেক রহমান সব শুনে সেখানে উপস্থিত সবাইকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
এই বৈঠকের পর থেকে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যায় মুফতি হান্নান তার বাড্ডার অফিস, মোহাম্মদপুর ও বিভিন্ন গোপন আস্তানায় সহযোগীদের নিয়ে কয়েক দফার বৈঠকে অপারেশন চালানোর পরিকল্পনা গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন। ওই সময় (২০০৪ সাল) তাদের হাতে থাকা গ্রেনেডের মধ্য থেকে কিছু গ্রেনেড ব্যবহার করে সিলেটের মেয়র বদর উদ্দিন আহাম্মদ কামরান, আওয়ামী লীগ নেত্রী ও এমপি জেবুন্নেসা হক, সুনামগঞ্জের এমপি আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালায়।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০০৪ সালের আগস্টে মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীরা জানতে পারেন যে, সিলেটে গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে ঢাকার মুক্তাঙ্গনে আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ সমাবেশ করবে। তখন তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, ওই সমাবেশে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর গ্রেনেড হামলা চালানো হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীরা আবারো তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা তাজউদ্দিনসহ এনজিও সংগঠন আল মারকাজুল ইসলামের অফিসে উপস্থিত হন। এরপর আল মারকাজুল ইসলামের একটি মাইক্রোবাসে সংগঠনটির নেতা মাওলানা আব্দুর রশীদকে সঙ্গে নিয়ে ‘হাওয়া ভবনে’ যান। মাওলানা রশীদকে ভবনের নিচ তলায় রেখে অন্যরা দোতলায় তারেক রহমানের অফিসে প্রবেশ করেন। তারেক রহমান ছাড়াও, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামী নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, তৎকালীন ডিজি এনএসআই ব্রিগেডিয়ার আব্দুর রহিম, ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন ডাইরেক্টর সিআইবি (পরে মেজর জেনারেল) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী এ সময় উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যায় মুফতি হান্নান সবার সহযোগিতা চান। তারেক রহমানসহ সবাই সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এরপর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১৮ আগস্ট তৎকালীন সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর বাসায় মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা তাজউদ্দিন, মুফতি আব্দুল হান্নান, লুৎফুজ্জামান বাবর, হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফ ও ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম আরিফের উপস্থিতিতে আবারো বৈঠক হয়। আব্দুস সালাম পিন্টু ও বাবর জানান, সব ধরনের প্রশাসনিক সহযোগিতা দেয়া হবে এবং হানিফ ও আরিফ সব ধরনের সহযোগিতা করবেন।
অভিযোগপত্রে আরো উল্লেখ করা হয়, ২০ আগস্ট মুফতি হান্নানের সহযোগী আহসানউল্লাহ কাজল ও মুফতি মঈন ওরফে আবু জান্দাল উপমন্ত্রী পিন্টুর ধানমন্ডির বাসা থেকে মাওলানা তাজউদ্দিনের সরবরাহকৃত ১৫টি আর্জেস গ্রেনেড সংগ্রহ করে পশ্চিম মেরুল বাড্ডায় আহসান উল্লাহ কাজলের ভাড়া বাসায় মুফতি হান্নানের অফিসে নিয়ে যান। ওই অফিসে মুফতি হান্নান মুন্সীসহ হরকাতুল জিহাদের সদস্যরা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার কৌশল ও চূড়ান্ত প্রস্তুতির বৈঠক করেন। পরের দিন ২১ আগস্ট মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সী ওরফে আবুল কালাম ওরফে আব্দুল মান্নান ও মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফরের নির্দেশনায় এবং তত্ত্বাবধানে মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, শাহাদাত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, হোসাইন আহম্মেদ তামিম, মঈন উদ্দিন শেখ মুফতি মঈন ওরফে খাজা ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আব্দুর রাজ্জাক, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ওরফে খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে শামিম ওরফে রাশেদ, উজ্জ্বল ওরফে রতন, মহিবুল্লাহ মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন, আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন, খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল, আবু বকর ওরফে হাউজে সেলিম হাওলাদার, লিটন ওরফে মাওলানা লিটন ওরফে দেলোয়ার হোসেন ওরফে জুবায়ের, ওমর ফারুক, শুভ, ফেরদৌস বাবু ওরফে রাতুল বাবু, আহসান উল্লাহ কাজল ও মাসুদ সরাসরি বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের প্রতিবাদ সভায় গ্রেনেড হামলা চালানোর জন্য গ্রেনেডসহ কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে যান এবং পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রেনেড হামলা চালায়। হামলার পর সন্ত্রাসীরা নিবিঘ্নে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অবস্থায় আরো কয়েকটি গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়। এগুলো আলামত হিসেবে না রেখে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় নিয়ে ধ্বংস করা হয়। ঘটনার তিনদিন পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো স্পর্শকাতর এলাকা থেকেও একটি অবিস্ফোরিত আর্জেস গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়। এই তাজা গ্রেনেডটিও সংরক্ষণ না করে ধ্বংস করা হয়।
মুফতি হান্নান গ্রেপ্তার হওয়ার পর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, শরীফ শাহেদুল আলম বিপুলকে দিয়ে ২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর আর্জেস গ্রেনেড দিয়েই হামলা চালানো হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার পরে জিজ্ঞাসাবাদে বিপুল নিজেও স্বীকার করেছেন যে আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলার জন্য তিনি মুফতি হান্নানের কাছ থেকে গ্রেনেড সংগ্রহ করে এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী হামলা চালায়।