সরকারের সদিচ্ছা জরুরি

আগের সংবাদ

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন

পরের সংবাদ

আওয়ামী লীগ বিরোধী নির্বাচনী ঐক্য যুগান্তকারী তামাশা মাত্র

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১১, ২০১৮ , ৮:০২ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১১, ২০১৮, ৮:০২ অপরাহ্ণ

অধ্যাপক হাসানুর রশীদ

প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, বিশ্ব ইতিহাস কেন্দ্র ও জাদুঘর, ঢাকা

 

ড. কামাল হোসেন ও তার বাম-ডান ঘরানার তথাকথিত যোদ্ধারা সবাই জানেন। তবু রহস্যজনক কারণে তারা বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। এটি একটি যুগান্তকারী রাজনৈতিক তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়।

ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ নেতাদের হীনমন্যতা ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ক্ষুব্ধ শামসুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কামরুজ্জামানসহ কয়েকজন তরুণ নেতার উদ্যোগে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৫৬ সালের দিকে এসে মুসলিম শব্দটি পরিহার করে দলটি আওয়ামী লীগ নাম গ্রহণ করে এবং একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সে সময় আওয়ামী লীগভুক্ত একটি রক্ষণশীল অংশ দলটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। এ ছাড়াও মুসলিম লীগসহ কয়েকটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা রাজনীতি ও ধর্মীয় কারণে আওয়ামী লীগ বিরোধী শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন।

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারি করেন। তিনি ১৯৬২ সালের ৮ জুন সীমিত আকারে রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনার সুযোগ প্রদান করেন। সামরিক শাসনের কবলে পড়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ১৯৬৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে পুনরুজ্জীবিত হয়। তিনি সাত বছর নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার সংগ্রামে লিপ্ত হন। বঙ্গবন্ধুর অভাবিত রাজনৈতিক দক্ষতায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি অঞ্চলে আওয়ামী লীগর মজবুত সাংগঠনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত সম্মিলিত বিরোধী দলের সম্মেলনে ৬ দফা দাবিনামা উপস্থাপন করেন। তারপর ৬ দফা দাবির পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে তিনি আত্মনিবেদন করেন। পরবর্তীকালে অল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক ও পূর্ব পাকিস্তানের জনস্বার্থ রক্ষার প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে জনমনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তাঁকে কারারুদ্ধ ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি করেও আওয়ামী লীগের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখা যায়নি। ফলে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অভাবিত সাফল্য লাভ করে। ১৬২ আসনের ১৬০টিতে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও আওয়ামী লীগ বিরোধীদের অবস্থান একেবারে দুর্বল ছিল না। উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মোট ভোটার ছিল ২ কোটি ৯৪ লাখ ৬৯ হাজার ৩৮৬ জন এবং সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মোট বৈধ ভোটের শতকরা ৭৫ ভাগ ভোট পেয়েছিল। ১৯৭১ সালের নির্বাচনে ৪১ লাখ ১৩ হাজার ৫৭০ জন ভোটার আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়নি। এই ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে একটি মোটাদাগে বলা যায়, পূর্ব পাকিস্তানের মোট ২ কোটি ৯৪ লাখ ৬৯ হাজার ৩৮৬ জন ভোটারের শতকরা ২৫ ভাগ অর্থাৎ ৭৩ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৬ জন ভোটার আওয়ামী লীগের বিপক্ষে ছিল। এরা মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামসহ কিছু সাম্প্রদায়িক ও বাম ঘরানার কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে ভোট দিয়েছিল।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট প্রদানকারী অনেক ভোটার পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা মেনে নিতে পারেননি। তারা পাকিস্তান অক্ষত রেখে পূর্ব পাকিস্তানের স্বশাসন চেয়েছিলেন মাত্র। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলে তারা আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষুব্ধ হন। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত মূলত এরাই ছিল আওয়ামী লীগ বিরোধী। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের একটি পক্ষ জাসদ গঠন করলে এদের পাল্লা ভারী হয়।

বঙ্গবন্ধু একটি আদেশের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যা-পরবর্তীকালে প্রেক্ষাপট বদলে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতি সামরিক ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। রাষ্ট্র অস্থির সময় অতিক্রম করতে থাকে। এ রকম সময় ৩ নভেম্বরের ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে রক্তপাতহীন এক সেনা অভ্যুত্থান ঘটে যায়। আবার কর্নেল তাহেরের পরিকল্পনায় বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে ৭ নভেম্বর প্রতি-অভ্যুত্থান ঘটে এবং ঘটনাচক্রে জেনারেল জিয়া রাষ্ট্র-ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। পরবর্তীকালে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলসমূহকে রাজনীতি করার অবাধ সুযোগ প্রদান করেন।

জেনারেল জিয়া ছিলেন খুবই উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তা। তিনি সুপরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে নেন। তিনি দেশে সামরিক শাসন জারি রেখেই রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন। জেনারেল জিয়া জানতেন, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্যক্তিদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আরেকটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল গঠন করা সম্ভব নয়। সে কারণে তিনি রাজনৈতিক দল গঠনের আগেই স্বাধীনতা বিরোধীদের ক্ষমতার পাদপ্রদীপে নিয়ে আসেন। তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতায় তিনি মুক্তিযুদ্ধের ছদ্মাবরণের আড়ালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন।

১৯৭৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি ও আওয়ামী লীগ বিরোধী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অতিক্ষুদ্র অংশ নিয়ে রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে অগণতান্ত্রিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ন্যাশন্যাল পার্টি (বিএনপি) গঠন করেন। তিনি স্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

এ প্রসঙ্গে অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের তথ্য স্মরণ করা যায়। তিনি ‘লিগেসি অব ব্লাড’ গ্রন্থে লিখেছেন :
জিয়ার বিএনপি পাকিস্তানি দালালদের জন্য তার সব সদর দরজা খুলে দিয়েছিল। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে পদপ্রার্থীদের মধ্যে ২৫০ জনই ছিল এই দালালগোত্রের রাজনীতিবিদ। তাদের অধিকাংশই শেখ মুজিবের আমলে পাকিস্তানি শাসকচক্র ও হানাদার বাহিনীর সঙ্গে দালালির অভিযোগে অভিযুক্ত হয় এবং সাজা ভোগ করে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি একজন সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন। তার নামের আদ্যাক্ষর নিয়ে জেড ফোর্স গঠিত হয়েছিল। তিনি সে ফোর্সের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার রাজনৈতিক দল বিএনপিতে তার অনেক সহযোদ্ধা যোগ দিয়েছিলেন। তাই বলে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল ছিল না। এ দলের উপরিভাগে দুধের সরের মতো কিছুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন সত্য। তবে এ দলের ভিত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ও মৌলবাদী মানসিকতার আওয়ামী লীগ বিরোধীদের দ্বারা। তারাই ছিল এ রাজনৈতিক দলটির মূল শক্তি।

উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো কাস্টিং ভোটের শতকরা প্রায় ২৩ ভাগ ভোট পেয়েছিল। সে নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী একাই পেয়েছিল কাস্টিং ভোটের শতকরা ৬.৭০ ভাগ ভোট। পরবর্তীকালে একমাত্র জামায়াতে ইসলামী ছাড়া অন্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতি ও ভোটে অবস্থান হারিয়ে ফেলেছে। তাহলে দলগুলোর সমর্থক ও ভোটাররা কোথায় গেলেন? এই বিপুলসংখ্যক ভোটার বিএনপির মাঝে বিলীন হয়ে গেছে। মূলত বিএনপি প্রতিষ্ঠা লাভের পরবর্তী ৩৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগ বিরোধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় হয়ে আছে।

সাম্প্রতিক সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনসহ কিছু জনবিচ্ছিন্ন নেতা আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার নামে বিএনপির সঙ্গে জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। তারা এ দলটির সঙ্গে মোর্চা গঠন করে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন। তারা ঐক্য প্রতিষ্ঠার শর্ত হিসেবে বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের শর্ত দিয়েছেন। বিষয়টি চরম হাস্যকর বৈ আর কিছু নয়। বাংলায় একটি কথা আছে, ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দিব কোথা’। তেমন বিএনপির সর্বাঙ্গ জুড়েই তো আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতা বিরোধীদের বসবাস।

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে যে কেউ যে কোনো রাজনৈতিক দল করতে পারেন, যে কেউ যে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে পারেন। এমনকি যে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট-মোর্চা গড়ে তুলতে পারেন। এটি তাদের গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকার। তবে তারা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধীদের আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে থাকা কোনো রাজনৈতিক দলকে মুক্তিদ্ধের পক্ষের দল বলতে পারেন না এবং এমন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্য গঠন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে নিজেকে দাবি করতে পারেন না।

ড. কামাল হোসেন ও তার বাম-ডান ঘরানার তথাকথিত যোদ্ধারা সবাই জানেন। তবু রহস্যজনক কারণে তারা বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। এটি একটি যুগান্তকারী রাজনৈতিক তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। আর যাই হোক, এ তামাশা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি মেনে নিতে পারে না।

অধ্যাপক হাসানুর রশীদ : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, বিশ্ব ইতিহাস কেন্দ্র ও জাদুঘর, ঢাকা।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা