রায় কার্যকর করে জাতিকে দায়মুক্ত করতে হবে

আগের সংবাদ

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ

পরের সংবাদ

তিস্তা পাড়ের বিপন্ন মানুষের কান্না থামাবে কে?

প্রকাশিত হয়েছে: অক্টোবর ১০, ২০১৮ , ৮:২৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: অক্টোবর ১০, ২০১৮, ৮:৪৫ অপরাহ্ণ

প্রফেসর ড. এম শাহ্ নওয়াজ আলি

সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন

 

নদীর একূল ভাঙে ওকূল গড়ে এইতো নদীর খেলা। নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই ভাঙাগড়ার খেলা আবহমানকালের চিরচেনা চিত্র, চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। প্রতিনিয়ত ভাঙাগড়ার খেলায় মত্ত হাজার নদীর দেশ বাংলাদেশ। নদীপারের মানুষগুলো প্রমত্তা নদীর ভাঙনে সহায়সম্বল, ভিটেমাটি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয় আবার নদীর কাছে পাওয়া পলল সমৃদ্ধ মাটিতেই ফলায় সোনার ফসল। কিন্তু দেশের উত্তরের রাক্ষুসী নদী তিস্তাপারের জেলা রংপুর, গাইবান্ধা এবং লালমনিরহাটের লাখ লাখ মানুষের কাছে ভাঙাগড়ার সেই চিরচেনা চির পরিচিত শব্দটি যেন পাল্টে গেছে।

গত ৫০ বছর ধরে প্রমত্তা তিস্তা শুধু ভাঙছে আর ভাঙছে। বহু গ্রাম, বহু জনপদ, বহু বন্দর করালগ্রাসী তিস্তার হিংস্র ছোবলে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। যেখানে একদিন হাজারো মানুষের কর্মব্যস্ততায় আর কলকারখানার শব্দে মুখর হতো দিনরাত, সেখানে আজ অথৈ পানি। যে বন্দরের লঞ্চ, স্টিমার, ট্রলারের ভেঁপুর শব্দে পার্শ্ববর্তী জনপদের মানুষদের ঘুম ভাঙতো কিংবা কর্মব্যস্ত জীবনের ঘণ্টা বেজে উঠত সেখানে আজ ধু-ধু বালুচর। এ সবই আমার মতো অসংখ্য মানুষের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া রংপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট জেলার হারিয়ে যাওয়া শত শত জনপদের অত্যুজ্জ্বল স্মৃতিময় দৃশ্য।

কয়েক যুগ আগে নিজের পৈতৃক ভিটামাটি খরস্রোতা তিস্তার গর্ভে চলে গেলেও দ্বিতীয়বার সেই জমির অস্তিত্ব আর চোখে পড়েনি। বছরের পর বছর নদীবক্ষে গ্রাস হয়ে আছে লাখ লাখ একর জমি। যে কৃষকের একদিন ছিল পুকুর ভরা মাছ, গোলা ভরা ধান আর গোয়াল ভরা গরু, ভয়াল তিস্তার হিংস্র থাবায় একে একে সবকিছু হারিয়ে তাদের অনেকেই পথের কাঙাল। অনেক অবস্থাসম্পন্ন কৃষক আজ দিনমজুর।

অপ্রতিরোধ্য এ রাক্ষুসী তিস্তা কবে কোথায় গিয়ে শান্ত হবে তা কেউ জানে না। ষাটের দশক থেকে এ পর্যন্ত তিস্তা নদী অন্তত ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে সরে এসেছে। রাক্ষুসী তিস্তার ভরা যৌবনের রুদ্র রূপ বড়ই ভয়ঙ্কর। যখন যে দিকে হানা দেয় তা ল-ভ- এবং ধ্বংস না করে শান্ত হয় না। চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই প্রতিদিন জাতীয়, স্থানীয় কিংবা আঞ্চলিক পত্রিকাগুলোতে তিস্তার ভাঙন নিয়ে বিভিন্ন শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে। কয়েকটি পত্রিকা রংপুরের কাউনিয়া ও গঙ্গাচরার তীব্র নদী ভাঙন সমস্যা নিয়ে সম্পাদকীয় ছেপেছে। নদী ভাঙনের ফলে নিঃস্ব পরিবারগুলো নানা ধরনের দুঃখ কষ্ট আর দুর্দশার চিত্রও ফুটে উঠেছে এসব খবরগুলোতে। সত্যিই মনটা বেদনায় ভরে ওঠে প্রকৃতির বৈরী খেলার সঙ্গে সংগ্রামরত এসব মানুষদের কষ্ট দেখে! কিন্তু আমরা যারা ওদের এ সমস্যা থেকে রক্ষা করার জন্য কিছুই করতে পারি না, তাদের অনুভূতিকেই এ কষ্টগুলো নাড়া দেয়। যাদের সামর্থ্য আছে, অনেক কিছু করার আছে তাদের মনকে কখনোই নাড়া দেয় না।

গত ৫০ বছরে উত্তরাঞ্চলে ভাঙন প্রতিরোধে নেয়া হয়নি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা। শুধু রংপুর, লালমনিরহাট নয়, উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলার ১০টি জেলাতেই নদীভাঙন একটি ভয়াবহ সমস্যা হিসেবে রূপ নিয়েছে। এ পর্যন্ত কত হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান কেউই দিতে পারবে না। সরকারি কিংবা বেসরকারি হিসাব যাই হোক না কেন রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলার মোট ভূভাগের প্রায় ১০ ভাগ নদীবক্ষে বিলীন হয়ে গেছে।

বলা যায় প্রতি বছর এক নীরব বিপর্যয় হিসেবে ধেয়ে আসছে নদীভাঙন। ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমর, নদ-নদীর তীরবর্র্তী এলাকার মানুষ বসবাস করছে ভাঙনকে সঙ্গে নিয়ে। অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর নদীভাঙনের মধ্যে পার্থক্য হলো ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস সবকিছু লণ্ড ভণ্ড করে দিলেও একটি পরিবারের শেষ অবলম্বন পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে যায়। নদীভাঙনে সে স্মৃতি ও অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়, শুধু শিরোনাম হয়ে থাকে।

উত্তরাঞ্চলে ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোর মধ্যে রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা জেলায় শত শত গ্রাম নদীতে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। পাকিস্তান আমলে উত্তরাঞ্চলের নদীভাঙন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ রোধকল্পে ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। রংপুর থেকে পাবনা পর্যন্ত ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ বাঁধের অস্তিত্ব এখন বিপন্ন। এই বাঁধ দিয়ে বন্যা এবং নদীভাঙন পুরোপুরি রোধ করা যায়নি। মূল বাঁধকে রক্ষার জন্য দফায় দফায় দিতে হয়েছে বেড়িবাঁধ। সে বাঁধও টেকেনি। এ ছাড়াও বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নদী ভাঙনরোধে বেশকিছু প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও লুটপাট ও দুর্নীতির ফলে কোনো কাজে আসেনি। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫টি স্পার নির্মাণ করা হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুকুরচুরি, শুকনো মৌসুমে প্রকল্পের কাজ শুরু না করে বর্ষাকালে কাজ হাতে নেয়া এবং যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে গৃহীত সেই স্পার প্রকল্প পুরোপুরি পণ্ড হয়ে যায়। বলা যায় শত কোটি টাকা যমুনার জলে নিমজ্জিত হয়। এখনো দুয়েকটি স্পার টিকে থাকলেও যথাযথ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চলতি বর্ষা মৌসুমেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। ভাঙন প্রতিরোধে বিশ্বব্যাংকের অর্থানুকূল্যে বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে একটি হার্ড পয়েন্ট ও সিরাজগঞ্জে রিভেটমেন্ট নির্মাণের কাজ চলছে। এতে ব্যয় হবে ৬০০ কোটি টাকা।

এ প্রকল্পে নদীর তীর সংরক্ষণ করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ভাঙন প্রতিরোধে সামান্য কিছু এলাকায় ভূমিকা রাখবে। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের অবশিষ্ট এলাকাকে তিস্তা ও যমুনার ভয়াল ছোবল থেকে বাঁচাবে কে? ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কারণ কিংবা নেতৃত্বের কারণেই হোক উত্তরাঞ্চলে শিল্পায়নের অভাব এবং অনুন্নত যোগাযোগের কারণে অনেক পিছিয়ে। কিন্তু যুগ যুগ ধরে নদী ভাঙন, বন্যা, খরা ও ঝড়ের সঙ্গে সংগ্রাম করে তারা আজ ক্লান্ত। স্বাধীনতার পর গত ৪৭ বছরে ১০টি সরকার বদল হয়েছে। সেইসঙ্গে বদলে গেছে ‘জনদরদী’ ও সমাজসেবী, রাজনীতিবিদদের ভাগ্য। শুধু বদলায়নি তিস্তা ও যমুনা পাড়ের লাখ লাখ হতভাগ্য সংগ্রামী মানুষদের জীবন-জীবিকা ও ভাগ্যের চাকা।

ভাটির দেশ বাংলাদেশ। নদীর দেশ বাংলাদেশ। হাজার নদীর দেশ বলে পরিচিত এই ভূভাগের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে সুবিস্তৃত জালের মতো ছেয়ে আছে এই নদী। বলা যায় ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এ জনপদকে ঘিরে রেখেছে নদী। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা, ইছামতি, মধুমতির মতো বড় বড় নদীগুলোর নাম বেশি আলোচনায় এলেও নাম না জানা আরো অনেক নদীর করাল গ্রাসে বিলীন হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম, মাঠের পর মাঠ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে নিষ্কৃতির কি কোনো উপায় নেই? পৃথিবীর অনেক দেশেই নদীভাঙন অভিশাপ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। আবার অভিশপ্ত সেই নদীকেই বশে এনে ব্যবসাবাণিজ্য শিল্পায়ন তথা যোগাযোগের ক্ষেত্রে নবদিগন্তের উন্মোচন হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে চীনের হোয়াংহো নদীর কথা বলতে পারি যাকে এক সময় চীনের দুঃখ বলা হতো। কিন্তু সেই চিত্র পাল্টে গেছে। হোয়াংহো আজ চীনের আশীর্বাদ। কলকাতার হুগলি, লন্ডনের টেমস, মিসরের নীল নদ, এসব নদীকে ওরা অভিশাপের বদলে আশীর্বাদ হিসেবে রূপান্তর করেছে- যা এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

প্রফেসর ড. এম শাহ্ নওয়াজ আলি : সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন।