শোলাকিয়া হামলার চার্জশিট দাখিল, বিচারকাজ ত্বরান্বিত হোক

আগের সংবাদ

ব-দ্বীপ পরিকল্পনা একটি সময়োপযোগী সমন্বিত দূরদর্শী উদ্যোগ

পরের সংবাদ

শিশুদের দেখানো পথে কি আমরা হাঁটছি?

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৮ , ৭:৪২ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৮, ৭:৪২ অপরাহ্ণ

স্কুলে যাওয়া শিশুরা যখন হাতেকলমে একটি জাতিকে সড়ক পরিবহনের ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিতে পারে, তারচেয়ে বড় সুফল আর কোনো আন্দোলনে কি হতে পারে? যা আমরা বড়রা পারিনি, কোমলমতি স্কুলের শিক্ষার্থীরা তা করে আমাদের শিক্ষা দিয়ে দিল। অনিয়ম ধরিয়ে দেয়ার জন্য তারা মাঠে নেমেছিল। কোনোরকম সন্দেহের অবকাশ নেই যে তারা ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিতে পেরেছে। অনিয়ম হচ্ছিল, বিশৃঙ্খলা ছিল এ বিষয়ে এখন আর এ দেশের কারো বুঝতে বাকি নেই। আর এই বুঝার কাজটি সুচারুভাবে করিয়ে দেখাল শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে। বুঝিয়ে গেল- আমরা তো পারলাম, তোমরা পারো না কেন?

গত ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া খানম মীম এবং আব্দুল করিম রাজীব নিহত হয়। ঘটনার পরদিন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে তুমুল আন্দোলন করে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নিয়ে চালকের লাইসেন্স আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করেছে। আর লাইসেন্স না থাকলে মামলা করিয়েছে পুলিশ দিয়ে। লাইসেন্স না থাকলে পুলিশের গাড়িও তারা আটকে দিয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া গাড়ি নিয়ে বের হতে পারেননি এমপি-মন্ত্রীরাও। সত্যিকারের ট্রাফিক-পুলিশের ভ‚মিকায় অবতীর্ণ যেন তরুণ শিক্ষার্থীরা। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সব দাবি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই বিষয়টি তদারকি করেছেন। ঘাতক বাসের চালক ও মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সব স্কুলের সামনে প্ল্যাকার্ডধারী বিশেষ ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন হয়েছে, শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজ সংলগ্ন বিমানবন্দর সড়কে আন্ডারপাস নির্মাণের কাজ উদ্বোধন করা হয়েছে এবং ওই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের জন্য পাঁচটি বাস দান করা হয়েছে। সর্বোচ্চ শাস্তি ৫ বছরের বিধান রেখে সড়ক পরিবহন আইনের খসড়ায় চ‚ড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ।

চোখে আঙুল দিয়ে এই তরুণ শিক্ষার্থীরা জাতিকে দেখিয়ে গেল কীভাবে সড়কে শৃঙ্খলা আনা যায়। অবৈধ চালক, অবৈধ গাড়ি কীভাবে রাস্তায় বন্ধ করা যায়। ট্রাফিক ডিউটি কীভাবে সততার সঙ্গে করা যায়। স্কুলে যাওয়া শিশুরা যখন হাতেকলমে একটি জাতিকে সড়ক পরিবহনের ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিতে পারে, তারচেয়ে বড় সুফল আর কোনো আন্দোলনে কি হতে পারে? শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে সুস্পষ্ট হয়েছে বিআরটিএর দুর্নীতি আর অনিয়ম, ট্রাফিক পুলিশের অনিয়ম; সরকারের ত্রুটি এই সড়ক পরিবহন খাতে। সরকার, দেশ শিক্ষা নিতে পেরেছে এই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। এর থেকে বড় সফলতা আর কিবা হতে পারে। যা আমরা বড়রা পারিনি, কোমলমতি স্কুলের শিক্ষার্থীরা তা করে আমাদের শিক্ষা দিয়ে দিল। অনিয়ম ধরিয়ে দেয়ার জন্য তারা মাঠে নেমেছিল। কোনোরকম সন্দেহের অবকাশ নেই যে তারা ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিতে পেরেছে। অনিয়ম হচ্ছিল, বিশৃঙ্খলা ছিল এ বিষয়ে এখন আর এ দেশের কারো বুঝতে বাকি নেই। আর এই বুঝার কাজটি সুচারুভাবে করিয়ে দেখাল শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে। বুঝিয়ে গেল- আমরা তো পারলাম, তোমরা পারো না কেন?

মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ দুদিকই থাকে। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্তত ওপিঠটি যেন আসবেই। এখানে ভালো কাজ এগোয়, তারপর রাজনীতির অশুভ থাবায় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় শুভ সূচনা এবং এক সময় তা রূপ নেয় কালো অধ্যায়ে। এখানেও তাই হয়েছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মনের টানে, প্রাণের টানে গণমানুষের প্রাণের দাবি নিরাপদ সড়ক নিয়ে সামনে এগিয়ে এসেছিল এবং এক পর্যায়ে তারা সড়ক দখল করে নিয়েছিল। দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে তারা সহজভাবে নিতে পারেনি। কেননা এ মৃত্যু সহজ মৃত্যু ছিল না। নিরাপদ সড়ক বাংলাদেশের গণমানুষের চাহিদার একটি মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করছিল গত কয়েক বছর ধরে। বিশেষ করে মিশুক-মুনীর আর তারেক মাসুদের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর বিষয়টি মানুষের মনে বড় হয়ে দেখা দেয়। জাগতে থাকে মানুষ এই দাবিতে। কিন্তু বেপরোয়া ড্রাইভিং, লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভার, ত্রুটিযুক্ত গাড়ি, ভাঙা রাস্তা সব মিলিয়ে সড়ককে অনিরাপদ করেই রাখছিল। এবার জ্বলে উঠেছিল শিক্ষার্থীরা।

কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অন্যতম স্লোগান ছিল ‘রাস্তা বন্ধ, রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে’। আমার কাছে অন্য একটি বিষয় খুব গুরুত্ব সহকারে ধরা দিয়েছিল। কোমলমতি শিশুরা প্রতিবাদ জানাতে শুধু রাস্তায় নয়, দলবেধে এবং তারা নিজেরাই নিজেদের সংগঠিত করে পুরো ঢাকা শহরকে আগলে রেখেছিল সপ্তাহখানেক ধরে। সন্তানদের চিন্তায় পিছু নিয়েছিল অভিভাবকও। তাই রাস্তাটি সাধারণ মানুষের দখলে চলে গিয়েছিল। এই সন্তানরা অধিকাংশই ছিল স্কুলের ছাত্রছাত্রী। অভিভাবকরা দেখল, স্কুল প্রতিষ্ঠানের বাইরে এসব সন্তানরা কী করতে পারে এবং কতটা পারে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নিয়ে নতুন করে ইতিবাচক চিন্তার জন্য অভিভাবক ও স্কুলের শিক্ষকদের থাকতেই পারে। বর্তমান সমাজে স্কুল ছাত্রছাত্রীদের মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ব্যবহার নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রচুর মাথা ব্যথার কারণ আছে। কিন্তু সে মাথা ব্যাথা ঝেড়ে ফেলে এই আন্দোলন যোগ করে দিল স্বাধীনভাবে এত বড় একটি আন্দোলন পরিচালনার অভিজ্ঞতা। সমাবেশ এবং এত বড় আন্দোলন করার সুযোগ পাওয়ার মতো বয়স তাদের ছিল না। পরিস্থিতি তাদের অল্প বয়সেই অনেক বড় দায়িত্ব দিয়ে ফেলেছিল। ভবিষ্যতে এর ফলাফল কোথাও কোথাও অভিভাবক ও শিক্ষকরা যখন ভোগ করবে তখন তাদের চিন্তার অবকাশ অবশ্যই হবে।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক।