শিশুদের দেখানো পথে কি আমরা হাঁটছি?

আগের সংবাদ

নর্থ ক্যারোলিনায় ফ্লোরেন্সের আঘাত

পরের সংবাদ

ব-দ্বীপ পরিকল্পনা একটি সময়োপযোগী সমন্বিত দূরদর্শী উদ্যোগ

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৮ , ৭:৫৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৮, ৭:৫৫ অপরাহ্ণ

ড. আতিউর রহমান

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ

আমাদের আশা করার ক্ষমতা যত বড় হবে তত দ্রুতই এগিয়ে যাবে স্বদেশ। আমাদের বড়ই সৌভাগ্য যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুদূরপ্রসারী চিন্তা করতে পারেন। একুশ শত সালে বাংলাদেশ কোথায় যাবে সেই স্বপ্নও তিনি নিজে দেখতে পারেন এবং দেশবাসীকে দেখাতে পারেন। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখেই এমন আগাম ভাবনা তিনি ভাবছেন। ব-দ্বীপ পরিকল্পনা তার এমন দীর্ঘমেয়াদি ভাবনার ফসল।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের বিভিন্ন সেক্টরে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তা মোকবেলা করার জন্য একটা কৌশলগত পরিকল্পনাই হচ্ছে ‘ডেল্টা প্ল্যান বা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা’। এটা বিনিয়োগ পরিকল্পনাও বটে। কারণ ছয়টি হটস্পট নির্ধারণ করা হয়েছে ব-দ্বীপ পরিকল্পনায়। এগুলো হচ্ছে উপকূল, নদী ভাঙন, মোহনার পরিবর্তন তথা চরাঞ্চল, হাওর, নগর, বরেন্দ্র ভূমি ইত্যাদি। মূল কথা হচ্ছে যেসব জায়গায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব খুব বড়ভাবে অনুভব করা যাচ্ছে সেসব হটস্পটে যে আর্থসামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা দেখা দিচ্ছে সেগুলো মোকাবেলা করার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তথা ডেল্টা প্ল্যানের মাধ্যমে হাতে নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি একনেকে এই ‘ডেল্টা প্ল্যান বা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা’ প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেছেন।

নিঃসন্দেহে, আমাদের দেশের জন্য এটি একটি অভিনব দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নীতি পরিকল্পনা। কারণ এর আগে কখনো এত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাংলাদেশ নেয়নি। এই পরিকল্পনা কতগুলো সময়ের ‘মাইলস্টোন’ অনুযায়ী ভাগ করা হয়েছে। যেমন ২০৩০, ২০৪০ বা ২০৮১ পর্যন্ত এই পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়ন করা হবে তাও এতে বলা আছে। আর বাদবাকি উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। আরেকটা ভালো কথা বলা হয়েছে যে প্রতি ৫ বছর পরপর এই পরিকল্পনাটাকে আপডেট করা হবে। নয়া তথ্য যুক্ত করা হবে। পরিবর্তনকে হিসেবে নেয়া হবে। সেই দিক থেকে বিবেচনা করলে এটি একটি ‘লাইভ ডকুমেন্ট’। এক জীবন্ত দলিল। ব-দ্বীপ পরিকল্পনার বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে এটা একইসঙ্গে টেকনিক্যাল, সোর্সিও-পলিটিক্যাল ও ইকোলজিক্যাল ভাবনার সমন্বিত দলিল। একসঙ্গে অনেক জিনিস যুক্ত করা হয়েছে এই পরিকল্পনায়। মূলত নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা এখানে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

নেদারল্যান্ডস একটি ব-দ্বীপ। সমুদ্র জলতটের নিচে তার অবস্থান। তাই নেদারল্যান্ডসকে পুরো ফোল্ডার দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। আমরা অবশ্য উপকূল অঞ্চলে বেশকিছু ফোল্ডার স্থাপন করেছি। নেদারল্যান্ডস সার্বিকভাবে তা করতে পেরেছে। তাদের দেশ ছোট বলে অনেক বেশি অরগানাইজড তারা। তাদের লোকাল গভর্নমেন্টও খুব শক্ত। আমি নেদারল্যান্ডসের ফোল্ডারগুলো দেখেছি। কী পরিকল্পিতভাবেই না তারা এটিকে বাস্তবায়ন করেছেন। আমাদের ডেল্টা প্ল্যান বা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা খুবই ভালো একটি উদ্যোগ। কারণ বাংলাদেশের রয়েছে নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ এক অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে, বন্যার সঙ্গে বসবাস করা এবং একইসঙ্গে বন্যার যে ইতিবাচক দিকগুলো রয়েছে সেগুলো গ্রহণ করার একটি সংস্কৃতি এখানে অনেক দিন ধরে গড়ে উঠেছে। ‘নদীর সঙ্গে বাস করো, নদীকেও বাঁচতে দাও’- এই সংস্কৃতি দিন দিন পোক্ত হচ্ছে। প্রায় ২০ বছর আগে ফ্লাড প্ল্যান (বন্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা) নামে একটি পরিকল্পনা আমরা নিয়েছিলাম। ফ্লাড প্ল্যান-১, ফ্লাড প্ল্যান-২ এরকম কয়েকটি প্রকল্প আমরা হাতে নিয়েছিলাম। আমিও একটি গ্রুপের সঙ্গে কাজ করেছি প্রকল্প পরিকল্পনা প্রণয়নের সময়। সেই সময় আমরা সরেজমিন ঘুরে ঘুরে এই জিনিসগুলো চিহ্নিত করেছিলাম। প্রফেসর আইনুন নিশাতসহ অনেকের সঙ্গে তখন আমরা এই পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ করেছি। নদীর স্বাভাবিক গতি বন্ধ না করে নদীকে নদীর মতো চলতে দেয়ার আহ্বান ওই দলিলগুলোতে সংযুক্ত হয়েছিল। বিশেষ করে নদীতে বসবাসকারী মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রজাতি যেন ভালোভাবে বাঁচতে পারে সেদিকটা খেয়াল রেখে বন্যাতটের উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেয়ার পরামর্শ আমরা দিয়েছিলাম। একইসঙ্গে নদীর যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেরকম কিছু স্ট্রাকচার গড়ে তোলার তাগিদও ওই সব দলিলে ছিল। আর নদীর সুবিধাগুলো গ্রহণ করার ওই কনসেপ্টগুলো সম্ভবত খানিকটা হলেও কাজ করেছে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে।

ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় প্রচুর সংখ্যক দেশি-বিদেশি কনসালটেন্ট যুক্ত ছিলেন। জানা গেছে, ২৬শ বিশেষজ্ঞ কাজ করেছেন এই পরিকল্পনার পেছনে। নিঃসন্দেহে এ এক বিরাট কর্মযজ্ঞ। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলমকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সমন্বয় করার জন্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্ব দিয়েছেন এই কাজটির পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে। তার একটা বড় গুণ, তিনি শুধু কাছেরটাই দেখতে পান না। অনেক দূরের বিষয়ও তিনি দেখতে পান। আমরা যখন ২০০৮ সালে ‘দিন বদলের সনদ’ তথা নির্বাচনী ইশতেহার তৈরির কাজ করছিলাম তখন তিনি আমাদের বারবার পরিবর্তনের কথা বলছিলেন। আগামীতে আমাদের সমাজ, অর্থনীতিতে কীভাবে পরিবর্তন আনা সম্ভব সেসব কথা ঐ সনদে তিনি যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি প্রযুক্তির ব্যবহার করে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার আইডিয়াটা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তখন বলেছিলেন, মানুষকে আমার দরকার এবং প্রযুক্তিরও প্রয়োজন আছে। মানুষের জ্ঞান এবং প্রযুক্তির সুফল মিলেই তিনি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে। তিনি বলতেন এমন একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে যেখানে প্রযুক্তি থাকবে, একইসঙ্গে মানুষও কাজ করবে। ২০০৯ সালে ফের ক্ষমতায় আসার পরপরই তিনি সমন্বিত প্রেক্ষিত পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন, যেটা ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

ওই পরিকল্পনার মাঝখানে আবার দুটি প্ল্যান দিয়েছেন তিনি। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এই সময়েই হাতে নেয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনাগুলোর আলোকেই ২০১৫-২০৩০ সাল নাগাদ এসডিজি প্ল্যান করলেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশও এসডিজি প্ল্যান করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের এসডিজির বৈশিষ্ট্য হলো যে আমরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে আলাপ করে পরিকল্পনাগুলো তৈরি করেছিলাম। একটা জাতীয় কমিটি হয়েছিল এসডিজি পরিকল্পনা তৈরির জন্য। সরকার, দেশীয় এনজিও, সিভিল সোসাইটি সবাই মিলে আলাপ করে আমরা পরিকল্পনাটা তৈরি করেছিলাম। আমাদের পরিকল্পনা বা আইডিয়াগুলো বিভিন্ন অংশীজনদের কাছ থেকে পাওয়া। ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় কৃষি, শিল্প, পরিবেশ-প্রযুক্তি এবং মানুষ জড়াজড়ি করে আছে। এটা একটা সামগ্রিক সমন্বিত পরিকল্পনা। রবীন্দ্রনাথ তার ‘শিক্ষা ও লক্ষ্য’ প্রবন্ধে বলেছেন, যে একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে সে কতটা আশা করতে পারে। সে কতটা সুস্পষ্টভাবে ভাবতে পারে সে কোথায় আছে এবং কোথায় যাবে। এই ভাবনাগুলোর মধ্যেই একটি জাতির আসল শক্তি নিহিত। আমাদের প্রধানমন্ত্রীরও বড় গুণ তিনি ভবিষ্যৎটা দেখতে পান। তিনি জানেন যে দেশকে আধুনিক করতে চাইলে একটি আধুনিক সমাজ দরকার। উন্নত দেশ করতে চাইলে একটি উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর সমাজের প্রয়োজন হয়। সে জন্য গুণমানের শিক্ষার খুব প্রয়োজন। তা ছাড়া দেশের সবাইকে নিয়ে চলতে হলে বা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন চাইলে পিছিয়ে পড়া মানুষকে মূলধারায় যুক্ত করতে হয়।

সেই বিচারে ডেল্টা প্ল্যান একটা উপযুক্ত বড় সমন্বিত পরিকল্পনা। আগামীতে এর মধ্যে আমাদের বিভিন্ন খাতের থোপগুলো বের করতে হলে আমাদের অনেক অর্থের প্রয়োজন। ২০৩০ সাল নাগাদ ৩৭ বিলিয়ন ডলার খরচ করা হবে বলে এই পরিকল্পনায় বলা হয়েছে। আশিটি প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে অনেক গবেষণাধর্মী প্রকল্পও রয়েছে। সব ডিসিপ্লিনকে একসঙ্গে আনার চেষ্টা করা হয়েছে এই পরিকল্পনায়। এতে ইঞ্জিনিয়াররা যেমন আছেন, ইকোনোমিস্টরাও রয়েছেন। সোস্যালজিস্টরা যেমন আছেন, রয়েছেন সাধারণ মানুষও। তবে ডেল্টা প্ল্যানের একটি দুর্বলতার কথা বললে ভুল হবে না। এটি বহুল আলোচিত নয় সেই অর্থে। সাধারণ মানুষ দলে দলে এর মধ্যে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়নি। তাই মূলত এটি একটি কারিগরি পরিকল্পনাই রয়ে গেছে। এটা খুব খারাপ না। কারণ টেশনিশিয়ানরা তো টেকনিক্যাল প্ল্যানই করবেন। সেটিই তো স্বাভাবিক। ডেল্টা প্ল্যান যখন বাস্তবায়ন শুরু হবে তখন যেন সাধারণ মানুষকে বেশি করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কারণ আমাদের যে লুকায়িত জ্ঞান রয়েছে, আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের দুর্যোগের সঙ্গে বসবাস করার যে অনন্য অভিজ্ঞতা রয়েছে সেসব যেন আমরা বাস্তবায়নের সময় কাজে লাগাই। এর মধ্যে স্থানীয় পরিকল্পনাও থাকতে হবে। ওপর থেকে চাপিয়ে দিলে হবে না। যেমন সিরাজগঞ্জ আর বাহাদুরাবাদের ইকোলজির সঙ্গে মেঘনার ইকোলজিকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। মেঘনা আর সিরাজগঞ্জের নদীর ধর্ম কিন্তু এক নয়। ফলে স্থানীয় বাস্তবতাগুলো মাথায় নিয়ে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে।

আগাম চিন্তা করে বর্তমানকে ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করাই কৌশলগত পরিকল্পনার কাজ। সেই দৃষ্টিভঙ্গিতেই নদী যে সভ্যতার উৎস সেটাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে ব-দ্বীপ পরিকল্পনার মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, একটি নদী যদি কোনো লোকালয় থেকে দূরে সরে চলে যায় তাহলে ওই লোকালয়ের সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়। পৃথিবীর বড় বড় সভ্যতাগুলো নদীর পাড়েই গড়ে উঠেছে। নদীকে যদি ধ্বংস করি তাহলে সভ্যতাও ধ্বংস হতে বাধ্য। তাই আমাদের নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বড় নদীগুলো বাঁচিয়ে রাখা বা জীবন্ত রাখাই ব-দ্বীপ পরিকল্পনার মূল কথা। এরই মধ্যে আমাদের অনেক নদী মরে গেছে। বলা যায় আমাদের সীমাহীন লোভের কারণে আমরা তাদের মেরে ফেলেছি। অসচেতনতার জন্য আমরা আমাদের নদী-খাল-বিল মেরে ফেলছি। তাই নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার ভাবনা থেকে এই দূরদর্শী ব-দ্বীপ পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমাদের নদীগুলোকে আর মারা যাবে না। নদীকে বাঁচিয়ে রেখে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হবে। এটা করতে গেলে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। যেমন আমরা উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ড্রেজার ব্যবহার করে নদীর মূল চ্যানেল গভীরতর করার উদ্যোগ নিচ্ছি। নদীর ভাঙন রোধে দুপাশে যেসব অবকাঠমো গড়ে তোলা দরকার সেসব গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে এর সুফলটাও নিতে হবে। নদী থেকে যে মাটি তোলা হবে তা দিয়ে একটা নতুন সমতল ভূমি তৈরি হবে। সেখানে অনেক কিছু আবাদ করতে পারব। অনেক স্থাপনা তেরি করতে পারব। আমাদের যে ফোল্ডারগুলো রয়েছে সেগুলোরও পুনঃসংস্কার করা দরকার।

আগামী দশ বা বিশ বছর পর হয়তো আমাদের সমুদ্রের পানি এতটাই বেড়ে যাবে যে বর্তমান ফোল্ডার উপচে নোনা পানি ভেতরে চলে আসবে। এখন থেকেই তাই ওই ফোল্ডার উন্নত করতে হবে। ব-দ্বীপ পরিকল্পনার মাধ্যমে এমন পরিকল্পনা করতে হবে যাতে করে আগামী দশ বা বিশ বছর আমাদের কী ধরনের অবকাঠামো লাগবে তা চিহ্নিত করা যায়। রাস্তাগুলো আমরা করেছি সেসব তো এক সময় পানির নিচে ডুবে যাবে। তাহলে সেগুলোকে আমাদের উঁচু করতে হবে। ব-দ্বীপ পরিকল্পনা এমন অবকাঠামো তৈরির দিকনির্দেশনা দেবে।

এই পরিকল্পনা মাফিক যদি কাজ করতে পারি তাহলে বছরে দেড় শতাংশের মতো আমরা আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে পারব। সেটাই বলা হয়েছে ডেল্টা প্ল্যানে। এখন যদি সাড়ে সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার হয় ডেল্টা পরিকল্পনা যোগ করলে তা ৯ শতাংশ হবে। সুতরাং এটা একটা বিরাট সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে অনেক কর্মসংস্থান হবে। পরিকল্পনা মতো অনেক প্রকল্প হাতে নিতে হবে। তবে চ্যালেঞ্জও আছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের সমাবেশ করা। বছরে যদি আমাদের কয়েক বিলিয়ন ডলার বাড়তি খরচ করতে হয়, সেই অর্থ পাব কোথা থেকে? অর্থ পাওয়ার একটাই উপায় হচ্ছে জনগণকে বাড়তি কর দিতে হবে। নদীভিত্তিক যে ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে সেসব বাড়াতে হবে। আমরা আমাদের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির সব পণ্য সড়কপথে ট্রাকে পাঠাই। কিছু বিমানেও পাঠাই। যে খরচ হয় তার এক-তৃতীয়াংশ খরচ হবে যদি আমরা ওই পণ্য পাঠাতে নদীপথ ব্যবহার করতে পারি। নদীপথে পণ্যগুলো পাঠালে তার থেকে যে রাজস্ব আসবে সেই আয়ের একটা অংশ এই পরিকল্পনায় আমরা ব্যবহার করব। এরকম সুদূরপ্রসারী চিন্তা আমাদের করতে হবে। ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের খরচের বড় একটা অংশ নিশ্চয়ই সরকারই দেবে। তবে প্রাইভেট সেক্টরকেও এগিয়ে আসতে হবে। প্রাইভেট সেক্টর তার সামাজিক দায়িত্ব থেকে এই নদীগুলোকে উন্নত করার জন্য বিনিয়োগ করবে তেমন প্রত্যাশাই করা হচ্ছে। এখানে তাদেরও লাভ হবে। কারণ নদীভিত্তিক একটা পরিবহন ব্যবস্থা যদি গড়ে ওঠে তারাই তো সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন। পরিবহন খরচ কম হলে তাদের আয় রোজগার বাড়বে। এর সুফল পুরো সমাজই পাবে। তাই সুদূরপ্রসারী এই পরিকল্পনা গ্রহণ করে বর্তমান সরকার যথেষ্ট দূরদর্শিতা দেখিয়েছে- এ কথাটি জোর দিয়েই বলা যায়।

ড. আতিউর রহমান: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ।