দেশের অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত

আগের সংবাদ

বিজ্ঞান গবেষণা : বাংলাদেশ

পরের সংবাদ

অভিবাসীর কান্নায় নিশ্চুপ বিশ্ব বিবেক!

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৮ , ৭:২৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৮, ৭:২৩ অপরাহ্ণ

মোতাহার হোসেন

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

বিশ্বের দেশে দেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। যুদ্ধবিগ্রহ, সন্ত্রাস, সহিংসতা, অর্থনৈতিক টানাপড়েন, প্রাকৃতিক কারণ, বর্ণবৈষম্য, রাজনৈতিক, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির কারণে মানুষ বিভিন্ন সময়ে নিজ দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবিকা ও বাঁচার প্রয়োজনে নিজ জন্ম এলাকা ছেড়ে ভিন্ন দেশে যেতে বাধ্য হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে অভিবাসী প্রবেশের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবির ঘটনায় অভিবাসী মৃত্যুর হার বাড়ছে মর্মে সম্প্রতি একটি খবর বেরিয়েছে। এটি উদ্বেগের। এক কথায় বলা যায়, আজ বিশ্বের দেশে দেশে অভিবাসীদের আর্তনাদে ভারী হয়ে আসছে আকাশ, বাতাস। আর্তমানবতার ক্রন্দনে বিশ্ব বিবেক অনেকটাই নিশ্চুপ। যদিও জাতিসংঘ বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে কথা বলছে- কিন্তু কে শোনে কার কথা! যাক বলছিলাম কেন মানুষ অভিবাসী, উদ্ভাস্তু হয় সে প্রসঙ্গে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অভিবাসী মানুষের সংখ্যা যেমনি বাড়ছে তেমনি তাদের জীবন-জীবিকায় দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। বিশ্বের অধিকাংশ ধনী রাষ্ট্র অভিবাসীদের আশ্রয়ের পরিবর্তে ‘অভিবাসী বোঝাই ট্রলার, নৌকা নদীতে, সাগরে ডুবিয়ে মানুষ মারছে।’ বিশ্বে এখন অভিবাসীর সংখ্যা ২৫ কোটিরও বেশি এবং তারা বিশ্ব জনসংখ্যার ৩ শতাংশ। তবে বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের (গ্লোবাল জিডিপি) ১০ শতাংশ হচ্ছে তাদের অবদান। এই তথ্য জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের।

পাশ্চাত্যজুড়ে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে যখন অভিবাসনবিরোধী বর্ণবিদ্বেষী রাজনীতির উত্থান ঘটছে, তখন সদ্য সমাপ্ত ‘ফুটবল বিশ্বকাপে’ ফ্রান্স ও ইউরোপকে মনে করিয়ে দেয়, এই অর্জনে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদানই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপে ফরাসি দলের হয়ে যারা খেলেছেন, তাদের ৭৮ শতাংশই হচ্ছে অভিবাসী। এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেয়া দলগুলোর মধ্যে ফ্রান্স দলেই অভিবাসীর সংখ্যা বেশি।

অভিবাসন, বিশেষত মুসলমান অভিবাসনের বিরুদ্ধে ইউরোপে বর্তমানে যে রাজনৈতিক হাওয়া উঠেছে, এর সূত্রপাত কিন্তু ফ্রান্সে ইনমেরি লোপেনের দল ন্যাশনাল ফ্রন্টের উত্থানের মাধ্যমে। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই বর্ণবিদ্বেষী দল দ্বিতীয় এবং তার আগের নির্বাচনে তৃতীয় অবস্থানে ছিল। আর এই দলের রাজনীতি মোকাবেলায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে ফ্রান্সের মূলধারার ডানপন্থি ও বামপন্থি উভয় দলই অভিবাসনবিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রটিতে মুসলমানরা আগে যেসব ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতেন, সেগুলোর কয়েকটিই তারা হারিয়েছেন।

গ্লোবাল কমপ্যাক্ট অন মাইগ্রেশন নিয়মমাফিক অভিবাসনের বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ করে দেবে এবং একই সঙ্গে তা কোটি কোটি অভিবাসীর অবৈধ পথে দেশান্তরী হওয়ার ঝুঁকি কমাবে। মানুষের বেঁচে থাকা যখন সংকটে পড়ে তখন তা মানবিক বিপর্যয়ে পৌঁছায়। অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই বিপর্যয় শব্দটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাস্তাবে অভিবাসীদের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়েই চলছে নিষ্ঠুরতা, অমানবিক আচরণ। গত কয়েক বছর ধরে নির্যাতন আর হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পেতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশান্তরী হচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে ২০১৭-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ কোটি ৮৫ লাখ মানুষ দেশান্তরী হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৬ লাখ মানুষ ২০১৭ সালে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে সর্বোচ্চ ৬৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশত্যাগ করেছে। দেশত্যাগী মানুষ নিরুপায় হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশেই বেশিরভাগ আশ্রয় নিয়ে শরণার্থী হচ্ছে। শতকরা ৮৫ ভাগই পাশের দেশে প্রবেশ করে। আবার কোনো কোনো দেশ অভিবাসীবাহী নৌকা ডুবিয়ে তাদের হত্যা করে। এর নজির আছে প্রচুর। তবুও মানুষ প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে অভিবাসী হয়। এ পর্যায়ে আফ্রিকা, আরব, এশিয়ার শরণার্থীদের বেশ সংখ্যক ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছে। শুধু আটলান্টিক নয়, সাগর, মহাসাগর পাড়ি দিয়ে লাখ লাখ শরণার্থী ইউরোপের বিভিন্ন প্রবেশ করছে। বর্তমান ইউরোপের অনেক দেশে শরণার্থীদের আশ্রয় দিচ্ছে না। অবশ্য জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের উদারনীতির কারণে ২০১৬ সালে ১২ লাখ শরণার্থী জার্মানি প্রবেশ করেছিল। অবশ্য এ সময় ইউরোপের অন্যান্য দেশ ইতালি, নেদারল্যান্ডস, স্পেনসহ অনেক শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়। এর আগে ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। অভিবাসীর পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা সর্বাধিক। অনুরূপ জাতিগত নিধনের স্বীকার হয়ে গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে আরো প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের যে বর্বরোচিতভাবে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করেছে, পৃথিবীর শরণার্থীদের ইতিহাসে এত নির্মম ঘটনা আর কোথাও ঘটেনি। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রতি যে সহমর্মিতা দেখিয়েছে তা মানবতার ইতিহাসে নজিরবিহীন। বাংলাদেশের এই উদ্যোগ বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত হয়েছে এবং হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যারাই অভিবাসী হয়ে অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন এক সময় তারা তাদের জীবনাচার বদলে সংগ্রাম ও কষ্টকে মেনে নিয়ে মেধা, মনন, বৃদ্ধি, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, নিষ্ঠা দিয়ে নিজের এবং যে দেশে তারা অভিবাসী হয়ে বসবাস করছেন তাদের দেশের উন্নয়নে, অগ্রগতিতে, সংস্কৃতি, খেলাধুলাসহ সব কর্মকাণ্ডে অসামান্য অবদান রেখেছে। যদিও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে সেই সৃজনশীলতা, মেধা, সংস্কৃতি, শিক্ষার ও হার কম। এ কারণে তারা প্রতিবাদী হয়ে নিজ দেশে থাকতে পারেনি। বছরের পর বছর ধরেই তারা মিয়ানমারের সামরিক জান্তাসহ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর হাতে নিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যার শিকার।

বিশ্বের দেশে দেশে এখন যেভাবে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর নিধন, নিপীড়ন, নির্যাতন চলছে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ১৯৭১ সালের আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ আলোকবর্তিকা হিসেবে অনুপ্রেরণা জোগাবে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। পাশাপাশি বিশ্বের অপরাপর দেশের উচিত অভিবাসীদের ব্যাপারে মানবিক আচরণ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করা। কারণ অভিবাসী হলেই খারাপ, অকর্মণ্য, অপদার্থ হয় না তার বড় প্রমাণ বিগত বিশ্বকাপ। এই বিশ্বকাপে বিজয়ের নেপথ্যে অভিবাসী ফুটবলাররাই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। আমরা অভিবাসী মানুষের পক্ষে, মানবতার পক্ষে, মানবাধিকারের পক্ষে। তাই অভিবাসীদের আর্তনাদ, আহাজারিতে বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হবে, বিশ্ব নেতারা দাঁড়াবেন তাদের পাশে। তবেই মানবতার জয় হবে- সেই প্রত্যাশাই করছি।

মোতাহার হোসেন : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।