নগরবাসীর নিরাপত্তায় ডিজিটাল মনিটরিং

আগের সংবাদ

আওয়ামী লীগের সমস্যা আত্মসন্তুষ্টি ক্ষতিকর

পরের সংবাদ

আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু!

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮ , ৮:০৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮, ৮:০৫ অপরাহ্ণ

ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল

সম্পাদক, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)

ডেঙ্গু প্রতিরোধ তো সরকারের একার কাজ, সিটি করপোরেশনের কাজ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ এগুলো হলো আমাদের মজ্জাগত ধারণা। কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে আমার ন্যূনতম দায়িত্ব কি আমি পালন করতে পারি না? আমরা কি পারি না আমাদের আশপাশটি অন্তত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে। শুধু তাই নয়, আমি আরো একজন মানুষকে সচেতনও করতে পারি ডেঙ্গু থেকে বাঁচার জন্য।

কিছুদিন আগে হঠাৎ ভোরবেলা এক পরিচিত মানুষের ফোন, দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। ঘুম থেকে উঠেই পড়িমরি করে ছুটলাম হাসপাতালে। একটি প্রাইভেট হাসপাতালে সকালটা বেশ অলসতায় ভরা। একজন নার্স ক্যান্টিনে আয়েশি ভঙ্গিতে নাস্তা করছিলেন। হাসপাতালে এসে জানলাম অসুস্থ ব্যক্তিটি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত প্রায় চারদিন হলো। তার রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ দশ হাজারে নেমে এসেছে যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যা হোক রোগীকে আমরা পরবর্তী সময় স্কয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করি এবং ৫ দিন পর সে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসে। এরই মধ্যে আমার ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত ঢাকা শহরের প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। সবাই শুরুতে সাধারণ জ্বর মনে করলেও পরবর্তী সময় খুবই ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। ঢাকা শহরে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত নানান রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো কোনো এলাকায় এটির বিস্তার হচ্ছে খুবই দ্রুত। যেমন গুলশান। এ ছাড়া শহরজুড়েই এই রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে আতঙ্কজনক হারে। কিন্তু আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কি এ বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব প্রদান করছেন? প্রতিরোধমূলক ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন? বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থা ও টিম গঠন করেছেন? এই ডেঙ্গু অন্যদিকে মোড় নেবে কিনা সে বিষয়ে গবেষণা কি চলছে? আমরা বিগত কয়েক বছরের চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাবের কথা জানি। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত ছিলাম। সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। আমার কর্মক্ষমতা অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে এই চিকুনগুনিয়া। এক বছর হয়ে গেলেও আমার ওপর চিকুনগুনিয়ার প্রভাব এখনো বলবৎ।

আমরা জানি ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এডিস মশার কামড়েই এই রোগের বিস্তার ঘটে। সাধারণত বর্ষাকালে এডিস মশার বিস্তার ঘটে। ঘরে, বারান্দায়, ছাদে, রাস্তায় জমানো পানিতে এ মশার বংশবৃদ্ধি ঘটে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হয় (১০৪ ডিগ্রি)। এর পাশাপাশি প্রচণ্ড গা ব্যথা, ক্ষুধামন্দা, মাথাব্যথা, জয়েন্টে ব্যথা, পালস রেট কমে যাওয়া, ব্লাড প্রেসার কমে যাওয়াসহ নানান উপসর্গ দেখা দেয়। এক কথায় ডেঙ্গু জ্বর যে কোনো ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে ভয়াবহ রকম ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে যা তাকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত ভোগান্তিতে রাখে। এডিস মশার সাধারণত দিনের দুটি সময়ে কামড়ায় একটি হলো সূর্যোদয়ের আধঘণ্টার মধ্যে আর আরেকটি হলো সূর্যাস্তের আধঘণ্টা আগে। সাধারণত চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস দেখা যায়। এর যে কোনো একটি দ্বারা আক্রান্ত হলে অন্যগুলো দ্বারা আর আক্রান্ত হয় না। কারণ শরীর ওই ভাইরাসের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে। তবে সে অন্য কোনো ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতেই পারে। ডেঙ্গু জ্বর আবার দুধরনের। একটি হলো সাধারণ জ্বর আর আরেকটি হলো ডেঙ্গু হেমোরোজিক। ডেঙ্গু এখন মহামারী আকারে ভারত, থাইল্যান্ড, জাপান, ফিলিপাইন, বাংলাদেশসহ পশ্চিম আফ্রিকা, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা, উত্তর-পূর্ব অস্ট্রেলিয়া, ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশে দেখা যায়। এক কথায় বিশ্বব্যাপী এই রোগ মহামারী আকারেই ছড়িয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছরে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সর্বস্তরে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। একটি সময় অপেক্ষাকৃত অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, জলাবদ্ধতা, ঘিঞ্জি বস্তি এলাকায় এ ধরনের মহামারী ছড়িয়ে পড়লেও এখন তা শহরের অট্টালিকাময় মনোরম পরিবেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। যে কারণে ঢাকা শহরে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষ পাওয়া যাচ্ছে গুলশাল এলাকায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট চিকিৎসক ও পরিবেশ আন্দোলন নেতা ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, সাধারণ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে এসি, ফুলের টব, অ্যাকুরিয়ামসহ বিভিন্ন স্থানে স্বচ্ছ পানি জমিয়ে রাখে এবং ডেঙ্গু মশার বংশবৃদ্ধি হয় এই পরিষ্কার পানিতে। তাই অপেক্ষাকৃত অভিজাত এলাকায় এ মশার আক্রমণ ও প্রাদুর্ভাব বেশি। ডা. লেলিন চৌধুরী আরো বলেন, ডেঙ্গু এখন শহর থেকে গ্রামেও বিস্তার করছে। এই রোগের প্রাদুর্ভাবের অন্যতম বড় কারণ হলো বিদ্যমান দুর্বল প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আর জনগণের অসচেতনতা।

সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এ ক্ষেত্রে ত্বরিত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মাঠে যেমন কাজ করতে হবে মশা প্রতিরোধের জন্য, একইভাবে গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে এর প্রতিরোধে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও নাগরিকদের নিয়ে তিন স্তরের সমন্বিত কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। পার্ক, লেক ও মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে মশা নিধনের ব্যবস্থা যেমন করতে হবে, একইভাবে প্রতিটি নাগরিককে এ বিষয়ে সচেতন ও সক্রিয় করার উদ্যোগও নিতে হবে। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান ভারতের নয়াদিল্লিতে এক জরুরি বৈঠকে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন এবং তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধ তো সরকারের একার কাজ, সিটি করপোরেশনের কাজ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ এগুলো হলো আমাদের মজ্জাগত ধারণা। কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে আমার ন্যূনতম দায়িত্ব কি আমি পালন করতে পারি না? আমরা কি পারি না আমাদের আশপাশটি অন্তত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে। শুধু তাই নয়, আমি আরো একজন মানুষকে সচেতনও করতে পারি ডেঙ্গু থেকে বাঁচার জন্য। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাই প্রধান। কারণ যখন একটি রোগ ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করেছে তার প্রতিরোধের জন্য সমন্বিত কার্যক্রম একমাত্র সরকারই নিতে পারে। তবে জনগণের সমন্বিত শক্তিও এ ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। লাখ লাখ স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়ে রাস্তায় নেমে শান্তিপূর্ণ একটি আন্দোলন করল নিরাপদ সড়কের দাবিতে। আমরা কিন্তু এই তারুণ্যকে সবসময় এ ধরনের উদ্যোগে পাশে পেতে পারি। আর তার জন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীলভাবে তাদের আহহ্বান করা ও কাজে লাগানো। সমাজ সংস্কারের জন্য তারুণ্যের বিকল্পও যেমন নেই, তেমনি যে কোনো জাতীয় স্বার্থে এই তারুণ্যই আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল। তাই আসুন শুধু চোখ বুজে না থেকে, একটু চোখ মেলে দেখি। ডেঙ্গু এ সময়ের জন্য একটি আতঙ্কের নাম কিন্তু আমরা এই আতঙ্ককে কাটাতে সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলেই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারি। আর এ জন্য স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও নাগরিকদের এখনই যূথবদ্ধ হতে হবে। তার কোনো বিকল্প নেই।

ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল : সম্পাদক, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)।