আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু!

আগের সংবাদ

বিদ্যুৎ বিভ্রাটে স্থগিত সংসদ অধিবেশন

পরের সংবাদ

আওয়ামী লীগের সমস্যা আত্মসন্তুষ্টি ক্ষতিকর

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮ , ৮:১২ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮, ৮:১২ অপরাহ্ণ

শেখর দত্ত

রাজনীতিক ও কলাম লেখক

নিজ দলের বিদ্রোহীদের আন্দোলনও আওয়ামী লীগের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর রাস্তা অবরোধ আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ দেশবাসীর অভিজ্ঞতার মধ্যে আছে। প্রসঙ্গত বলতেই হয়, কিছুদিন আগে নির্বাচন সামনে রেখে বিভাগীয় সম্মেলনেও নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় শৃঙ্খলার বিষয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। এখন রুদ্ধদ্বার জরুরি বৈঠকে তা আবার পুনরাবৃত্তি করতে হচ্ছে।

নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে ততই দুই নেত্রী, দুই দল, দুই ধারার রাজনীতির সমস্যাগুলো মাত্রার ভিন্নতা থাকলেও আরো জটিল ও সুস্পষ্ট হচ্ছে। রাজনীতি সমস্যা ছাড়া চলে না। সাংবিধানিক-গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নির্বাচন হচ্ছে সবচেয়ে বড় ঘটনা, পছন্দের কর্মসূচিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য বিভক্ত জনগণের মধ্যে যুদ্ধ, যা প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর পারস্পরিক লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়। বিনা যুদ্ধে কেউ কখনো নির্বাচনী মাঠ ছেড়ে দেয় না। এটা অবশ্য বলা হয়ে থাকে যে, গত নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের ২০ দলীয় জোট ভোট বয়কট করেছিল। কিন্তু আসলে কি ভোটযুদ্ধ বয়কট করেছিল? করেনি। আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে গৃহযুদ্ধের প্রচেষ্টা নিয়ে ভোট বানচাল করে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ করতে চেয়েছিল। নির্বাচনী যুদ্ধকে জনগণের উৎসবে রূপান্তরিত করতে দেয়া হয়নি। বোঝাই যাচ্ছে, আসন্ন নির্বাচনে এবারেও দুই প্রধান দল ও জোটের কেউ ফাঁকা মাঠ পাবে না। ভোট বাক্সের যুদ্ধ বা রাস্তার যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়েই ক্ষমতায় বসতে হবে। বলাই বাহুল্য জোট গঠনে, কর্মসূচি উত্থাপনে, শক্তি সংহতকরণে, জনগণকে সম্মিলন ঘটাতে যে দলের সমস্যা যত কম থাকবে, সেই দলই থাকবে নির্বাচনী যুদ্ধে এগিয়ে। এই দিক বিচারে অবস্থাটা কি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের!

সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকার আওয়ামী লীগের হাতে থাকছে বলে যারা মনে করছেন, ক্ষমতার দৌড়ে দলটি ফুল বিছানো পথে আছে, তারা আসলে সমস্যার কাঁটাকে লঘু করে দেখছেন। এটা ঠিক বিএনপির মতো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সংকট বা শূন্যতার মধ্যে নেই। নেত্রী শেখ হাসিনা আছেন শক্ত অবস্থানে। আর তৃণমূলে দল বা সম্ভাব্য প্রার্থীর চাইতে জনপ্রিয়তা বিচারে আওয়ামী লীগ নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আছেন অনেক এগিয়ে। স্বাধীনতার পর তো বটেই যদি পাকিস্তানি আমল থেকে এখন পর্যন্ত এই মানচিত্রের রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনাকারী সিভিল ও মিলিটারি শাসকদের অবস্থান, অবস্থা ও কার্যক্রম তথা ক্ষমতা কেন্দ্রের ভারসাম্য রক্ষা করে দেশ ও জনগণকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনায় নেয়া যায়, তবে দেখা যাবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা থাকবেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, অনেক নম্বর পেয়ে শীর্ষস্থানে।

জাতীয় পরিচয় ও ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি নিয়ে প্রায় সমভাবে দ্বিধাবিভক্ত, ‘খাই-খাই’ বা লুটেরা অর্থনীতির উঁচু থেকে নিচুতলা পর্যন্ত দাপট, ‘চাঁদে ঘাতক সাঈদীকে দেখা’ যাওয়ার মতো সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতা, হত্যা-ক্যু তথা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক বা জরুরি আইনের শাসন, নির্লজ্জভাবে ক্ষমতায় থাকার ফন্দিফিকির, স্থিতি না পাওয়া সরকার পদ্ধতি প্রভৃতি গণবিরোধী ও দেশবিরোধী অশুভ ও অগণতান্ত্রিক কারণ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও দেশটির ওপর চেপে বসে আছে। রয়েছে অতীতের জের ও উপমহাদেশের বর্তমান অবস্থার টানাপড়েনের কারণে পাকিস্তান-ভারত নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনভিপ্রেত বিভক্তি। ভূ-রাজনৈতিক কারণে ছোট দেশ হওয়ায় শক্তিধর বড় দেশের নাক গলানো তো আছেই। এখনকার দুনিয়ার অন্যতম প্রধান সমস্যা শরণার্থী সমস্যার কবলে মুক্তিযুদ্ধের মর্মবাণী মানবতা ঊর্ধ্বে তুলে ধরার কারণে পড়ে গেছে দেশ। এই পরিস্থিতিতে সরকারে থেকে সাংবিধানিক-গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রেখে দেশকে উন্নতি-অগ্রগতি-সমৃদ্ধি ও জনগণের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা ও মানোন্নয়ন করা আমাদের দেশটিতে খুবই কঠিন ও জটিল।

বলাই বাহুল্য এটা প্রমাণিত এই জটিল ও কঠিন কাজটি আওয়ামী লীগ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিয়ে হচ্ছে। নানা চড়াই-উৎরাই সত্ত্বেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বহুমুখী ও প্রসারিত করে জনগণকে যথাসম্ভব শান্তি ও স্বস্তি দিতে পেরেছেন তিনি। বিশ্বসভায় তিনি দেশের মর্যাদাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’, ‘দুর্যোগের দেশ’, ‘সামরিক কর্তাদের শাসিত দেশ’, ‘অভাব-অনটনের দেশ’, ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’, ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ প্রভৃতি শব্দগুলো এখন যেন সুদূর অতীতের বিষয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে দেশ এখন ‘অমীমাংসিত এক বিস্ময়’, ‘রোল মডেল’। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিক ইনস্টিটিউটের (আইআরই) জরিপে ৬৫ শতাংশ মানুষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আস্থাশীল ফল এমনি এমনি বের হয়নি।

বলার অপেক্ষা রাখে না, উল্লিখিত কারণে পাকিস্তানও এখন হতে চায় বাংলাদেশের মতো। এ জন্য অবশ্য পাকিস্তানি আমলের সূচনায় প্রথম যে দল গণতন্ত্রের সূতিকাগারে জন্ম নিয়েছিল, যে দল পাকিস্তানি আমলে গণতন্ত্র ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা ও মুক্তিযুদ্ধে অবিসংবাদিতভাবে নেতৃত্ব দিয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ও পরাজিত শত্রুঘেরা দেশে দেশবাসীকে প্রথম গণতান্ত্রিক সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা উপহার দিয়েছিল, যে দল স্বাধীনতার পর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের মধ্যে ভোট ও ভাতের সংগ্রামকে বিজয়ের মুখ দেখিয়েছিল; সেই দলকে এখন গণতন্ত্র সংকোচনের অপবাদ ঘাড়ে নিতে হচ্ছে।

বলাবাহুল্য, অভিজ্ঞতা আওয়ামী লীগকে এই পথে নিয়ে গেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত নবজাত দেশকে গণতন্ত্র উপহার দিয়ে বঙ্গবন্ধু পেয়েছিলেন ‘রাতের বাহিনী’ আর ‘চাটার দল’। দুর্নীতি ও নাশকতা বঙ্গবন্ধুর সরকারকে স্থিতি শাস্তি ও স্বস্তির মধ্যে থাকতে দেয়নি। পরিণতি ১৫ আগস্টের কালরাত্রির শতাব্দীর সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সেই নৃশংসতা! আর শেখ হাসিনা ২০০১ ও ২০০৮ সালে পড়েছিলেন যথাক্রমে সা-ল-শা মার্কা ‘প্রথম রাতে বিড়াল মারা’ ও ইয়াজউদ্দিন মার্কা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর ফাঁদে। সাধে সাধে তো আর গণতন্ত্রের পথ মানিক মিয়া এভিনিউর মতো না হয়ে আঁকাবাঁকা বা কণ্টকাকীর্ণ হয়নি। প্রবাদ বলে ডালে ডালে চড়তে চাইলে পাতায় পাতায় চলতেই হয়। ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ইতিহাসই বাংলাদেশের কপালে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার পথ এমন বন্ধুর করে দিয়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে ধারণা করা যায়, এখন নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা পর্যন্ত আগামী কয়েক মাস এই পথ অতিক্রম করতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে প্রধানত নিম্নের কতক সমস্যা অতিক্রম করতে হবে।

এক. দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সমস্যা। যেমনটা অনুমান করা হয়েছিল, তেমনটাই হচ্ছে। এলাকায় এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এখানে ওখানে সাংসদদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হচ্ছে। মনোনয়নের প্রত্যাশায় দলবল নিয়ে নাকি প্রতি আসনে গড়ে ১০ জন প্রার্থী মাঠে নেমে গেছে। একে অপরের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা প্রচার তুঙ্গে তুলছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতা কে কার পক্ষে তা নিয়ে ভেতরে ভেতরে প্রচার হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুধাবন করে গত কয়েকদিন আগে জরুরিভাবে আহূত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে নেত্রী শেখ হাসিনাকে তাই বলতে হয়েছে, ‘দলের বিরুদ্ধে গেলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’ কথা যদি কাজে পরিণত না হয়, তবে বিপদ আছে আওয়ামী লীগের।

দুই. মন্ত্রী-নেতাদের বেফাঁস কথাবার্তা আওয়ামী লীগের জন্য বিরাট সমস্যা। প্রথমে ইভিএমের পক্ষে অহেতুক দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে বাধানো হলো বিতর্ক। সৃষ্টি করা হলো বিভ্রান্তি। সেই একই ধারা, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এর সুরাহা হলো। তারপর নির্বাচনের তারিখ নিয়ে কথা বলায় সৃষ্টি হলো অনভিপ্রেত বিভ্রান্তি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাকে কেন এমনটা বলার সুযোগ দেয়া হলো যে, ‘অর্থমন্ত্রীর এ কথা বলা তার ঠিক হয়নি।’ সাধারণ সম্পাদক ওবায়েদুল কাদের বললেন, ‘ইসিকে বিব্রত করা আমাদের কাজ নয়।’ কত ধরনের যে আছে অনভিপ্রেত অহেতুক কথা! কেন যেন মনে হচ্ছে, নির্বাচনের তিন মাস দলীয় মুখপাত্র নিয়োগ করার প্রয়োজন রয়েছে আওয়ামী লীগের।

তিন. ভোটারদের মধ্যে ইনকামবেন্সি ফ্যাক্টর ও এন্টি আওয়ামী লীগ ইউনিটি বিদ্যমান থাকায় জোট গঠন ও সম্প্রসারণ নিয়েও আওয়ামী লীগের আত্মসন্তুষ্টির অবকাশ নেই। নতুন কোনো দলকে কি জোটে নিতে পারবে আওয়ামী লীগ? অতীত অভিজ্ঞতায় বলা যায়, জাতীয় পার্টিকে সামলানো আর পাগলা ঘোড়াকে সামলানো একই কথা। এরশাদ ইতোমধ্যে নানা ধরনের উল্টোসিধে কথা বলে সিঁদুরে মেঘ দেখাচ্ছেন। ড. কামাল এরশাদের নাম শুনতে পারতেন না, তিনি পর্যন্ত জাতীয় পার্টি বৃহত্তর ঐক্যে আসবে কিনা প্রশ্নে নিশ্চুপ থেকেছেন। দলে শৃঙ্খলার সমস্যা রেখে জোটের সহযোগী বিশেষত ভোটবিহীন দল ও প্রার্থীকে সিট ছেড়ে দিয়ে নির্বাচন করাটা আওয়ামী লীগ এখনো তেমন রপ্ত করতে পারেনি। প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও দলীয় প্রার্থীকে ভেতরে ভেতরে ‘সাইজ আপ’ করতে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতারা ওস্তাদ। হুঁশিয়ারি যতই হোক কিংবা বহিষ্কার যা-ই হোক, জিতলে আবারো দরজা খুলে স্বাগত জানানোর সংস্কৃতি আওয়ামী লীগে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। নিজস্ব সিটে নেত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচন থাকবে, সর্বোপরি থাকবে দেশব্যাপী দলীয় প্রচারের কাজ। গৃহবিবাদ সামলানোর কাজটা করবেন কে বা কারা। কোনো ব্যবস্থাপনা কি দাঁড় করাবে আওয়ামী লীগ! বিএনপি যদি জামায়াতের সঙ্গে ২০ দলীয় জোট বহাল রেখে বৃহত্তর জোট করে নির্বাচনে অংশ নেয়, তখন এই গৃহবিবাদের পরিণতি হতে পারে মারাত্মক।

চার. স্বতঃস্ফূর্ত ও কথিত দলনিরপেক্ষ আন্দোলন সামাল দেয়াও আওয়ামী লীগের জন্য সমস্যা হতে পারে। বেশি দূরে না গিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে রাস্তার নিরাপত্তা কিংবা কোটা আন্দোলনের সময় দেখা গেছে, সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও বাহিনী যেমন কমবেশি অকেজো হয়ে যায়, বহু আন্দোলন-সংগ্রামে অভিজ্ঞ ও গণসমর্থিত আওয়ামী লীগও কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। পারছে না সাধারণ মানুষ বা ছাত্রদের পক্ষে নামাতে। এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাঘা বাঘা নেতারা থাকতেও ক্যাডার দিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন সামলানোর অভিযোগ আওয়ামী লীগকে ঘাড়ে নিতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রেও শেষ ভরসা নেত্রী। নির্বাচনের শেষ দিনগুলোতে এমন কোনো ঘটনায় আওয়ামী লীগকে বিপদে পড়তে হতে পারে।

পাঁচ. নিজ দলের বিদ্রোহীদের আন্দোলনও আওয়ামী লীগের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর রাস্তা অবরোধ আন্দোলনের চ‚ড়ান্ত রূপ দেশবাসীর অভিজ্ঞতার মধ্যে আছে। হিংসাত্মক জ্বালাও-পোড়াওসহ অস্ত্রের ঝনঝনানি পর্যন্ত হয় ওই সব তথাকথিত আন্দোলনে। প্রসঙ্গত বলতেই হয়, কিছুদিন আগে নির্বাচন সামনে রেখে বিভাগীয় সম্মেলনেও নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় শৃঙ্খলার বিষয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। এখন রুদ্ধদ্বার জরুরি বৈঠকে তা আবার পুনরাবৃত্তি করতে হচ্ছে। তথাকথিত সেই ন্যায্য প্রার্থী আন্দোলন রাস্তা অবরোধে দাঁড়ানো বন্ধ করা বা হয়ে গেলে থামানোর ব্যবস্থা নিয়ে আগাম কিছু ব্যবস্থাপনা দাঁড় করানোর প্রয়োজনীয়তা কিছু আছে কি!

ছয়. বিএনপি নির্বাচনের আগে আন্দোলন করতে চাইবেই। যদি নির্বাচনে যায়, তবুও নিঃসন্দেহে বলা যায় মুখ রক্ষা এবং দলকে সংহত ও পক্ষের জনগণকে সক্রিয় করার জন্য আন্দোলনের খেলায় মাঠে নামবেই। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ করার কৌশল তো আছেই। ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি ২০ দলীয় জোটের বৈঠক করছে আবার ‘ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে ছাড় দিয়ে’ বৃহত্তর ঐক্য করতে চাইছে। ২০ দলীয় বৈঠকের ফলাফল এবং বিএনপি ও যুক্তফ্রন্ট-গণফোরাম নেতাদের কথা থেকে মনে হচ্ছে, দুই দিকেই পা রেখে বিএনপিকে দুই ধরনের ঐক্য করার সুযোগ দিবে সংশ্লিষ্ট দলগুলো। সেই অবস্থায় যদি আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তি রাস্তায় নামে, তবে পরিস্থিতি কি হবে! আন্তর্জাতিক ও জাতীয়কারণে ক্ষমতার ভারসাম্যের সব হিসাব রাজনীতিতে সব সময় মিলে না। অপ্রত্যাশিত অনেক কিছুই রাজনীতির অনুষঙ্গ; বিশেষত নির্বাচনী যুদ্ধ যখন হচ্ছে।

উল্লিখিত সমস্যাগুলো ছাড়াও নির্বাচন ঘিরে দল ও দেশের ভেতর-বাইরের অপ্রত্যাশিত ছোট-বড় আরো আরো সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে আওয়ামী লীগকে। ইতোমধ্যে জানা গেল হেফাজত আবারো দাবি নিয়ে মাঠে নামছে। সরকারের ছাড় কতটুকু কার্যকর থাকবে কে জানে! বাম দলগুলোও আছে গতবারের মতো অনেকটাই বিএনপির মতো সরকারবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আক্রমণাত্মক মুডে। অতীতে কখনো আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়া ও থাকার পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। হত্যা-খুন, যড়যন্ত্র-চক্রান্ত ইত্যাদির মধ্য দিয়ে রক্তাক্ত ও কণ্টকাকীর্ণ পথে আওয়ামী লীগকে অগ্রসর হতে হয়েছে। এবারে দেশ যখন ক্রসরোডে; একদিকে যেমন দেশ ও জনগণের উন্নতি অগ্রগতির দ্বার নানা সম্ভাবনা নিয়ে অবারিত, তেমনি গণতন্ত্র ও সংসদীয় ব্যবস্থার সামনে রয়েছে জনগণকে বিভ্রান্ত ও হতাশ করার মতো হিমালয়সম বাধাবিপত্তি। নির্বাচন সামনে রেখে তাই লাখ-কোটি টাকার প্রশ্ন: পারবে কি আওয়ামী লীগ ঢেউয়ের ওপর দিয়ে পালের নৌকা চালিয়ে যেতে?

শেখর দত্ত : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।