টাঙ্গাইলের বাসাইলে ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে এক ব্যক্তির মৃত্যু

আগের সংবাদ

খালেদার মুক্তি দাবিতে বিএনপির মানববন্ধন

পরের সংবাদ

চিকিৎসা নিয়ে নানামুখী তৎপরতা বিএনপির

খালেদার অসুস্থতায় উদ্বেগ

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৮ , ১:৫১ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৮, ১:৫১ অপরাহ্ণ

দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিএনপিতে। কারাবন্দি দলীয় চেয়ারপারসনের চিকিৎসার জন্য গতকাল দিনভর নানামুখী তৎপরতা চালিয়েছেন নেতারা। দেনদরবার চালিয়েছেন সরকারের সঙ্গে, রিট দায়ের করেছেন হাইকোর্টে। এর আগে ধরনা দিয়েছেন বিদেশি ক‚টনৈতিক মহলেও। চিকিৎসার জন্য বিএনপি ও খালেদা জিয়ার পছন্দ ঢাকার বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতাল। দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে অ্যাপোলো হাসপাতালের নামও এসেছে। তবে সরকার বলেছে, কারাবিধি অনুযায়ী চিকিৎসা হবে খালেদার। শিগগিরই মেডিকেল বোর্ড গঠন করে এ ব্যাপারে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
সচিবালয়ে গতকাল রবিবার বিকেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সঙ্গে বৈঠক করে ইউনাইটেড হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দাবি জানান বিএনপি নেতারা। মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বেলা আড়াইটায় সচিবালয়ে প্রবেশ করে। বিকেল পৌনে ৪টা পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চতুর্থ তলায় মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের কক্ষে এই বৈঠক চলে। বৈঠকের একপর্যায়ে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীনও মন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করেন। এ সময় মির্জা ফখরুলের সঙ্গে ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, জমির উদ্দিন সরকার, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান।
বৈঠক সূত্র জানায়, বিএনপি নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশের পর তারা কুশল বিনিময় করেন। এর পরপরই খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের বিষয়টি উপস্থাপন করেন। দলীয় চেয়ারপরসনকে তার পছন্দ মোতাবেক ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানান তারা। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাৎক্ষণিক কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীনকে ডেকে পাঠান। বিএনপি নেতাদের সামনেই খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান। সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন জানান, গত ১৪ এপ্রিল পিজি হাসপাতালে খালেদা জিয়ার যেসব শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয় তাতে তেমন কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি। তবে তার বর্তমান অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ। সব শুনে মন্ত্রী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বোর্ড বসিয়ে, তাদের মতামত নিয়ে তাকে জানাতে বলেন। খালেদা জিয়ার চিকিৎসার ব্যাপারে তিনি আন্তরিকভাবে দেখবেন বলেও উপস্থিত বিএনপি নেতাদের আস্বস্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বৈঠক শেষে বের হয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা তাকে (মন্ত্রী) অনুরোধ করেছি, খালেদা জিয়াকে দ্রুত যেন বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। ইউনাইটেড হাসপাতাল যেটা তিনি পছন্দ করেন, সেই হাসপাতালে নেয়ার জন্য আমরা তাকে অনুরোধ করেছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জানিয়ে ফখরুল বলেন, মন্ত্রী বলেছেন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও আইজি প্রিজনসহ অন্যদের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি এও বলেছেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যারা আছেন, তাদের পরামর্শ নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন।
বিশেষায়িত হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চেয়ে রিট : এদিকে, দেশের যে কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে দণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। গতকাল রবিবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় খালেদা জিয়ার পক্ষে তার আইনজীবীরা রিটটি দায়ের করেন বলে নিশ্চিত করেন ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, ইউনাইটেড বা বিশেষায়িত হাসপাতালে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসাসেবা দেয়ার নির্দেশনা চেয়ে রিটটি দায়ের করা হয়েছে। পাশাপাশি খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য একটি বিশেষ বোর্ড গঠন ও এখন পর্যন্ত তার চিকিৎসাসেবা সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র দাখিলের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে রিটে।
খালেদা জিয়াকে যথাযথ চিকিৎসাসেবা না দেয়া সংবিধানের ৩২ ও ৩৫ (৫)-এর পরিপন্থী এমন যুক্তিতে রিটটি করা হয়েছে বলে জানান এ আইনজীবী। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিতে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি হবে না, তা জানতে রিট আবেদনে রুল চাওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজি (প্রিজন), ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সুপারসহ সাতজনকে রিটে বিবাদী করা হয়েছে বলে জানান আইনজীবী নওশাদ জমির।
প্রধান বিচারপতির কাছে খালেদার আইনজীবীদের নালিশ : জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিচারকাজ পরিচালনার জন্য হঠাৎ করে আইন বহিভর্‚তভাবে আদালত স্থানান্তর করা হয়েছে এমন অভিযোগ করে প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। গতকাল রবিবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সঙ্গে তার খাস কামরায় দেখা করে এই হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা। এ সময় আইনজীবীরা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ভালো নয় উল্লেখ করে লিখিত আবেদনে বলেন, তিনি (খালেদা জিয়া) গুরুতর অসুস্থ, তিনি হাঁটতে পারেন না। যা সরকারও স্বীকার করেছে। তবুও সরকার তার যথাযথ চিকিৎসার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। দেশের কারাগারের তালিকা থেকে পরিত্যক্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারটি এখনো বাদ দেয়া হয়নি সে কারণে সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি ছাড়া পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে আদালত স্থাপন অবৈধ ও আইন বহিভর্‚ত।
প্রধান বিচারপতির কাছে লিখিত আবেদনে আরো বলা হয়, আমরা আপনার কাছে অনুরোধ করছি, যারা বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং যে বিচারিক কর্মকর্তা তার বিচাররিক সীমা লঙ্ঘন করেছেন তাদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশ (হাইকোর্ট বিভাগ) ১৯৭৩ বিধি অনুযায়ী তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হোক।
প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার সাক্ষাৎ শেষে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, হঠাৎ করে রাতের বেলা নিয়ম ও আইন বহিভর্‚তভাবে জেলখানার একটি কক্ষকে অস্থায়ী আদালত বানানো হয়েছে। যাতে আইন অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে নেয়ার বিধান থাকলেও সেটি করা হয়নি। বিষয়টি আমরা প্রধান বিচারপতিকে জানিয়েছি। তিনি ধৈর্যের সঙ্গে বিষয়টি শুনেছেন। তিনি বিষয়টি দেখবেন বলেও আশ্বাস দিয়েছেন। আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, গত তারিখে আপনারা দেখেছেন অসুস্থ অবস্থায় জোর করে খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। খালেদা জিয়া বসতে পারেন না, দাঁড়াতে পারেন না, হাঁটতেও পারেন না। এ অবস্থায় তাকে হাজির করা হয়েছে। আইনজীবীদের কোনো জুডিশিয়াল নোটিস পর্যন্ত দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা আগে একটি জুডিশিয়াল আদেশ দিয়ে আইনজীবীদের একটি নোটিস করতে হয়। সেই নোটিস পর্যন্ত করেনি। যেহেতু এটা ওপেন ট্রায়ালও নয়। সেই কারণে আমরা সেখানে উপস্থিত হতে পারিনি। পরে এই আদালত আবার ১২ সেপ্টেম্বর তারিখ দিয়েছেন।
দুপুর ১টা ২০ মিনিট থেকে ১টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলী, জয়নুল আবেদীন, মীর মোহাম্মদ নাছির, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদলসহ বিএনপির আইনজীবীরা।
আইন জানেন না খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আইনমন্ত্রী : আইন বহিভর্‚তভাবে কারা অভ্যন্তরে আদালত স্থাপন করা হয়েছে, খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের এমন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, তারা যদি এরকম কথা বলে থাকেন তাহলে আমি বলব, তারা আইন জানেন না। গতকাল রবিবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টে তার খাস কামরায় সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
ঘণ্টাব্যাপী সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে ঈদের পর সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলাম। পারিবারিক নানা কারণে এতদিন (ঈদের পর) দেখা করতে পারিনি।
এর ঘণ্টাখানেক আগে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা অভিযোগ করেন, হঠাৎ করে বেআইনিভাবে কারাগারে আদালত স্থাপন করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে আমি জানি না। আমি যে বিষয়ে জানি না সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। এ বিষয়ে অবগত হওয়ার পর আমি নিশ্চয়ই মন্তব্য করব।
সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ না করে কারাগারে আদালত স্থাপন করায় আইনের লঙ্ঘন হয়েছে বলে দাবি করছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা এ বিষয়ে আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, তারা (খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা) যদি এরকম কথা বলে থাকেন তাহলে আমি বলব, তারা আইন জানেন না।
প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার সাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিচারের জন্য বিশেষ আদালত স্থাপন সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বকশীবাজার এলাকার সরকারি আলিয়া মাদরাসা ও সাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসংলগ্ন মাঠে নির্মিত এলাকাটি জনাকীর্ণ থাকে। সে জন্য নিরাপত্তাজনিত কারণে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের ৭ নম্বর কক্ষকে বিশেষ জজ আদালত-৫ হিসেবে ঘোষণা করা হলো।
প্রজ্ঞাপনে আরো উল্লেখ করা হয়, এখন থেকে বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন মামলা নং ১৮/২০১৭ এর বিচার কার্যক্রম পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের কক্ষ নং-৭ এর অস্থায়ী আদালতে অনুষ্ঠিত হবে। এরপর গত বুধবার ওই আদালতে বিচার চলাকালীন খালেদা জিয়া বলেন, আমি অসুস্থ। পা ফুলে যায়। আপনারা যা ইচ্ছা রায় দেন, আমি বারবার আসতে পারব না।