এলএনজি আমদানিতে অর্থায়ন করবে আইডিবি

আগের সংবাদ

চট্টগ্রাম জেলায় পাঁচ বছরে ভোটার বেড়েছে ৭ লাখ ১৬ হাজার

পরের সংবাদ

সৌদি আরবে নারী শ্রমিক এবং রাষ্ট্র

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৮ , ৮:০৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৮, ৮:০৮ অপরাহ্ণ

ফারুক যোশী

কলাম লেখক

অর্ধ শতাব্দীর কাছাকাছি আমাদের স্বাধীনতা। পৃথিবীব্যাপী দেশটার একটা মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই দেশটার নারী শ্রমিকরা সৌদি আরবে যাবে অর্থ খরচ করে। অথচ সেখানে নির্যাতিত হবে পাশবিকভাবে। এটা একদিকে আমাদের নির্যাতিত নারীদের জন্য, তাদের পরিবারের জন্য যেমন গ্লানি নিয়ে আসে, ঠিক তেমনি রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকাটাও প্রশ্নবোধক হয়ে যায়। নারীর ক্ষমতায়নের বিয়য়টাকে যতটা গুরুত্ব দিচ্ছে আমাদের বাংলাদেশ, ততটুকুই গুরুত্বটা যেন আসে নারী শ্রমিকদের ব্যাপারে। নারীরা এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আরেক সোপান।

বাংলাদেশের নারীরা সাহসী হয়েছেন। স্বনির্ভরশীল হয়েছে। অর্ধকোটি নারী শুধু বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্পে কাজ করছেন। অন্তত দেড়-দুই কোটি মানুষ এই শিল্পের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মূলত নারীরাই এই দেড়-দুই কোটি মানুষের অন্ন সংস্থান করছে। ব্রিটেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পোশাক গোটা দেশকেই পরিচিতির একটা রেখায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। কম মূল্যে শ্রম কিনে নেয়া তথা শ্রমিক শোষণ-নির্যাতন অন্যদিকে এই নারীদের দ্বারা চালিত শিল্পকে কেন্দ্র করে দেশের একটা গোষ্ঠী ফুলেফেঁপে শতসহস্র কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। তবুও বলতেই হয় নারীরা জড়িয়ে পড়ছে কাজে, তাদের কাজের একটা ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া গ্রামে-শহরে ওই নারীরা শ্রম দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে আরো হাজারো পরিবার। রাষ্ট্রের উঁচু সেক্টরসহ বিভিন্ন জায়গায় নারীদের অবস্থান চোখে পড়ার মতো। অর্থাৎ বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারায় নারীরা এখন এক অপরিহার্য অংশ। মৌলবাদী শত বাধা, তবুও এগিয়ে যাচ্ছে নারীরা বাংলাদেশে।

নারীদের এই বাস্তবতার সময়ে সৌদি আরবে তাদের কর্মের বাজার নিয়ে বাংলাদেশ একটা ভালো প্রস্তাব পেয়েছে সৌদি আরবের কাছ থেকে। সৌদি আরবে বাংলাদেশি মহিলাদের (গৃহকর্মী) কপাল খুলেছে। সেখানে তাদের বেতনভাতা দ্বিগুণ করা হচ্ছে। ২৫ আগস্ট সৌদি আরবে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত গোলাম মসি এই তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন। নিঃসন্দেহে এ খবরটি বিদেশে কাজ করতে আগ্রহী মহিলাদের জন্য এক কাক্সিক্ষত সংবাদ, গৃহকর্মী হিসেবে যারা কাজ করতে আগ্রহী, তারা এটাকে একটা লোভনীয় প্রস্তাব হিসেবেই দেখবেন। এমনিতেই সৌদি আরব গৃহকর্মীদের কর্মসংস্থানের একটা নির্ভরযোগ্য স্থান হিসেবে পরিচিত এবং সে জন্যই ২০১৫ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই লক্ষাধিক নারী সেখানে গেছেন কাজ করতে।

অভাব আর হতাশায় ক্ষয়ে যাওয়া পরিবারের নারীদের সাহসী হতেই হয়, স্বামী-সন্তান কিংবা স্বনির্ভরশীল হওয়ার প্রত্যয় নিয়ে এরা যেমন কায়িক পরিশ্রমী হয় শহর থেকে গ্রামে, ঠিক তেমনি পাড়ি জমায় বিদেশে একজন পুরুষের মতোই। এরা হয়তো জানত এ পৃথিবী পুরুষরাই শাসন করে। বর্তমান বাংলাদেশের বহু উচ্চারিত শব্দ নারীর ক্ষমতায়ন তারা বোঝে না। শুধু জানে একজন পুরুষই ওদের মালিক হবে। এত মানুষের মতোই আচরণ করবে। কিন্তু সৌদি আরব যাওয়ার পর এদের অনেকেরই সেই আশায় গুড়েবালি হয়। মনিবদের অধিকাংশই মানুষের মতো আচরণ করে না। এরা মধ্যযুগীয় কায়দায় এদের ওপর চালায় নির্যাতন।

এমনিতেই মধ্যপ্রাচ্যের পুরুষগুলো রুক্ষ। সম্ভবত পরিবেশগত কারণেই এদের স্বভাব-চরিত্রে এক ধরনের এরাগেন্সনেস অর্থাৎ দাম্ভিকতা কাজ করে। ঐতিহাসিকভাবেই দেখা যায় নারীদের প্রতি এদের সম্মানবোধ খুব একটা নেই। তাদের দেশেই মেয়েদের বিয়ে অনেকটা মেয়ে ক্রয় করে নেয়ার মতো। আর যেহেতু চার দেয়ালের বাইরে এদের অধিকার খুব একটা নেই, সে হিসেবে তাদের দেশের মেয়েরাই তটস্থ আছে। যেহেতু গণমাধ্যমেও এদের অনেক কিছুই আসে না, সে হিসেবে বিশ্ব হয়তো দেখে না এদের নারী বাজির নৃশংসতা। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশগুলোতে যখন নারীরা এসেছে গৃহপরিচারিকা হয়ে ইতোপূর্বে, তখন থেকে জানা গেছে কি নৃশংসভাবে তারা চালিয়েছে এই বর্বরতা নারীদের ওপর। আর সে জন্যই এখন ফিলিপিন, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে নারী গৃহকর্মীদের সংখ্যা কমে গেছে মধ্যপ্রাচ্যে এবং তা তাদের রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের কারণেই। যেহেতু এদের নারী গৃহকর্মী প্রয়োজন, তাইতো এরা বাজার খুঁজেছে। বাংলাদেশকে এরা আকর্ষণীয় অফার দিয়ে আকৃষ্ট করছে। সৌদি আরবে নিয়োজিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসী জানিয়েছেন, ‘সৌদি নাগরিকরা বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী নিতে দুই হাজার মার্কিন ডলার করে পরিশোধ করে।

স্বভাবতই তারা গৃহকর্মীদের কাছ থেকে ভালো কাজ আশা করেন। কিন্তু গৃহকর্মী হিসেবে যারা আসেন, তাদের বেশিরভাগই আরবি ভাষা না শিখেও গৃহকর্মে কী ধরনের কাজ করতে হবে সে সম্পর্কে কোনো প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করে আসেন। নতুন পরিবেশ, আবহাওয়া, লোকজন ইত্যাদি দেখে গৃহকর্মীরা ঘাবড়ে যান। ফলে গৃহকর্তারা-কর্ত্রীরা যেমনটা আশা করেন গৃহকর্মীরা সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন না। তখন তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়’।

স্বাভাবিকভাবেই সরকারের জন্য এ এক বিরাট ব্যবসা। এ ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার জন্য রাষ্ট্র নারীদের জন্য কর্মের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে, উৎসাহ দিচ্ছে। যা রাষ্ট্রের জন্য লাভজনক, অন্যদিকে নারী স্বাবলম্বী হতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের টাকায় দেশ সমৃদ্ধ হতেও একটা খুবই ইতিবাচক দিক। কিন্তু রাষ্ট্র যখন তাদের শ্রমিক বিশেষত নারী শ্রমিক দিয়ে ব্যবসা করবে, রেমিটেন্স বৃদ্ধি করবে, তখন নিশ্চয়ই ওই যে মানুষগুলোর শ্রমকে বিনিয়োগ করল বিদেশের মাটিতে, তাদের হয়ে কি কোনো কিছুই করার নেই। রাষ্ট্রদূত বলেছেন, যে নারীরা গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে যান, তাদের বেশিরভাগই আরবি ভাষা না শিখেও গৃহকর্মে কি ধরনের কাজ করতে হবে তা জেনে যান না, সে জন্যই তারা নির্যাতনের শিকার হন। গোলাম মসী তথা রাষ্ট্র কিন্তু এই জায়গায় নির্যাতনের কথাটা স্বীকার করে নিলেন, প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিলেন ওই নারীদের ধর্ষিতা হওয়ার কথা। এবং তার কথা থেকেই তাদের ব্যর্থতাটুকুও জনসমক্ষে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কারণ বাংলাদেশ যেখানে অর্থনৈতিকভাবে সরাসরি লাভবান হচ্ছে, সেখানে যখন গৃহকর্মী পাঠানো হয়, তখন ওই মহিলাদের ন্যূনতম প্রশিক্ষণ না দিয়ে ওই দেশ কিংবা দেশের মানুষ সম্পর্কে কোনো ধারণ না দিয়ে কীভাবেই পাঠায়। তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নটা আসতেই পারে, আমাদের রাষ্ট্র কি ন্যূনতম মনিটরিংয়ের ব্যবস্থাটাও রাখতে পারে না আদম ব্যবসায়ীদের ওপর?

একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে জেনে-শুনে তুলে দেয়া হচ্ছে নারীদের ওই পশুদের হাতে। স্বীকার করি, শ্রমিক শোষণ কালে কালে ঘটে, ঘটবে। যতদিন শোষক এবং শোষিত শব্দ দুটো থাকবে, ততদিন হয়তো এ থেকে মুক্ত হতে পারবে না এই শ্রেণিকে প্রশ্রয় দেয়া রাষ্ট্রগুলো। কিন্তু অন্তত শারীরিক নিরাপত্তাটা তো তারা দিতে পারে। এখনো যখন কোনো স্বাধীনতাবিরোধীদের কাছে পাকিস্তানিদের ধর্ষণের কথা ঘৃণাভরে উল্লেখ করা হয়, তখন তাদের অনেকেই মিন মিন করে বলে, যুদ্ধে এসব কর্মকাণ্ড অস্বাভাবিক নয়। তাদের স্পর্ধিত উচ্চারণ যাই হোক, এটা নৃশংসতা, এটাই মানবতাবিরোধী অপরাধ। এ অপরাধ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। পাকিস্তানিরা মানবতাবিরোধী অপরাধই করেছিল সে সময় এবং সে জন্য আমরা ধিক্কার দিয়ে যাই, ঘৃণা করে যাব সে সময়ের শাসকদের কাল থেকে কালান্তরে। অর্ধ শতাব্দীর কাছাকাছি আমাদের স্বাধীনতা। পৃথিবীব্যাপী দেশটার একটা মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই দেশটার নারী শ্রমিকরা সৌদি আরবে যাবে অর্থ খরচ করে। অথচ সেখানে নির্যাতিত হবে পাশবিকভাবে। এটা একদিকে আমাদের নির্যাতিত নারীদের জন্য, তাদের পরিবারের জন্য যেমন গ্লানি নিয়ে আসে, ঠিক তেমনি রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকাটাও প্রশ্নবোধক হয়ে যায়। নারীর ক্ষমতায়নের বিয়য়টাকে যতটা গুরুত্ব দিচ্ছে আমাদের বাংলাদেশ, ততটুকুই গুরুত্বটা যেন আসে নারী শ্রমিকদের ব্যাপারে। নারীরা এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আরেক সোপান। সুতরাং শুধু রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের প্রয়োজনে ওই নারী শ্রমিকদের বিদেশ পাঠানোর ভাবনাটা মাথায় না রেখে, কর্মস্থলে ওদের নিরাপত্তার ব্যাপারটা রাষ্ট্রীয়ভাবেই নিতে হবে এবং তা ভেবে দেখতে হবে গভীরভাবে। বাংলাদেশি নারী ছড়িয়ে পড়ুক পৃথিবীর দেশে দেশে, আর সে জন্য সাহসী ওই নারীদের সহায়তা দেয়াটুকু আমাদের রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের যেমন কর্তব্যের মাঝে পড়ে, ঠিক সেভাবেই একজন মানুষ হিসেবে মানবিকতা কিংবা নৈতিকতার ব্যাপারটাও উড়িয়ে দিতে পারবেন না এই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক।