ট্রাম্পের সাবেক প্রচার উপদেষ্টার ১৪ দিনের কারাদণ্ড

আগের সংবাদ

যানবাহন চলাচল অনেকটা বন্ধ, জনদুর্ভোগ চরমে

পরের সংবাদ

সনদে সমতার স্বীকৃতি

মূলধারা থেকে পিছিয়ে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৮ , ১:৪১ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৮, ১:৪১ অপরাহ্ণ

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাকে যুগোপযোগী করে নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘদিন ধরে চলছে সরকারের নানা উদ্যোগ। স্বীকৃতিসহ কমিশন গঠন করে কওমি শিক্ষা আইন প্রণয়নেও চেষ্টা চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরে কওমি সনদকে স্বীকৃতি দেয়া হয়।
তবে কওমির শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও পরামর্শ জানিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা। তারা বলেন, সনদে সমতা এলেও শিক্ষার মান, যুগোপযোগিতা ও বাস্তবক্ষেত্রে মূলধারা থেকে অনেক পিছিয়ে কওমির শিক্ষার্থীরা। এ পরিস্থিতিতে মূলধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কওমির পাঠসূচি পরিবর্তনসহ সরকারের মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণে আনার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
কওমির সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদিস’ এবং মূলধারার ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি মাস্টার্সের পাঠ্যসূচির মধ্যে পার্থক্যের বিষয় উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মুহম্মদ শফিকুর রহমান।
তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, দাওরায়ে হাদিসে শুধু হাদিস ও কুরআনের তাফসিরই পড়ানো হয়, যুগোপযোগী কোনো শিক্ষা নেই। তবে ইসলামিক স্টাডিজে বিভিন্ন ধর্মের তুলনামূলক পাঠসহ সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা দেয়া হয়। পাঠ্যসূচি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মূলধারার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে ১০ বছর ধরে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গণিত, সামাজিক বিজ্ঞানসহ বাস্তবমুখী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে কওমির প্রাথমিকের ছয় বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে এ শিক্ষা।
এক বছরে ‘দাওরায়ে হাদিস’ স্তরে হাদিস সিহাহ সিত্তার সঙ্গে পড়তে হয় তাফসির ও হাদিস-সংক্রান্ত আরো দুটি কোর্স। বিপরীতে ইসলামিক স্টাডিজের দুই সেমিস্টারে দশটি বিষয়ের মধ্যে তাফসির ও হাদিস ছাড়াও পড়তে হয় ‘সায়েন্স অব দ্য কুরআন’, ‘টিচিং এন্ড রিসার্চ মেথোডলজি’ এবং ‘ইভ্যালুয়েশন এন্ড ফিলোসফি অব রিলিজিয়ন এন্ড কমপ্যারেটিভ রিলিজিয়ন’ নামের বাস্তবমুখী কোর্সগুলো।
কওমি সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ১০৬৫ সালে বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত নিজামিয়া পাঠশালায় প্রণয়ন করা ‘দরসে নিজামিয়া’ পাঠ্যসূচি অনুসরণ করে ১৮৬৬ সালে ভারতের দেওবন্দে প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় প্রচলন হয় কওমি শিক্ষাব্যবস্থা। দেওবন্দের সে পাঠ্যক্রম পড়ানো হয় দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোতে। যেখানে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, জিহাদ ও হিজাব বিষয়ক পাঠদান। যে শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য ইসলামের ওপর আবর্তিত যে কোনো হামলার সুদৃঢ় ও প্রামাণ্য জবাব দেয়া। অন্যদিকে মূলধারার পাঠ্যক্রমে দেশপ্রেম, অসম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ওপর জোর দেয়া হয়।
ঐতিহ্যবাহী কওমির পাঠ্যসূচি বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য নেই ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউশনের পরিচালক অধ্যাপক সৈয়দা তাহমিনা আখতারের কাছে। কওমি সনদের স্বীকৃতি নিয়ে দ্বিমত পোষণ করে তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, তাদের কী পড়ানো হচ্ছে, সে বিষয়ে শিক্ষাবিদদের অবশ্যই মতামত নেয়া দরকার। শুধু পারলৌকিক বিষয় পড়লে তারা বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাবে।
তবে দেওবন্দের পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন কিংবা আধুনিকীকরণের কোনো সুযোগ নেই বলে জানান কওমি সনদ বাস্তবায়ন কমিটির মুখপাত্র ও সম্মিলিত কওমি মাদ্রাসা ফেডারেশনের মহাসচিব মুফতি রুহুল আমিন।
ভোরের কাগজকে তিনি বলেন, হাদিস আর কুরআনভিত্তিক পাঠসূচি অনুসরণে কওমিতে পড়ানো হয়। চাকরির নিশ্চয়তার চেয়ে সনদের স্বীকৃতি বড় মর্যাদার।
জানতে চাইলে কওমি শিক্ষাকে বিশেষধারার হিসেবে উল্লেখ করে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসীর মামুন ভোরের কাগজকে বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থা ভিন্ন হলেও চাকরি পেতে চাইলে তাদের অভিন্ন পরীক্ষাই দিতে হবে। মূলধারার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাদের টিকতে হবে।
তবে কওমি সনদের স্বীকৃতি আগামীতে শিক্ষাক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, এমনিতে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা নানামুখী সংকটে আছে, তার ওপর এই স্বীকৃতি সংকটকে বাড়াবে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বেনবেইস) জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের ১৪ হাজারের বেশি কওমি মাদ্রাসায় পড়ছে ১৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। তাদের মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০১০ সালে সংসদে পাস হয় কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি। ২০১৩ সালের ১৫ এপ্রিল কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সভাপতি শাহ আহমদ শফীকে চেয়ারম্যান করে ১৭ সদস্যের কওমি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়।
ওই বছরের ২৮ আগস্ট কওমি আইনের খড়সা মন্ত্রিসভায় উঠানো হলেও তা প্রত্যাহার করা হয়। তবে গত বছরের ১১ এপ্রিল শাহ আহমদ শফীর উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাওরায়ে হাদিসকে স্বীকৃতি দেন। সর্বশেষ চলতি বছরের ১৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে কওমি সনদ আইনের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়।