ফুলবাড়ীতে জেলা ইজতেমা

আগের সংবাদ

মফস্বলে শিক্ষার আলোকবর্তিকা

পরের সংবাদ

পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে গৃহহীন শত শত পরিবার

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৮ , ৩:৫৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৮, ৩:৫৮ অপরাহ্ণ

পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়ন। গত ৩/৪ দিনের অব্যাহত নদী ভাঙনে এই ইউনিয়নের হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি ও শত শত পরিববার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। এসব পরিবার অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে দেবগ্রাম মধু সরদার পাড়া গ্রামে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, দুয়েক মিনিট পর পরই নদীর পাড়ের বিশাল অংশ ভেঙে পড়ছে নদীতে। ভয়াবহ এ পরিস্থিতি দেখতে নদীর পাড়ে ভিড় করেছেন শত শত মানুষ। এ সময় কথা হয় ১০নং যদু মাতুব্বার পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আকাশ মৃধা ও মকবুল হোসেনের সঙ্গে। তারা জানান, তারা ২০/২৫ মিনিট আগে এখানে এসেছেন ভাঙন দেখতে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের চোখের সামনে অন্তত ১শ ফুট জায়গা নদীতে চলে গেছে।
অপরদিকে ওইসব এলাকার মানুষ পরিবার নিয়ে বসতভিটে থেকে দ্রæত ঘরবাড়ি ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফরিদা বেগম (৪৫) নামের এক গৃহিণী চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ঘর ভাইঙ্গা নিয়া এক আত্মীয়র বাড়ি রাখতাছি। সেহানে রাইখা দমডা ফালাই, হেরপর দেহুম কোনে যাওয়ন যায়। এহানেতো ভাঙনের ডরে দম বন্দ হয়া আসতাছে।
আর একটু এগুতেই চোখে পড়ল এক হৃদয়বিদার দৃশ্য। একটি পরিবার তাদের ঘর-বাড়ি, গরু-ছাগল নিয়ে একটি ট্রলার বোঝাই করে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। নারী-পুরুষ-শিশুসহ প্রত্যেকেরই চোখে জল। তাদের বিদায় দিতে আসা গ্রামবাসীর চোখেও জল। এ বিদায় যেন অন্য রকম এক যন্ত্রণার। বছরের পর বছর যাদের সঙ্গে কেটেছে, কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে, সব ছিন্ন করে অজানার উদ্দেশে যাত্রা। বিদায় নেয়া পরিবারের সদস্য লালন সরদার (৪৮) কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, পাগলা নদী আমাগো একসঙ্গে থাকতে দিল না।
দেবগ্রামের তোরাপ আলী সরদার (৬০), ফুলচাঁদ (৪৫), রিজিয়া বেগম (৩৮), আবুল শেখ (৫০), আফছার সরদারসহ (৬৫) অনেকেই জানান, সপ্তাহখানেক ধরে এ এলাকার নদী ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতি মুহ‚র্তে এ এলাকার মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় কোনো জনপ্রতিনিধি বা সরকারের কেউ তাদের খবর নিতে আসেননি। তাদের সামন্যতম খোঁজ খবর পর্যন্ত নেননি।
এদিকে পদ্মা নদীর ভাঙনে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলসহ জমি নদীতে বিলীন হওয়ায় ওই এলাকার কৃষকরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। চর দেলুনদী গ্রামের কৃষক আ. ছালাম (৬০) জানান, নদী ভাঙনে তার ৮ বিঘা ফসলি জমি নদীতে চলে গেছে। এ সময় তার পাশে থাকা নূর ইসলাম, সোহাগী বেগম, নুরজাহান বিবিসহ অনেকে বলেন, গত কয়েক দিনে চর বরাট, অন্তার মোড়, দেলুনদী, তেনাপচা, দেবগ্রামসহ নদী পাড়ের জমিতে থাকা বিভিন্ন ধরনের ফসল নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তারা আরো জানায়, তারা প্রত্যেকেই ৩/৪ বার করে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন।
দেবগ্রাম ইউনিয়নটিকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার দাবিতে গত মঙ্গলবার শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী ১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী ও জেলা প্রশাসকের কাছে ইউপি চেয়ারম্যান আতর আলী সরদারের নেতৃত্বে স্মারকলিপি দিয়েছেন ইউনিয়নবাসী।
দেবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আতর আলী সরদার জানান, তার ইউনিয়নের ৩, ৪ ও ৫নং ওয়ার্ডের শত শত পরিবার ভাঙন আতঙ্কে ভিটেমাটি ছাড়ছেন। এই কয়েক দিনে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকার বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে ইউনিয়নটি নদী ভাঙনের শিকার হলেও এখন পর্যন্ত ভাঙন রোধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি কর্র্তৃপক্ষ। এ ইউনিয়ন অর্ধেকের বেশি অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বাকিটুকুও যাওয়ার উপক্রম হয়েছে এখন। শত শত পরিবারের ঘর-বাড়ি ভাঙছে, তারা কোথায় যাবে। এখনই ভাঙন রোধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে গোয়ালন্দের মানচিত্র থেকে দেবগ্রাম নামের ইউনিয়নটি হারিয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু নাসার উদ্দিন জানান, পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন সম্পর্কে ইতোমধ্যে প্রশাসন অবগত হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিকেলে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলী এমপি ও জেলা প্রশাসন মহোদয় ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ভাঙন প্রতিরোধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতায় সব রকম ব্যবস্থা নেয়া হবে।