ভোটযুদ্ধের আগে জোটযুদ্ধ

আগের সংবাদ

ধর্ষিতাকে ফেলা হয়েছিল নদীতে

পরের সংবাদ

সাক্ষাৎকার : ড. ইয়াসমিন হক

২২ বছরের সাধনার ফসল

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৮ , ১:২৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৮, ১:২৮ অপরাহ্ণ

স্বল্প সময় ও খরচে দেশীয় এক দল গবেষকের উদ্ভাবিত ক্যান্সার শনাক্তের পদ্ধতি নিয়ে ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এ খবর আশা জাগিয়েছে দেশবাসীর মনে। সেই সঙ্গে উজ্জ্বল হয়েছে দেশের ভাবমূর্তিও। গবেষক দলের প্রধান ছিলেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হক। এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার টেলিফোনে ভোরের কাগজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই গবেষক জানান, দীর্ঘ ২২ বছরের সাধনায় এই সাফল্য মিলেছে। তবে আমরা সবে মাত্র কাজ শুরু করলাম। এ ক্ষেত্রে আরো কী নতুন নতুন বিষয় আমরা উদ্ভাবন করতে পারি সে জন্য কাজ চলবে।
ভোরর কাগজ (ভো.কা) : আজকের এই সাফল্য কত দিনের সাধনায় মিলেছে?
ইয়াসমিন হক : গবেষণা তো একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে শুরুর কথা যদি বলি তাহলে বলতে হয় ১৯৯৬ সাল থেকে। সেই হিসেবে ২২ বছর।
ভো.কা : দীর্ঘ এই যাত্রা পথের গল্পটা শুনতে চাই।
ইয়াসমিন হক : গল্পটা সত্যিই দীর্ঘ। মূলত শাবিপ্রবিতে এক সময় এক্সপেরিমেন্টাল নন-লিনিয়ার অপটিক্স নিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছিল। কারণ, প্রথমত, এটি দিয়ে চমকপ্রদ ফিজিক্স গবেষণা করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, এটি সে রকম ব্যয়বহুল নয়। তবে এখানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তাত্তি¡ক নন-লিনিয়ার অপটিক্স কোর্স শুরু করা হয়েছিল আরো অনেক আগে। ১৯৯৭ সাল থেকে। কোনো বস্তুর সঙ্গে আলোর মিথস্ক্রিয়ায় বস্তুটিকে দৃশ্যমান করার বিষয় নিয়ে নন-লিনিয়ার অপটিক্স পর্যালোচনা করে। সে কারণে লেজার আবিষ্কার হওয়ার পর যখন প্রথমবার শক্তিশালী তীব্র আলো পাওয়া সম্ভব হয় তখন থেকে নন-লিনিয়ার অপটিক্স গবেষণা বিকশিত হতে শুরু করে। অতি তীব্র আলোর সংস্পর্শে এলে মাধ্যমগুলোর আলোকীয় ধর্মের পরিবর্তন হতে শুরু করে এবং তাদের নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশিত হতে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন পদার্থ বা মাধ্যমকে তখন তাদের নন-লিনিয়ার অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য দিয়ে শ্রেণি বিভাগ করা সম্ভব হয়। যেহেতু আলোর তীব্রতাই হচ্ছে মূল বিষয়, সে কারণে লেজার প্রযুক্তি গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নন-লিনিয়ার অপটিক্স বিকাশ লাভ করতে শুরু করে।
২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের নন-লিনিয়ার অপটিক্স গ্রুপটি উচ্চ শিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) অর্থায়নে বাস্তবায়িত একটি প্রজেক্টের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম এক্সপেরিমেন্টাল নন-লিনিয়ার অপটিক্স রিসার্চ ল্যাবরেটরি নির্মিত হয়। স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি শিক্ষার্থীরা এই ল্যাবরেটরিতে ভিন্ন ভিন্ন লেজার ব্যবহার করে নানা ধরনের জৈব, অজৈব এবং বায়ো-স্যাম্পলের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের কাজ শুরু করে। এই নমুনাগুলোর ভেতর দিয়ে শক্তিশালী লেজার রশ্মি পাঠিয়ে তাদের নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা হয়। এভাবে কোনো পদার্থের নন-লিনিয়ার অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটি অনেক ক্ষেত্রেই বায়োকেমিক্যাল প্রক্রিয়া বা স্পেক্ট্রোস্কোপিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নমুনার গুণাগুণ বের করার চাইতে সহজতর ও ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়া সম্ভব। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এই নন-লিনিয়ার অপটিক্স রিসার্চ ল্যাবরেটরিটি গবেষকদের অত্যন্ত সূক্ষ্ণ অপটিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেয়।
২০১৫ সালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নন-লিনিয়ার অপটিক্স রিসার্চ গ্রুপটি গবেষণার ব্যবহারিক দিক নিয়ে কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। গ্রুপটি হেকেপের উইন্ডো ফোরের আওতায় ইউনিভার্সিটি-ইন্ডাস্ট্রি সমন্বিত গবেষণার জন্য একটি উদ্ভাবনীমূলক পরিকল্পনা জমা দেয়। এই পরিকল্পনাটি ছিল ক্যান্সার রোগাক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করে ক্যান্সারের সম্ভাব্য উপস্থিতি ও অবস্থা চিহ্নিত করার একটি প্রক্রিয়া উদ্ভাবন। অর্থাৎ প্রচলিত বায়োকেমিক্যাল ক্যান্সার নির্দেশক বায়োমার্কারের পরিবর্তে একটি অপটিক্যাল বায়োমার্কার উদ্ভাবন করা। সহজ ভাষায় বলা যায়, ক্যান্সার রোগাক্রান্ত রোগীদের রক্তে এমন কিছু একটা অনুসন্ধান করে বের করা যায়, যার নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্যটি ক্যান্সার রোগের সম্ভাব্যতার একটি ধারণা দেবে। একই সঙ্গে খুব সহজে নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্যটি অনুসন্ধানের জন্য একটা সহজ যন্ত্রও তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়। সজভাবে বলা যায়, এই উদ্ভাবনী প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে শুধু ক্যান্সার রোগাক্রান্ত রোগীদের রক্ত নয়, অন্য যে কোনো নমুনার নন-লিনিয়ার ধর্ম খুবই সহজে সূক্ম ভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হবে। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে ‘নন-লিনিয়ার অপটিক্স ব্যবহার করে বায়োমার্কার নির্ণয়’ শীর্ষক প্রকল্পটি হেকেপের আওতায় সিপি-৪০৪৪ হিসেবে গৃহীত হয়। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে নন-লিনিয়ার বায়ো-অপটিক্স রিসার্চ ল্যাবরেটরি নামে একটি নতুন ল্যাবরেটরি নির্মিত হয়। এই ল্যাবরেটরিতে ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের রক্তের সিরামে শক্তিশালী লেজার রশ্মি পাঠিয়ে নন-লিনিয়ার ধর্মের সূচক পরিমাপ করার কাজ শুরু হয়েছে।
ভো.কা : এত বিষয়বস্তু থাকতে এই বিষয়টিকেই কেন বেছে নিলেন?
ইয়াসমিন হক : দেশে অসংখ্য মানুষ ক্যান্সারে মারা যাচ্ছে। বেশির ভাগ রোগীর ক্যান্সার শনাক্ত হয় রোগের শেষ পর্যায়ে। বর্তমানে ক্যান্সার শনাক্তে যে প্রচলিত পদ্ধতি রয়েছে সেটি বেশ ব্যয়বহুল। এ ছাড়া বিশ্বে এখন পর্যন্ত এমন কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি, যার মাধ্যমে আগে থেকেই ক্যান্সার শনাক্ত করা যায়। গবেষকদের সব সময়ই নতুন নতুন বিষয়ের প্রতি আগ্রহ থাকে। নিজেদের সম্পদ এবং সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে কাজটি করতে চেয়েছিলাম। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবটি থাকায় কাজের সুবিধা হয়েছে।
ভো.কা : গবেষণা করতে গিয়ে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন কি?
ইয়াসমিন হক : গবেষণার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো বাজেট। গবেষণার শুরুর দিকে আমাদের এই প্রতিবন্ধকতা ছিল।
ভো. কা : ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
ইয়াসমিন হক : আমি আগেই বলেছি, গবেষণা একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমি বলব, আমরা সবে মাত্র কাজ শুরু করলাম। এই ক্ষেত্রে আরো কী নতুন নতুন বিষয় আমরা উদ্ভাবন করতে পারি সে জন্য কাজ চলবে।