সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা কি অসম্ভব?

আগের সংবাদ

বর্তমান আদর্শগত বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা

পরের সংবাদ

বিএনপির ‘ছয় দফা’ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৮ , ৭:৫৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৮, ৭:৫৯ অপরাহ্ণ

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সব শাসনামলেই সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের মাত্রাতিরিক্ত ‘অত্যাচার’ থাকে। আওয়ামী লীগের শাসনামলটি তার ব্যতিক্রম হলে মানুষ খুশি হতো। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঘোষিত রূপকল্প বাস্তবায়নে ছাত্র সংগঠনের তরুণদের উজ্জীবিত কিংবা সম্পৃক্ত করতে পারলে বর্ণিত অত্যাচার থেকে দল ও দেশ অনেকটাই স্বস্তিতে থাকতে পারত। উপরন্তু আওয়ামী লীগও অপকৃষ্ট দুর্নামের কবল থেকে রেহাই পেত।

গত এক সেপ্টেম্বর বিএনপি তার জন্মের ৪০ বছর অতিক্রম করল। দীর্ঘদিন পর বিএনপি ঢাকার রাজপথে মোটামুটি সফল একটি জনসভা অনুষ্ঠান করতে পেরেছে। এই ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সভা থেকে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে দলটির মধ্য থেকে নতুন কোনো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য শোনা গেল না। কোনো বক্তার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনার কথাও শোনা যায়নি- যা থেকে সাধারণ মানুষ একটি দিকনির্দেশনা পেতে পারে। তবে দীর্ঘদিন পর এরূপ একটি অনুষ্ঠান সম্ভব হওয়ায় বিএনপির বিভিন্ন সারির নেতাকর্মীর মনোভাব অনেকটা চাঙ্গা হয়েছে তা বলা যায়। কর্মীদের চাঙ্গা এই মনোভাবকে নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা ভবিষ্যতে কতটা ধরে রাখতে পারবেন তা এই মুহূর্তে বলা সহজ নয়।

বিএনপির ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সেদিনের সেই সভা থেকে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে মোটামুটিভাবে ছয়টি দাবি উত্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম বা এক নম্বর দাবি খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তার নামে রুজু হওয়া সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। অপরদিকে মহাসচিবের কণ্ঠে ছয় দফা ঘোষণার আগে কর্মীদের মনে উদ্দীপনা জাগাতে বিভিন্ন নেতারা ‘গরম’ বক্তব্যও দিয়েছেন। এদের মধ্যে গয়েশ্বর রায়, মির্জা আব্বাস, খন্দকার মোশাররফ কিংবা মওদুদ আহমদ ছিলেন অন্যতম। তাদের বিভিন্নজনের বিচ্ছিন্ন বক্তব্যে যা বোঝা গেছে তার মর্মকথা অনেকটা এরূপ যে, দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। তাকে মুক্ত করতে হলে প্রয়োজনে রাজপথে মৃত্যুবরণ করা হবে, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করতে দলটির কোনো কোনো নেতার বক্তব্য থেকে আওয়াজ পাওয়া গিয়েছে। আবার কেউ কেউ এমন বাস্তবসম্মত কথাও বলেছেন যে, ‘আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের নেত্রীকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।’ সে জন্য রাজপথে আন্দোলন করার প্রস্তুতি নিতেও নেতাকর্মীদের আহ্বান জানানো হয়েছে। এসবও পুরনো কথারই পুনরাবৃত্তি। নির্বাচনের তিন-চার মাস আগে বিএনপির উচিত ছিল সাংগঠনিকভাবে আরো সমৃদ্ধ বক্তব্যদানের মাধ্যমে সাধারণের মনোযোগ আকৃষ্ট করা।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর জনসভায় বিএনপি নেতাদের বক্তব্য কেবল উচ্চকণ্ঠ ও আবেগদীপ্তই ছিল। তাদের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে যে, বিভিন্ন মেয়াদে বিএনপির শাসনামলে এ দেশের মানুষ গণতন্ত্রের সমুদ্রে ‘হাবুডুবু’ খেয়েছে। আর আওয়ামী লীগ এ দেশের মানুষের সব অধিকার কেড়ে নিয়েছে, কাউকে কোনো কথাই বলতে দেয়নি এবং এখনো দিচ্ছে না! বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগের মতো এত জেল-জুলুম এ দেশে আর কোনো শাসকগোষ্ঠী কখনো দেয়নি! আওয়ামী লীগই এ দেশে স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রবর্তক ইত্যাকার কিনা! বিএনপি-জামায়াত জোট ও হাওয়া ভবন শাসিত বাংলাদেশের সেই দুর্দিন, দেশ ও দেশের মানুষের দুর্দিনের সেই ক্লিষ্ট চেহারার কথা বিএনপির নেতারা কী করে ভুলে গেলেন তাও বিস্ময়ের বিষয়! বিশেষ করে ২০০১ সালের নির্বাচনোত্তর বিএনপি-জামায়াত জোট এ দেশের মানুষের শুধু কণ্ঠই নয়, ব্যক্তিত্ব বোধ, স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার হরণ করে নিয়েছিল। কোনো নির্বাচিত সরকারের আমলে তখন যে পরিমাণ খুন, ধর্ষণসহ সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে তা ‘নির্বাচনরূপ গণতন্ত্রে’র প্রতি উপহাস ছাড়া আর কী হতে পারে জানি না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং হাওয়া ভবন যেন ছিল দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার সচিবালয়। আর আজকে যারা গণতন্ত্রের মুক্তির (!) কথা বলে সোচ্চার মূলত তারাই সেদিন ছিলেন গণতন্ত্রের কবর খননকারী। আবার ২০১৪ সালের গণতান্ত্রিক নির্বাচন বয়কট ও প্রতিহত করতে গিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট এ দেশের মানুষকে পেট্রল বোমা ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে কীভাবে হত্যা করেছে তা ইতিহাস কিংবা মানুষের মন থেকে মুছে গেছে বলেই তারা ধারণা করে বসে আছেন!

অন্যদিকে বিএনপির বাইরে যারা গণতন্ত্রের মুক্তির কথা বলছেন, তাদের শক্তি, সামর্থ্য এমনকি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়েও সাধারণ মানুষ যথেষ্ট ওয়াকিবহাল; খানিকটা সুশীল, খানিকটা ক্ষমতালোভী ও সুবিধাভোগী এসব চেহারাকে সাধারণ মানুষ আগেও প্রত্যক্ষ করেছে। সুতরাং রাজনৈতিক ময়দানে প্রকৃতপক্ষে তারা যে কোনো ‘ফ্যাক্টর’ নন তা তাদের নানা রূপ ও আয়তনে নতুন জোট গড়ে তোলার শূন্যগর্ভ হুঙ্কারের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রমাণ করে ফেলেছেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে এখন আবার তাদের জোট গঠনের নেপথ্য শানেনজুল এবং বিভিন্ন রকমের উপক্রমনিকাও প্রকাশ পাচ্ছে। ফলে এসব জোট গঠনের পশ্চাতে যে ‘বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ’ নেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে জোট গঠনের পশ্চাতে কার্যকর দেশ-বিদেশের নানা রকমের তদবির ও যোগাযোগ, কিছুটা ষড়যন্ত্র বললেও অত্যুক্তি হবে না! অতএব তাদের উদ্দেশ্যে বলতে ইচ্ছা করে- এ দেশের সাধারণ মানুষকে বোকা ভেবে ধোঁকা দেয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতো সাধারণেও যে ভূমিকা আছে তাও এ দেশের জনগণ বুঝেছে। সচেতন এবং সতর্ক থাকার মধ্য দিয়েই এ দেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক চেতনাকেই সর্বোর্ধ্বে ধারণ করে। অতীতে যেমনটি হয়েছে আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনেও জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গণতন্ত্রকেই প্রতিষ্ঠিত করবে; মহলবিশেষের উসকানিতে বিভ্রান্ত হবে না।

তবে এ কথা ঠিক যে, আগামী নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের সম্মুখে কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। এই চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়েই তাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে হবে। মহাজোট সরকার পরপর দুই মেয়াদে ক্ষমতায় আসীন আছে। দুই মেয়াদের প্রায় দশ বছরের শাসনামলে সরকার এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ‘উন্নয়নের মহাসড়কে’ দেশকে নিয়ে গেলেও অনেকের আকাক্সক্ষার দোরগোড়ায় পৌঁছতে যেমন পারেনি তেমন পারেনি সবার মন জয় করতেও। সাম্প্রতিককালের দুটি বড় আন্দোলন থেকেও আওয়ামী লীগ তাদের অর্জন নিজ ঘরে তুলতে পারেনি। এর একটি কোটা সংস্কার এবং অপরটি কিশোর আন্দোলন। কিশোর আন্দোলনকারীরা বর্তমানে ভোটার না হলেও ভবিষ্যৎ-ভোটার; কিন্তু অভিভাবকরা ভোটার। অন্যটি কোটা সংস্কার আন্দোলন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের ভেতর বিএনপি ও জামায়াতের যত প্রকার যোগসূত্রই গোয়েন্দা সংস্থা আবিষ্কার করুক এই আন্দোলনটিতে ছিল উঠতি বয়সী সব তরুণের সমর্থন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব তরুণের সবাই আবার আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটারও। আসন্ন নির্বাচনে এই তরুণদের একটা অংশের কাছে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করা সহজ হবে না।

আবার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার স্লোগান নিয়ে আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনা করলেও দলটির অঙ্গ সংগঠন এবং দলের শক্তি হিসেবে পরিচিত ছাত্রলীগ তার সদস্যদের পুরো মাত্রায় ‘ডিজিটাল’ ভার্সনে রূপান্তর করতে পারেনি। উদাহরণ হিসেবে পুনরায় উল্লেখ করা যায় সাম্প্রতিককালের সেই দুটি আন্দোলনকেই। অর্থাৎ কোটা সংস্কার ও কিশোর আন্দোলন। এ দুটি আন্দোলনে ডিজিটাল মিডিয়াকে ‘গুজব’ সৃষ্টিকারীরা যেভাবে ব্যবহার করেছে ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের তরুণ সমর্থকরা তুলনায় তার ধারের কাছেও যেতে পারেনি। সব শাসনামলেই সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের মাত্রাতিরিক্ত ‘অত্যাচার’ থাকে। আওয়ামী লীগের শাসনামলটি তার ব্যতিক্রম হলে মানুষ খুশি হতো। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঘোষিত রূপকল্প বাস্তবায়নে ছাত্র সংগঠনের তরুণদের উজ্জীবিত কিংবা সম্পৃক্ত করতে পারলে বর্ণিত অত্যাচার থেকে দল ও দেশ অনেকটাই স্বস্তিতে থাকতে পারত। উপরন্তু আওয়ামী লীগও অপকৃষ্ট দুর্নামের কবল থেকে রেহাই পেত। যে দলটির মাধ্যমে দেশ ডিজিটাল হচ্ছে সে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তথ্যপ্রযুক্তিবিমুখ তা মানা যায় না। এসবও আগামী নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে সন্দেহ নেই। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনকারী শিবিরে মাঝেমধ্যে হতাশারও সৃষ্টি হয়।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।