টেকসই দেশ গড়ার প্রত্যাশা

আগের সংবাদ

বিএনপি ধ্বংস করছে কে? কোথায় নিতে চায়?

পরের সংবাদ

মুদ্রানীতি মুদ্রাস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করবে

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৮ , ৭:৩৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৮, ৭:৩৯ অপরাহ্ণ

ড. মিহির কুমার রায়

ডিন, সিটি ইউনির্ভাসিটি

খেলাপি আদায়ের দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করলে মুদ্রাস্ফীতি কমে আসবে এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরতে বাধ্য হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় ঘোষিত মুদ্রানীতিতে এ বিষয়গুলো কিছুই উল্লেখ নেই। এটা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সহায়ক মুদ্রানীতি নয়। তাহলে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তাদের গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে প্রয়োগধর্মী মুদ্রানীতি প্রণয়নে এগিয়ে আসতে হবে।

অতিসম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে তাদের নতুন অর্থবছরের (২০১৮-১৯) জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে এমন একটি সময়ে য়থন দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। নির্বাচন মানেই দেশের ভেতরে অনুৎপাদন খাতে বিপুল পরিমাণ ব্যয় যা অনেকাংশে মুদ্রাস্ফীতি ত্বরান্বিত করবে। দেশ সবে মাত্র স্বল্প আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নতি হয়েছে। মধ্য আয়ের দেশের যাত্রাপথে এটিই প্রথম মুদ্রানীতি ঘোষণা। প্রতি বছরই সরকার জুন মাসে পরবর্তী আর্থিক বছরের জন্য জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী বাজেট ঘোষণা করে থাকেন কতগুলো আর্থ-সামাজিক টার্গেটের ভিত্তিতে যাকে মূলত বলা যায় ছক ভিত্তিক গতানুগতিক প্রক্রিয়া যেখানে অর্থনীতির প্রতিফলন ঘটে। বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং এই কাজকে সঠিক পথে বাস্তবায়িত করতে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বছরের দুটি পর্বে মুদ্রানীতি ঘোষণা করে থাকে। প্রস্তাবিত ঘোষিত মুদ্রানীতি বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো : অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৫.৯ শতাংশ রাখা, বেসরকারি খাতে ঋণের উচ্চতর প্রবৃদ্ধি সংকুলানের সুযোগ সৃষ্টি, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৬.৮ শতাংশ, সরকারি খাতে ১০.৪ শতাংশ, ব্যাংকের পরিচালনা ব্যয় হ্রাস, আমানত ও ঋণের মুদ্রাহারের ব্যবধান কমিয়ে আনা, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা হার বনাম ট্রেজারি বন্ডের সুুদের হারের যৌক্তিকতাকরণের ব্যবস্থা, ঋণের ব্যবহার উৎপাদন তথা কর্মসংস্থানমুখী, রপ্তানি জোরদার, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স প্রবাহ জোরদার, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার শক্তিশালীকরণ ইত্যাদি। বর্তমান বছরের জুন মাসে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছিল ৫.৭৮ শতাংশ যা বাজেটে ঘোষিত ৫.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি টার্গেটের চেয়ে বেশি। তবে মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা করা করা হয়েছে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে।

তবে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকায় নির্বাচনী কেন্দ্রিক অনুৎপাদনশীল সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ব্যাপক মুদ্রার প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন দাঁড়িয়েছে ১৩.৯ শতাংশ এবং জোগান সীমিত রাখার উদ্দেশ্য প্রবৃদ্ধি গড় বার্ষিক ১২ শতাংশ লক্ষ ধরা হয়েছে। আবার ব্যাপক মুদ্রার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বর্তমান বছর থেকে রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধির গড় বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা অনুসরণ করা হয়েছে। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে আরো উল্লিখিত হয়েছে যে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির মন্থরতা ও রেমিটেন্স আন্তঃপ্রবাহ নিম্নমুখী হওয়ায় মুদ্রা জোগানের নিট বৈদেশিক সম্পদের অংশ সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকের তারল্যে তার প্রভাব বাড়ছে। যার ফলে সিআর আর বর্তমানে ৫.৫ শতাংশ এবং রেপো সুদের হার ৬ শতাংশে রাখা হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট কাটাতে সিআরআর রেপোর হার কমানোর বিষয়টি ঘোষিত মুদ্রানীতির বহাল রাখা হয়েছে যদিও অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি সহায়ক হবে। তা ছাড়াও সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকার অনিশ্চয়তায় বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। আবার আমদানিতে ভোগ্যপণ্য স্থান পাবে যা প্রবৃদ্ধি সহায়ক না হয়ে মূল্যস্ফীতি সহায়ক হবে।

এ ব্যাপারে দেশের বরেণ্য অর্থনীতিবিদরা একই কথা বলছেন যে সিআরআর, রেপো ও রিজার্ভ রেপোর কম হার হওয়ায় ব্যাপারে অর্থ সরবরাহ বাড়বে, ব্যাংকে সুদের হার কমবে যাতে মুদ্রাস্ফীতি ঊর্ধ্বগতি হতে পারে। আবার বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কারণে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় মুদ্রাস্ফীতি তার সঙ্গে ঘটেছে ডলারের তুলনায় টাকার অবমূল্যায়ন এবং ক্রমাগতভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমাবনতি। বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সমস্যা তারল্য নয়, ব্যবস্থাপনা সংকট যেগুলো ঘোষিত মুদ্রানীতিতে উল্লিখিত হয়নি। এখনো সুদের হার ৯ ও ৬ শতাংশ হারে বাস্তবায়নের যে সিদ্ধান্ত ছিল তা অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হয়নি যা নীতিনির্ধারকদের দুর্বলতার আরো একটি দিক। ব্যাংকারদের ধারণা বাজার অর্থনীতির যুগে বাজার ব্যবস্থাই সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করবে ওপর থেকে চাপিয়ে দিয়ে নয়। সুদের হার কম হলেই বিনিয়োগ বেড়ে যাবে এমনটি শতভাগ সত্যি নয়। তার জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ, অবকাঠামোগত সুবিধা ও জনজীবনে নিরাপত্তা। আবার অনেকে মনে করেন দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা সচল রাখতে হলে কৃষি, শিল্প, নারী, উপজাতি দলিত শ্রেণি ইত্যাদি উদ্যোক্তাদের আয়বর্ধকমূলক কাজ জড়িত করতে সহনীয় সুদে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে তাদেরও যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।

আবার খেলাপিঋণ বর্তমানে মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় শতকরা ১২ ভাগ যা ব্যাংকিং খাতের ভাইরাস হিসেবে দেখা দিয়েছে যার কারণে ব্যাংকের মুনাফা কমেছে, তারল্য সংকট বাড়ছে এবং ব্যাংক পরিচালনায় স্থবিরতা চলছে যা রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকে বেশি। খেলাপি আদায়ের দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করলে মুদ্রাস্ফীতি কমে আসবে এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরতে বাধ্য হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় ঘোষিত মুদ্রানীতিতে এ বিষয়গুলো কিছুই উল্লেখ নেই। এটা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সহায়ক মুদ্রানীতি নয়। তাহলে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তাদের গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে প্রয়োগধর্মী মুদ্রানীতি প্রণয়নে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমান বছরে বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৫২ মার্কিন ডলার এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন দেশের আর্থিক সেবা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার অভিযান বিশেষত দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি ও এসএমই খাতে অর্থ জোগাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিগত বছরগুলোতে অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, মুদ্রানীতির সঙ্গে রাজস্বনীতির সম্পর্ক রয়েছে যা একটি আর একটির সহায়ক। তাই মুদ্রানীতি হোক প্রয়োগধর্মী, উৎপাদনবান্ধব ও আর্থিক উন্নয়নের হাতিয়ার।

ড. মিহির কুমার রায় : ডিন, সিটি ইউনির্ভাসিটি।