একাত্তরের জননী রমা চৌধুরীর প্রয়াণ

আগের সংবাদ

উন্নয়নে আস্থা প্রয়োজন

পরের সংবাদ

রমা চৌধুরী : জীবন ও সাহিত্য

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৮ , ৭:৫৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৮, ৭:৫৭ অপরাহ্ণ

ইলিয়াস বাবর

কবি ও লেখক

‘আমার জীবন এখন নিভু নিভু। মনে হয় অপূর্ণই থেকে যাবে স্বপ্নগুলো। কিছুই বুঝি করা আর হলো না। একবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করার সৌভাগ্য হয়েছিল। তখন কিছুই চাইনি তার কাছে। আরেকবার যদি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হতো! অপূর্ণ স্বপ্নগুলোর কথা তুলে ধরতাম তার কাছে।’

‘যে মাটির নিচে আমার দুই দু’টি সন্তান শুয়ে আছে, শুয়ে আছে লাখ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সে মাটিতে আমি দম্ভের সঙ্গে জুতা পায়ে চলি কি করে? তাই জুতা পায়ে দেয়া ছেড়ে দিয়েছিলাম।’ যে জননী বাংলাদেশের, প্রিয় জন্মভূমির প্রতিটা ইঞ্চি মাটিতে জিইয়ে রাখেন তার সাধনা আর স্বপ্নের বীজ- তিনি যুগের অবতার হয়ে আমাদের শিক্ষা দিয়ে যান কীভাবে ভালোবাসতে হয় মাটিকে-মানুষকে-স্বাধীনতাকে। এমনতর ভিন্ন জীবনধারা আর বিশ্বাসে জীবন কাটিয়েছেন প্রিয় মানুষ রমা চৌধুরী।

আমাদের গল্প-উপন্যাসে অহরহ দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা ভিক্ষাবৃত্তি করছেন, মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে পতিতা হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধার ভাই কি ছেলে ডাকাত হচ্ছে- সাহিত্য যদি সত্যিকার অর্থেই সমাজের দর্পণ হয় তবে মানতে হবে এসব। সেই তথাকথিত এবং প্রায়-প্রচলিত ধারণাটিকে রমা চৌধুরী বদলে দেন নিজের জীবন দিয়েই। তিনি জীবিকার মাধ্যম করে নেন লেখাকেই! যে দেশে অধিকাংশ লেখকই রয়্যালিটি পান না বলে শোরগোল তোলেন অথচ একজন রমা চৌধুরী জীবনের আর সবদিকে তো বটেই এখানেও অনন্য হয়ে যান! তিনি নিজে বই ছাপেন, নিজে নিজের বই বিক্রি করেন। অবশ্য নিজে বিক্রির এ আয়োজন তার কাছে একান্তই প্রয়োজনীয় ও বেঁচে থাকার অবলম্বন হলেও এ সমাজেরই অনেক ভদ্রজন তাকে দিনের পর দিন অপেক্ষায় রেখেছেন বই কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। রমা চৌধুরী তার এই লেখ্যবৃত্তি নিয়ে এমন ধারণাই পোষণ করেন- ‘আমার কুষ্ঠিতে লেখা আছে আমি লেখ্যবৃত্তি গ্রহণ করেই জীবিকা নির্বাহ করব। অনেকটা সে কথাকে বাস্তবায়ন করার জন্যই লিখছি। আর এ ছাড়া এই অবস্থায় আমার অন্য কিছু করারও সুযোগ নেই। বাঁচতে হলে অর্থের প্রয়োজন। আমি কারো গলগ্রহ হতে কখনো পছন্দ করতাম না, এখনো করি না।’ আরেক বইয়ের ভূমিকায় রমা চৌধুরী তার পেশা-নেশা নিয়ে এভাবেই বলেন, ‘লেখা ছিল আমার নেশা, আর তা বিক্রি করাই ছিল একমাত্র পেশা। ওই লেখা বিক্রির আয় দিয়েই আমি বহন করছিলাম আমার অনাথ আশ্রম দয়ার কুটিরের যাবতীয় ব্যয়ভার।’ এমনকি তাকে নিয়ে লিখে, তার সম্পত্তি অপদখলের পাঁয়তারাও দেখতে হয়েছে সময়কে। তার রচিত গ্রন্থাদি কি একেবারেই জলো ছিল? কিংবা ফেলনা? অথচ বিচিত্র বিষয়ে তার সাহিত্যরচনাগুলো ভাস্বর। প্রবন্ধের মতো কঠিন বিষয়েও তিনি পারঙ্গম- রবীন্দ্র সাহিত্যে ভৃত্য, নজরুল প্রতিভার সন্ধানে, সপ্তরশ্মি, যে ছিল মাটির কাছাকাছি, ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি গ্রন্থে প্রবন্ধকার রমা চৌধুরীর পরিচয় পাওয়া যায়। এবং পাঠকদের কবুল করতে হয়, প্রবন্ধকার শুধু শখেই লেখেননি, তার হৃদয়ের বৌদ্ধিক ভাবনা দিয়েই এসব প্রবন্ধে নিজের ভাবনাপুঞ্জকে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন অন্যের হৃদয়ে।

রমা চৌধুরীর জন্ম চট্টগ্রামে। বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা চট্টগ্রামেই- যদিওবা জীবনের নানা বাঁকে তাকে নানাদিকে যেতে হয়েছে। এরপরেও জন্মধাত্রী চট্টগ্রাম, বীরপ্রসবিনী চট্টগ্রামের আলোকসামান্য মনীষাদের নিয়ে তার প্রবন্ধ সংকলন ‘চট্টগ্রামের লোক সাহিত্যে জীবন-দর্শন’ প্রসিদ্ধ। চট্টগ্রামে প্রচলিত সমাজমনস্ক লোকছড়া, লোকসাহিত্য, ছড়া ও প্রচলিত প্রবাদের ঐতিহাসিক সূত্র, ধাঁধাঁর ভেতর থাকা রঙ্গ, প্রবাদের ভেতর দিয়ে সমাজের অসঙ্গতিতে বিদ্রুপ ইত্যাদির সুলুকসন্ধান করেছেন রমা চৌধুরী ‘চট্টগ্রামের লোক সাহিত্যে জীবন-দর্শন’ বইয়ে। এই প্রবন্ধগ্রন্থটি রমা চৌধুরীর উজ্জ্বল কাজগুলোর একটি। ছন্দ ও অন্তঃমিলের মাধ্যমে ছড়া কীভাবে আমাদের হৃদয়ে স্থান করে নেয়, ইতিহাসকে কীভাবে ধারণ করে লোকছড়া, কীভাবে লোকছড়ায় ধরে রাখে বিচিত্রতা ধরে রাখে রচয়িতরা তা নানা আলোয় ব্যাখ্যা করেন রমা চৌধুরী প্রাগুক্ত গ্রন্থে। প্রবাদের মাধ্যমে স্থানিক ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসকে চিহ্নিত করার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি দারুণভাবে আলোকপাত করেন প্রবন্ধকার। প্রবন্ধের ক্ষেত্রে রমা চৌধুরী তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে নিরাবরণ ও নির্মোহভাবেই তুলে আনেন পাঠকের সামনে। আমাদের হুজুগে সমাজে তার বৈচিত্র্যময় প্রবন্ধ ও চিন্তার যথাযথ ব্যাখ্যা তো হয়নি, উল্টো তার রচনাকে ভিত্তি করে নানাবিধ কথার ডালপালা গজাতে সুযোগ দিয়েছে আমাদের সমাজের পশ্চাৎপদ চিন্তাধারাই। ‘মেয়েদের মা হবার সুযোগ দাও’ প্রবন্ধের পাঠ ও মেজাজ ধরার মতো সময় কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে এখনো হয়নি স্বাভাবিকভাবেই।‘… এখন আমার প্রশ্ন হলো প্রাচীনকালের মুনি-ঋষিরা বা মহামানবরা যদি সন্তানের জন্মদানে অমন স্বাধীনতা পেয়ে থাকেন, তাঁদের সাত খুন যদি মাফ হয়ে যায় প্রয়োজনের অজুহাতে; বর্তমান যুগের হতভাগ্যমানব-সন্তানদের কেন এক খুন না করতেই বাপ পাকানো হবে? এখনকার কুন্তী-মাদ্রীরা কেন বীরমাতার মর্যাদা পাবে না, শুধু লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার হবে; এবং সমাজের অত্যাচার-উৎপীড়ন, নিগ্রহ-নিপীড়ন সইতে না পেরে আত্মহননে বাধ্য হবে?’ রমা চৌধুরীর এমনতর মতে অধিকাংশই একমত হবে না- ঝুঁকির কাজ এই, এই ডিসকোর্সে আলোচনার ক্ষেত্রও এখনো তৈরি করতে পারেনি আমাদের মানসকাঠামো। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, রমা চৌধুরী- যার জন্ম কিনা ১৯৩৬ সালে, তখন এই পরাধীন দেশের যে আর্থ-সামাজিক অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়, তিনি সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করলেন নানান প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে, শিক্ষকতা করলেন, সন্তানের মা হলেন, স্বামীর কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে নিজের ইজ্জত বিলিয়ে দিলেন- এসবই কি তার এমন চেতনা-গঠনের মূল কারণ? এর বহুবিধ ব্যাখ্যা হতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যা, রমা চৌধুরীর নিজের জীবন আর অভিজ্ঞতা। আমরা যদি রমা চৌধুরীর জীবনকে গভীরভাবে দেখার চেষ্টা করি তবে দেখব, তার আপসহীন জীবনের সুষমা, ত্যাগের অনিঃশেষ মহিমা, মাতৃমমতা, সর্বোপরি দেশজননী হয়ে ওঠার অতিবাস্তব কিংবা শিউরে ওঠার মতোন এক কাহিনী। তিনি বারবার পুরুষ দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন, সন্তানদের পিতৃপরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছেন আমাদেরই বলশালী সমাজব্যবস্থার কারণে। ফলে, যে নারী একাত্তরের মহান প্রেক্ষাপটে সব হারানোর পরেও, নানা সুবিধা নেয়ার সুযোগ আসার পরেও- এমনকি তার বিনয়ের কাছে হার মানতে হয় রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাসীন মানুষটিকেও, এমন মানুষ শতাব্দীতে খুব বেশি জন্মায় না, একজন রমা চৌধুরীকে রাষ্ট্র কিংবা পরিপার্শ্ব গড়ে তুলতে পারে না, হয়ে উঠতে হয় জীবন দিয়ে। এখানেই রমা চৌধুরীকে নিয়ে কাজ করার সুযোগ কিংবা তার রচনার ব্যাখ্যা করার একটা যুক্তিযুক্ত পথ দেখা যায়।

রমা চৌধুরীর আত্মজৈবনিক রচনা ‘একাত্তরের জননী’ আমাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য একটি বই। ‘একাত্তরের চিঠি’, ‘একাত্তরের ডায়রী’, ‘আমার একাত্তর’ এর মতোই মূল্যবান এবং সাহিত্যগুণ সম্পন্ন একটি স্মৃতিকথা একাত্তরের জননী। গ্রন্থটি পাঠে আমাদের বারবার চোখে ভাসে একাত্তরের দৃশ্য, বারবার ফিরে যাই রক্তাভ একাত্তরে। একজন দুঃখিনী মায়ের স্মৃতির সঙ্গে তখন একাকার হয়ে যায় সারা বাংলার মায়েদের স্মৃতি। ‘যে ছিলো মাটির কাছাকাছি’ গ্রন্থে রমা চৌধুরীর গবেষক পরিচয়কে বিস্তৃত করতে পারি। তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে গবেষণা করেছেন, জাতীয় কবি নজরুল ইসলামকে নিয়ে গবেষণা করেছেন- তাদের সাহিত্য ও নানাদিক নিয়ে নিজের মতো দিয়েছেন, ধীমান বিশ্লেষণ করেছেন, গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। রমা চৌধুরী জনজীবনের সঙ্গে জসীমউদ্দীনের সাহিত্যের সংশ্লেষ, জনজীবনের প্রভাব ও তৎসময়ের বিশুদ্ধ প্রদর্শনকেই চিত্রিত করেন। জসীমউদদীন, প্রকারান্তরে লোকজ-ঐতিহাসিক ধারাকে ভুলে যাওয়ার এই আকালে ‘যে ছিল মাটির কাছাকাছি’ পাঠ নতুনভাবে জসীমউদ্দীন পাঠে আমাদের উৎসাহী করে। রমা চৌধুরী যেমন বলেন- ‘জসীমউদ্দীনই সেই পল্লীকবি যিনি যুগাতিশয়ী সার্থকতার দাবি করতে পারেন কালজয়ী সাহিত্যিকরূপে। কারণ, তাঁর সৃষ্টির মূল সুর বেদান। এ বেদনানুভ‚তিও একে অপরের মানসপটে মুদ্রিত করার যাদুকরী শক্তিই তাঁকে হুযুগের কবি না বানিয়ে যুগের কবির সম্মানিত আসন দান করেছে।’ একজন রমা চৌধুরীকে চিনতে হলে আমাদের বারবার আশ্রয় নিতে হবে তার রচনাসমগ্রে। রবীন্দ্র-নজরুল-জসীমউদ্দীন তার রচনায় আছে, আছে তার সময়। সেই যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের বাস্তবতা, যুদ্ধ-পূর্ব বাঙালি সমাজ সম্পর্কে জানতে হলে রমা চৌধুরীর রচনার ধারস্থ হতেই হয়। ‘সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ স্মৃতিগদ্য গ্রন্থটি পাঠে একজন নারীর উঠে আসা, সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন, তাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং পরিপার্শ্ব সম্পর্কে জানতে হলে বইটি পাঠ জরুরি। সময়ের সঙ্গে রমা চৌধুরীর যুদ্ধ, পরিবেশ আর প্রতিক‚লতার সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার নানা তথ্যে পূর্ণ গ্রন্থটি। ষাটের উত্তাল রাজনীতি, ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তানি শোষণ ও দৃষ্টিভঙ্গি- প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপুঞ্জের বয়ান তার এই গ্রন্থে পাওয়া যায়।

তিনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে বলেন, ‘আমার জীবন এখন নিভু নিভু। মনে হয় অপূর্ণই থেকে যাবে স্বপ্নগুলো। কিছুই বুঝি করা আর হলো না। একবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করার সৌভাগ্য হয়েছিল। তখন কিছুই চাইনি তার কাছে। আরেকবার যদি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হতো! অপূর্ণ স্বপ্নগুলোর কথা তুলে ধরতাম তার কাছে।’ প্রিয় পাঠক, একজন রমা চৌধুরীর স্বপ্নগুলো কি খুব বড়? কিংবা একান্তই কি তার ব্যক্তিগত? অনাথ আশ্রম, বৃদ্ধ নিবাস, লোকসাহিত্য কেন্দ্র, বাবার নামে একাডেমি… এসব প্রতিষ্ঠানে তো জনকল্যাণই করা হয়ে থাকে। যে দেশ বঙ্গবন্ধুর ডাকে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন হয়েছিল যাবতীয় অনাচার আর ব্যবধান থেকে নিস্তার পেতে সে দেশের একজন শ্রেষ্ঠ সেনানীর এসব চাওয়া কখনোই অপূর্ণ থাকতে পারে না। তাছাড়া রমা চৌধুরীর চাওয়ার সূত্র ধরেই মূলত একজন মানবসন্তান রমা চৌধুরীকে আমরা পরিপূর্ণভাবে দেখার সুযোগ পাই। তিনি নিজের আয়েশের জন্য, সন্তানের জন্য কিংবা পুরস্কারের কথা বলেননি। তার যে ব্যক্তিত্ব, তার যে ত্যাগ তা বরং নির্দিষ্ট জীবন শেষ হয়ে গেলেও মানুষের কল্যাণে আসুক, মানবতার শিক্ষায় আসুক এমনটাই চেয়েছিলেন রমা চৌধুরী। আমরা জানি এবং বিশ্বাস করতে চাই, একজন রমা চৌধুরী, একজন বীরাঙ্গনা, একজন সমাজসংস্কারক, একজন প্রগতিবাদী মানুষের স্বপ্ন পূরণ হবে।

ইলিয়াস বাবর : কবি ও লেখক।