অনাগ্রহী তারুণ্য ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ

আগের সংবাদ

অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

পরের সংবাদ

মনে রাখবেন ‘খালি কলসি বাজে বেশি’

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮ , ৭:৩১ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮, ৭:৩১ অপরাহ্ণ

কামাল লোহানী

প্রবীণ সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা কেন ভোটের রাজনীতির হাতে জিম্মি হয়ে গেল? তাইতো ধর্মান্ধ মৌলবাদী শক্তি নির্বিবাদে দেশকে নিজেদের লক্ষ্য পানে টেনে নেয়ার অপকৌশল প্রয়োগ করার সুযোগ পেয়ে গেছে। আর তাই দেশবাসীর উষ্মা প্রত্যক্ষ করে রাজনৈতিক মুনাফা লোটার গন্ধে গন্ধে একটি ‘ডিসগ্রান্টল্ড’ গ্রুপ ব্যক্তি ইমেজকে ভর করে সংঘবদ্ধ হতে চাল চেলেছে। এরা হলেন সবার পরিচিত, অল্পপরিচিত কতিপয় ব্যক্তিত্ব, যার মধ্যে ড. কামাল হোসেন, ডা. বি. চৌধুরী, পরবর্তী প্রজন্মের মাহমুদুর রহমান মান্নাও রয়েছেন।

অনুন্নত দেশীয় রাজনীতি তো বলতে পারব না, কারণ আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। যদিও লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। অর্জনে সময়ও কম লাগবে না, ছয় বছর। তবুও তৃপ্তির ঢেকুর তোলার জন্য ‘সার্টিফিকেট’ পেয়ে গেছি। কিন্তু ‘জাতীয় রাজনীতি’ কীভাবেই না কলুষিত হয়ে চলেছে। আমাদের দেশে কত যে দল, রাজনৈতিক দল আছে, তার হিসাব সবাই বলতেও পারবে না। কারণ সময়ে সময়ে ওগুলো গজাচ্ছে, আনতাবড়ি। তবে এদের আবার সবাই রাজনৈতিক দলীয় সংজ্ঞায় পড়ার কথা নয় কারণ তারা কেবলমাত্র ধর্মীয় মনোভাব নিয়ে ইসলামি দল করে এবং দেশময় ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা আবার কেউ কেউ তো জবরদস্ত সন্ত্রাসী আর জঙ্গি তৎপরতায়ও লিপ্ত। সঙ্গে সঙ্গে দেশটাকে সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত বাতাসে ‘নীল’ করে ফেলতে হরহামেশাই ধর্মের দোহাই পেড়ে রাজনীতি নামক জজবায় মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। আর তারই সঙ্গে সরকারও ওই নিয়তিকে গ্রহণ করে আত্মহননের সাময়িক হলেও সেই পথ বেছে নিয়ে নিজেদের আখের জলুসপূর্ণ করতে চেষ্টা করছে। ঘটনাচক্রে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, এমন ব্যক্তিও আজকাল রাজনীতির মহারণে ‘ঢাল তালোয়ার নেই, নিধিরাম সরদার’ হয়ে কত যে সব দেশের সাধারণ মানুষকে সবক দিচ্ছেন তার ইয়ত্তা নেই। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দমন-পীড়ন ও হত্যা-খতম করেছেন ক্ষমতা আর রাইফেলে, শিশুহত্যার অভিযোগও আছে কারো কারো বিরুদ্ধে, তারাও মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে রাজনীতিতে এসে জায়গা দখলে প্রাণপণ চিৎকার করছেন ধর্মের নামে, তরী কূলে ভেড়ানো তো দূরের কথা, মাঝ দরিয়ায় ডোবার অবস্থায় ডুবন্ত প্রাণীর মতন নাক উঁচিয়ে বাঁচার কোশেশ করছে। ভাগ্যে বিশ্বাস করি না, তবু বলব এই ‘কপট চরিত্র’ রাজনীতি পুঙ্গবরা তরী ক‚লে ভেড়াতে পারছেন না। জনগণ এদের কথায় ভজবার পাত্র নয়, সেটা তো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে চরম জাতীয়তাবাদের প্রকাশে প্রমাণ করেছেন। আমরা যারা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করি, তারা রাষ্ট্রের মধ্যে যে রাজনৈতিক ‘ব্যায়াম’ চর্চা হতে দেখি, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে মাঝেমধ্যে, সত্যি কথা বলতে কি, হতাশ হয়ে যাই।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কী এমন বাংলাদেশ চেয়েছিল। গণতন্ত্রের কথা বাদ দিলাম, ‘সমাজতন্ত্র’ স্লোগান হিসেবে উত্তম, মানুষে আগ্রহ সৃষ্টি করে বটে তবে বাস্তবায়ন অত সহজসাধ্য নয়, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা এটি তো পূর্বপুরুষদের দেয়া ঐতিহাসিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক, তাকেও কি ধরে রাখতে পেরেছি? মুক্তিযুদ্ধে ‘হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান- আমরা সবাই বাঙালি’ এই স্লোগান আমরা দিয়েছিলাম কিন্তু যখন হেফাজতে ইসলামের মতন স্থানীয় একটি সংগঠন- তাও আবার মাদ্রাসাভিত্তিক, যে শিক্ষার মাধ্যম আমরা কোনোদিন গ্রহণ না করে একমুখী সর্বজনীন শিক্ষাই দাবি করে এসেছি পাকিস্তান জমানায়, সেই তারা একটি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনের কাছে এত নতজানু নীতি করল কেন? কেন মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে প্রায় অর্ধ শতাব্দীকালের পর ধর্মান্ধতার খপ্পরে পড়ে গেলাম? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাই না। গণজাগরণ মঞ্চই তো সে দিন আদতে এর ‘মোক্ষম লক্ষ্য’ ছিল এবং হেফাজত যখন মিথ্যা সমাপ্তির পর রমনা পার্কের গাছপালাকে আড়াল করে মঞ্চের ওপর হামলা করার পাঁয়তারা করেছিল, এ খবর পেয়ে গণজাগরণ মঞ্চের স্বতঃস্ফূর্ত সচেতন মুক্তিযুদ্ধের নতুন প্রজন্ম কি প্রচণ্ডভাবে শুধুমাত্র লাঠিসোটা নিয়ে প্রতিহত করেছিল ইসলামের তথাকথিত হেফাজতকারী স্বঘোষিত সংগঠনের মোল্লাদের! মঞ্চে ছেলেমেয়েদের তাড়া খেয়ে কীভাবে লেজ গুটিয়ে ভেগেছিল, তাতো সবাই দেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সরকার সেই কপট ধর্মান্ধতাকে প্রশ্রয় দিয়ে অথবা পারস্পরিক সমঝোতার নীতিতে হেফাজতকে যেমন মধ্যরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে থেকে পুলিশ বাহিনী অসাধারণ কৃতিত্বের সঙ্গে স্বল্প প্রাণহানির বিনিময়ে ঢাকা থেকে বিতাড়িত করল কাঁচপুর পর্যন্ত; একই ভোরে খবর এল ‘গণজাগরণ মঞ্চ’-এর হাড়মাংস উচ্ছেদ করা হয়েছে শাহবাগ চত্বর থেকে। এই আকস্মিক বিনিময় নতুন রাজনৈতিক আপসকামিতা পত্তন করল রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে। হায়রে স্বার্থবাদের রাজনীতি! হেফাজত যত না ছিল, সরকার ও রাষ্ট্র তাকে আরো বড় করে দেখাল। ওরা প্রশ্রয় পেয়ে গেল। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, যারা মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনে, বই পড়ে, ছবি-চলচ্চিত্র এমনকি নাটক দেখে নিজেদের দেশপ্রেমকে শানিত করে গড়ে তুলতে চাইছিল, তাদের ভোঁতা করে ধর্মান্ধতায় ডোবাতে প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, কুসুম কুমারী, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, হুমায়ুন আজাদ পর্যন্ত উচ্ছেদ হয়ে গেলেন আর সেই জায়গা নিল ওই জঙ্গি ধর্মীয় আঞ্চলিক সংগঠনের প্রেসক্রিপশনের নির্দেশমতন লেখা কবিতা, গল্প ইত্যাদি। প্রতিবাদে ঝড় উঠেছিল। কিন্তু ‘থোর বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়’ রয়ে গেল।

মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে প্রচলিত রাজনৈতিক চর্চা আদর্শিক চেতনা থেকে যেভাবে সরে গেছে এবং এখনো যাচ্ছে তাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আবার ফেরানো এবং যে মুজীব-স্বপ্ন ও বজ্রকণ্ঠের আহ্বানে দেশবাসী বাংলার জনগণ অকপটে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মাতৃভূমিকে লুটেরা শাসকশ্রেণির কবল থেকে পুনরুদ্ধার করতে, তার কোনোই তুলনা নেই। আজ সেই বাংলাদেশে জনগণের ইচ্ছা পূরণের চেয়ে রাজনীতির তরলায়িত রূপ-উপাখ্যান অতীতের সব ইতিহাসকে ছাড়িয়ে গেছে। দেশে রাজনীতির উত্থান-পতন এবং তোষণ প্রক্রিয়ার বহুল প্রচলন প্রচলিত সংসদীয় রাজনীতিকেও ভেঙেচুরে ফেলেছে। যারাই সরকারে আসছে, তারাই দেশটাকে ধর্মনিরপেক্ষতার স্লোগান ও আদর্শকে নস্যাৎ করে কপট ও দ্বিচারিতার রাজনীতিই পত্তন করেছেন। দেশ আজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা যে গর্বের অধ্যায় ও দায়মুক্তির পরিচিতি অর্জন করেছে, তাকে সাধুবাদ জানিয়ে কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় চলেছি? যদি প্রশ্ন করি, গণতন্ত্র কোথায়? তবে কি খুঁজে পাব সেই সোনার হরিণকে? ধর্মনিরপেক্ষতা জলাঞ্জলি দিতে তো দেশটাকেই হেফাজতে ইসলামের শীর্ষজন মোহাম্মদ শফীর কুৎসিত বক্তব্য ও বয়ানের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে আমরা কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ জনগণকেই অপমান করছি না? আমরা কি তাদের ডিকটেশনে শিক্ষাব্যবস্থাকে পাল্টাতে চেষ্টা করিনি? রাষ্ট্র এমন নষ্ট ও দুর্বল রাজনীতিতে প্রবেশ করে কি ‘উন্নয়নের মহাসড়কে’ নিজেদের বহুল প্রচারিত কর্মকাণ্ডকেও জনগণের কাছে অবিশ্বস্ত করে ফেলেননি? এই ধর্মীয় উন্মাদনা বঙ্গবন্ধু কি তাঁর জীবনে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন? এর জবাব ১৯৭২-এর সংবিধান সাক্ষ্য দেবে। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় আওয়ামী লীগ সরকার পরিপূর্ণ সুযোগ পেয়েও ভোটের রাজনীতির অঙ্ক মেলাতে গিয়ে ‘পঞ্চদশ সংশোধনী’র মাধ্যমে জেনারেল জিয়ার ‘বিসমিল্লাহ…. রহমানের রহিম’ এবং জেনারেল এরশাদের ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’কে রেখে দেননি? তারপরও যখন ধর্মনিরপেক্ষতা খুঁজি এই সরকারের কার্যক্রমে, সে তো বালখিল্য ছাড়া আর কিছু নয়। ভোটের রাজনীতির ঘুঁটি চালতে গিয়ে কার চোখে ধুলো দিচ্ছে সরকার?

আমরা মহাশূন্যে যাচ্ছি, কিন্তু সেই উৎক্ষেপণের সফলতা অর্জনে দেশবাসীর মনে স্থায়ী উল্লাস দেখতে পাচ্ছি না কেন? রূপপুর আণবিক প্রকল্প, পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন ইত্যাদি যে চমক সৃষ্টি করেছে নাগরিক জীবনে, আমরা কি ভেবে দেখেছি যাপিত জীবনে তা কতটা ব্যতিক্রম ঘটিয়েছে? সমাজতন্ত্র একেবারে বিসর্জিত হয়েছে। তার কথা নাইবা উচ্চারণ করলাম। মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা কেন ভোটের রাজনীতির হাতে জিম্মি হয়ে গেল? তাইতো ধর্মান্ধ মৌলবাদী শক্তি নির্বিবাদে দেশকে নিজেদের লক্ষ্য পানে টেনে নেয়ার অপকৌশল প্রয়োগ করার সুযোগ পেয়ে গেছে। আর তাই দেশবাসীর উষ্মা প্রত্যক্ষ করে রাজনৈতিক মুনাফা লোটার গন্ধে গন্ধে একটি ‘ডিসগ্রান্টল্ড’ গ্রুপ ব্যক্তি ইমেজকে ভর করে সংঘবদ্ধ হতে চাল চেলেছে। এরা হলেন সবার পরিচিত, অল্পপরিচিত কতিপয় ব্যক্তিত্ব, যার মধ্যে ড. কামাল হোসেন, ডা. বি. চৌধুরী, পরবর্তী প্রজন্মের মাহমুদুর রহমান মান্নাও রয়েছেন। এক সময়ের ডাকসাইটে ছাত্রনেতা ‘চার খলিফা’র একজন আ স ম আব্দুর রবও আছেন তবে তার সেই ধার এখন শূন্যতে। ড. কামাল হোসেনকে সবাই আইন বিষয়ে বিজ্ঞ পণ্ডিতজন বলেই মান্য করেন। তবে তার রাজনৈতিক চরিত্র তিনি কখনোই গড়ে তুলতে পারেননি। ব্যক্তি ছাড়া সমষ্টিতে তার প্রচণ্ড ঘাটতি আছে। তার সংগঠন ‘গণফোরাম’ কি কোনো প্রভাব আদৌ ফেলতে পেরেছে রাজনীতিতে? আর পারেনি বলেই কোনো লড়াই-সংগ্রামে তার সংগঠনকে দেখা যায়নি? ১৪ দল তো ১০ বছর গদিতে আসীন উনাদের কোনো সমর্থন না নিয়েই। ব্যক্তিত্ব সর্বস্ব রাজনীতি মানুষ মেনে নেয় না। তিনি বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য হয়ে মন্ত্রিসভায়ও স্থান পেয়েছিলেন সংবিধান রচনার অন্যতম কারিগর হিসেবে, কিন্তু নির্বাচনে দাঁড়িয়ে এই ঢাকাতেই তাকে পরাজয়বরণ করতে হয়েছে। যাহোক, কামাল তুনে কামাল নাহি কিয়া। অন্যতম জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক, বাক নান্দনিকতায় ঋদ্ধ, সফল চিকিৎসক এবং বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি, পরে অবমানিত ও অপসারিত ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তার মতন মান্যবর একজনকে কীভাবে বিএনপি হেনস্থা করেছে, তাতো আমরা সবাই জানি। ক’জন তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন মনে আছে সবার। পাঠকও নিশ্চয়ই ভোলেননি রেলগেট থেকে কীভাবে বিএনপির হাত থেকে প্রাণ বাঁচানোর জন্য দৌড়াতে হয়েছিল। ছেলে তার সহযোগী, তার যোগ্যতা যদি বলি মুখেই, তাহলে কি ভুল হবে? তার দল ‘বিকল্প’র সেক্রেটারি মেজর মান্নান ব্যবসায়ী, সুযোগের সন্ধানে তো থাকবেনই, তাই এখন এদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন, আগে এত বিপর্যয় গেল দেশের ওপর দিয়ে ‘বিকল্প’ কোনো সংগ্রামে তো ছিলই না, এমনকি সোচ্চার হয়েছেন বলে জানি না, এখন এরা নড়াচড়া করছেন কেন? সামনে বুঝি ভোট, তাই না? তবে কি কোনো লাভ হবে?

প্রচণ্ড প্রভাব ও সাহসিকতা নিয়ে রাজনীতি নয় ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ কায়েম করতে যারা সরব ছিলেন, তাদের অন্যতম ‘আ স ম’ আজ তো জীবন্মৃত। কি করতে পারবেন? তবে এই ‘লট’-এর মধ্যে ‘তরুণ তুর্কি’ মাহমুদুর রহমান মান্না আওয়ামী লীগে দারুণ ছিলেন। রাজনীতির পরিবর্তনে কিছুটা বসে পড়লেও কথকতায় বেশ পটু ছিলেন এবং গাল ভরা নাম ‘নাগরিক ঐক্য’ নিয়ে আবির্ভ‚ত হয়ে চেষ্টা করছিলেন কিন্তু হলো না কিছুই। যারা ভেবেছিলেন পেছনে থাকবেন, তারাও নেই। সুতরাং তাকে এসব রাজনীতিতে অনপরিহার্য ব্যক্তিদের সঙ্গেই গলা ও পারদর্শিতা মেলাতে হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আবির্ভূত হওয়ার ডিম এখনো তাতেই আছে, ফোটেনি। পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধ্বে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সলিমুল্লাহ হলের মাঠে এক বক্তৃতার কথা মনে পড়ে গেল। তিনি একটি ফরমুলা বয়ান করেছিলেন ০+০=০। আজ প্রায় ৬০ বছর পরে এদের তড়পানি শুনে সে কথাই মনে পড়ে গেল। কাদের সিদ্দিকী কি করবেন জানি না। তবে তিনি আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে দাঁড়াতে কি পেরেছেন? এদের সঙ্গে এলেই বা কি হবে। নির্বাচনের আগে এরা বসাবসি করছেন বেশ। প্রকাশ্যে যেটুকু আসছে, তাতে অনেকেই ভাবছেন বিএনপির সঙ্গে দল ভারী করতে পারেন বলে মনে হচ্ছে। না হলে তারা তো আর আওয়ামী-বিএনপির বিকল্প তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি হতে পারবেন না। আমার ধারণা, পুরোপুরি বিএনপির সঙ্গে যাওয়া হয়তো সম্ভব হবে না জামায়াত সিনড্রোমের কারণে। কিন্তু জামায়াতবিহীন বিএনপিতে এরা গেলে কি বিএনপি লাভবান হবে? নাকি নতুন বোঝা কাঁধে চাপবে? আবার বিএনপি জামায়াতকে ওপেনলি ছাড়ার কথা বলে কৌশলে, গোপনে যে আঁতাত রাখবে না, তার কি নিশ্চয়তা আছে?

ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাও তো নাকি ৩১টি দল নিয়ে জোট বেঁধেছেন, আওয়ামী আঙিনায় ঘোরাফেরাও করছেন। বক্তব্যের ভাষা পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ‘ফিস আউট অব ওয়াটার’ হয়ে যে বাজারের পণ্য হওয়া ছাড়া আর কিছুই হয় না, তাই প্রমাণ করেছেন ব্যারিস্টার।

আগে যে ক’জনার নাম উল্লেখ করলাম, তারা যদি বিএনপির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেনও তাতে কি হবে? পাল্টাবে ভোটের রাজনীতি? জনগণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ এ কথা নিশ্চিন্তে বলা যায়। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধকে যারা অগ্রগণ্য ভাববেন তারাই জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। এখন তো দেখছি, বিএনপি এত দমন-পীড়ন তারপরও কেবল মুখটা চালিয়েই যাচ্ছে। বস্তুত ‘আন্দোলন’ শব্দটা উচ্চারণ করছে বটে কিন্তু তারা আন্দোলন আদৌ করতে পারবে বলে তো মনেই হয় না। বিএনপি মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার, গুম, হত্যা, নানা উপসর্গের কথা বলে নিজেদের শক্তিমত্তার দুর্বলতা ঢেকে জনগণের সামনে কেবল কান্নাকাটিই করে যাচ্ছেন। জনগণ সহানুভূতিশীল হনও যদি, তারা কি তাদের কর্মী, সমর্থক, নেতা, সংগঠকদের আদৌ সক্রিয় ও সাহসী করতে পারবেন? নির্বাচন তো এসেই গেল, কিসের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি? আন্দোলন করতে গেলে দমন-পীড়ন যে সইতে হয় এত অতীতের অভিজ্ঞতাও বলে। সেই কথা ভেবেই বিএনপিকে কোমর বাঁধতে হবে। বন্ধু একজন তো বলেই বসলেন, ‘কোমরই নেই তো বাঁধবে কি করে, আন্দোলন তো দূরের কথা’। এটাই বাস্তব। তবে বিএনপি নেতারা গুলশানে, প্রেসক্লাবে আর নয়া পল্টনে বসে বক্তৃতা আর প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে ‘বিপ্লব’ করে ফেলছে। এই দিল উল্টে সরকারকে। মনে পড়ে গেল প্রবাদটা, ‘খালি কলসি বাজে বেশি’। হায়রে কী নির্মম সত্য হয়েই না তা প্রকাশিত হচ্ছে!

সুতরাং দেশবাসী জনগণ বিশেষ করে ভোটাররা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন, শপথ নিন যে করেই হোক ছাপ্পা ভোট, বুথ দখল, আগের রাতেই ব্যালট বক্স ভরে রাখা, ভোট কেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট কেউ একজন দিয়ে গেছে এমন আশঙ্কা দূর করার জন্য নিজেরা সংঘবদ্ধ হন, তবেই সব প্রচারণার বিরুদ্ধে সুস্থ নির্বাচনে এসবের জবাব দিতে পারবেন। আর রাজনীতিকদের বলি, মানুষে বিশ্বাস স্থাপন করুন।

কামাল লোহানী : প্রবীণ সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।