মানিকগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযান আটক ১৫

আগের সংবাদ

আজ শুভ জন্মাষ্টমী

পরের সংবাদ

পাঁচ হাজার কোটি টাকা আর্থিক কেলেঙ্কারির হোতা নিয়ে রহস্য

এই আজিজ কোন আজিজ?

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮ , ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮, ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ

‘আজিজ’ রহস্যে তোলপাড় ব্যাংক পাড়া। ব্যাংক যাকে আজিজ বলছে, তিনি নিজেকে ওই আজিজ বলে স্বীকার করছেন না। তার দাবি, এ আজিজ তিনি নন, এ অন্য কেউ। তাহলে কে এই আজিজ? আজিজ রহস্যের জট খুলতে হিমশিম সংশ্লিষ্টরা। জনতা ব্যাংকের পাঁচ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির হোতা ওই আজিজ। গত ৩১ জুলাই রিমেক্স ফুটওয়্যারের মালিক এম এ আজিজের নামে একটি চিঠি ইস্যু হয় জনতা ব্যাংক থেকে। সিনেমা পাড়ার সবচেয়ে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আজিজই ব্যাংক থেকে লোন নেয়া রিমেক্স ফুটওয়্যারের মালিক এমন দাবি ট্যানারি সংশ্লিষ্ট লোকজন ও জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের। তবে প্রথম থেকেই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন এম এ আজিজ। এমনকি তিনি রিমেক্স ফুটওয়্যারের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততাও এড়িয়ে যেতে চাইছেন। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, কে এই আজিজ যাকে না জেনেই এতগুলো টাকা ঋণ দিল জনতা ব্যাংক?
জনতা ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র পাঁচ বছরে ভুয়া রপ্তানি নথি তৈরি করে জনতা ব্যাংক থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি বের করে নিয়েছে ক্রিসেন্ট গ্রæপ ও রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড। এ কেলেঙ্কারির বড় অংশই সম্পন্ন হয়েছে রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের নামে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে জনতা ব্যাংকের খেলাপি হয়ে পড়েছে এক হাজার ২৬ কোটি টাকার বেশি ঋণ। আর রিমেক্সের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন এম এ আজিজ, যিনি সিনেমা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু এম এ আজিজ বিষয়টি অস্বীকার করায় এ নিয়ে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে রয়েছে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষও। এই সমস্যাটি আইনানুগভাবেই মীমাংসার কথা বলেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ। অবশ্য এ নিয়ে দুপক্ষের দায় আছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ব্যাংকের দায়িত্ব হচ্ছে কোনো ব্যক্তিকে ঋণ দেয়ার আগে অবশ্যই তার সমস্ত কাগজপত্রের রেকর্ড রাখা। তার সম্পর্কে পুরোপুরি জেনে তবেই ঋণ দিতে হবে। তেমনি গ্রাহকেরও উচিত সব ধরনের তথ্য সঠিকভাবে দিয়ে তবেই ঋণ নেয়া। এর ব্যতিক্রম হলে বুঝতে হবে, দুপক্ষেরই সমস্যা রয়েছে।
জাজ মাল্টিমিডিয়ার এম এ আজিজ আর রিমেক্স ফুটওয়্যারের এম এ আজিজ একই ব্যক্তি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ। তিনি বলেন, জাজ মাল্টিমিডিয়ার চেয়ারম্যান এবং রিমেক্স ফুটওয়্যারের চেয়ারম্যান এম এ আজিজ একই ব্যক্তি। এম এ আজিজ এবং এম এ কাদির দুই ভাই। চামড়া ব্যবসা তাদের পৈতৃক ব্যবসা বলেই আমরা জানি। বাংলাদেশ ফিনিস লেদার গুডস এন্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার এসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) অফিস সেক্রেটারি মো. জয়নাল বলেন, তারা আপন দুই ভাই। তাদের পৈতৃক ব্যবসা এই চামড়া শিল্প। অস্বীকার কেন করছেন, জানি না। তিনি আরো বলেন, ব্যাংক থেকে এতগুলো টাকা কোনো প্রতিষ্ঠান নিতে হলে অবশ্যই তার সম্পর্কে যাচাইবাছাই করে নেয়া দরকার।
চলতি বছরের ৩১ জুলাই রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের চেয়ারম্যান এম এ আজিজের নামে ইস্যু করা এক চিঠিতে এম এ আজিজের ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়, হাউজ নং-৫৩৬, রোড নং-১১, বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটি, আদাবর-১১, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। জানা যায়, ক্রিসেন্ট গ্রæপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা হচ্ছে ১ হাজার ২৬ কোটি ৮৪ লাখ ৪০ হাজার ৬২৩ টাকা। যার চেয়ারম্যান হচ্ছেন এম এ আজিজ। জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, জাজ মাল্টিমিডিয়ার চেয়ারম্যান এম এ আজিজই হচ্ছেন রিমেক্স ফুটওয়্যারেরও চেয়ারম্যান। এ অভিযোগে গত
৩১ জুলাই ব্যাংকটির উপমহাব্যবস্থাপক রুহুল আমীন খান স্বাক্ষরিত এক চিঠি এম এ আজিজের কাছে পাঠানো হয়। তবে অভিযোগটি সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেন আজিজ। তিনি ভোরের কাগজকে প্রথমে ক্রিসেন্ট গ্রুপের মালিক এম এ কাদেরকে চেনেন না বলে জানান। পরবর্তীর্তে আবার বলেন, আমার ভাইয়েরটা আমি খাইও না, পড়িও না। ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আমি নই, আমার ভাই এম এ কাদের। রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের সঙ্গেও আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। জনতা ব্যাংকের চিঠির ব্যাপারে তিনি বলেন, জনতা ব্যাংক যার নামে চিঠি ইস্যু করেছে সেই এম এ আজিজ আর আমি একই ব্যক্তি নই। ব্যাংকটি যে ঠিকানা ব্যবহার করেছে তাও আমার ঠিকানা নয়। যদি তার ভাই এম এ কাদের ঋণ নিয়েও থাকে তাহলেও এর দায়ভার নিতে তিনি রাজি নন বলেও জানান আজিজ। তিনি এ বিষয়ে মামলা করবেন বলে জানালেও পরে একাধিকবার ফোন দিয়েও আর তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তার ভাই এম এ কাদের বলেছেন, এই এম এ আজিজই রিমেক্স গ্রুপের মালিক এবং তার নিজের ভাই। আজিজ জাজ মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে দাপটের সঙ্গেই চলচ্চিত্র অঙ্গনে আছেন।
এম এ আজিজ যে এম এ কাদেরের ভাই, সেটা জানিয়েছেন জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুছ ছালাম আজাদও। তিনি বলেন, রিমেক্স ফুটওয়্যারের চেয়ারম্যান এম এ আজিজকে আমরা এম এ কাদেরের ভাই বলেই জানি। এম এ আজিজ সিনেমা তৈরি করেন বলে শুনেছি।
ব্যাংকটির বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগের (এফটিডি) উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল আমীন খান ও সহকারী মহাব্যবস্থাপক আবদুর রহিম স্বাক্ষরিত চিঠিতে রিমেক্স ফুটওয়্যারের সব দায়-দেনা পুরান ঢাকার ইমামগঞ্জ থেকে লোকাল অফিসে স্থানান্তর করার বিষয়টি জানানো হয়। এম এ আজিজকে উদ্দেশ্য করে এতে লেখা হয়েছে, ‘আপনি অবগত আছেন যে, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান কার্যালয়, ঢাকার ২৪ শে জুন, ২০১৮ তারিখের পত্র (সূত্র নং-এফইপিডি(এফইএমপি/০৩/(এ)/২০১৮-৫৬৩৩) এবং জনতা ব্যাংক লিমিটেড প্রধান কার্যালয়ের ফরেন ট্রেড ডিপার্টমেন্ট-এক্সপোর্ট-এর পত্র (সূত্র নং-এফটিডি/ইমামগঞ্জ/এডি লাইসেন্স/স্থগিত/১৮, তারিখ ২৫ জুন-২০১৮) মোতাবেক জনতা ব্যাংক লিমিটেড ইমামগঞ্জ করপোরেট শাখায় পরিচালিত আপনার প্রতিষ্ঠানের দায়-দেনা জনতা ব্যাংক লিমিটেড লোকাল অফিস, ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রেও জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিসেন্ট লেদারের রপ্তানির অর্থ দেশে না এলেও জনতা ব্যাংক ভুয়া রপ্তানি বিল কিনে গ্রুপটির হাতে নগদ টাকা তুলে দিয়েছে। কিন্তু রপ্তানির কোনো অর্থ দেশে ফেরত আসছে না। এ ছাড়াও সরকারের নগদ সহায়তা তহবিল থেকে ১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা নিয়েছে। আটকে রয়েছে বিদেশে রপ্তানির ১ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত গ্রুপের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা ৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ করপোরেট শাখায় মোট ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ছয় প্রতিষ্ঠানের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা ২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান লুনা শামসুদ্দোহার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।