এই পাশবিকতার শেষ কোথায়?

আগের সংবাদ

মনে রাখবেন ‘খালি কলসি বাজে বেশি’

পরের সংবাদ

অনাগ্রহী তারুণ্য ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ

প্রকাশিত হয়েছে: সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮ , ৭:২৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮, ৭:২৩ অপরাহ্ণ

অজয় দাশগুপ্ত

কলাম লেখক

দেশের মানুষের সঙ্গে রাজনীতির যোগ কতটা? এ প্রশ্ন যৌক্তিক হলেও তোলা যাবে না। কারণ মিডিয়া আর সমাজে রাজনীতির জয়জয়কার। ব্যাপারটা খোলাসা না করলে মনে হবে স্ববিরোধী কথা বলছি। সমাজে তাদের জয়জয়কার মানে নিজেদের ঢাক নিজেরা পেটানো। আপনি টিভি খুলুন, রেডিও শুনুন, ই মিডিয়া বা কাগজে চোখ রাখুন দেখবেন ঘুরেফিরে এক মানুষ এক মুখ। হয় ওবায়দুল কাদের নয় মির্জা ফখরুল। এখন সরকারি দলের সমালোচনা করা মানে বিপদ টেনে আনা। তারা নিজেরাও ভালো জানেন তাদের সব কর্মকাণ্ড সমর্থনযোগ্য না। বরং কিছু কিছু মন্ত্রী-নেতা বা সংগঠকদের আচরণ আর খায়েশে মানুষ এখন তেতে আছে। মানুষ অনেক কিছু নিতে পারে না। নিতে চায়ও না। কিন্তু তার সামনে কোনো পথ খোলা নেই। এটা আমরা সবাই মানি শেখ হাসিনা না থাকলে রাজনীতির বারোটা বাজতে দেরি হবে না। তিনি একা শক্ত হাতে হাল ধরে দেশকে যে জায়গায় নিয়ে এসেছেন সেখান থেকে পিছপা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর হলে জনগণের অমঙ্গল ছাড়া কিছু হবে না। তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা। তার রক্তে রাজনীতি। বিগত আমলে তিনি নিজের ভূমিকা আর আপন গৌরবে দীপ্ত। কিন্তু তার সহযাত্রীরা কি আসলেই তেমন কোনো অবস্থান করে নিতে পেরেছেন?

তারপরও মিডিয়া খুললেই গুটিকয় মুখ। এভাবে সমাজকে একমুখী করে তোলার কারণে আজ দেশে রাজনীতি অবরুদ্ধ। রাস্তা মাঠ সমাজে কোথাও দেখা না মিললেও বিএনপির ছায়া কত শক্তিশালী সেটাও মিডিয়াতেই স্পষ্ট। জামায়াত এখন অদৃশ্য শক্তি। বাকি দলগুলো থেকেও নেই। আর সংসদে বিরোধী দল নামে পরিচিত জাতীয় পার্টি আসলে কি? রংপুর নির্ভর এই দলের রংঢং দেখে ক্লান্ত মানুষ এটা বোঝেন এরশাদ থাকলে বিনোদনের অভাব নেই। তিনি এমন এক চরিত্রবান যাকে তার স্ত্রীও বোঝেন না। রওশন এরশাদ ভালো বলতে পারবেন এই মানুষটি আসলে কি চান? তবে যা তিনি চান আর যা তিনি চান না তা সরিয়ে এখন তিনিও নির্ণায়ক। তার দলের সঙ্গে সমঝোতা করার দরকার পড়েছিল যে কারণে সে আপসমুখী রাজনীতি যতদিন না সরবে ততদিন তিনিও তার হাঁটুভাঙা দল রাজনীতিতে ক্রিম খেয়ে যাবে।

এই যে বিনোদনের রাজনীতি আর নেই রাজনীতির আছে রাজনীতি তা নিবে আমাদের নতুন প্রজন্মের কি কোনো আগ্রহ আছে? আজকাল দুনিয়াজুড়ে রাজনীতি এক অচলায়তন। একদিকে মানুষের অনাগ্রহ আরেক দিকে তাকে লোভী করে তোলা সামাজিক মিডিয়া ও প্রযুক্তি যে শূন্যতা তৈরি করছে তার জেরে পৃথিবী একদিন নেতৃত্বশূন্য হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কেউ কাউকে সম্মান করে না। মানা না মানাও এখন একটা খেলা। সেই অস্থিরতা উন্নত দেশকে এখন কাবু করতে না পারলেও এক সময় এ কারণে রাজনীতি হীনবল হয়ে পড়বেই। আর তখন ট্রাম্পের মতো একগুঁয়ে জেদি মানুষ এসে বসবেন গদিতে। নতুন নতুন সমস্যা আর সমস্যার বেড়াজালে মানুষ তাদের সুখের দুনিয়াকে দেখবে দুঃখের কাঁটাগাছ হিসেবে।

বাংলাদেশের বেলায় তেমন এক দুঃস্বপ্ন এখনো দেখা যাচ্ছে না বটে তবে এক সময় আমাদের দেশের অভিজ্ঞ বয়সী মানুষরা রাজনীতি থেকে বিদায় নিলে তখন কে কাকে পথ দেখাবে? ওবায়দুল কাদের আর মির্জা ফখরুলদের এখন অভিজ্ঞতার বাইরে কি দেয়ার আছে? অর্থমন্ত্রী বা রেলমন্ত্রীর কথা ভাবুন। দু-চারজন নবীন নেতা বা মন্ত্রী ছাড়া সবটাই বয়সের ভারে ক্লান্ত। বয়স তখনই সমস্যা যদি তা নতুন রক্তের স্পন্দন না বোঝে। যদি না বোঝে কি চায় নতুন প্রজন্ম? বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনে সব সময় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে চলতেন। বাংলাদেশ স্বাধীন করার ব্যাপারে ছাত্রলীগের ভূমিকা কি মুছে ফেলা যাবে? তারা ছিলেন বলেই হয়তো বঙ্গবন্ধুর কাজগুলো সহজ হয়েছিল। তখনকার সময় কত বয়স ছিল তাজউদ্দীনের? সে বয়সেই তিনি একটি নতুন দেশের সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করতে পেরেছিলেন। কারণ মানুষ যৌবনেই পারে সাহস আর শৌর্য নিয়ে ঘটনা মোকাবেলা করতে। বয়স মানুষকে তা করতে দেয় না। এই সত্য আজ আমাদের দেশে স্পষ্ট। বিগত কয়েকটি ঘটনায় আমরা কি দেখেছি? কোটা আন্দোলন আর নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থামানো গেছে না দমানো গেছে? সে অবদমিত শিখা কোথায় আবার আগুন ধরিয়ে দেবে কে জানে? কারণ তারুণ্যের মনন বুঝতে পারেনি বলেই মন্ত্রীর হাসিতে রাস্তা কেঁপে উঠেছিল। রাতের পর রাত রাস্তায় থাকা বাচ্চাদের দিকে তাকালেই বোঝা যেত তারা কি চায়? জানি না সে চোখের ভাষা সরকার ও সংশ্লিষ্টরা বুঝেছেন কিনা।

যা দেখছি তাতে এটা স্পষ্ট বাংলাদেশের রাজনীতি বিদেশের মতো একদিকে আগ্রহহীনতা হারিয়েছে। আর একদিকে যে তারুণ্য উঠে আসছে তারা কি চায় সেটা আমরাও বুঝি না। তাই তাদের মন ও মননের ভাষা বোঝার কাজ শুরু করা দরকার। আগুন চাপা দিয়ে রাখলে বর্তমান, সমাজ, উন্নয়ন বা রাষ্ট্র কিছুই নিরাপদ থাকে না। সত্তর, আশি এমনকি নব্বই দশকেও যৌবনই ছিল সামনের সারিতে। বিএনপির যুবরাজ এসে তার বারোটা বাজিয়ে দিয়ে গেলে এখন চলছে সে অপযাত্রার মিছিল।

এটা নিশ্চিত প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধে উজ্জীবিত করার কাজ হয় না। খালি কথায় তা হবে না। আর একটা বিষয় সংস্কৃতিকে চাপা দিয়ে রাখলেও মানুষ মূলত মরে বেঁচে থাকে। তাই মুক্ততার আজ কোনো বিকল্প নেই। সরকারের এত ভালো কাজ। এত সুসময় তবু কেন বন্ধন ছেঁড়া যায় না? বাংলাদেশ তো মাথা নোয়াবার দেশ না। তার রক্তে আছে দ্রোহ। তার শরীরে এখন উজ্জ্বলতা। এ দেশকে ক্রিকেটার, ফুটবলার বা সঙ্গীত তারকাদের মতো নতুনরা এসে রাজনীতির হাল না ধরলে কোন নৌকা কূলে ভিড়াব আমরা? এ প্রশ্নের উত্তর জানা আগামীর জন্য জরুরি।

দেশ একটা বড় আবেগ আর ভালোবাসার বিষয়। কিন্তু তার সঙ্গে চাই যুক্তি। চাই স্বচ্ছ আর সাবলীল নেতৃত্ব। সেটা যদি পাওয়া না যায় বাংলাদেশের এই তারুণ্য ফেসবুক, কম্পিউটার কিংবা ছোট পর্দার বাইরে আসতেই পারবে না। তাদের জীবন জয়ী করে তোলার জন্য আমাদের রাজনীতি ও সমাজ কাজ করুক এটাই প্রত্যাশা।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।