দায়ী অ্যাশের স্বামী!

আগের সংবাদ

গরুর দুধ মায়ের দুধের বিকল্প নয়

পরের সংবাদ

গর্ভাবস্থায় পুষ্টি ও ব্রেস্ট লাম্প

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৩১, ২০১৮ , ৪:২৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ৩১, ২০১৮, ৪:২৯ অপরাহ্ণ

গর্ভধারণ যে কোনো নারীর জীবনে পরম আকাক্সিক্ষত মুহূর্ত। গর্ভধারণের পর প্রথম যে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটতে পারে তা হচ্ছে গর্ভপাত। এ জন্য পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় বিভিন্ন কুসংস্কারকে দায়ী করেন, যেমন সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়া, স্বামী-স্ত্রীর সহবাস, সামান্য আঘাত পাওয়া ইত্যাদি। সাধারণভাবে এগুলো গর্ভপাতের জন্য দায়ী না। প্রতি ১০০ জন গর্ভবতী নারীর মধ্যে ১৫ জনের ক্ষেত্রে প্রথমবার গর্ভপাতের সম্ভাবনা থাকে। অনেক সময় ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে এর কারণ নির্ণয় করা যায়।
ভিটামিন ওষুধ খেতে অনেকে অনীহা প্রকাশ করে, তাদের ধারণা এতে বাচ্চা বড় হয়ে যায় এবং সিজারের সম্ভাবনা বাড়ে। এটি একটি ভুল ধারণা। ভিটামিন মায়ের শরীরের রক্তশূন্যতা দূর করে এবং হাড় ক্ষয়ের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।
অনেক মা এ সময় শারীরিক পরিশ্রম ও সহবাস করা থেকে বিরত থাকেন এবং এটা গর্ভের বাচ্চার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। কিন্তু কিছু কিছু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা (যেমন, প্লাসেন্টা প্রিভিয়া, রিপিটেড আবরসন, ওটএজ) ছাড়া মায়েরা স্বাভাবিক সব কাজই চালিয়ে যেতে পারেন। এই অবস্থায় একজন মা প্রতিদিন ৩০ মিনিট যে কোনো মধ্যম মানের ব্যায়াম (যেমন হাঁটা, সাঁতার কাটা) করতে পারেন সপ্তাহে ৩ থেকে ৭ দিন। এতে করে অতিরিক্ত ওজন হওয়া, ডায়াবেটিস এবং প্রেসারের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
পেঁপে ও আনারস পেটের জন্য উপকারী ফল এবং পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যায়। তবে যাদের গর্ভপাতের হিস্ট্রি আছে তাদের প্রথম তিন মাস অতিরিক্ত কাঁচা পেঁপে ও আনারস খাওয়া উচিত নয়। কারণ কিছু ক্ষেত্রে এগুলো জরায়ুর সংকোচন ঘটিয়ে গর্ভপাত করতে পারে। এই সময়ে আধা সিদ্ধ মাংস, আনপাস্তুরাইজড মিল্ক, হটডগ খেলেও লিস্টেরিয়া নামক জীবাণুর সংক্রমণ থেকে গর্ভপাত হতে পারে। বাড়ির পোষা বিড়াল থেকেও এই জীবাণু আসতে পারে। যাদের ঘুমের সমস্যা আছে তাদের অতিরিক্ত চা, কফি বাদ দিতে হবে এবং প্রি এক্লাপ্সিয়া বা প্রেসারের সমস্যা থাকলে খাবারে অতিরিক্ত লবণ খাওয়া উচিত হবে না।

গর্ভাবস্থায় কতটুকু ওজন বাড়া স্বাভাবিক?
এই সময়ে একজন মায়ের সাধারণত ১০-১২ কেজি পর্যন্ত ওজন বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। তবে এটা গর্ভের আগের ওজনের ওপর নির্ভর করে। যাদের ইগও ১৯ এর কম সেসব মা ১৭ কেজি পর্যন্ত বাড়তে পারেন তবে ইগও ২৫ এর বেশি হলে ৭ কেজি পর্যন্ত ওজন বাড়লেই যথেষ্ট। এর মধ্যে প্রথম তিন মাস ১ থেকে ২ কেজি এবং মাঝের ও শেষ তিন মাস ৫ কেজি করে ওজন বাড়তে পারে।

কোন খাবার কীভাবে পুষ্টি দিতে পারে?
আমাদের দেশে গর্ভবতী মাদের পুষ্টিহীনতার একটি প্রধান কারণ কুসংস্কার এবং অসচেতনতা। অনেকের ধারণা গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ভিটামিন ও পুষ্টিকর খাবার খেলে গর্ভের শিশু বড় হয়ে যাবে এবং সিজারের সম্ভাবনা বাড়ে। কিন্তু এ সময়ে মা ও বাচ্চার পুষ্টির জন্য অন্য সময়ের চেয়ে অধিক খাবারের দরকার হয়। মায়ের জন্য অতিরিক্ত যে পুষ্টিমান দরকার তাহলোÑ
ক্যালরি-৩০০ ক্যালোরি, প্রোটিন-৬০ মিগ্রাম, ক্যালসিয়াম- ১২০০ মিগ্রাম, আয়রন-৩০ মিগ্রাম।
বিভিন্ন রকম খাবার থেকে আমরা খাবারের উপাদানগুলো পেয়ে থাকি। খাবার নির্বাচনের সময় তাই সতর্ক থাকতে হবে যাতে সব রকম উপাদানই প্রয়োজনীয় মাত্রায় থাকে। দিনে ১০ গøাস পানি এবং আঁশ জাতীয় খাবার যেমনÑ লাল আটার রুটি, শাক-সবজি, কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণে সাহায্য করে। শক্তি প্রদানকারী খাবারগুলোর মধ্যে আছে আটা, গম, পাস্তা, নুডুলস, ওটস, আলু ইত্যাদি। ফলমূল ও শাক-সবজি থেকে আমরা পাই বিভিন্ন রকম ভিটামিন ও এন্টি অক্সিডেন্ট। প্রোটিনের উৎকৃষ্ট উপাদানগুলো হলো মাছ, মাংস, ডিম, বাদাম, শিম, সয়া প্রডাক্ট। প্রতিদিন এক গøাস দুধ আমাদের ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণ করতে পারে। এ ছাড়া ক্যালসিয়ামের অন্য সোর্সগুলো হচ্ছে চিজ, দই, ব্রকলি, এলমন্ড, আইসক্রিম ইত্যাদি। আয়রন জাতীয় খাবারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সবুজ শাক, লাল মাংস, বাদাম, কচু জাতীয় সবজি। প্রতিদিনের খাবারের অর্ধেকটা জুড়ে থাকা উচিত ফলমূল ও শাক-সবজি এবং ফ্যাটের পরিমাণ সমস্ত খাদ্যের ৩০% বা এর কম হতে হবে।

কোন খাবার পরিত্যাগ করা উচিত?
এ সময় আনপাস্তুরাইজ দুধ, আধা সিদ্ধ মাংস, অপরিষ্কার শাক-সবজি থেকে কিছু ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হতে পারে, যা গর্ভপাতের জন্য দায়ী। এ ছাড়া এলকোহল, অতিরিক্ত চা-কফি, কোল্ড ড্রিঙ্ক পরিহার করা উচিত। গর্ভাবস্থায় কিছু মায়েরা অখাদ্য, যেমন বরফ, মাটি, বালি, ছাই এসব খেয়ে থাকে। এই প্রবণতাকে পিকা বলে। এই প্রবণতা মা ও বাচ্চার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

ব্রেস্ট লাম্প (চাকা) মানেই ক্যান্সার নয়
ব্রেস্ট লাম্প বা ব্রেস্টে চাকা অনুভ‚ত হওয়া মেয়েদের জন্য একটি বড় শঙ্কার বিষয়। তবে ব্রেস্ট লাম্প মানেই ক্যান্সার নয়। ক্যান্সার ছাড়াও ব্রেস্টে বিভিন্ন কারণে চাকা হতে পারে।
ব্রেস্টে চাকা হওয়ার কিছু পরিচিত কারণগুলো হচ্ছে,
ফাইব্রএডিনসিস : সাধারণত ২৫-৩৫ বছর বয়েসে হয়ে থাকে। এর কারণে মাসিকের আগে বুকে চাকা চাকা এবং ব্যথা অনুভব হয়, যা মাসিক হওয়ার পর কমে যায়। মাসিকের সময় যে হরমোন নিঃসরিত হয় তার কারণে ব্রেস্টের টিস্যুতে কিছু পরিবর্তন হয়, ফলে এই ধরনের অনুভ‚তি হয়।
ফাইব্রএডিনোমা : এটি একটি বিনাইন লাম্প। ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়েসে বেশি হয়। সাধারণত হঠাৎ করে বুকে এই চাকা ধরা পড়ে যা সহজেই নড়াচড়া করে এবং ব্যথাহীন হয়ে থাকে। এ জন্য এ ধরনের চাকাকে ব্রেস্ট মাউস বলা হয়। সাইজ ছোট হলে আপনা আপনি মিলিয়ে যেতে পারে, তবে বড় হলে অপারেশন করে অপসারণ করতে হয়।
ব্রেস্ট সিস্ট : সিস্ট হচ্ছে পানিভর্তি টিউমার। এগুলো যে কোনো বয়সে হতে পারে, তবে মহিলাদের মেনপোজের আগে বেশি হয়। সিস্টগুলো মসৃণ ও গোলাকার হয়ে থাকে। এর চিকিৎসা হচ্ছে নিডেলের মাধ্যমে পানি অপসারণ করা।
ব্রেস্ট এবসেস বা ইনফেকশন : এটা স্তন্যদায়ী মায়েদের ক্ষেত্রে বেশি হয়। অনেক সময় ব্যাকটেরিয়া আঘাতপ্রাপ্ত স্থান বিশেষ করে ক্রাক নিপেল দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে পুঁজ তৈরি করে। এটি খুব ব্যথাযুক্ত হয়। চিকিৎসা হিসেবে ব্যথার ওষুধ, এন্টিবায়োটিক, গরম কমপ্রেশন দেয়া হয়। পুঁজ বা এবসেস বড় থাকলে সার্জারির মাধ্যমে ড্রেইন করে নিয়মিত ড্রেসিং করার দরকার হয়।
ফ্যাট নেক্রসিস : কোনো কারণে ব্রেস্ট আঘাতপ্রাপ্ত হলে ব্রেস্টের ফ্যাটি টিস্যু নেক্রসিস হয়ে চাকা তৈরি করে। এগুলো সাধারণত ধীরে ধীরে অপসারিত হয়, কিছু ক্ষেত্রে সার্জারি করার দরকার হয়।
লাইপোমা : এটা ফ্যাটি টিস্যুর টিউমার, যা ক্যান্সার নয়। সাইজ বড় হলে সার্জারি করা অপসারণ করা লাগে।
ব্রেস্ট ক্যান্সার : ব্রেস্টে চাকার একটি কারণ হচ্ছে ক্যান্সার। অন্যান্য চাকার সঙ্গে এর পার্থক্য হলো এটি সহজে নড়াচড়া করানো যায় না, উপরিভাগ অমসৃণ ও সাধারণত ব্যথাহীন হয়ে থাকে।

কীভাবে ব্রেস্টের চাকা বুঝতে পারব?
সেলফ এক্সামিনেশনের মাধ্যমে নিজেই নিজের স্তন্য পরীক্ষা করে দেখা যায়। প্রতি মাসে মাসিকের পর আপনি ঘরে বসেই আপনি এ পরীক্ষা করতে পারেন।

কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
যে কোনো চাকা অনুভব হলে অবশ্যই ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে এর ধরন নির্ণয় করতে হবে, বিশেষ করে চাকাটি যদি মাসিক হওয়ার পরও মিলিয়ে না যায়, আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে অথবা ব্যথা থাকে।
ব্রেস্টের চামড়ায় কোনো পরিবর্তন লক্ষ করলে যেমন, কুঁচকানো ভাব, লোমক‚পের ছিদ্র বড় হয়ে যাওয়া অথবা রংয়ের কোনো পরিবর্তন।
নিপেল ভেতরের দিকে ঢুকে গেলে অথবা এ থেকে কোনো অস্বাভাবিক ডিসচার্জ বা রস বের হলে।
কি কি পরীক্ষার দরকার হতে পারে?
চাকার কারণ নির্ণয় এর জন্য কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার হয়, যেমন আলট্রাসনোগ্রাম, এফএনএসি, বায়োপসি, ম্যামোগ্রাফি ইত্যাদি।
ক্যান্সার প্রতিরোধের কিছু উপায় : যাদের ফ্যামিলিতে ব্রেস্ট ক্যান্সারের হিস্ট্রি আছে তাদের এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। এ ছাড়া সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ, হরমোনাল পিল ৩-৫ বছরের অধিক গ্রহণ না করা এবং বাচ্চাকে সঠিকভাবে বুকের দুধ পান করালে ব্রেস্ট ক্যান্সারের প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।

পেপ টেস্ট কি এবং কেন
পেপ টেস্ট হয়?
পেপ টেস্টের মাধ্যমে জরায়ু মুখের কোষ নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এ পরীক্ষায় কোষের এমন কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা হয় যা ধীরে ধীরে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ এ পরীক্ষাটি জরায়ু ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা নির্ণয় করতে সক্ষম যখন এর সহজেই চিকিৎসা সম্ভব।

কখন এই পরীক্ষাটি করতে হবে?
কোনো ধরনের জরায়ুর সমস্যা থাকলেই কেবল এ পরীক্ষাটি করতে হবে, তা কিন্তু নয়। ২১ থেকে ৬৫ বছর পর্যন্ত প্রত্যেক মহিলাদের প্রতি তিন বছর পর পর এ পরীক্ষাটি করা উচিত। যদি পেপ টেস্টের সঙ্গে ঐচঠ-উঘঅ টেস্ট নর্মাল থাকে তবে প্রতি পাঁচ বছর পর পর এ টেস্টটি করা যাবে। গর্ভাবস্থায়ও এ পরীক্ষাটি করা যায়।

কীভাবে পরীক্ষাটি করা হয়?
এ পরীক্ষার জন্য চামচের মতো একটি যন্ত্র মাসিকের রাস্তায় দিয়ে ব্রাশ এবং কাঠির সাহায্যে জরায়ু মুখ থাকে কোষ নিয়ে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। এতে আপনি তেমন ব্যথা পাবেন না, তবে সামান্য অস্বস্তি লাগতে পারে।
ফলাফল এবনরমাল হলে কি করতে হবে?
এ পরীক্ষার ফলাফলে যদি কোষের অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণ ধরা পড়ে, তবে ভয় পাবেন না, কারণ এটি সাধারণভাবে ক্যান্সার বোঝায় না। অনেক সময় জরায়ুতে জীবাণুর সংক্রমণ বা প্রদাহ থেকেও এবনরমাল ফলাফল হতে পারে। সংগৃহীত কোষের পরিমাণ কম থাকলে এটি পুনরায় করার দরকার হয়। তবে পরীক্ষার ফলাফলে ঈওঘ বা ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা দেখা গেলে আপনাকে কল্পস্কপি এবং বায়পসি করার জন্য পাঠানো হবে। বায়পসি রেজাল্টের পর অথবা অনেক সময় কল্পস্কপি করাকালীন অবস্থাতেই চিকিৎসা করা হয়। এর বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হচ্ছে লিপ, কোল্ড কোয়াগুলেসন, কটারি, লেজার। এ চিকিৎসার পরও ডাক্তারের তত্ত¡াবধানে নিয়মিত ফলোআপ করে যেতে হবে।

এর কোনো বিকল্প টেস্ট আছে কি?
পেপ টেস্টের একটি বিকল্প হচ্ছে ঠওঅ টেস্ট, যা আরো সহজে এবং কম খরচে করা যায়। তবে সব ল্যাবরটরিতে ঠওঅ টেস্ট হয় না।
বলা যায়, জরায়ু ক্যান্সার একটি প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সার। কারণ এই টেস্টের মাধ্যমে ক্যান্সার হওয়ার আগেই তা নির্ণয় করা সম্ভব।

সবশেষে মনে রাখা উচিত, গর্ভবতী মাকে সব সময় হাসিখুশি ও দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকতে হবে। কারণ গর্ভাবস্থায় মায়ের মানসিক অবস্থা পরবর্তীকালে শিশুর বিকাশে প্রভাব ফেলে, যা গবেষণায় প্রমাণিত।

ডা. নুসরাত জাহান
সহকারী অধ্যাপক (অবস-গাইনি)
ডেলটা মেডিকেল কলেজ, মিরপুর ১, ঢাকা

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা