মা-বাবাকে লাঞ্ছনার প্রতিবাদে স্কুলছাত্রের আত্মহত্যা

আগের সংবাদ

জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করল মিয়ানমার

পরের সংবাদ

জর্ডানে গিয়ে অন্তঃসত্ত্বা নারী শ্রমিকের আর্তনাদ

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ২৯, ২০১৮ , ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ২৯, ২০১৮, ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ

‘মানুষ বিদেশ গিয়া আয় উন্নতি করে। স্যুটকিস ভইরা কত কী আনে। আর আমি! দেড় বছর বিদেশ থাইকা আমি দেশে পাঠাইছি মাত্র চার হাজার টাকা। আর পেটে কইরা নিয়া আইছি…’। কথা শেষ না করে চৌকিতে শুয়ে থাকা লাল রঙ্গা কম্বলে মোড়ানো ছয় দিন বয়সী মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁদলেন সুমি (ছদ্মনাম)।
এই শিশুর আগমনে খুশি নয় পরিবারের কেউই। হয়নি কোনো আনন্দ উৎসব। আছে বুক ভরা হাহাকার আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা। অপ্রত্যাশিত এই সন্তানের জন্য সুমির পরিবারকে সমাজ-বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। তবুও সন্তানকে নিজের কাছেই রাখতে চান তিনি। মেয়েকে নিয়েই কাটিয়ে দিতে চান বাকিটা জীবন। মেয়ের নাম রেখেছেন সাদিয়া।
মানিকগঞ্জের সিংগাইরের দরিদ্র পরিবারের বড় সন্তান সুমি। বাবা ভ্যানচালক। অভাবের সংসারে একটু সচ্ছলতা আনতে আদম ব্যবসায়ী কাশেম আলীর মাধ্যমে মাত্র ১৫ বছর বয়সে ২০১৬ সালের ২৩ অক্টোবর শ্রমিক হিসেবে জর্ডানে যান এই কিশোরী। সেই থেকে তার জীবনে যা যা ঘটেছে সেগুলো দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি কেউ। মিশুক ও উচ্ছল স্বভাবের মেয়েটি এখন হাসতে ভুলে গেছেন। কথাও বলেন না খুব একটা।
সুমির বাবা জানান, ১৫ বছরের সুমিকে ২৫ বছর বয়সী দেখিয়ে পাসপোর্ট করায় কাশেম আলী। ঋণ করে তাকে ১০ হাজার টাকা দেয়া হয়। কথা ছিল গৃহকর্মী হিসেবে তাকে কাজ দেয়া হবে। কিন্তু প্রতি পদে পদে প্রতারণার শিকার হয়েছেন সুমি। এক বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজে দেয়া হলেও সেই বাড়িতে তাকে সহ্য করতে হয়েছে বর্বর নির্যাতন। যৌন নিগ্রহ ছিলা তার নিত্যদিনের সঙ্গী। এরপর হাতবদল হয়ে সোনিয়া নামের এক বাংলাদেশি নারীর কাছে গিয়ে পড়েন সুমি। দাম্মাম শহরে সোনিয়া তাকে যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করে। সেখানে আরো ২০ জন নারীকে রাখা হয়েছে যৌন কর্মে।
সুমি বলেন, ‘যখন জানলাম সোনিয়া বাংলাদেশের মাইয়া, তখন মনে হইছিল এইবার বাঁচলাম। কিন্তু সোনিয়া আমার জীবনডারে শেষ কইরা দিছে। খারাপ কাম করতে চাই নাই দেইখা আমার দানা-পানি বন্ধ কইরা দিছে। দিন রাইত মারত। বাধ্য হইছি খারাপ কামে নামতে।’
সুমির বাবা বলেন, ‘কাশেমের কাছে মাইয়ার খোঁজ নিতাম। সে কইছে জর্ডানে যে বাড়িতে সুমিরে পাঠানো হইছে সেখান থেইক্কা সে পালাইছে। তাই সুমির দায়িত্ব আর তার নাই। মাইয়ারে পাওয়ার লেইগা সিংগাইর থানায় মামলা করি। সেই মামলাও তুইল্লা নেই বাইধ্য হইয়া।’
দেড় বছর পর সুমির পরিবার জানতে পারে জর্ডানে সিংগাইর উপজেলার চান্দহুর ইউনিয়নের চর চামটা গ্রামের নিহাজ উদ্দিনের মেয়ে সোনিয়ার কাছে আছে সুমি। সোনিয়ার সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়। সেখানে কয়েক মাস থাকার পর সুমি একবার পালিয়ে যায়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। সোনিয়া তাকে ধরে নিয়ে আসে। সোনিয়ার বাসার নিচতলায় ভাড়া থাকত ভারতীয় নাগরিক নির্মাণ শ্রমিক গরজিদ। এই গরজিদই তার সন্তানের বাবা। অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ায় আর কাজ করতে পারছিল না সুমি। তাই তাকে অনেকটা ছুড়েই ফেলে দেয় সোনিয়া। তাকে পুলিশে দেয়। দুই মাস জেল খাটার পর পাঁচমাসের অন্তঃস্বত্ত্বা হয়ে দেশে ফেরে সুমি।
সুমির মা বলেন, ‘অবিহাইত্তা মাইয়া বিদেশ থেইক্কা পেটে বাচ্চা নিয়া আইছে। লজ্জায় বাড়ির বাইর হইতাম পারি না। নানা জনে নানা কথা কয়। আমাগো সমাজের মাতবর আলেক উদ্দিন কুরবানির ঈদের আগে জানাইছে, সমাজ থেইক্কা আমাগো বাদ দেয়া হইছে। আমাগো পাশে কেউ নাই। কিন্তু যাগর লেইগা আমার মাইয়ার এই অবস্থা তাগর কোনো শাস্তি হইল না।’
সোমবার রাতে মানব পাচার আইনে সোনিয়াসহ পাঁচজনকে আসামি করে সিংগাইর থানায় মামলা করেছেন সুমি। থানার অফিসার ইনচার্জ খন্দকার ইমাম হোসেন ভোরের কাগজকে জানান, ২৮ আগস্ট রাতে ভিকটিম নিজে বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। মামলা নাম্বার ৬১।
সুমিকে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম থেকে সব ধরনের চিকিৎসা ও কাউন্সিলিং সহায়তা দেয়া হয়। লেদারগুডস এন্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফেকচারস এন্ড এক্সপোর্টস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে এক লাখ টাকার অনুদান।