'লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক' ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত ময়দান

আগের সংবাদ

মোহাম্মদপুরে ট্রাক চাপায় রাইড সার্ভিস পাঠাওয়ের চালক নিহত

পরের সংবাদ

সৌদি আরবে নির্যাতিত নারী শ্রমিক

বাঁচার আর্তিতে দৈনিক ফোন করেন ৬-৭ জন

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ২০, ২০১৮ , ১২:২৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ২০, ২০১৮, ১২:২৮ অপরাহ্ণ

‘বাঁচান ভাই; আমারে বাঁচান। ছেলে এক রাত্তিরে আসে। বাবা আরেক রাত্তিরে আসে। আমার জানডা বাইর হইয়া যাইতেছে। কী যে যন্ত্রণা আমার ওই জায়গায় (যোনি পথে)। ওই জায়গায় আলু (মাংস পিন্ড) বাইর হই গেছে। আমি থাকতে পারতেছি না ভাই। আমারে বাঁচান ভাই। আমারে বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করেন ভাই। আমি মইরা গেলাম ভাই।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলেই মোবাইলে ওই প্রান্তে থাকা সৌদি আরবে এক নারী শ্রমিক ডুুকরে কেঁদে ওঠেন। এ প্রান্তে থাকা পুরুষ কণ্ঠ জানতে চান তিনি কবে সৌদি আরব গিয়েছেন? নারী কণ্ঠে তখনো কান্নার শব্দ। ঢোক গিলে বললেন, ‘চার মাস হইছে ভাই। এই কয় মাসেই আমার জানডা বাইর হইয়া গেছে ভাই।’
পুরুষ কণ্ঠ জানতে চান তিনি এখন সৌদি আরবের কোথায় আছেন? বের হওয়ার সুযোগ আছে কিনা? নারী কণ্ঠ বলেন, ‘সৌদি আরবের আলবাহায় আছি। বাইর হওয়ার সুযোগ নেই। গেটে তিন চারটা তালা দেয়া। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলি। কিন্তু নেয় না। খালি একটা বড়ি দেয়। আর কোনো কিছু করে না। নিলে আমি দেহাবনি এসব যদি কই দিই; তাই ডাক্তারের কাছে নেয় না। আমারে বাঁচান। আমার জানডা বাইর হই গেল। বাংলাদেশে গিয়ে আমি কাজ করি খাব। আমারে বাঁচান। রক্ত পরতেছে দুই ঠ্যাং বেয়ে বেয়ে। বাঁচান ভাই।’
ফোনে নারী কণ্ঠটি খুলনার রেহানা আক্তারের (ছদ্মনাম)। পুরুষ কণ্ঠটি বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য কর্মকর্তার। জানা যায়, রিক্রুট এজেন্সি আল মিনার ওভারসিজ আর এল-১২৩৫-এর মাধ্যমে চলতি বছর ৩ এপ্রিল ভাগ্য বদলের আশায় সৌদি আরব যান রেহানা। এরপর থেকেই তার জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার।

সৌদি আরবের দুর্বিষহ জীবন থেকে বাঁচার আর্তি জানিয়ে রেহানার মতো প্রতিদিনই ফোন করছেন নির্যাতিত নারী শ্রমিকরা। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক গড়ে ছয় থেকে সাত জন নির্যাতিত নারী ফোনে দেশে ফিরে আসার আর্তি জানান।
জানা যায়, নারী শ্রমিকদের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেয়ে প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে ব্র্যাক। তাদের অনেককেই বিভিন্ন সময়ে দেশে পাঠানো হয়েছে। সৌদিতে সেফ হোমে আরো অনেকে দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন। ফিরে আসা নির্যাতিত নারী শ্রমিকদের সব রকম সহায়তা করছে সংস্থাটি। পরে তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত শুনে অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে থাকে।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, অসংখ্য নারী শ্রমিক যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়ে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন ১০৫ জন নারী। এখনো ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন ৪৩ জন।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসানের মতে, নির্যাতনের শিকার প্রতিটি নারীর পূর্ণাঙ্গ বয়ান নেয়া উচিত। সে কার মাধ্যমে কীভাবে গিয়েছে, কোথায় ছিল, তার সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছে এর প্রতিটি ঘটনা সেই বয়ানে থাকবে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সৌদি আরবের কাছে জবাব চাওয়া হোক কেন তারা আমাদের দেশের নারীর সঙ্গে এমন আচরণ করেছে।
বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক এসোসিয়েশনের (বমসা) পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, সৌদি ও মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা নতুন নয়। নির্যাতিত নারীদের বাঁচার আর্তি কর্তৃপক্ষের কানে পৌঁছায় না বলেই এখনো সেইসব দেশে আমাদের দেশের মেয়েরা যাচ্ছে। নির্যাতিত হচ্ছে। সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, অভাবের তাড়নায় দেশ-পরিবার ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমানো নারীরা রেমিট্যান্স মেশিন বা পরিসংখ্যান শুধু নয়।