দুদকের মামলায় গতি আনতে হবে

আগের সংবাদ

গুজব ও রাজনীতি

পরের সংবাদ

সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা সময়ের দাবি

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১০, ২০১৮ , ৮:৩১ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ১০, ২০১৮, ৮:৩১ অপরাহ্ণ

অলোক আচার্য্য

সাংবাদকর্মী ও লেখক

সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নামে এক ধরনের ভর্তি পরীক্ষার কথা অনেকদিন ধরেই দেশে আলোচিত হচ্ছে। দেশের বড় বড় শিক্ষাবিদ এই পদ্ধতির প্রয়োগ নিয়ে আশা প্রকাশ করেছেন। অনেকেই চাইছেন এর বাস্তবায়ন হোক কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আমরা কেবল ভর্তি পরীক্ষার্থীদের ঝামেলা লাঘব করতে চাই। তাদের শারীরিক ও মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দিতে হবে। বর্তমানে শুধু মেডিকেল কলেজগুলোতে এই পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষা প্রচলিত আছে। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা যদি সমন্বিতভাবে নেয়া সম্ভব হয় তাহলে বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে এই পদ্ধতির প্রয়োগ সম্ভব হবে না কেন।

প্রতি বছর এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয় শিক্ষার্থীরা। জীবনযুদ্ধ থেকে কোনো অংশে কম না এই ভর্তিযুদ্ধ। প্রতি বছর যে হারে পাসকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন সংখ্যা তার থেকে কম। তারপর আবার রয়েছে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়, পছন্দের বিষয় নির্বাচন। সব মিলিয়ে বিশাল চাপ। এবার অবশ্য পাসের হার কম হওয়াতে একটু চাপ কমতে পারে। তবে কোচিং সেন্টারগুলোর জন্য ছাত্রের চাপ আগের থেকেও বেশি। প্রচুর লেকচার শিট, গাদা গাদা কাজ এ সবের মাধ্যমে ব্যস্ত রেখে বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রস্তুত করা হয়। উচ্চ শিক্ষার জন্য তাই তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয় তাদের। এই তীব্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তারা নিজেদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায়। কিন্তু তারা এই তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনার মুখোমুখি হয়। এইচএসসি পাসের পরই তারা পছন্দের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে প্রথমেই মোটা টাকা দিয়ে কোচিংয়ে ভর্তি হয়। তারপর মাস দুয়েক ভর্তি কোচিং শেষ করে ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়। এই সময়ে যাদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল তারা এই কোচিং করার সুযোগ পায় না। প্রচলিত ধারণা এটাই যে কোচিং ছাড়া কেউ বিশ^বিদ্যালয়ে সুযোগ পায় না। অবশ্য প্রচলিত ধারণাই আজ ধ্রুব সত্যি। অভিভাবকদের মধ্যে তাই নামিদামি কোচিংয়ে সন্তানকে ভর্তি করাতে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শেষে কোন কোচিং থেকে কতজন ভর্তি হতে পেরেছে তা নিয়ে রীতিমতো হুলস্থুল কাণ্ড করে বসে। প্রশ্ন ফাঁস নামক যে ব্যাধি শিক্ষার অন্দরমহলে ঢুকে গেছে তার মূল অভিযোগ কিন্তু এ সব কিছু অর্থলোভী নামিদামি কোচিংয়ের বিরুদ্ধে।

গত বছরে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার দাবি জোরালো হয়েছিল। কারণ ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়ার সময় যানজটে আটকা পড়ে অনেক ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ভেঙেছিল। গত বছর রাজশাহী প্রথম বর্ষে স্নাতক ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে আসা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অনেক শিক্ষার্থী যানজটে আটকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। যানজটের কারণে দেশের আর্থিক ক্ষতি হয়, সময়ের অপচয় হয়। যারা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক হয়ে রাজশাহীতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে এমন হাজার হাজার ভর্তি ইচ্ছুক পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। যারা অংশ নিতে পারেনি তাদের কেউ কেউ ভর্তি পরীক্ষায় টিকেও যেতে পারত। যদি নাও টিকত তাদের মনে পরীক্ষায় অংশ নেয়ার যে ইচ্ছা ছিল তা পূরণ হতো। কারণ ঢাকায় পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর যারা টিকতে পারে না তাদের ইচ্ছা থাকে দেশের অন্যতম স্বনামধন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার। আজ যারা পরীক্ষা দিতে পারেনি তাদের জন্য কারো তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু কি তীব্র যন্ত্রণায় তাদের পরীক্ষার সময়টা রাস্তায় কেটেছে তা বুঝতে বাকি থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, পরীক্ষায় উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৯০ ভাগ। এই হার আরো বাড়তে পারত যদি ওই যানজটে আটকে পড়া শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হতে পারত। তারা উপস্থিত হতে পারেনি এটা অবশ্যই তাদের ব্যর্থতা। এই অনুপস্থিতির দায় বর্তায় ছাত্রছাত্রীর ওপর। কিন্তু যদি তারা পরীক্ষায় অংশ নেয়ার বদলে ঘুমিয়ে থাকতো বা অন্য কোনো কারণে পরীক্ষা কেন্দ্রে আসতে না পারত তাহলে কিছু বলার ছিল না। তারা পরীক্ষা দিতে পারেনি রাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বহমান একটি সমস্যার জন্য। নিজের জন্য নয়। এ সব ঘটনার পরে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা একটি পদ্ধতি কার্যকরের জোর দাবি ওঠে। ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য একজন ছাত্রকে দেশের আনাচে-কানাচে ছোটাছুটি করতে হয়। পথে এ দেশে কত ধরনের বিপদ অপেক্ষা করে। মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টিসহ নানা রকম পার্টি। যানজটের কথা বাদই দিলাম। দেশের দূরপ্রান্তে আত্মীয় না থাকলে সেখানেও একটা ঝামেলা থাকে। এতসব ঝামেলা থেকে মুক্তি দেয়ার উদ্দেশেই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার কথা বলা হচ্ছিল। মেডিকেল কলেজের পরীক্ষা সমন্বিত পদ্ধতিতেই অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ ছুটে ছুটে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে পরীক্ষা দেয়ার দরকার হয় না।

সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নামে এক ধরনের ভর্তি পরীক্ষার কথা অনেকদিন ধরেই দেশে আলোচিত হচ্ছে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য এবং অভিভাবকের জন্যও মঙ্গলজনক এই পদ্ধতির বাস্তবায়ন করা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছে। এই পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। দেশের বড় বড় শিক্ষাবিদ এই পদ্ধতির প্রয়োগ নিয়ে আশা প্রকাশ করেছেন। অনেকেই চাইছেন এর বাস্তবায়ন হোক কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না তা কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে। যে কোনো পদ্ধতি প্রয়োগে সমস্যা আসতে পারে তবে তা সমাধান করতে আলোচনা করতে হবে। আমরা কেবল ভর্তি পরীক্ষার্থীদের ঝামেলা লাঘব করতে চাই। তাদের শারীরিক ও মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দিতে হবে। বর্তমানে শুধু মেডিকেল কলেজগুলোতে এই পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষা প্রচলিত আছে। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা যদি সমন্বিতভাবে নেয়া সম্ভব হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই পদ্ধতির প্রয়োগ সম্ভব হবে না কেন। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় মূলত একই প্রশ্নপত্রে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা নেয়া হয়ে থাকে। শাবিপ্রবি ও যবিপ্রবি যদি এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয় তাহলে কোনো পরীক্ষার্থী সিলেট বা যশোর যে কোনো এক স্থান থেকেই অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা দিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে মেধা তালিকার আবেদন বিশ্ববিদ্যালয় অনুযায়ী করা হবে। এই কল্যাণকর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে এত বিলম্ব হবে কেন। যদিও কয়েক বছর ধরেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চেষ্টা করছে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিতে। অনেক আগে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধীনে কুয়েট, চুয়েট, রুয়েট একযোগে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা আমাদের অত্যন্ত প্রয়োজন। এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক মত থাকলেও আমাদের বিরাট এই কর্মযজ্ঞ যে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে আয়োজন করা হয় তাদের স্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে। যানজট যদি নাও সমস্যা করে তাহলেও দীর্ঘ পথের ক্লান্তি থেকে তাদের মুক্তি দেয়া প্রয়োজন। অপরিচিত স্থান, আবাসন অনিশ্চয়তা, যাত্রার যানবাহন সমস্যা ইত্যাদি থেকে মুক্তি দিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা এখন কেবল অপেক্ষা মাত্র।

অলোক আচার্য্য : সাংবাদকর্মী ও লেখক।