আসিফের ‘দিল দিওয়ানা’

আগের সংবাদ

টাইগারদের নৈপুণ্যে মুগ্ধ কোচ

পরের সংবাদ

আর্থিক খাতে নানা কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতি

দুদকের মামলায় কচ্ছপগতি

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১০, ২০১৮ , ৩:২৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ১০, ২০১৮, ৩:৩০ অপরাহ্ণ

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনে যে কোনো মামলা দায়েরের পরবর্তী ৬ মাসের (১৮০) মধ্যে তদন্ত শেষ করার বিধান রয়েছে। আর বিচার শুরু হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করার কথা। কিন্তু দুদকের মামলায় বেশির ভাগই দেখা গেছে, মামলা দায়েরের পর দুই/আড়াই বছর লেগে গেছে তদন্ত শেষ করতে। একইভাবে বিচার শুরু হওয়ার পরও বছরের পর বছর অতিবাহিত হলেও শেষ হচ্ছে না বিচারকাজ। আর্থিক খাতের আলোচিত দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ঘটনায় দায়ের করা ডেসটিনি, হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রæপের মতো চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর ক্ষেত্রে একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। অথচ ৬০ দিনে মামলা নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্বারোপ করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের একটি সার্কুলারও জারি আছে।

জানা যায়, ডেসটিনি, হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার আইনে বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে শেষ হচ্ছে না। মামলার প্রতিটি ধাপ চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার যুক্তি দেখিয়ে আসামিপক্ষের সময়ক্ষেপণ এবং বিচারক সংকট ও মামলার চাপসহ নানা কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

মামলার অভিযোগ আমলে নেয়া, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়ে সময়ক্ষেপণ করায় দুর্নীতির বিচারে গতি নেই বলে দাবি দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খানের। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, আদালতকে কঠোর হতে হবে। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ না থাকলে সময় চেয়ে আবেদন জানালে বিচারিক আদালত থেকে নামঞ্জুর করা উচিত।

দুদকের তফসিলভুক্ত মামলাগুলো দ্রæত বিচারের লক্ষ্যে ১৯৫৮ সালের ‘দ্য ক্রিমিনাল ল’ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী বিশেষ জজ আদালত স্থাপন করে সরকার। বর্তমানে রাজধানীতে ১২টিসহ সারাদেশে ৩৫টি বিশেষ জজ আদালত রয়েছে। দুদকের মামলার বিচারের এখতিয়ার সম্পন্ন এসব বিশেষ জজ আদালত থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দুদকের মামলা বিচারাধীন ৩ হাজার ৪১২টি। আর এসব আদালতে মামলা বিচারাধীন আছে দেড় লাখের বেশি। দুদকের মামলার তুলনায় অন্যান্য মামলার সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় দুর্নীতির বিচার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এসব বিষয় লক্ষ্য করে ২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সুপ্রিমকোর্টে চিঠি পাঠায় দুদক। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ১৯৫৮ সালের দ্য ক্রিমিনাল ল’ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্টের ৩ ধারা বিধান মতে বিশেষ জজ আদালত গঠিত হয়। একই আইনের ৬ (ক) ধারা অনুযায়ী দুর্নীতি মামলা আমলে নিয়ে বিচার শুরুর ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করার কথা। কিন্তু ২০০৩ সালের বিশেষ আদালত (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আইন হওয়ার পর অন্য দেওয়ানি-ফৌজদারি মামলাও বিশেষ আদালতে বিচারের জন্য আসছে। ফলে দুর্নীতি মামলার বিচারে বিচারকরা যথেষ্ট মনোযোগ ও সময় দিতে পারছেন না। আবার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে মামলাগুলো বিশেষ জজ আদালতে পাঠানো হচ্ছে না। ফলে বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতগুলোয় অনেক সময় দুর্নীতি মামলার স্বল্পতা দেখা দেয়। এ অবস্থায় দ্য ক্রিমিনাল ল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৮ অনুযায়ী ৬ (ক) ধারায় প্রদত্ত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ জজদের প্রতি তাগিদ দেয়ার অনুরোধ জানানো হয় দুদকের ওই চিঠিতে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকে ২০১৬ সালের ৯ নভেম্বর একটি সার্কুলার জারি করে দুদকের মামলার বিচারের ক্ষেত্রে ৬০ দিনের বিধান পালনের নির্দেশ দেয়া হয়। দুদকের মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এবং আইনে ধার্যকৃত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়া হয়। সার্কুলারে আরো বলা হয়, সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে- অধিকাংশ জেলার দায়রা ও মহানগর দায়রা জজ দুর্নীতির সব মামলা বিচারের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় বিশেষ জজ ও বিশেষ জজ আদালতে পাঠাচ্ছেন না। কিছু মামলা নিজ আদালতেই রেখে দিচ্ছেন। কিছু

ক্ষেত্রে অধীনস্থ অতিরিক্ত দায়রা জজ ও যুগ্ম দায়রা জজ আদালতে পাঠাচ্ছেন। ফলে বিভাগীয় বিশেষ জজ ও বিশেষ জজ আদালতগুলোয় দুর্নীতি মামলার স্বল্পতা দেখা দিচ্ছে। এতে বিভাগীয় বিশেষ জজ ও বিশেষ জজ আদালতগুলোয় দুর্নীতির মামলা আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এ অবস্থায় সব জেলা ও দায়রা জজ এবং মহানগর দায়রা জজকে দুর্নীতির মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিভাগীয় বিশেষ জজ ও বিশেষ জজ আদালতে পাঠানোরও নির্দেশ দেয়া হয়।

ডেসটিনির দুই মামলা : দেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে অন্যতম কেলেঙ্কারির নাম ডেসটিনি কেলেঙ্কারি। ব্যবসায়ের নাম ভাঙিয়ে প্রতারণামূলক এমএলএম পদ্ধতিতে ডেসটিনি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এ ঘটনায় ২০১২ সালে দুটি মামলা করে দুদক। এ দুই মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান ডেসটিনি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট লে. জেনারেল (অব) হারুন-অর-রশিদ এবং ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীনসহ প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ ৪৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ৪ মে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। দুই মামলায় সাক্ষী করা হয় ১৫০ জনকে। হাইকোর্টের নির্দেশে ২০১৬ সালে মামলা দুটিতে অভিযোগ গঠিত হয়। বর্তমানে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৫-এ মামলা দুটি বিচারাধীন।

জানা গেছে, ডেসটিনির দুই মামলার মধ্যে একটি মামলায় ১৫০ সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র দুইজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আরেকটি মামলায় মাত্র তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। এ অবস্থায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট এ মামলার এক আসামির জামিন শুনানিকালে মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্বের বিষয়টি লক্ষ করে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। আদালত বলেন, এই মামলার এক সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করতে দুই বছর সময় লেগেছে। অন্যান্য সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করে দশ বছরেও বিচার শেষ হবে কিনা, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান।

হলমার্ক গ্রুপের ১২ মামলা : দেশের ব্যাংকিং খাতে আর্থিক কেলেঙ্কারির আরেকটি নজির হলমার্ক গ্রুপ। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখাসহ কয়েকটি শাখার মাধ্যমে আড়াই হাজার কোটি টাকার হাতিয়ে নেয় এই বিজনেস গ্রæপ। সে কেলেঙ্কারিতে ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ূন কবিরসহ ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ২০১২ সালে ৩৮টি মামলা করে দুদক। তদন্ত শেষে ২০১৪ সালে ১১টি মামলায় অভিযোগপত্র দেয়া হয়। এসব মামলায়ও ২০১৬ সালের মার্চ ও ফেব্রুয়ারিতে চার্জ গঠন হয়। এরপর ১১টি মামলায় ২৮২ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। অথচ মামলাগুলোয় চার্জশিটে মোট ৮৫৩ সাক্ষী রয়েছেন। এসব মামলায় হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, এমডি তানভীর মাহমুদ ও জিএম তুষার আহমেদ এখন কারাগারে। তবে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ব্যাংকটির অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই।

বিসমিল্লাহ গ্রুপের১৩ মামলা : ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে আরেকটি কেলেঙ্কারির নাম বিসমিল্লাহ গ্রুপ। ২০১৩ সালে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিসমিল্লাহ গ্রæপ। তারা এই টাকা তুলে নেয় ৫টি ব্যাংক থেকে। গ্রুপের এমডি খাজা সোলায়মান চৌধুরী ও তার স্ত্রী এবং গ্রুপের চেয়ারম্যান নওরিন হাবিব এ অর্থ আত্মসাতে জড়িত। তারাও পালিয়েছেন দেশ ছেড়ে। এ ঘটনায় বিসমিল্লাহ গ্রুপের ১৩ জন ও ৫টি ব্যাংকের ৪১ জন ব্যাংকারকে আসামি করে ১২টি মামলা করে দুদক। তদন্ত শেষে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। এর মধ্যে ১০টি মামলায় অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ চলছে। বাকি তিনটি মামলায় পুনরায় অধিকতর তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানো হয়েছে। যে ১০টি মামলায় বিচারকাজ চলছে, সে মামলাগুলোয় প্রাথমিক পর্যায়ে সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ চলমান রয়েছে।