সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা সময়ের দাবি

আগের সংবাদ

রাজনীতিই হওয়া উচিত মূল চালিকাশক্তি

পরের সংবাদ

গুজব ও রাজনীতি

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১০, ২০১৮ , ৮:৩৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ১০, ২০১৮, ৮:৩৫ অপরাহ্ণ

কোনো সংঘটিত ঘটনার সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে নাকি সব সংবাদ সরকার সেন্সরড করেন। এ সব কারণে সারা দেশের কয়েক হাজার গণমাধ্যমের পরিবেশিত সংবাদের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে। এখন গণমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশন নিয়ে প্রচারিত সেন্সরডটি সত্য না গুজব তা স্পষ্ট করা দরকার। ফেসবুক নামক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দেশে বেশ কয়েকটি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। সরকারকে এই বিষয়টি নিয়ে জনগণের কাছে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন।

গুজব বিষয়টি রাজনীতির একটি অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতি করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর বৈতরণী পার হওয়ার জন্য রাজনীতিবিদরা গুজবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। তবে এ গুজবেই আবার রাজনীতিবিদদের জন্য নিউটনের তৃতীয় সূত্র হয়ে দাঁড়ায়। ফলে উল্টো আঘাত করে তাদের ওপরেই। সবাই বলে থাকেন স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাই নাকি গুজব তৈরির কারখানা। স্বৈরশাসনামলে সরকারের পক্ষ থেকে ও স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটানোকারীদের উভয়ের পক্ষ থেকেই নাকি গুজব রটানো হয়ে থাকে। এটা অনেকটা ঠিক। পূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গুজব কখনোই কার্যকারিতা পায় না। হিটলারের তথ্য মন্ত্রী গোয়েবলস একটি মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করার জন্য বারবার মিথ্যাটিকে সত্য হিসেবে পরিবেশন করতেন। তাতে মিথ্যাটাও সত্যে রূপ লাভ করত। গুজব কিন্তু গোয়েবলসীয় থিওরির চেয়েও ভয়ঙ্কর একটি বিষয়। যা আদৌ ঘটেনি বা ঘটার সম্ভাবনাও নেই এমন বিষয় রটানোটাই হলো গুজব। হিটলারের পরবরর্তী সময়েও নানা কায়দায় মিথ্যাকে সত্য আর সেই সঙ্গে গুজব রটিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার এবং নিজেদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য কাজ করেছে শাসক গোষ্ঠী। তাই গুজব এখনো প্রচলিত। যে কোনো গুজবেই রাজনীতিতে স্থায়িত্ব পায় না ঠিকই তবে গুজব সমাজ আর রাজনৈতিক অঙ্গনকে কলুষিত করে যায়। কোনো গুজব ছড়িয়ে পড়লে এর মাধ্যমে রাজনীতিবিদরা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার মতো করে স্বার্থ হাসিল করার চেষ্টায় লিপ্ত হন। তাই অনেক সময় দেখা যায় গুজব রটনাকারীকে রাজনীতিবিদরাই তৈরি করে থাকেন। তবে গুজবে স্বার্থ হাসিল রাজনৈতিক মহলের হয় আর এ কারণে সীমাহীন কষ্ট পোহাতে হয় সাধারণ মানুষের যারা গুজবের তুরুপের তাস হয়। রামু থেকে রংপুরসহ নানা স্থানে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবের মূলে ছিল গুজব। উল্লিখিত ঘটনাগুলো যে গুজব তা যখন অনুধাবিত হয় তার আগেই চলে গিয়েছিল বেশ কিছু নিষ্পাপ প্রাণ এবং হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ। জামায়াতিরা সাঈদীকে চাঁদে দেখা গিয়েছে এই বলে সারা দেশে গুজব রটিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে চেয়েছিল। তৎক্ষণাৎভাবে অলীক ও অসম্ভব বিষয়টিকে জামায়াতীরা সত্য বানানোর গুজব রটিয়ে সারা দেশে মহাতাণ্ডব চালায়। পুলিশ সদস্যসহ সারা দেশে বহু সাধারণ মানুষ ওই সময়কার জামায়াতের তাণ্ডবে প্রাণ হারায়। গুজবটি যখন মানুষ বুঝতে পারে তখন কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যায়। জামায়াতীরা এই গুজব ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে পারেনি বরং তা উল্টো হয়ে দাঁড়ায়, নিজেদের ছোড়া তীরফলক নিজেদের বক্ষে প্রোথিত হয়। এই তাণ্ডবের পর জামায়াত জনসম্পৃক্ততা হারায়। বর্তমানে দেশের মানুষ আর জামায়াতীদের বিশ্বাস করে না।

তবে এত সব কিছুর পরেও গুজব রটানো হচ্ছে গুজব রটছে। আর সাধারণ মানুষ যাচাই-বাছাই না করেই এই গুজবে কান দিচ্ছে বা দেয়ানোর চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি কিশোরদের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনকে ঘিরে নানা ধরনের তথ্যের ভিডিও চিত্র প্রকাশ পায়। প্রকাশিত তথ্য এবং ভিডিও চিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বাইরে এই আন্দোলনের প্রকাশিত সব তথ্যই ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক নির্ভর। ফেইস বুকের ওপর মানুষের নির্ভরতাও বাড়ছে। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া বিষয়গুলোর কোনটা সত্য আর কোনটা গুজব তা নির্ধারণ করাটাও কষ্টসাধ্য বিষয়। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে যারা অংশ নিয়েছে তারা সবাই কিশোর। কিশোরদের এই আন্দোলনের জন্য আগে বা আন্দোলন চলাকালীন কোনো প্লাটফরম তৈরি হয়নি। সমগ্র আন্দোলনটা পরিচালনা করার জন্য কোনো নেতা বা সংগঠককে মুখ্য দায়িত্বে দেখা যায়নি। তাই পুরো আন্দোলনটা ছিল সুশৃঙ্খলভাবে সংগঠিত কিন্তু সংগঠনহীন ও অরাজনৈতিক। কিশোরদের এই আন্দোলনে প্রথমত গুজব রটানোর পথ সৃষ্টি করে পরিবহন সেক্টর। আন্দোলন চলাকালীন পরিবহন মালিকরা সারা দেশে অঘোষিত হরতাল আহ্বান করে। যানবাহনের নিরাপত্তার অজুহাতে পরিবহন মালিকরা যান চলাচল সারা দেশে বন্ধ রাখে। যে কিশোররা এই আন্দোলনের মূল এক্টিভিস্ট হিসেবে কাজ করেছে তাদের মধ্যে কোনো প্রকার সহিংসতার লক্ষণ ছিল না। তবে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনে কিছু ঘটতে পারে এটাই ছিল পরিবহনের মালিকদের আশঙ্কা আর এই আশঙ্কাকে ঘিরেই বহুমুখী গুজবের উৎপত্তি দানা বাঁধতে থাকে। অপরদিকে এই আন্দোলনের ব্যাপকতা ঘটায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। প্রচারের কাজে ফেসবুকের ভূমিকাটাকে ঘিরে সৃষ্টি হয় নানা গুজবের। যেসব ঘটনার চিত্র ভিডিও হিসেবে ধারণ করে ভাইরাল করা হয় তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে সেই সঙ্গে ফেসবুকে প্রকাশিত স্থির চিত্রগুলো নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। তবে কোনো কোনো বিষয়গুলো সরকারের বিপক্ষে গেছে তা নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। কিন্তু বাস্তবে কোনো বিষয়ই সরকারের রাজনৈতিকভাবে বিপক্ষে যাওয়ার কথা না বা যায়নি। নৌপরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিটি সমগ্র সরকারের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেললেও আন্দোলনরত কিশোররা সরকারের পদত্যাগ কিন্তু চায়নি। গণতান্ত্রিক পরিবেশে সাধারণ মানুষ একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ চাইতে পারে। পদত্যাগ চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিকভাবে জল ঘোলা করার উদ্দেশ্যটাও দুধরনের, কেউ সমগ্র সরকারকে দোষারোপ করে নৌমন্ত্রীকে রক্ষা করছেন আবার কেউ সরলভাবে শুধু কাণ্ডজ্ঞানহীন মন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছেন। এ দুধরনের সত্য রয়েছে আন্দোলনের একটি অংশে। তাই আন্দোলন কার্যক্রমের সব তথ্য উপস্থাপনে ভিন্নতা দেখা যায়। ভাইরাল বিষয়গুলো সত্য না গুজব এ বিষয় নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠবে? বাংলাদেশে বর্তমানে ৫০টির মতো ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যম রয়েছে। যারা বেসরকারি টিভি চ্যানেল হিসেবে পরিচিত। উল্লেখিত চ্যানেলগুলো সচিত্র এবং লাইভ আন্দোলনের সংবাদ পরিবেশন করেছে। এই অর্ধ শত সচিত্র সংবাদ পরিবেশনকারী সংস্থা থাকার পরও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিবেশিত তথ্যগুলো জনমনে বিশ্বাস অর্জন করে কি করে। তাহলে ধরে নিতে হবে জনগণ এই অর্ধশত টিভি চ্যানেলের পরিবেশিত সংবাদ বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাই জনগণ ফেসবুকের সংবাদকে বিশ্বাস করছেন। বর্তমানে একটি কথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে, তা হলো সরকার সব গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছেন। কোনো সংঘটিত ঘটনার সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে নাকি সব সংবাদ সরকার সেন্সরড করেন। এ সব কারণে সারা দেশের কয়েক হাজার গণমাধ্যমের পরিবেশিত সংবাদের প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে। এখন গণমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশন নিয়ে প্রচারিত সেন্সরডটি সত্য না গুজব তা স্পষ্ট করা দরকার। ফেসবুক নামক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দেশে বেশ কয়েকটি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। সরকারকে এই বিষয়টি নিয়ে জনগণের কাছে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন। তথ্য পরিবেশনের এই আজব পদ্ধতি দেশের রাজনীতিকে ভয়ঙ্কর বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল কিশোরদের এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন। সমর্থন জানানোটা যথার্থ তবে এই প্রসঙ্গে সরকারের পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলনটির ফল নিজেদের কোর্টে নেয়ার প্রচেষ্টাটা যথার্থ নয়। রাজনৈতিক গোষ্ঠী কিশোর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রচারিত সংবাদগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক ইস্যু সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। এই কারণে আন্দোলনের পরিবেশিত সংবাদগুলোর তথ্য বিভ্রাটে পরিণত হয়।

দেশের রাজনীতিকরা গুজবের মতো বিষয়গুলোকে হাতিয়ার করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেন বার বার। কিশোররা সড়কে এই অনিয়মগুলো জনগণের সম্মুখে আনতে পারলে সড়কের এই অনিয়মগুলো রাজনীতিবিদদের কি জানা ছিল না। তারা কেন রাজনৈতিক কার্যক্রমে এই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেননি। রাজনীতিবিদদের রাজনীতি কি জনকল্যাণ আনা না নিজেদের ক্ষমতায় বসানোর একটা প্রচেষ্টা। এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে কোটা সংস্কার এবং নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের মাধ্যমে। এই দুটি আন্দোলন চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে যে দেশের সমস্যাগুলোর সমাধানের চেয়ে রাজনীতিকরা নিজেদের ক্ষমতাটাই বেশি চেনেন। দেশের সরকার দলীয়, বিরোধী রাজনীতিকসহ অন্য সুশীলরা কিশোরদের ইস্যুগুলোকে অরাজনৈতিকভাবে দেখেননি। সবাই আন্দোলনের ইস্যুকে কেন্দ্র করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছেন। তাই সুশৃঙ্খল আন্দোলনকে ঘিরে রটেছে গুজব। রাজনীতিবিদদের এটা বোঝা উচিত গুজবের মাধ্যমে স্ট্যান্ডবাজি রাজনীতি হয়। গুজব ছড়িয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনের নির্মলতা আনা যায় না। দেশে এ ধরনের রাজনীতির কারণে গণতন্ত্র স্থায়িত্বশীলতা পায় না।

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন : কলাম লেখক।