ক্ষুব্ধ মমতা

আগের সংবাদ

নওগাঁয় ট্রাকের ধাক্কায় ভ্যানচালকের মৃত্যু

পরের সংবাদ

দিয়াকে ছবির মধ্যে খুঁজছে পরিবার

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ৩১, ২০১৮ , ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ৩১, ২০১৮, ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ

ইমরান রহমান

ইমরান রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা থেকে

প্রতিদিন দুপুর ১টায় কলেজ থেকে বাসায় ফিরত দিয়া। বাসায় এসে নিজ রুমে একটু বিশ্রাম নিত। কিন্তু গতকাল দুপুরে আর ফেরেনি। তবে, দুপুরের দিকে তার মতোই কলেজ ড্রেস পড়–য়া ৮-১০ জন শিক্ষার্থী তার বাসায় আসে। অশ্রæসিক্ত চোখে তারা দিয়ার রুমে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের মাঝখানে একটি ছবি আগলে নিশ্চুপ বসেছিল দিয়ার মা রোকসানা বেগম। কিছুক্ষণ পরেই হাতে থাকা একটি সাদা ফ্রেম দেখে গুমরে কেঁদে উঠেন আবার নিশ্চুপ হয়ে যান। পাশের রুম থেকে এসে দিয়ার বড় বোন রোকেয়া খানমও মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।
বাবা জাহাঙ্গীর ও ছোট ভাই রিয়াদুল ইসলামও দিয়ার টেবিলের উপরে টানানো ছবির অ্যালবাম দেখে হু হু করে কাঁদছেন। তাদের বিশ্বাসই হচ্ছে না দিয়া আর নেই। তাইতো ছবির দিকে তাকিয়ে দিয়াকে খুঁজছেন আর বারবার কেঁদে উঠছেন তারা। প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের শত সান্ত¦নাতেও থামছে না তাদের আহাজারি। গতকাল সোমবার দুপুর ২টার দিকে রাজধানীর মহাখালীর দক্ষিণপাড়ার জিপি-ক/৭৫ নম্বর বাসার নিচতলায় দিয়ার রুমে গিয়ে এ আহাজারির দৃশ্য চোখে পড়ে।
দিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর আলম ভোরের কাগজকে বলেন, আমি একতা পরিবহনের চালক। ঢাকা-রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিয়মিত ট্রিপে যাই। ট্রিপে গেলে ২ দিন বাসার বাইরে থাকতে হয়। কিন্তু যখন বাসায় আসি তখন সবার আগে দৌড়ে এসে দরজা খুলে দিত দিয়া। আমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সালাম দিয়ে বলত বাবা কেমন আছ? এরপরই শুরু হতো একের পর এক জমিয়ে রাখা নালিশ। অভিযোগগুলো বলেই বলত, বাবা বিচার করো। এখন আর বিচার চাওয়ার কেউ থাকল না বলেই আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রতিদিন সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ত দিয়া। সকাল সাড়ে ৬টার মধ্যে কলেজে যেত। আমি অথবা ওর মা সাড়ে ৬টার একতা পরিবহন বাসে তুলে দিতাম। এরপর দুপুর সাড়ে ১২টায় কলেজ ছুটি হলে বান্ধবীদের সঙ্গে দোতলা বাসে করে বাসায় আসত দিয়া। কিন্তু আজ আর আসেনি বলেই আবারো কাঁদতে থাকেন তিনি। এরপর বাইরের দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলেন, অনেক কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করিয়েছি। বড় মেয়ে টিএনটি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী। ছোট ছেলে রিয়াদ স্থানীয় আইপিএইচ স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। দিয়া আমার কাছে শুধু চেয়েছিল রমিজ উদ্দিন কলেজে ভর্তি হবে। করেছিও তাই। আগে নিয়মিত দিয়াকে কলেজ থেকে নিয়ে আসলেও ইদানীং আর্থিক সঙ্কটে আর যেতাম না। আর এতেই আমার বুকের ধন নয়নের মানিক মেয়েটা হারিয়ে গেছে।
বিলাপ করে দিয়ার বাবা আরো বলেন, রবিবার দুপুরে একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে আমাকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে যেতে বলা হয়। তখন স্বপ্নেও ভাবিনি দিয়া আর নেই। হাসপাতালে গিয়ে ট্রলিতে শোয়ানো দুটি লাশ দেখি। একটির চাদর উল্টাতেই দেখি আমার দিয়া চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে আছে। তখন পুরো আকাশ ভেঙে পড়ে আমার ওপর। মনে হচ্ছিল মেয়ের লাশ দেখার আগে আমার মৃত্যু হলো না কেন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একজন ড্রাইভার হিসেবে আমি জানি রাজধানীর বেশিরভাগ বাসচালক অবৈধভাবে বাস চালায়। যার ফল একের পর এক দুর্ঘটনা। সংশ্লিষ্টদের এখনই সময় এদিকে চোখ দেয়া। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শুনেছি ঘাতক জাবালে নূর পরিবহনের মালিক এক মন্ত্রীর স্বজন। প্রভাবশালী হওয়াতেই আমাদের কোনো খোঁজ কেউ নেয়নি। তাতে কোনো দুঃখ হচ্ছে না। কিন্তু এরপর কারো বুক খালি হলে দুঃখটা বাড়বে।
দিয়ার মা বলেন, দিয়ার স্বপ্ন ছিল ব্যাংকার হবে। কিন্তু তা আর হলো না। ও (দিয়া) আমাদের কাছে কখনোই কিছু চাইত না। ও ফ্রি থাকলে নাচ-গান করতে ভালোবাসত। দুই বোনের মধ্যেও বেশ মিল ছিল। ওরা একটি টেবিলেই দুজন ভাগাভাগি করে পড়ত। দিয়ার বড় বোন বলেন, দিয়ার দুষ্টুমিগুলোই বেশি মনে পড়ছে। যাদের কারণে আমার বোনকে হারালাম তাদের বিচার চাই। আর কারো বোন যেন হারিয়ে না যায়। রবিবার রাতেই স্থানীয় রহিম মেটাল মসজিদ কবরস্থানে দিয়ার লাশ দাফন করা হয়।
এদিকে, অপর নিহত আবদুল করিম ওরফে রাজিবই ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র স্বপ্ন। অনেক আগেই তার বাবা মারা যায়। এরপর থেকে সে রাজধানীর দক্ষিণখানের আশকোনা হাজীক্যাম্প এলাকার ৭২৩/৪ নম্বর বাসায় খালাতো ভাই মিরাজের সঙ্গে থাকত। তার মা গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার রেহানিয়া এলাকায় থাকেন। রবিবার রাতেই করিমের লাশ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়।
করিমের বন্ধু আবির হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, করিম রমিজউদ্দিন কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের সি সেকশনে পড়ত। পড়ালেখার পাশাপাশি গান করাই ছিল তার একমাত্র শখ। অনেকগুলো মিউজিক ভিডিও বেড় করেছে ও। স্বপ্ন ছিল ইউটিউবার হবে। লাভছিক রাহাত নামে ওর ইউটিউব চ্যানেলও আছে। যেকোনো কালচারাল অনুষ্ঠানে ও গান করত। বন্ধুদের আড্ডায় অন্য কেউ গান গাইলে ও নেচে দেখাত। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের হাসিখুশি রাখতে পটু ছিল করিম। এজন্য আমরা ওকে জোকার বলে ডাকতাম। করিমের পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুনেছি ওর বাবা নেই। মায়ের একমাত্র স্বপ্ন ছিল করিম। সেটাও হারিয়ে গেল। এখন যদি ক্ষতিপূরণ না দেয়া হয় তাহলে ওর মায়ের কি হবে।
উল্লেখ্য, গত রবিবার দুপুরের দিকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের রেষারেষিতে করিম ও দিয়া নামে শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়।