জনপ্রশাসন পদক পেলেন ৪২ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান

আগের সংবাদ

সরাইলে পিকআপ ও কাভার্ড ভ্যানের সংঘর্ষে নিহত ২

পরের সংবাদ

দশ বছর নিলাম হয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ২৩, ২০১৮ , ১২:১৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ২৩, ২০১৮, ১২:১৫ অপরাহ্ণ

সর্বশেষ স্বর্ণের নিলাম হয়েছে ২০০৮ সালে। এরই মধ্যে কেটে গেছে ১০টি বছর। কিন্তু এই সময়ে এক তোলা স্বর্ণও নিলামে তোলেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০০৮ সালে চারটি লটে ৯১ কেজি স্বর্ণ নিলাম করা হয়। এরপর থেকে এ পর্যন্ত ৯৬৩ কেজির কিছু বেশি পরিমাণ জব্দ করা স্বর্ণ আদালতের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের অস্থায়ী খাতে জমা পড়েছে। এর মধ্যে স্থায়ী খাতে রয়েছে ১০ কেজি। এই স্বর্ণ নিলাম ডাকার জন্য সর্বশেষ গত দুই মাস আগে শুল্ক গোয়েন্দারা চিঠি দিলেও ব্যবস্থা নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভল্টে স্বর্ণ ফেলে রাখায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এ খাত। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, উদ্ভ‚ত পরিস্থিতিতে নিলাম প্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে।
জানা গেছে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত শুল্ক গোয়েন্দারা বিভিন্ন জায়গা থেকে মোট চার হাজার ৬৪৫ কেজি বা ১১৬ মণের সামান্য বেশি স্বর্ণ জব্দ করেছে। এর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে না পারায় তা রাষ্ট্রের অনুক‚লে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। বাজেয়াপ্ত স্বর্ণের মধ্যে দুই হাজার ২৯৯ কেজি বা ৫৭ মণ ১৯ কেজি সমসাময়িক আন্তর্জাতিক দরে কিনে সরকারকে টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বাইরে ২৪ মণ বা ৯৬৩ কেজি স্বর্ণের বিপরীতে এখন আদালতে মামলা চলছে। আর বিভিন্ন সময়ে নিলামের মাধ্যমে কিছু স্বর্ণ বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া আদালতের নির্দেশে শুল্ক পরিশোধ সাপেক্ষে কিছু স্বর্ণ ফেরত দেয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মূল্যবান দ্রব্য গুদাম কর্তৃপক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অস্থায়ী খাতে ৯৬৩ কেজির কিছু বেশি স্বর্ণ জমা করা হয়েছে। ২০০৮ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত অস্থায়ী খাত থেকে স্থায়ী খাতে এসেছে ২৮ কেজির কিছু বেশি। এর মধ্যে ১৫৫টি বারের ওজন ১৮ কেজির কিছু বেশি। এই বারগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক কিনে নেবে। বাকি ১০ কেজি স্বর্ণের অলঙ্কার নিলামের জন্য সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের তিনজন কর্মকর্তাসহ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ মোট পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। তবে ওই স্বর্ণের পরিমাপ ও মান নিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে তা বিক্রি প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জব্দ করা স্বর্ণের কোনো দাবিদার না পাওয়া পর্যন্ত সেগুলো অস্থায়ী খাতে রাখা হয়। এ বিষয়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের করা মামলা নিষ্পত্তির পর এর মালিকের অনুক‚লে স্বর্ণ ফেরত দেয়ার রায় না গেলে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে এর মালিক ঘোষণা করা হয়। পরে ওই স্বর্ণ স্থায়ী খাতে নিয়ে নিলামের আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে স্বর্ণগুলো যদি স্ট্যান্ডার্ড হলমার্ক স্টিকারযুক্ত বার আকারে থাকে, তবে সেগুলো আন্তর্জাতিক দরে কিনে নিয়ে রিজার্ভে রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের কারেন্সি অফিসার আওলাদ হোসেন চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, স্থায়ী খাতের স্বর্ণ আমরা নিলাম করে থাকি। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিলাম প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রয়েছে। তিনি বলেন, স্থায়ী খাতে নিলাম করার মতো স্বর্ণ জমা না হওয়ায় গত ১০ বছরে কোনো নিলাম হয়নি। তবে বর্তমানে ১০ কেজির কিছু বেশি স্বর্ণ নিলাম করার সুযোগ রয়েছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যেহেতু এই স্বর্ণ জমা রেখেছিল, সেহেতু এর মালিক তারা। বাংলাদেশ ব্যাংক এই স্বর্ণ নিলাম করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে দেবে, যা কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তাদের আয়ের খাতে দেখাবে। পরে ওই অর্থ তারা সরকারের হিসাবে জমা করবে।
সূত্রমতে, শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে গত বছর আপন জুয়েলার্সে অভিযান চালায় শুল্ক গোয়েন্দা। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন শাখা থেকে সাড়ে ১৩ মণ স্বর্ণ ছাড়াও আটক করা হয় হীরাসহ মূল্যবান ধাতু। শুধু এই ঘটনাই নয়; স্থল ও বিমান বন্দরে প্রায়ই ধরা পড়ছে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা স্বর্ণ। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় স্বর্ণের চোরাচালান ধরা পড়ে ২০১৩ সালের জুলাই মাসে। ওই বছরের ২৩ জুলাই নেপাল থেকে আসা একটি বিমান থেকে ১২৪ কেজি ২১৬ গ্রাম স্বর্ণ আটক করা হয়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চোরাচালানটি ধরা পড়ে ২০১৪ সালের ২৬ এপ্রিল। আটক করা এসব স্বর্ণ রাখা হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে। স্বাধীনতার পর থেকে জব্দ হওয়া স্বর্ণের মধ্যে রাষ্ট্রের অনুক‚লে আদালত থেকে বাজেয়াপ্ত হওয়া দুই হাজার ৩০০ কেজি স্বর্ণ কিনে রিজার্ভে যোগ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শিগগিরই আরো ১৮ কেজি রিজার্ভে নেয়া হবে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, জব্দ স্বর্ণের মধ্যে শুধু অলঙ্কার এবং প্রথম শ্রেণির নয় এ রকম স্বর্ণের বার নিলামে বিক্রি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ নিলামটি হয়েছে ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই। সে সময় ২১ কেজি ৮২২ গ্রাম স্বর্ণ বিক্রি করা হয়েছিল। একই বছরে আরো তিন ধাপে ২৫, ২৫ ও ২০ কেজি স্বর্ণ নিলামে বিক্রি করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, ট্যারিফ কমিশন ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ২০১১ সালে পরিচালিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈধ উপায়ে কোনো স্বর্ণ আমদানি হয় না। এ অবস্থায় দুবাই, সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশ থেকে এক শ্রেণির চোরাকারবারির সহায়তায় স্বর্ণ এনে তা এখানকার বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। দীর্ঘদিনের দাবির পর স্বর্ণ আমদানির জন্য সম্প্রতি একটি নীতিমালা করা হয়েছে।
দেশে স্বর্ণ আমদানির প্রক্রিয়া সহজতর না হওয়ায় বাজারে জোগান বাড়াতে জব্দ করা স্বর্ণ নিলামের দাবি জানিয়ে আসছিলেন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) নেতারা। ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিলাম ডাকার অনুরোধ জানিয়ে গত ১৭ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দেয় শুল্ক গোয়েন্দা। পাশাপাশি চোরাচালান বন্ধে দ্রæত স্বর্ণ আমদানি নীতিমালা করারও সুপারিশ করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা রাজি হাসান বরাবর পাঠানো হয় ওই চিঠি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সহিদুল ইসলাম জানান, চিঠি দেয়া হলেও ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহিন বলেন, দেশের বাজারে স্বর্ণের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো নিলামের আয়োজন করলে যথেষ্ট সাড়া পাবে। তিনি বলেন, বাজারদর অনুসারেই নিলামে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্বর্ণ কিনে নেন ব্যবসায়ীরা।