চার জেলায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ৪

আগের সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরিতে নৌকাডুবিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৭

পরের সংবাদ

ব্যাংক খাতে বিনিয়োগকারীদের মাথায় হাত

শেয়ারবাজারে রক্তক্ষরণ

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ২১, ২০১৮ , ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ২১, ২০১৮, ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ

দেশের শেয়ারবাজারের মোট মূলধনের ৪০ শতাংশের বেশি ব্যাংক ও আর্থিক খাতের। বিগত ২-৩ বছরে অধিকাংশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও কয়েকটি ব্যাংকের মালিকানা বদলের ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরেই টানা নেতিবাচক ধারায় রয়েছে এ খাতের শেয়ার দর। এতে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাচ্ছেন শেয়ারবাজার থেকে। এরই ধারাবাহিকতায় গত তিন বছরে প্রায় ৪ লাখের বেশি বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজার ছেড়েছেন। নিষ্ক্রিয় রয়েছে অনেক বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব। এ ছাড়া যারা বাজারে টিকে আছেন, তারাও লোকসান গুনতে গুনতে হাঁপিয়ে উঠেছেন। অথচ চীনের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে মালিকানা ভাগাভাগি ও বাজেটে আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানের করহার কমানোয় আশায় বুক বেঁধেছিলেন তারা।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপের কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে তার কোনোটাই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে একই ধরনের পদক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এসবের কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। নির্বাচনী বছরে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের নজরদারিও কমেছে বলে অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের। এ ছাড়া সরকারি ২৬টি প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির কথা থাকলেও বছরের পর বছর ধরে তা আটকে আছে। একইভাবে আটকে আছে পাওয়ার গ্রিড, তিতাস গ্যাসের মতো লাভজনক প্রতিষ্ঠানের সরকারি অংশের শেয়ারের অফলোড। পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে যার কোনো বিকল্প নেই।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জুন পর্যন্ত শেয়ারবাজারে মোট বিনিয়োগকারী ছিল ৩১ লাখ ৯৫ হাজার ৫৫০ জন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এরপরের বছর থেকেই ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে বিনিয়োগকারী ও বিও হিসাব সংখ্যা। ২০১৭ সালের জুনে শেয়ারবাজারে মোট বিনিয়োগকারী ছিল ২৯ লাখ ২৮ হাজার ৬৩৯ জন। যা এক বছরের ব্যবধানে ১ লাখ ৬৪ হাজার ২৫২ জন কমে ২০১৮ সালের জুনে দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ ৬৪ হাজার ৩৮৭ জনে। এই এক বছরে পুরুষ বিনিয়োগকারী কমেছে ১ লাখ ১১ হাজার ৭৩৪ জন এবং নারী বিনিয়োগকারী কমেছে ৫৩ হাজার ২২২ জন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, শেয়ারবাজারের মৌলভিত্তির খাত ধরা হয় ব্যাংক খাতকে। গত ছয় মাস ধরেই টানা দরপতনের ধারায় রয়েছে এ খাতের শেয়ার। ফলে ভালো খাতে বিনিয়োগ করেও মুনাফা দূরে থাক, মাসের পর মাস ধরে পুঁজি হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খোয়া গেছে অর্ধেক পুঁজিই। গত বৃহস্পতিবার এবি ব্যাংকের ক্লোজিং প্রাইজ ছিল ১১.৯ টাকা। অথচ গত ২২ জানুয়ারি একই শেয়ার লেনদেন হয়েছে ১৯.৬ টাকায়। ৬ মাসের ব্যবধানে শেয়ার দর কমেছে ৭.৭ টাকা। অন্যদিকে গত ২১ জানুয়ারি ঢাকা ব্যাংকের শেয়ার দর ছিল ১৯.৮ টাকা। ছয় মাসের ব্যবধানে কমতে কমতে বৃহস্পতিবার তা এসে ঠেকেছে ১২.৬ টাকায়। অর্থাৎ এ শেয়ারেও ৬ মাসে বিনিয়োগকারীর লোকসান হয়েছে ৭.২ টাকা। একইভাবে লোকসান গুনতে গুনতে পুঁজি হারিয়ে বাজার ছাড়ছেন ব্যাংক খাতের বিনিয়োগকারীরা। অথচ একই সময় দুর্বল মৌলভিত্তির ‘জেড’ গ্রুপের অধিকাংশ শেয়ারের দাম বেড়েছে গড়ে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন অর্থবছরের বাজেটে করপোরেট করহার কমানো হয়েছে। এতে ব্যাংক খাত লাভবান হলেও, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার কারণে এসব শেয়ারে দাম বাড়ছে না। এ ছাড়া বাজেটে পুঁজিবাজার নিয়ে বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ ছিল না বললেই চলে। অন্যদিকে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই দিনের পর দিন জেড গ্রুপের শেয়ারের দাম লাগামহীনভাবে বাড়লেও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ তা দেখেও দেখে না। সর্বোপরি ‘কারসাজি’ চক্রে জড়িতদের চিহ্নিত এবং বিচারের আওতায় না আনার কারণেও শেয়ারবাজারের অস্থিরতা কাটছে না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে একই ধরনের গতানুগতিক কথা বলতে হচ্ছে। শেয়ারবাজারের উন্নয়নে যেসব সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে তা আদৌ কার্যকর হচ্ছে না। এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য এমন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ ছিল না। তবে যে পদক্ষেপ ছিল তা হলো ব্যাংকের করপোরেট করহার কমানো। কিন্তু ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ায় এসব শেয়ারেও কোনো উন্নতি নেই। তবে যেসব সংস্কার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে তার সঠিক বাস্তবায়ন হলেও শেয়ারবাজারের উন্নতি আশা করা যায়।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত জাতীয় ঐক্যের সভাপতি আনম আতাউল্লাহ নাঈম ভোরের কাগজকে বলেন, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ শেয়ারবাজার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিএসইসি সমন্বয় করে শেয়ারবাজারের উন্নয়ন করার কথা থাকলেও দুই অথরিটির মধ্যে সমন্বিত কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয় শেয়ারবাজারের লাগাম টেনে ধরতে চায় তারা। মোট কথা, শেয়াবাজারের নানা সংস্কারের কথা থাকলেও, এসবের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এতে হতাশ হয়েই নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
এদিকে শেয়ারবাজারের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারে ট্রেড পরবর্তী ক্লিয়ারিং এন্ড সেটেলমেন্টে বিলম্ব এবং প্রশিক্ষিত বিনিয়োগকারীর অভাব রয়েছে। তাই আগামী বছরের ২৭ জুনের মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জের পৃথক ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট কোম্পানি গঠন করার লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বিগত তিন বছরের অর্জনে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য ২৩টি কোম্পানিকে আইপিও, ১০টি কোম্পানিকে রাইট ইস্যু, ৬১টি কোম্পানিকে বন্ড ও ডিবেঞ্চার এবং ২০টি কোম্পানিকে প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যুসহ ৩৮০টি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি ও ২৭২টি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিকে মোট ৬৭ হাজার ১৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা মূলধন তোলার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এই চুক্তিকে আশার আলো হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে মর্ডান সিকিউরিটিজের এমডি খুজিস্থা নুর-ই-নাহরিন ভোরের কাগজকে বলেন, শেয়ারবাজারের বাজার মূলধন বাড়ছে। যা বাজারের জন্য ইতিবাচক। তবে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমছে এটাও ঠিক। শেয়ারবাজার ইতিবাচক হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।