অর্জন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং চ্যালেঞ্জ

আগের সংবাদ

একে অপরকে জানার চেষ্টা করছি : প্রিয়াংকা চোপড়া

পরের সংবাদ

পরিশুদ্ধ ছাত্রলীগ দেখার অপেক্ষায়..

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১৪, ২০১৮ , ১০:৪২ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ১৪, ২০১৮, ১০:৪২ অপরাহ্ণ

শহীদ ইকবাল

অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আমাদের মধ্যে যদি মানবিক গুণ না থাকে, পরমত সহিষ্ণুতা যদি না থাকে, অধিকার ও আশ্রয়ের সহানুভূতি যদি না তৈরি হয়- তবে এ সমাজ তৈরি হবে কীভাবে! আর যে সমাজ তখন তৈরি হবে তা কেমন হবে! এ সব দুঃখজনক আলামত দেখে সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী নিজেই ধীরেসুস্থে ছাত্রলীগের কমিটি গঠন নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছেন।

সাম্প্রতিক পেপার-পত্রিকায় ছাত্রলীগের বেপরোয়া পরিস্থিতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সরকারের নামে, ক্ষমতার নামে, ক্যাম্পাস পরিস্থিতির নামে এটা এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটা কেউ চায় না। যে কোনো ছাত্র সংগঠন সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানরূপে যখন দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহন করে- তখন এরূপ কর্মকাণ্ড অপহারী বলেই মনে হয়। বর্বরোচিত কায়দায় কাউকে লাঠিপেটা করা, অপমান-অপদস্ত করা কোনোভাবেই সুস্থ কর্ম নয়। এটা বিবেকবান কেউ মানবেন না, মেনে নেবেন না, নিতে পারেন না। বিষয়টি নিয়ে যদি সভ্য সমাজে প্রশ্ন তুলি, সেটা অনেক বেশিই বলা হয়। কারণ যা ঘটছে তা সভ্য-অসভ্যের বাইরে। কার্যত সীমা অতিক্রম করে গেছে এবং এ রকম ঘটনা বিভিন্ন সময়ে কোনো একটা ইস্যুতে হরহামেশাই ঘটছে। অনেকেই হয়তো বিষয়গুলো গা করেন না- বা তা এড়িয়ে যান, পেছনে হয়তো নানারকম কারণ থাকে। ধরা যাক, স্বার্থ থাকে বা ক্ষমতার বৃত্তের সংকেত থাকে বা কেউ কোনোকিছু দ্বারা প্রভাবিতও হন ইত্যাদি। কিন্তু সর্বোপরি যে কোনো সংবেদনশীল মানুষ এমনটা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়া কঠিন, মেনে না নিয়ে বরং দুঃখকাতর হবেন।

প্রসঙ্গত আমি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ করা ছাত্রদের একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, তারা ছয় দফা জানে কিনা! বাহাত্তরের সংবিধানের মূলকথাগুলো জানে কিনা- কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, তারা একজনও উত্তর দিতে পারেনি। প্রশ্ন করি, এ ছাত্রলীগ কারা? এরা কোন মত বা আদর্শপন্থি? ক্ষমতার নামে অন্যকে পেটায়, চাঁদাবাজি করে, ফাও খায়, নিপীড়ন করে- এরাই তো করে! এটা তো কোনো সংগঠনিক কাজ নয়! মূল্যবোধ ও মতাদর্শের লেশমাত্র যেখানে নেই! প্রধানমন্ত্রী প্রায় সব সম্মেলনেই ছাত্রদের কাগজ-কলম ও পড়াশোনার পরামর্শ দেন। দলের ঐতিহ্যের কথা বলেন। দল গঠনে শক্তিশালী ভ‚মিকা নেয়ার কথা বলেন। কিন্তু কেউ কী তা মানছে? দল গঠনের কাজও কী হচ্ছে? আমরা এই কলামে আগেও বলেছি, মাঠ পর্যায়ে দলের কোনো কাজ নেই!

সর্বত্র চলছে বেপরোয়া উস্কানি ও বাহুবলের প্রদর্শন। এসব দেখে একটা ভয়াবহ ভবিষ্যতের কথা যেন মনে পড়ে যায়! সে ভবিষ্যৎটা কী? আমাদের মধ্যে যদি মানবিক গুণ না থাকে, পরমত সহিষ্ণুতা যদি না থাকে, অধিকার ও আশ্রয়ের সহানুভূতি যদি না তৈরি হয়- তবে এ সমাজ তৈরি হবে কীভাবে! আর যে সমাজ তখন তৈরি হবে তা কেমন হবে! এ সব দুঃখজনক আলামত দেখে সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী নিজেই ধীরেসুস্থে ছাত্রলীগের কমিটি গঠন নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছেন। কিন্তু তার একক চেষ্টা কতদূর ফলপ্রসূ হবে- সেটা বর্তমান পরিস্থিতিতে আশ^স্ত বা অর্থপূর্ণ মনে করা খুব কঠিন মনে হয়। আর কতটা তা নিয়ন্ত্রণশীল থাকবে তাও বলা মুশকিল। তবে আমরা নিশ্চয়ই চাইব গঠনমূলক পরিবর্তন আসুক।

দুই.
প্রসঙ্গত, আমরা নিশ্চয়ই চাইব, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারা অবিরত থাক। সম্প্রীতির বাংলাদেশ সর্বদা প্রত্যক্ষগোচর হোক। যে লক্ষ্যে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল- তার চরম পর্যায় স্পর্শ করুক। কিন্তু সরকারি সংগঠনের লেবাস গায়ে ঝুলিয়ে ছাত্রলীগ যা করছে তা কী বরদাস্ত করার মতো? একে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দলের স্বার্থেই তা খুব জরুরি এবং একই সঙ্গে এটাও সত্য বলে বিবেচ্য করা যেতে পারে যে, যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম যখন যৌক্তিক জনসমর্থন পায় তখন কোনো বাজে কথায় কান না দিয়ে তার মূল ও সত্য নিরূপণ করা জরুরি। রাষ্ট্রযন্ত্র যেন ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ না হয়। তাহলে আমরা কেউই সুস্থ পরিবেশ পাব না, নিরাপদ থাকব না। নির্মল নিঃশ্বাসে বাঁচতেও পারব না। আমি এই মুহূর্তে হিটলারের প্রচার মন্ত্রীর উদাহরণ টানব না কিংবা বেনিতো মুসোলিনির কথাও বলবো না। স্রেফ নষ্ট জিনিসকে পরিশুদ্ধ করার কথাই বলব। কারণ আমাদের এখনো আশার অনেক কিছু আছে। আর আশাবাদী হয়েই মানুষকে বাঁচতে হয়। মানুষের মানবিক হওয়ার পথটিও তাই। কার্যত বাঙালির ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠত্বও সেখানে।

ইতিহাস স্মরণে রেখে বলা যায়, ছাত্রলীগ ও বিশ^বিদ্যালয় ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। এই সংযুক্তিটা কীসের! নিশ্চয়ই আদর্শ ও ঐতিহ্যের। তা কেউ অস্বীকারও করবে না। কিন্তু সেটি এ পর্যায়ে অবনতিশীল অবস্থায় পৌঁছল কেন! এটা কী প্রত্যাশিত ছিল? এর জন্য কী কোনো রাষ্ট্রীয় ইঙ্গিত থাকে? কেউ কী বলে দিয়েছিল যে, দলবদ্ধ হয়ে হাতুড়ি দিয়ে ছাত্রকে পেটাও! এর দায় কে নেবে? একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে এটা কী প্রত্যাশিত? বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললে এই কর্মকাণ্ডের পরিণতি কী কোনো রাস্তা পায়! এটা কী কখনো কল্পনীয় কিছু হতে পারে? আমি শোষিতের পক্ষে, দুর্নীতিবাজদের এ দেশে স্থান হবে না, সন্ত্রাস চলবে না, দেশ গড়ার জন্য সবাইকে আত্মত্যাগ করতে হবে, সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে, কাউকে অন্যায় কিছু করতে দেয়া হবে না- কথাগুলো সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু আরো বলে চলেন, বাঙালির মুক্তির জন্য আমি জীবনের অনেকটা সময় কারাগারে কাটিয়েছি। এখন তোমাদের ত্যাগ করতে হবে। স্বপ্নদ্রষ্টার স্বপ্ন ছিল এই বাংলাদেশ। কিন্তু এই দেশে যে অভাবনীয় ব্যাপারগুলো সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগ করে চলছে সেটি কী তারা জেনে বুঝে করছে না নিছক পাশববৃত্তি জাহির করার জন্য করছে- সেটা এক প্রকার প্রশ্ন! বস্তুত ছাত্রলীগে বোধ হয় কোনো নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। এই নেতৃত্ব কেমন হবে, কী তার পদ্ধতি-প্রণালী সেটি সরকারের অনেক নেতাই জানেন। কারণ তারা ছাত্র নেতৃত্ব থেকেই আজ দলের ও সরকারের কর্ণধার হয়েছেন। কার্যত ছাত্র সংগঠনকে ঢেলে সাজানো দরকার। দক্ষ নেতৃত্বের জন্য এর বিকল্প কিছু নেই।

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ভ‚মিকার কথা আমাদের সবারই জানা। সেটা নিয়ে গর্ব আছে। কিন্তু একইসঙ্গে আমরা জানি ছাত্রসংগঠনের লেজুড়বৃত্তি করে ফায়দা লুটারও চেষ্টা করা হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে নব্বইয়ের গণআন্দোলনে ছাত্রদের যেমন সাহসী পদক্ষেপ ছিল তেমনি বিভিন্ন সময়ে শাসক শ্রেণির অঙ্গুলি-সংকেতে ছাত্রদের বেপরোয়া হতেও দেখা গেছে। নির্মম সন্ত্রাসের ভেতরে নিজেদের সেঁধিয়ে দিতে দেখা গেছে। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান সরকার এনএসএফ গুণ্ডদের তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে ছাত্রসমাজের তারুণ্যশক্তিকে ক্ষমতাসীন স্বৈরজান্তারা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে, মিলিটারি একনায়করা পাকিস্তানি শাসকদের ধারাবাহিকতায় এনএসএফ গুণ্ডদের মতো ছাত্রসমাজকে তীব্রভাবে ব্যবহার করেছে।

মনে করা যায়, সামরিক জান্তার প্রত্যক্ষ মদদে নীরু-অভিদের মতো অস্ত্রধারী ছাত্রদের হাতে ডা. শামসুল আলম খান মিলনের মতো মেধাবী চিকিৎসককে প্রাণ দিতে হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরকারি ছাত্র-সংগঠনেরই বাহ্যিক আধিপত্য দৃশ্যমান। কিন্তু সঠিক নেতৃত্ব নিয়ে তো প্রশ্ন আছে। এ প্রশ্নশীলতার কারণ চেতনা ও মূল্যবোধের অন্তঃসারশূন্যতা। সংগঠন না বোঝা। সংগঠনের নামে পেশিশক্তির বলদর্পী অপব্যবহার। এ ক্ষেত্রে একটি জিনিস লক্ষণীয় হয়ে ওঠে, কার্যত নীতিহীনতা বা আদর্শহীনতা কোনো দল বা সংগঠন তৈরি করে না। এরা যখন যার তখন তার। এই যখন যার তখন তার ‘নীতি’ দিয়ে কোনো মতাদর্শ বা চেতনাও প্রতিষ্ঠিত হয় না। বস্তুত তাতে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ধারাবাহিকতার নবায়ন হয়তো হয় কিন্তু রাজনীতি তৈরি হয় না। আর অপ-রাজনীতি প্রজাতন্ত্রের জন্য কোনো শুভ বার্তা বয়ে আনে না।

আমরা জানি, কখনোই কোনো অশুভ শক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। জোর-জুলুম নিপীড়ন কেউ কখনো মেনে নেয় না। কোনো সভ্য সমাজ তা গ্রহণ করার প্রশ্নই ওঠে না। আগেই বলেছি, আমরা যে ছাত্র সংগঠনটির কথা বলছি, তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস আছে। এ রাজনীতি দেশ গড়ার রাজনীতি। একটি দেশজন্মের রাজনীতির ইতিহাস ধারণ করে ছাত্রলীগ। এ ছাড়া বড় বড় রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস সৃষ্টির ইতিহাসও তার আছে। সবচেয়ে বড় কথা, এই ছাত্র সংগঠনের ভেতর থেকেই জন্ম নিয়েছে দেশ নেতৃত্ব। তৈরি হয়েছে অনেক অগ্রপথিক বড় বড় নেতা। তারাই এ দেশের অগ্রবর্তী সৈনিক। ফলে সুপথে চলার দর্শন তাদের নতুন নয়। তবে তা বিচ্যুত হলে অতীতের কৃষ্ণ-অভিজ্ঞতা ফিরে আসতে পারে। যেটা কারো জন্যই সুখকর হবে না। তাই ফেরাতে হবে ছাত্রলীগকে। পরিশুদ্ধতার কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। গঠনমূলক কাজে হাত দিতে হবে। তৃণমূল থেকে বড় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কাজে সফল হতে হবে। সে জন্য এক্ষুণি স্বপ্নমুখর কমিটেড নেতৃত্ব দরকার- যারা ছাত্রলীগ পুনর্গঠনে ও পূর্ণ পরিশুদ্ধতার অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করবে এবং অবশ্যই নিজেরাও পরিচ্ছন্ন থাকবে। পরিচ্ছন্ন নেতৃত্বই হোক পরিশুদ্ধ সংগঠন নির্মাণের কাক্সিক্ষত ছায়াপথ। সেখানে এই মুহূর্তে কঠোর হওয়ার কী কোনো বিকল্প আছে!

তিন.
বাংলাদেশ যেভাবে এগুচ্ছে সেখানে অনেক কিছুই স্নান হচ্ছে বিভিন্ন সময়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠা কোমলমতি অস্থিরচিত্তের কিছু মেধাশূন্য পেশি শক্তির কাছে। এরা কারা? হাইব্রিড হলে তাদের চিহ্নিত করাও দরকার। বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির একটি বড় অংশ যুদ্ধাপরাধীর বিচার কার্যকর হওয়ার পর দৃশ্যত নিবৃত্ত। কিন্তু কার্যত তারা কোথায়? দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে তো এখন ক্ষমতাসীন একক ছাত্র সংগঠনেরই দাপট চলছে। এ দাপুটে শক্তির মূল প্রবণতা কী? তা হলে তারা তো সংগঠন গোছানোর কোনো কাজ করছে না! ছাত্রদের সুবিধা-অসুবিধার দায় নিয়ে কাজ করছে কী! মেধা ও চিন্তার চর্চাও তো তেমন নেই! দলীয় আদর্শ প্রচারেও তাদের তেমন দেখা যায় না। তবে তাদের প্রতিপক্ষ কারা? মোটা দাগের এসব বিষয় দলীয় নেতৃত্বকে ভাবতে হবে। দলকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব নেতৃত্বের। সে কারণে পরিশুদ্ধ ছাত্রলীগ তৈরির পদক্ষেপ তাদেরই নিতে হবে। আর যদি মত ও আদর্শের কথা বলি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা তো নবায়নেরও দায়িত্ব নিতে হবে। নইলে দল টিকবে কী করে?

ভিশন ২০২১ বা ৪১ বাস্তবায়নে শক্তিশালী তারুণ্যনির্ভর সাংগঠনিক শক্তি দরকার- সেটি কে করবে? প্রশ্নগুলো নিছক পরামর্শসূচক করে তুললে হবে না, বাস্তব প্রয়োগ দরকার। সে জন্য এখন নেতৃত্ব সৃজন করা ও তার অভিপ্রেত লক্ষ্য অর্জনে অনেক কিছুর কঠোর নিয়ন্ত্রণ জরুরি। কাউকে সুযোগ করে দিলে সে ‘সুযোগের দায়’ কে নেবে- তাই সতর্কতা সার্থক করাটা এক্ষুণই জরুরি।

শহীদ ইকবাল : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।