ভূমিকম্প প্রতিরোধে টেকসই নির্মাণকে গুরুত্ব দিতে হবে

আগের সংবাদ

কলাপাড়ায় প্রতিপক্ষের হামলায় বৃদ্ধের মৃত্যু

পরের সংবাদ

ছাত্রদের সমস্যা কে দেখবে?

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১২, ২০১৮ , ৭:৫১ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ১২, ২০১৮, ৭:৫১ অপরাহ্ণ

লীনা পারভীন

কলাম লেখক

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকবে, ছাত্ররাজনীতি থাকবে কিন্তু ছাত্র সংসদ থাকবে না এটা তো অকল্পনীয় একটা বিষয়। একটা রাজনৈতিক পরিবেশ কেবল ছাত্রদেরই রাজনৈতিক বা দেশপ্রেমিক হতে শিক্ষা দেয় না বরং শিক্ষক কর্মচারী সবাইকেই সচেতন করে তোলে। একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি সদস্য হয়ে উঠে সচেতন। বর্তমানে যে জায়গাটি একেবারেই শূন্য। এভাবে চলতে পারে না।

দুদিন পরপর অস্থির হয়ে উঠছে শিক্ষাঙ্গন। আজকে ভ্যাট ইস্যু তো কাল কোটা ইস্যু তো আরেকদিন সময়মতো পরীক্ষা নেয়া ও ফল প্রকাশের দাবিতে। আছে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিও। ইস্যুর পর ইস্যু আসছে আর যাচ্ছে। আবার কখনো একই ইস্যুতে ছাত্ররা দুদিন পর পর রাস্তায় নামছে। সরকারের উপরের মহল ইস্যুর তীব্রতা বুঝে আলাপ-আলোচনার গরজ দেখাচ্ছেন অথবা উড়িয়ে দিচ্ছেন। তবে সম্প্রতি যতগুলো ইস্যু নিয়ে ছাত্ররা রাস্তায় নেমে এসেছে তার সবই আয়তনে বা তীব্রতায় কিছুটা হলেও সরকারকে বিব্রত করে তুলেছে। সরকারের হাতে জাতীয় পর্যায়ের এত ইস্যু যে তার মধ্যে কোনটা রেখে কোনটার দিকে মনোযোগ দেবে সেটাও একটা বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

অতিসম্প্রতি বা চলমান কোটা আন্দোলন নিয়েও একই ঘটনা ঘটেছে। ছাত্রদের সব ইস্যু নিয়েই যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকদের ব্যস্ত হতে হবে এমনটা আগে কখনই ছিল না। বলতে গেলে অনেক ইস্যুই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েই মিটে যেত। প্রশ্ন আসে, তাহলে এখন কেন সব ইস্যুই সরকারের কাঁধে এসে ভর করছে? জানি এর উত্তর অনেকেরই জানা থাকলেও গরজ কম। বিশ্ববিদ্যালয় মানেই ছাত্ররাজনীতির আলোকোজ্জ্বল ইতিহাস আর রাজনীতি মানেই ছাত্রদের সংগঠিত হওয়া। এ কথা আর নতুন করে বলার অবকাশ নেই যে বাংলাদেশ মানেই ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচার পতন আন্দোলন এবং সর্বশেষ ২০১৩ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা শাহবাগের গণজোয়ারের সব ক’টাতেই ছিল ছাত্রদের মুখ্য ভূমিকা। এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস মানেই মেধাবীদের ইতিহাস। ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস মানেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদের ইতিহাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় সব আন্দোলনের সূতিকাগার। এ কথার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়। দেশের জাতীয় বা আঞ্চলিক যে সমস্যাই হোক না কেন প্রতিবাদী জনতা প্রতিবাদ জানানোর জন্য জড়ো হয় এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই। বিশেষ করে ২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চের পর থেকেই শাহবাগ হয়ে উঠেছে সব কণ্ঠের একত্রিত হওয়ার একটি পরিচিত জায়গা। তবে লক্ষণীয় যে আন্দোলন এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বাইরে বেরিয়ে এসে স্থিতি পেয়েছে পাবলিক স্পেইসে। আগে যে আন্দোলন শুরু হতো ক্যাম্পাস থেকে, ডাকসু ভবন বা মধুর ক্যান্টিনের সামনে থেকে তেমন আন্দোলন এখন আর চোখে পড়ে না।

একটা সময় ছাত্রনেতাদের নামেই পাওয়া যেত পরিচয়। আদর্শই ছিল তাদের মূল মন্ত্র। সেদিন গত হয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখন মৃত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন রাজনীতি নেই বললেই চলে। রাজনীতি আসবেইবা কোথা থেকে? কোনো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও কী ছাত্র সংসদ নামক বিষয়টি আছে? মাননীয় রাষ্ট্রপতি যখন তার বক্তৃতায় ডাকসুসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার নিয়ামক হিসেবে দাবি করেন তখনো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়টিতে কান দেয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না। রাজনীতিবিদ নিজে নিজে জন্ম নেয় না। জীবনের আর দশটি যোগ্যতা অর্জনের জন্য যেমন কিছু নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে রাজনীবিদ হওয়ার জন্যও তেমনি দরকার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। কী সে প্রক্রিয়া? সে প্রক্রিয়া হচ্ছে পড়াশুনার পাশাপাশি দেশ ও সমাজ সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমে ন্যায় অন্যায়কে চিনতে পারার দক্ষতা অর্জন। ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিপক্ষে গর্জে উঠার মতো সাহসী হয়ে ওঠা। নিজের মতের পক্ষে অন্যকে আকৃষ্ট করার মতো দক্ষতা অর্জন। একজন শেখ মুজিব বা তাজউদ্দীনরা একদিনে গড়ে উঠেননি। রাজনীতি নেই কিন্তু ইস্যু কী মরে গেছে? ছাত্রদের শিক্ষাজীবন থেকে কর্মজীবন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা নিয়ে কথা বলার মতো জায়গাটি কী আছে আদৌ? এ নিয়ে চিন্তাইবা কে করছে? বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কী একবারও ভেবে দেখেছে রাজনীতিহীন করলেই কি ছাত্রদের সমস্যা মিটে যায়? কথায় বলে ছাত্ররাই আগামীর ভবিষ্যৎ কিন্তু কথাটির মানে বুঝি ক’জন এখন? ছাত্রদের মাঝেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের নেতৃত্ব। কিন্তু এসবের দিন এখন ফুরিয়েছে। ছাত্রদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা আছে কিন্তু নেই কোনো রাজনৈতিক শিক্ষা। একজন ছাত্রের অনশনের পরিপ্রেক্ষিতে জানুয়ারি মাসে হাইকোর্ট থেকে দেয়া এক আদেশে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই আদেশে হাইকোর্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ বা সহায়তা গ্রহণের আদেশও দিয়েছিলেন। কিন্তু কোথায় সে আদেশের কার্যকারিতা?

ডাকসুু নির্বাচনে কর্তৃপক্ষের ভয়টা কোথায় সেটাও ঠিক বুঝে আসছে না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকবে, ছাত্ররাজনীতি থাকবে কিন্তু ছাত্র সংসদ থাকবে না এটা তো অকল্পনীয় একটা বিষয়। একটা রাজনৈতিক পরিবেশ কেবল ছাত্রদেরই রাজনৈতিক বা দেশপ্রেমিক হতে শিক্ষা দেয় না বরং শিক্ষক কর্মচারী সবাইকেই সচেতন করে তোলে। একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি সদস্য হয়ে উঠে সচেতন। বর্তমানে যে জায়গাটি একেবারেই শূন্য। এভাবে চলতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা সরকার উভয়ের অস্তিত্বকে সুরক্ষিত রাখতেই সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলোতে পর্যায়ক্রমে নির্বাচন হয়ে পড়েছে অবশ্যম্ভাবী। একমাত্র একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক পরিবেশই পারে ছাত্রদের মধ্যে গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন ইস্যুকে সঠিক পথে পরিচালিত করে একটি সঠিক ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের রাস্তা তৈরি করতে। সুস্থ ধারার রাজনীতি চালু থাকলে সেখানে ছাত্র বা শিক্ষক বা বহিরাগত যেই হোক না কেন কোনো তৃতীয় পক্ষ এসে কোনোভাবেই পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে সাহস পাবে না। অন্তত অতীত ইতিহাস এটাই বলে।

লীনা পারভীন : কলাম লেখক।