ইন্টারনেট আসক্তি ও তরুণ সমাজ

আগের সংবাদ

মুজিব বর্ষ পালন প্রসঙ্গ

পরের সংবাদ

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস

শিক্ষা, সচেতনতাই গড়তে পারে শক্তিশালী জনসম্পদ

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১০, ২০১৮ , ৭:৫২ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ১০, ২০১৮, ৭:৫২ অপরাহ্ণ

অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার ও মো. হাসিব ইকবাল কানন

লেখকদ্বয় যথাক্রমে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক ও গবেষণা শিক্ষার্থী

বেকারত্ব থেকে পরিবেশ দূষণ, মাদকাসক্তি থেকে জঙ্গিবাদের উত্থান এ সবের মূলে রয়েছে জনসংখ্যার আধিক্য। অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়বহুল শিক্ষাব্যবস্থা, পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্রের সুযোগ না থাকা ও সীমিত সম্পদের কারণে দেশের এই বিপুল জনসংখ্যা বোঝা হয়ে পড়ছে। আমাদের দেশে বেশিরভাগ দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একটু ভেবে দেখুন আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জনসম্পদ কোনো কাজে আসছে না কারণ খেয়াল করলে দেখা যাবে যে, শিক্ষিত পরিবারের সদস্য সংখ্যা যতটাই কম অশিক্ষিত পরিবারের সদস্য সংখ্যা ঠিক ততটাই বেশি।

রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম একটি মূল উপাদান হলো ‘জনসংখ্যা’। প্রতি বছর ১১ জুলাই বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশেই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হয়ে আসছে। দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, জনসংখ্যা বিষয়ক সমস্যাগুলো সবাইকে জানানো এবং তা গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা। ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই বিশ্বের জনসংখ্যা ৫০০ কোটিতে উন্নীত হয় এবং পরবর্তী সময়ে ইউএনডিপির গভার্ন্যান্স কাউন্সিল প্রতি বছর এই দিনটিকে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৮৯ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করে আসছে। প্রতি বছরের মতো বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০১৮-এর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘Family Planning is a Human Right’ অর্থাৎ ‘পারিবারিক পরিকল্পনা একটি মানব অধিকার’।

একটি দেশের জনসংখ্যাকে ওই দেশের সম্পদ বলা হলেও অতিরিক্ত জনসংখ্যা সম্পদ নয়, বরং বোঝা বলা যায়। অপুষ্টি, অপর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগ, বেকারত্ব, চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা ইত্যাদি সমস্যার মূলে রয়েছে অতিরিক্ত জনসংখ্যা। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ১৮৬০ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২ কোটি। ১৯৪১ সালে যা বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ২০ কোটি। অর্থাৎ ৮০ বছরে বাংলাদেশে মাত্র দুই কোটি জনসংখ্যা বাড়ে। আবার ১৯৬১ সালে জনসংখ্যা ছিল ৫ দশমিক ৫২ কোটি যা ১৯৯১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ১৫ কোটি। ত্রিশ বছরে দ্বিগুণ জনসংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালে দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ২৭ লাখ। ২০১৬ সালের ১ জুলাইতে এই জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ কোটি ৮ লাখে। দেশের বর্তমান জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেখা যায় যে, দেশে এখন মোট পুরুষের সংখ্যা ৮ কোটি ১০ লাখ এবং মহিলার সংখ্যা ৮ কোটি সাড়ে ৭ লাখ। হিসাবে দেখা যায় দ্বিগুণেরও বেশি জনসংখ্যা বেড়েছে গত তিন যুগে। জরিপের তথ্যানুযায়ী দেশে পাঁচ বছরের ব্যবধানে ৪ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমেছে প্রায় ২২ ভাগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে পাওয়া যায় যে, বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হার ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং এ হারে বৃদ্ধি পেতে থাকলে ২০৫০ সালে জনসংখ্যা ২২ কোটি ২৫ লাখে পৌঁছবে।

‘Family Planning is a Human Right’ অর্থাৎ ‘পারিবারিক পরিকল্পনা একটি মানব অধিকার’। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়াতে বিষয়টি এখানে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও এখনো সেটা উদ্বেগজনক। পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখনো পুরোপুরি সচেতন হয়ে উঠেনি। তাই পরিবারের সদস্যদের ভরণ-পোষণ করার লক্ষ্যে ছুটছে স্বপ্নের রাজধানী শহর ঢাকাতে। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হার ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ঢাকা মেগা সিটিতে তা ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ। আর ঢাকার আশপাশে এই হার প্রায় ২০ শতাংশেরও বেশি। যে সব নগরে ১ কোটির বেশি মানুষ বাস করে, সে সব শহরকে জাতিসংঘের বসতি বিষয়ক সংস্থা ইউএন হ্যাবিট্যাট মেগা-সিটি নাম দিয়েছে। বিবিএস ও ইউএনএফপিএ এর তথ্য মতে, বাংলাদেশের সব চেয়ে বড় পুঞ্জিভ‚ত নগর হলো ঢাকা। মোট চারটি সিটি করপোরেশন যথাক্রমে ঢাকা দক্ষিণ করপোরেশন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর, দুটি বড় শহর সাভার ও কেরানীগঞ্জ, চারটি সেনানিবাস (ঢাকা, মিরপুর, সাভার ও রাজেন্দ্রপুর) নিয়ে গঠিত এবং কয়েকটি ছোট শহর ঢাকা সিটির অন্তর্ভুক্ত। দেশের ১০ শতাংশ জনসংখ্যা এই মেগা সিটিতে বাস করে। ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর গ্লোবাল সিটিস ইনস্টিটিউশন পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ২০৫০ সাল নাগাদ ঢাকা হবে বিশ্বের তৃতীয় জনসংখ্যাবহুল শহর এবং একই সময়ে জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩ কোটি ৫২ লাখ। এই অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ এবং এর পরিণতি ইতোমধ্যে রাজধানীবাসী অনুভব করছে। একটি দেশের জনসংখ্যা ওই দেশের সম্পদ হলেও এই অতিরিক্ত জনসংখ্যা রাজধানীর পরিবেশকে আরো দূষিত করছে, গবেষকরা বলছেন, ঢাকা শহরে মানুষ আসা বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। নদী ভাঙন, গ্রামাঞ্চলে কাজের সংকট, জলবায়ুর পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে মানুষের ঢাকার দিকে আসার পরিমাণ বরং আরো বাড়বে। কিন্তু মানুষ বাড়লেও ঢাকা শহরে নাগরিক সুবিধা বাড়ছে না বরং যে সব সেবা আছে তা বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা আবাসন সমস্যা। ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৫০ লাখ মানুষ বস্তিতে বাস করে যাদের সুপেয় পানির সরবরাহ, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ও গোসলের ব্যবস্থা নেই।

রাষ্ট্রপুঞ্জ বলছে, পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রতি বছর গড়ে ৮ দশমিক ৩ কোটি হারে বাড়ছে। এই হার আগামী দিনেও চলতে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। জনসংখ্যা বাড়ার কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর অভাবই একমাত্র কারণ এবং বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সমস্যা যেমন : পরিবেশ দূষণ, মাদকাসক্তি, শিক্ষার অভাব ইত্যাদি সমস্যার কারণ অধিক জনসংখ্যা। বেকারত্ব থেকে পরিবেশ দূষণ, মাদকাসক্তি থেকে জঙ্গিবাদের উত্থান এ সবের মূলে রয়েছে জনসংখ্যার আধিক্য। অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়বহুল শিক্ষাব্যবস্থা, পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্রের সুযোগ না থাকা ও সীমিত সম্পদের কারণে দেশের এই বিপুল জনসংখ্যা বোঝা হয়ে পড়ছে। আমাদের দেশে বেশিরভাগ দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একটু ভেবে দেখুন আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জনসম্পদ কোনো কাজে আসছে না কারণ খেয়াল করলে দেখা যাবে যে, শিক্ষিত পরিবারের সদস্য সংখ্যা যতটাই কম অশিক্ষিত পরিবারের সদস্য সংখ্যা ঠিক ততটাই বেশি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাক্কলন অনুযায়ী গ্রামাঞ্চলের ৪৭.১% লোক দারিদ্র্যসীমা এবং ২৪.৬% লোক চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। অপরদিকে শহরাঞ্চলের ৪৯.৭% দারিদ্র্যসীমা এবং ২৭.৩% চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। গড়ে দেশের ৪০% জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এদের পুনর্নির্বাসন না হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ দেশে আছে প্রায় ৮০ লাখ পথ শিশু। যাদের প্রয়োজন শিক্ষা, বাসস্থান, খাবার, কাপড়। এদের অবহেলায় রেখে কখনো দেশ এগিয়ে যেতে পারবে না। জনসংখ্যাবহুল এই দেশে দরিদ্রদের পুনর্নির্বাসন হলেই দেশ উন্নত হবে। সুতরাং সচেতনতা ও শিক্ষিত জনসম্পদ এর পাশাপাশি সরকার ও জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতা জনসংখ্যা সমস্যার সমাধান অন্যতম উপায় হতে পারে।

লেখকদ্বয় যথাক্রমে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক ও গবেষণা শিক্ষার্থী।