স্কুলে শিক্ষার্থী নির্যাতনের শেষ কোথায়?

আগের সংবাদ

শিক্ষা, সচেতনতাই গড়তে পারে শক্তিশালী জনসম্পদ

পরের সংবাদ

ইন্টারনেট আসক্তি ও তরুণ সমাজ

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১০, ২০১৮ , ৭:৪৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ১০, ২০১৮, ৭:৪৫ অপরাহ্ণ

আবু আফজাল সালেহ

উপপরিচালক (বিআরডিবি) লালমনিরহাট।

ফেসবুকের আসক্তি কমাতে স্কুলে স্কুলে সচেতনতা-প্রচার শুরু করলে এখনকার তরুণ প্রজন্মকে ওই কুপ্রভাব থেকে রক্ষা করা যাবে। স্কুলগুলোতে কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। কর্মশালায় ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার কুফল নিয়ে আলোচনা, পাঠচক্র করা যেতে পারে। ইন্টারনেটের কুফল থেকে সন্তানদের বাঁচাতে বিকল্প হিসেবে খেলাধুলা বা পরিবারের সদস্যদের সময় দেয়া একান্ত প্রয়োজন। প্রতিদিন বিকেলে পড়া শেষে তাকে খেলাধুলার সময় দিতে হবে। শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন।

হাতের অন্ধকারে আলোকিত পৃথিবী দেখা, ঘুম ঘুম চোখে রঙিন দুনিয়ায় প্রবেশ ইত্যাদি তারুণ্যকে ক্রমেই ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ইন্টারনেট আসক্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অনেকে বলেন যে, মাদকের পরিবর্তিত সংস্করণ হচ্ছে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বা ইন্টারনেটে অকারণে অতিমাত্রায় আসক্তি। মনোবিজ্ঞানী ও গবেষকরা বলছেন যে, একান্ত ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি যারা শেয়ার করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুদের সমবেদনা দিয়ে থাকেন এ ব্যাপারে উভয়ই অতিমাত্রায় ফেসবুক বা যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত। বলা হচ্ছে, সপ্তাহে ৩৮ ঘণ্টার বা এর বেশি যারা সামাজিক মাধ্যমে ডুবে থাকেন তাদের আসক্তি বলা যায়। মাদক ছাড়া যেমন অনেকে থাকতে পারেন না, সেরূপ ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়া থাকতে পারেন না! নেট সমস্যা বা কিছু সময়ের জন্য এ সব মাধ্যম বন্ধ থাকলে হতাশায় রি-অ্যাকশন দিয়ে পোস্ট দেন তাদের মোটা দাগে আসক্ত বলা যায়! যে সব ফেসবুক ব্যবহারকারী একাকিত্বে ভোগেন তারাই ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে বেশি স্ট্যাটাস দেন। প্রেম বা অন্য ক্ষেত্রে ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে বা যারা অযথা ফেসবুক তর্কে লিপ্ত হয় বা প্রশ্ন ছুড়ে উত্তর আশা করে তারাও ফেসবুকে অতিমাত্রায় আসক্ত। দেখা যায় খেলা বা কিছুকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগত চরিত্র হননে লিপ্ত থাকে, পারস্পরিক মতামতে অসহিষ্ণু বা অযথা ইস্যু তৈরি করে পারস্পরিক বা অন্যের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে (যেখানে নিজের লাভ লোকসান নেই) গালিগালাজ বা চরিত্রহননের চেষ্টা করে থাকে অনেকে। ফেসবুকে অতিমাত্রায় আসক্ত হলে ‘কাজ নেই তো খই ভাজ’ অবস্থা সৃষ্টি হয়। এটা আমাদের দেশে অতিমাত্রায় হচ্ছে এবং ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে। এ অবস্থা কিন্তু উন্নত বিশ্বে (যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ কান্ট্রিতে) বেশি নেই। কুরুচিপূর্ণ এ অবস্থা বাংলাদেশ এবং ভারতে বেশি। এটা ইন্টারনেটের অপব্যবহার বলা যেতে পারে। এর মধ্য দিয়ে আমরা পারস্পরিক একটা অসহিষ্ণু স্টুডেন্ট কমিউনিটি তৈরি করছি। যারা আগামীতে দেশকে নেতৃত্ব দেবে, সমাজকে নেতৃত্ব দেবে। সে জায়গায় তারা নেতৃত্ব দিতে পারবে না, কারণ তারা সামাজিকভাবে অসুস্থ। এমন কমিউনিটি কখনো একটা বৃহৎ কমিউনিটিকে লিড দিতে পারে না। ফুটবল বিশ্বকাপেও দেখলাম এ অসহিষ্ণুতা!

যারা আসক্ত তাদের যে সব শারীরিক সমস্যা হয় বলে চিকিৎসকরা বলে থাকেন তা হলো- পিঠে ব্যথা, মাথাব্যথা, মেরুদণ্ড সমস্যা, ওজনে ভারসাম্য নষ্ট, ঘুমের ব্যাঘাত, চোখে ব্যথা বা কম দেখা ইত্যাদি। ইন্টারনেটের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ কম্পিউটার নিয়ে বেশির ভাগ সময় কাটায় এবং সেই সময়টুকুর জন্য নিজেরাই মূল্য পরিশোধ করে। কম্পিউটার ও ইন্টারনেট আজ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সংবাদ, তথ্য, যোগাযোগ, কেনাকাটা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক, বিনোদন ইত্যাদি অনেক কিছুর জন্য মানুষ এখন ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কেউ যদি ইন্টারনেটের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি আজকের যুগের একটি অত্যন্ত জটিল সমস্যা ও অভিশাপ। অন্যান্য নেশার মতোই এটি একটি সর্বনাশা নেশা, যা ব্যক্তির সামাজিক, পারিবারিক ও পেশাগত জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। ইন্টারনেট ছাড়া থাকতে না পারা, বাদ দিতে গেলে দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা ও অন্যান্য সমস্যা আসা। মাত্রাতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাভাবিক, পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত জীবনকে ব্যাহত করা। এতে করে শারীরিক প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায় ঘাড় ও কোমরব্যথা, মাথাব্যথা এবং চোখে অস্বাভাবিক চাপজনিত সমস্যা হচ্ছে। মানসিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে- অনিদ্রা, অতিরিক্ত টেনশন বোধ, বিষণ্ণতা, যৌন সমস্যা, অপরাধপ্রবণতা, মনোযোগ কমে যাওয়া।

সন্তানকে শান্ত রাখতে মুঠোফোনসহ নানা যন্ত্রপাতি তাদের হাতে তুলে দেন ব্যস্ত বাবা-মায়েরা। এ থেকে সন্তানের মধ্যে প্রযুক্তি উপভোগ করার অভ্যাস জন্মায়। অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে সন্তানকে সব সময় ঘরে বন্দি রাখতে চান। নিজের চোখের সামনে দেখতে চান। সে ক্ষেত্রে তাদের হাতে মুঠোফোন-ল্যাপটপ তুলে দিয়ে আপাত স্বস্তি অনুভব করেন, যা শিশু-কিশোরদের যন্ত্রের প্রতি আসক্ত করে ফেলে। বাবা-মা নিজেরাও সারা দিন ইন্টারনেট নির্ভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মগ্ন থাকেন। সন্তানরা এতে উৎসাহিত হয়। কখনো কখনো কিছু বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপাদান শিশুদের প্রযুক্তি বা গেমের প্রতি আসক্ত করে তুলতে পারে। অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তি মানসিক রোগের সৃষ্টি করে। আক্রান্ত শিশুরা খিটখিটে মেজাজের হয়, মিথ্যে কথা বলে এবং সবার সঙ্গে অহেতুক তর্কে লিপ্ত হয়। এ ছাড়া স্কুলের রেজাল্ট দিন দিন খারাপ হতে থাকে। শিশুকে আত্মকেন্দ্রিক, অসহনশীল ও অসামাজিক করে। শিশুর বুদ্ধির বিকাশে বাধা দিয়ে সৃষ্টিশীলতা নষ্ট করে দেয়, শিশুর শারীরিক খেলাধুলার সময় কেড়ে নেয়। এতে শিশুরা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, শিশু শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে দেয়।

শিশুদের ফেসবুকের আসক্তি কমাতে অভিভাবকরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সন্তানকে অবশ্যই সময় দিতে হবে। সন্তান কখন কি করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে চলছে সে বিষয়ে খোঁজ নিতে হবে। সপ্তাহে অন্তত একদিন তাকে বাইরে বেড়াতে নিয়ে যান। শিশুকে গুণগত সময় দিন। মা-বাবা নিজেরাও যদি প্রযুক্তির প্রতি আসক্ত থাকেন, তবে সবার আগে নিজের আসক্তি দূর করুন। ফেসবুকের আসক্তি কমাতে স্কুলে স্কুলে সচেতনতা-প্রচার শুরু করলে এখনকার তরুণ প্রজন্মকে ওই কুপ্রভাব থেকে রক্ষা করা যাবে। স্কুলগুলোতে কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। কর্মশালায় ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার কুফল নিয়ে আলোচনা, পাঠচক্র করা যেতে পারে। ইন্টারনেটের কুফল থেকে সন্তানদের বাঁচাতে বিকল্প হিসেবে খেলাধুলা বা পরিবারের সদস্যদের সময় দেয়া একান্ত প্রয়োজন। প্রতিদিন বিকেলে পড়া শেষে তাকে খেলাধুলার সময় দিতে হবে। শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন। সব কিছু খোলামেলা আলোচনা করুন। তাহলে অনেক সমস্যাই সমাধান হয়ে যাবে। শিশুদের জন্মদিন কিংবা বিশেষ দিনে শিশুদের বই উপহার দিন। তাকে আস্তে আস্তে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। বই পড়লে একে তো জ্ঞান বাড়বে অন্যদিকে ফেসবুকের আসক্তি কমবে। সম্ভব হলে শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন মোবাইল। শিশুদের হাতে মোবাইল না দেয়া গেলেই ভালো। ১৮ বছরের নিচের সন্তানের ইন্টারনেটের যাবতীয় পাসওয়ার্ড জানুন। তবে লুকিয়ে নয়, তাকে জানিয়েই তার নিরাপত্তার জন্য পাসওয়ার্ডটি আপনার জানা দরকার; এটি বুঝিয়ে বলুন। বাসার ডেস্কটপ কম্পিউটারটি প্রকাশ্য স্থানে (কমন এরিয়া) রাখুন। শিশু যাতে আপনার সামনে মুঠোফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ ইত্যাদি ব্যবহার করে, সেদিকে গুরুত্ব দিন। নিরাপত্তামূলক অনেক সফটওয়্যার আছে। সেগুলো ব্যবহার করুন, যাতে আপনার বাসার সংযোগ থেকে কোনো নিষিদ্ধ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা না যায়।

আবু আফজাল সালেহ : উপপরিচালক (বিআরডিবি) লালমনিরহাট।