চট্টগ্রামে ম্যাক্স হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযান

আগের সংবাদ

নেত্রকোনায় স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীর যাবজ্জীবন

পরের সংবাদ

জয় ধরে রাখতে চায় আ.লীগ : আলোচনায় খালেদা জিয়া

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ৮, ২০১৮ , ৪:৫১ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ৮, ২০১৮, ৪:৫১ অপরাহ্ণ

দিনাজপুর সদর উপজেলার ১০ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত দিনাজপুর-৩ আসনটি প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ আসন। জেলার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে এই আসনটিতে কোনো রাজনৈতিক দলই একাধারে বেশি দিন রাজত্ব চালাতে পারেনি। কখনো আওয়ামী লীগ আবার কখনো বিএনপি এই আসনটিতে জয়লাভ করেছে। ফলে এ আসনে প্রার্থী মনোনয়নের ব্যাপারে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে প্রতিটি রাজনৈতিক দলই। অতীত ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে প্রার্থী বিবেচনায় এই আসনের মানুষ ভোট দিয়ে থাকেন। তাই এ আসনে প্রার্থী মনোনয়নে ভুল করতে চান না রাজনৈতিক দলগুলো। গুরুত্বপূর্ণ আসন হওয়ায় এবারো জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে চায় আওয়ামী লীগ, আর হারানো আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি। ২০ দলীয় জোটের শরিক জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধানের মৃত্যুর পর এই হারানো আসনটি পুনরুদ্ধারে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে প্রার্থী করতে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে জেলা বিএনপিসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতারা। বিভিন্ন মামলায় খালেদা জিয়া জেলে থাকায় বিকল্প প্রার্থী হিসেবে পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমকে প্রার্থী করার চিন্তা-ভাবনা চলছে বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়। অপরদিকে সদর ৩ আসনের এমপি ও জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম ইতোমধ্যে তার নির্বাচনী এলাকায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজ করে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নিয়েছেন। নির্বাচনী আলাপচারিতায় দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বরূপ বকসী বাচ্চু ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নাজির হোসেন নাজু বলেন, জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম তার নির্বাচনী এলাকা দিনাজপুর সদর আসনে যে নজিরবিহীন উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন তা অকল্পনীয়। এ আসনে এখনো তার বিকল্প কোনো প্রার্থী তৈরি হয়নি। তিনিই একমাত্র হেভিওয়েট প্রার্থী।
দিনাজপুরের এই সদর আসনটিতে স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ ৫ বার, বিএনপি ৩ বার এবং জাতীয় পার্টি একবার জয়লাভ করেছে। এর মধ্যে ১৯৭৩ সালে এখানে আওয়ামী লীগ থেকে এডভোকেট আমজাদ হোসেন (প্রয়াত), ১৯৭৯ সালে বিএনপির এস এ বারী এটি (প্রয়াত), ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের এডভোকেট আমজাদ হোসেন (প্রয়াত), ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির এড. মোখলেসুর রহমান (প্রয়াত), ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের এম আব্দুর রহিম (প্রয়াত), ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী খুরশীদ জাহান হক (প্রয়াত) এবং ২০০৮ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে ইকবালুর রহিম বিজয়ী হন। নির্বাচনে বিজয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এবারো এই আসনটি পেতে চায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। বর্তমান সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের অবস্থান অনেক শক্তিশালী। অপরদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের বড় বোন সাবেক মন্ত্রী খুরশীদ জাহান হকের মৃত্যুর পর এ আসনে প্রার্থী সংকটে ভুগছে বিএনপি। সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার মতো ভালো প্রার্থী না থাকায় খালেদা জিয়াকেই বেছে নেয় জেলা বিএনপি। তবে তিনি বর্তমানে জেলে থাকায় পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমকে প্রার্থী করার চিন্তা-ভাবনা করছে দলীয় হাইকমান্ড। তা না হলে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন অতিথি নেতারা। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ শফি রুবেল মোটামুটি চ‚ড়ান্ত।
১৯৯৬ ও ২০০১ সালে এই আসনটি দখলে ছিল বিএনপির। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের কাছ থেকে আসনটি ছিনিয়ে নেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবালুর রহিম। ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো জয়লাভের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে জাতীয় সংসদের হুইপ নির্বাচিত করে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দেন। ২০০৮ সাল থেকে বিজয় লাভ করা এই আসনের সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ও মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের চেয়ারম্যান এডভোকেট এম আব্দুর রহিমের ছেলে। হুইপ ইকবালুর রহিমের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা বেশ দৃঢ়। দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনি সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে থাকেন। এ ছাড়া সামাজিক কর্মসূচিতেও তার ব্যাপক অংশগ্রহণ রয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গের হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য মানবপল্লী নামে পৃথক আবাসন ব্যবস্থা নির্মাণ করা, বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণ ও সামাজিক কর্মকান্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় ওয়ার্ল্ড লিডারশিপ ফেডারেশন (ডব্লিউএলএফ) সোশ্যাল ইনোভেটর ক্যাটাগরিতে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। এ ছাড়া জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী সমাবেশে লাখো মানুষের সমাগম ঘটিয়ে আলোচিত হয়েছেন তিনি। সম্প্রতি তিনি দিনাজপুর গোর-এ শহীদ বড় ময়দানকে দেশের সর্ববৃহৎ ঈদগাহ ময়দানে রূপান্তরিত করেছেন, যা সারা দেশে প্রশংসনীয়। ইতোপূর্বে সদর উপজেলার প্রতিটি বাড়িতে শতভাগ বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া সম্পন্ন হয়েছে। সরকারি ছাড়াও নিজস্ব তহবিল থেকে গরিব ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি দেয়া এবং লেখাপড়ার ব্যবস্থা করায় ব্যাপক সুনাম রয়েছে হুইপ ইকবালুর রহিমের। তার পরিকল্পনায় আত্রাই নদীর ওপর দেশের সর্ববৃহৎ রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে, যা হাজার হাজার কৃষকের ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজকে আধুনিকায়ন করে এই এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া তার নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাÐ সম্পন্ন করেছেন। জাতীয় সংসদের হুইপ থাকা সত্তে¡ও তার নির্বাচনী এলাকায় তিনি যথেষ্ট সময় দিয়ে থাকেন।
আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে হুইপ ইকবালুর রহিম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী সুখী, সমৃদ্ধশালী তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে নির্বাচনী এলাকায় সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। দলীয় মনোনয়ন পেলে আবারো বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন এবং জনগণের সব ধরনের উন্নয়নে পাশে থাকার প্রতিশ্রæতি ব্যক্ত করেন।
এদিকে দলীয় কার্যক্রমে কিছুটা ভাটা পড়লেও এই আসনটি পুনরুদ্ধার করতে চায় বিএনপি। ২০০১ সালে খুরশীদ জাহান হক এই আসন থেকে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হওয়ার পর মহিলা ও শিশুবিষয়কমন্ত্রী হন। আর তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় বোন হওয়ার সুবাদে দিনাজপুরে শিক্ষা বোর্ড, জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালসহ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কাজ করেছেন তিনি। তার এই উন্নয়ন কর্মকান্ডের জন্য আবার বিএনপি এই আসনটি পুনরুদ্ধার করতে চান। কিন্তু তার মৃত্যুর পর এখানে বিএনপির প্রার্থিতায় শূন্যতা দেখা দেয়। আর এ শূন্যতায় ২০০৮ সালে পঞ্চগড় থেকে ডেকে এনে এ আসন থেকে প্রার্থী করা হয় জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সভাপতি শফিউল আলম প্রধানকে। কিন্তু এই অতিথি প্রার্থী শফিউল আলম প্রধান (প্রয়াত) আওয়ামী লীগের ইকবালুর রহিমের কাছে পরাজিত হন। এ ক্ষেত্রে এই শূন্যতায় আসনটি পুনরুদ্ধারে খালেদা জিয়া প্রার্থী হবেন এমন আশা ছিল দলটির অধিকাংশ নেতার। আর যদি এ আসনে তিনি প্রার্থী না হন সে ক্ষেত্রে আরো ৪ জনের নাম শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক লুৎফর রহমান মিন্টু, দিনাজপুর পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম এবং প্রয়াত মন্ত্রী বেগম খুরশিদ জাহান হকের বড় ছেলে শাহরিয়ার আকতার হক ডন। এ ছাড়া তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানেরও নাম শোনা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে দিনাজপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এ জেড এম রেজওয়ানুল হক জানান, এখন পর্যন্ত তিনি যেটা জানেন, সেটা হলো দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াই এ আসন থেকে নির্বাচন করবেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত দিনাজপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনিও চান দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াই এ আসন থেকে নির্বাচন করুক। যদি তিনি এ আসনে প্রার্থী হন তাহলে বিএনপি থেকে কারোই প্রার্থী হওয়ার প্রশ্ন আসে না। আর যদি না হন, সে ক্ষেত্রে তিনি বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন।
তিনি জানান, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আমলেও এই এলাকার ভোটাররা অনেক ঝুঁকি নিয়েও ধানের শীষ প্রতীকে তাকে দ্বিতীয়বারের মতো দিনাজপুর পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত করেছেন। শুধু পৌরসভা নয়, গোটা সদর উপজেলার মানুষ তাকে ভালোবাসেন এবং ভোট দিতে চান। মনোনয়ন পেলে আসনটি পুনরুদ্ধার করে বিএনপিকে উপহার দিতে পারবেন বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে জাতীয় পার্টি। গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী দিনাজপুর জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ শফি রুবেল। বিনয়ী ও সর্বদা হাসোজ্জ্বল জাতীয় পার্টির এই নেতা আহমেদ শফি রুবেল জানান, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী প্রার্থী হতে কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য তাকে বলা হয়েছে। এ জন্য তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি জানান, দিনাজপুরের এ আসনে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে কোন্দল আছে, যা জাতীয় পার্টিতে নেই। তিনি দাবি করেন, দিনাজপুরে যতই উন্নয়ন ঘটুক, তার সূচনা হয়েছে জাতীয় পার্টির আমল থেকে। সে ক্ষেত্রে এই আসনের মানুষের জাতীয় পার্টি এবং সফল রাষ্ট্রনায়ক এইচ এম এরশাদের প্রতি দুর্বলতা আছে। এ ইমেজকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে বিজয়ী হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।