এ দায়ভার কে নিবে?

আগের সংবাদ

কোটা সংস্কার আন্দোলন : ধৈর্য ও সহনশীলতাই কাম্য

পরের সংবাদ

বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থা ও একটি নিদান

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ৭, ২০১৮ , ৮:০৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ৭, ২০১৮, ৮:০৮ অপরাহ্ণ

অমিত গোস্বামী

কবি ও লেখক

২০১৫ সালের ১০ এপ্রিল ‘চিকিৎসায় বিদেশ নির্ভরতা উত্তরণ’ শিরোনামে এই পত্রিকায় সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছিল। প্রেক্ষিত বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থা। সম্পাদকীয়তে যা বলা হয়েছে তা আজো বহমান। বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে অনেক নিউজ প্রিন্ট খরচ হয়েছে। পারস্পরিক দায় চাপানোর সেই দস্তুর এখনো কেউ পরিত্যাগ করতে পারেননি। প্রথমে দেখে নেয়া যাক বাংলাদেশের সরকারি চিকিৎসা সংক্রান্ত কিছু তথ্য।

১৯৯৪ সালে প্রকাশিত একটা গবেষণাপত্র থেকে ডাটা নিয়ে নতুন রিসার্চ পত্র তৈরি করে জুলাই, ২০১৭ সংখ্যায় ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল থেকে প্রাপ্ততথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৬.১২ কোটি। ২০১৫ সালে মোট ১৭ কোটি ৮৬ লাখ ৯৭ হাজার ৯৫৮ বা ১৭.৮৭ কোটি রোগী দেশের সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন (DGHS ২০১৬)। এর মানে হলো দেশের মোট যে জনসংখ্যা তার চেয়ে বেশি মানুষ বহির্বিভাগে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছে। অর্থাৎ কিছু মানুষ একই বছরে কয়েকবার গিয়েছেন। বাংলাদেশে মোট রেজিস্টার্ড ডাক্তার ৭৮ হাজার এবারে আসুন একটা মজার হিসাব করা যাক। সরকারি সার্ভিস আটটা থেকে দুটো পর্যন্ত মোট ছয় ঘণ্টা হলে এবং শুক্রবার ও অন্য ছুটির দিন বাদ দিলে বছরে ৩০০ দিন ছয় ঘণ্টা করে হলে একেকজন ডাক্তারের মোট সার্ভিস হয় বছরে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮০০ ঘণ্টা। তাহলে বহির্বিভাগে যে ১০ হাজার ডাক্তার রোগী দেখেন তাদের মোট সার্ভিস হয় কত ঘণ্টা? এক কোটি আশি লাখ ঘণ্টা। আগেই উল্লেখ করেছি যে ২০১৫ সালে ১৭.৮৭ কোটি রোগী দেশের সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাহলে দেখা যাক প্রতি রোগীর দেখার জন্য কত সময় পেছেন ডাক্তাররা।

সব ডাক্তার যদি তাদের কর্ম ঘণ্টার সবটুকু সেকেন্ডই রোগীকে দেয়, অর্থাৎ মেশিনের মতো বিরতিহীন একনাগাড়ে কাজ করে, তবে তারা সর্বোচ্চ একজন রোগীকে সময় দিতে পারবে ৬.০৪ মিনিট বা ৩৬৪ সেকেন্ড। এটা অঙ্কের হিসাব। কিন্তু বাস্তবে এই ৩৬৪ সেকেন্ডও কি ডাক্তাররা রোগীকে দিতে পারেন? সম্ভব নয়। হাসপাতাল বা সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে ডাক্তারকে শুধু চিকিৎসা দেয়াই নয়, আরো কিছু কাজ সরকারি নিয়মে করতে হয়। কাজেই সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রতি রোগীর ডাক্তারদের থেকে প্রাপ্ত সময় আরো অনেক কম। এবারে আসি সরকারি-বেসরকারি সব নিয়ে। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল বলছে যে বাংলাদেশে যে পরিমাণ ডাক্তার আছে, তাদের দিয়ে রোগী দেখা ও অন্যান্য কাজ মিলে রোগী প্রতি ১৫০ সেকেন্ডের বেশি সার্ভিস দেয়ানো সম্ভব না।
কাজেই চিকিৎসা সংক্রান্ত এই আহাজারি থেকেই যাচ্ছে। সংবাদপত্রে প্রায়ই চিকিৎসাব্যবস্থার নেতিবাচক সচিত্র চালচিত্র দেখে মানুষ কেবল হতাশই হয়। দেশের জনগণও নেতিবাচক চিকিৎসা ব্যবস্থার সংবাদ পাঠ করে, অভিযোগ ওঠে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা যতই উন্নত কিংবা আধুনিক হোক না কেন, তা দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে থাকে সব সময়। অভিযোগ করা হয়ে থাকে, সরকারি হাসপাতালের একশ্রেণির অসাধু ডাক্তার থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট অসাধু ব্যক্তিদের বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে নিবিড় একটা সম্পর্ক থাকে। সম্পর্কটাকে অনৈতিক এই জন্য বলা হয়ে থাকে যে, সরকারি হাসপাতালের একশ্রেণির অসাধু ডাক্তার থেকে শুরু করে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ব্যস্ত থাকেন সরকারি হাসপাতালে আসা একজন রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে কমিশন খেয়ে নিজেদের পকেট ভারী করার কাজে। সংবাদপত্রে প্রায়ই প্রকাশিত হয়, মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে আইসিইউ বাণিজ্য আজকাল ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সেখানে বিন্দুমাত্রও মানবিকতার কোনো স্থান নেই। যে যেমনভাবে পারছে অসহায় রোগীদের নিয়ে এই অমানবিক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রকাশিত খবরে বলা হয়, দেশের রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোর ইনটেনসিভ কেয়ার অর্থাৎ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে একজন রোগীর স্থান পাওয়া আর সোনার হরিণ লাভ করা সমান কথা। দেশের হাসপাতালের আইসিইউ কেন্দ্রগুলোতে আসন সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। রোগীর স্বজনরা যখন রোগীদের জন্য আসন বরাদ্দ করতে পারেন না, তখনই সুযোগ বুঝে সক্রিয় হয়ে উঠে যারা এই আইসিইউ-ই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসকের কোথায় অবস্থান, আমরা সবাই তা বুঝতে পারি। এখানে বলে রাখা ভালো, সব চিকিৎসককে একই দোষে দোষী করা যায় না। কিছু সংখ্যক অর্থলোভী চিকিৎসকের কারণে পুরো চিকিৎসক সমাজ বিব্রত হচ্ছেন। দেশের বেশিরভাগ চিকিৎসক সরকারি চাকরির পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর সেবা দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া কোনো উপায়ও নেই। চিকিৎসকদের সরকারি চাকরি করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত চেম্বার এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসাসেবা দিয়ে আয়ের সুযোগ আছে, যা অন্য অনেক পেশার লোকদের নেই। সেই সুযোগ নেয়া ডাক্তারদের অপরাধ নয়।

মুমূর্ষু একজন রোগী এবং তার স্বজনদের কাছে একজন চিকিৎসক ত্রাণকর্তা হিসেবে আবিভর্‚ত হন। অথচ সেই ত্রাণকর্তার ভ‚মিকায় আবিভর্‚ত চিকিৎসকই বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার নামে অনেক অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের নাম লিখে দিচ্ছেন। কেননা তার নির্দিষ্ট করা ল্যাব থেকে পরীক্ষা করার ফি বাবদ নেয়া অর্থ থেকে একটা অংশ পেয়ে থাকেন। বিষয়টা কতটা অনৈতিক, তা একটু ভেবে দেখা দরকার। পাশাপাশি দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যে হারে প্রতিযোগিতা করে চিকিৎসকদের বিভিন্ন উপহারসামগ্রী প্রদান করছে, সেটাও কতটা শোভনীয়? আগে নতুন কোনো ওষুধ এলে তা চিকিৎসকদের কাছে পরিচিত করার জন্য সেই কোম্পানির পক্ষ থেকে নমুনা হিসেবে দেয়া হতো, যা একজন চিকিৎসক পর্যবেক্ষণ করে তা রোগীদের ব্যবহার করার পরামর্শ দিতেন। অথচ বর্তমানে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এমন কোনো গৃহস্থালি সামগ্রী নেই, যা চিকিৎসকদের দিচ্ছে না।

রোগীরা কেন উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে যান? ভারতের চিকিৎসকদের চেয়ে দেশের চিকিৎসকদের মান কোনো অংশেই কম নয়। তা হলে যান কেন? এক কথায় বুঝিয়ে দিচ্ছি। কোনো রেস্তোরাঁয় গেলে খাওয়ার অর্ডার দুভাবে দেয়া যায়। এক হলো আলাকাট ভিত্তিতে অর্থাৎ প্রতিটি পদের জন্য আলাদা অর্ডার আলাদা পেমেন্ট আরেকটি হলো থালি অর্থাৎ একটি থালিতে বিভিন্ন পদ দিয়ে আপনাকে দেবে এবং এর দাম নির্দিষ্ট। বাংলাদেশে আলাকাট সিস্টেম ভারতে থালি অর্থাৎ প্যাকেজ সিস্টেম। কাজেই ভারতে খরচ কম এবং ডাক্তারদের ব্যবহার অবশ্যই ভালো। কারণ এখানে আইন তুলনামূলকভাবে কড়া।

যে সম্পাদকীয় উল্লেখ করে এই নিবন্ধ শুরু করেছিলাম তার প্রেক্ষিত ছিল ২০১৫ সালের এপ্রিলের প্রথমদিকে গাজীপুরে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে নার্সিং কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ। তিনি সেখানে বলেন, চিকিৎসা গ্রহণে বিদেশ নির্ভরতা পরিত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কিছু মানুষ আছেন যারা তাদের সামান্য একটু অসুখ হলেই চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। কেন আমরা চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাব? আর কেন এ দেশে আন্তর্জাতিকমানের হাসপাতাল গড়ে উঠবে না? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাশা মতো আরো বেশকিছু বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে উঠলেও তারা কোনো দিক দিয়ে আন্তর্জাতিক মান ছুঁতে পারেনি। বরং বদনাম ডেকে আনছে বর্তমান সরকারের। তাই এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো অধিক। রাষ্ট্রই পারে তার সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করে এমন চিকিৎসা বাণিজ্যের সিন্ডিকেটের বড় বড় রাঘব-বোয়ালের কঠিন শাস্তি দিয়ে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে শুদ্ধ করতে। কিন্তু এই সমস্যা সমাধান হবে কি করে? চিকিৎসকের অপ্রতুলতা, অবকাঠামোর অভাব, বেনিয়া মানসিকতা সে সমস্যা থেকে উদ্ধার পাব কি উপায়ে? শুরুতেই উল্লিখিত সম্পাদকীয়তে এ সমস্যা সমাধানের নিদান দেয়া হয়েছে এই বলে, ‘প্রয়োজন প্রতিটি বিভাগে একটি করে উচ্চ মানসম্পন্ন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা। ঢাকার বাইরে উন্নতমানের হাসপাতাল স্থাপনে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহ ও সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান সংরক্ষণে সরকারের মনিটরিং থাকতে হবে। দেশে চিকিৎসা শিক্ষার মান বাড়াতেও উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি পূরণে উচ্চ পর্যায়ের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে কিংবা বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ এনে আমাদের দেশের চিকিৎসকদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদের রোগীবান্ধব মানসিকতা তৈরিও একটি জরুরি বিষয়। সন্তোষজনক চিকিৎসাসেবা পেলে কেউ নিশ্চয়ই বেশি ব্যয়ে বিদেশে যেতে চাইবেন না।’ কথাগুলো তিন বছর পর আজ সমানভাবে প্রাসঙ্গিক নয়?

অমিত গোস্বামী : কবি ও লেখক