বিচারকাজ দ্রুত শুরু হোক

আগের সংবাদ

রোহিঙ্গা সমস্যায় চীনই বড় সহায়ক শক্তি

পরের সংবাদ

বাংলাদেশের জঙ্গিবাদী সংকট

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১, ২০১৮ , ৯:৩৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ১, ২০১৮, ৯:৩৮ অপরাহ্ণ

হারুন হাবীব

মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও সাংবাদিক

তরুণমতিদের মনে জঙ্গিবাদী তত্ত্ব যাতে বাসা না বাঁধে, তারা যাতে সঠিক ও ভুল পথের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে, সে লক্ষ্যে জাতীয় ভিত্তিতে ‘মোটিভেশন’ কার্যক্রম চালু করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, এই ভূখণ্ড ধর্ম বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আত্মার সম্পদ। একে আঘাত করা, একই সঙ্গে অপব্যবহার করা অগ্রহণযোগ্য।

মত ও মন্তব্য

এক সময় প্রায় সর্বজনীনভাবেই মনে করা হতো যে, জঙ্গিতত্তে¡ দীক্ষিত এসব তরুণ মূলত গ্রামীণ জনপদের অসচ্ছল পরিবার এবং মাদ্রাসা থেকে উঠে আসে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও সে লক্ষ্যেই তাদের কার্যক্রম চালিয়েছে। কিন্তু গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারির নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর হামলাকারীদের নতুন পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এসব ঘটনায় যারা জড়িত তারা প্রায় সবাই শহরাঞ্চলের উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত পরিবারের তরুণ। কাজেই জঙ্গিবাদের মোকাবেলা আগে যেভাবে ভাবা হয়েছে, এখন তা নতুন মাত্রায় দেখার বাধ্যবাধকতা বর্তেছে। সেই সঙ্গে এটিও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে যে, কেন এবং কোন পরিস্থিতিতে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের একটি অংশও জঙ্গিবাদে প্রলুব্ধ হচ্ছে।

মোটকথা, বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সময় পেরিয়ে গেছে। সমাজের স্থিতিশীলতা, জনজীবনের নিরাপত্তা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে সুরক্ষা দিতে হলে এই সন্ত্রাস মোকাবেলার বিকল্প নেই। এ দায়িত্ব কেবল সরকার কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একার নয়। একই সঙ্গে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগোষ্ঠীগুলোরও। সে কারণে দেশে জঙ্গিবাদ মোকাবেলার জন্য চাই সমন্বিত এবং সুচিন্তিত জাতীয় পরিকল্পনা। জঙ্গিবাদের যে চেহারা ও প্রবৃত্তি তাতে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সমাজশক্তিকেও এই সমন্বিত প্রচেষ্টায় যোগ দিতে হবে। আমার বিশ্বাস, সংকট মোকাবেলার কয়েকটি স্তর নির্ধারণ করা জরুরি। যেমন ১. আশু কার্যক্রম, ২, স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রম এবং ৩. দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম। এ সব কার্যক্রমের মধ্যে প্রশাসনিক, গোয়েন্দা ও পুলিশি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হলেও পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতার দিকটিও উপেক্ষার নয়। একই সঙ্গে আইনি, বিচারিক ও শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের বিষয়গুলোও ভাবতে হবে। জঙ্গিবাদের অর্থের উৎস, দেশি-বিদেশি পৃষ্ঠপোষক ও পরিকল্পনাকারীদের নিয়েও ভাবতে হবে। সংকটের মূলে যেতে হবে।

মোটকথা, নতুন পরিস্থিতিতে নতুন কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে। নতুন নীতিকার্যক্রম গ্রহণে অবশ্যই সমাজচিন্তাবিদদের ধ্যানধারণা গ্রহণ করতে হবে। কারণ বাংলাদেশের জঙ্গি তৎপরতা আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহে অনুপ্রাণিত হলেও হতে পারে, কিন্তু এর দেশজ কারণ ও উপাত্ত আছে। কাজেই দেশজ রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এর সুরাহার পথ খুঁজতে হবে। রাজনৈতিক বাদানুবাদ ভুলে সংকটের মূলে যেতে হবে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা সমুন্নত রেখে, অবাধ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে বিকাশমান ও দৃশ্যমান রেখে গোটা পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে হবে। কোনো ‘হাফ হার্টেট’ বা আংশিক মূল্যায়ন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সহায়ক হবে না।

সব গণতান্ত্রিক মহলই জানেন যে, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর বিগত পঁয়তাল্লিশ বছরে সত্যিকার অর্থে জাতীয় স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও চেতনার কার্যকর লালন সম্ভব হয়নি। ১৯৭৫ সালে জাতির জনকের নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং তিন মাসের মাথায় জেলখানায় চার জাতীয় নেতার হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার বিরুদ্ধে লাগাতার আক্রমণ শুরু হয়। সামরিক ও আধাসামরিক শাসনামলগুলোতে পরিকল্পিতভাবে ধর্মান্ধতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধবাদীদের পুনর্বাসন ঘটানো হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান বাহিনীর হাতে গড়া রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী সঙ্গোপনে এবং নানা নামে, সংঘবদ্ধ হতে থাকে। এদের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য আসতে থাকে ‘বিদেশি তহবিল’।

বিশ্বের নানা প্রান্তের ঘটনাবলির প্রভাবও একেবারে কম নেই। ইরানের ‘ইসলামি বিপ্লব’, আফগানিস্তানে মার্কিন প্রভাবিত রুশবিরোধী ‘তালেবানি বিপ্লব’ এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। তালেবান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে জঙ্গিতত্ত্ব বাংলাদেশের মাটিতে মাথাচাড়া দিতে শুরু করে। অন্যদিকে ‘আরব বসন্তের’ নামে পশ্চিমা শক্তির ইন্ধনে তিউনিশিয়া, ইরাক ও মিসর তছনছ হওয়ার পর দেশগুলোর পরিস্থিতি কট্টর ধর্মপন্থিদের হাতে চলে যায়। যা হোক, এ সব হচ্ছে বৈশি^ক পরিস্থিতি। এ সবের প্রভাব বাংলাদেশে পড়েনি; তা নয়। পাশ্চাত্যের নীতি-কর্মকাণ্ডের শক্ত সমালোচনার বিষয়টিও ‘রাজনৈতিক ইসলাম’-এর প্রবক্তারা ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে। দেশীয় পরিস্থিতিও জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করেছে। দৃশ্যতই বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী এই জঙ্গিবাদ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে আঘাত করতে উদ্যত হয়েছে।

কিছু সুপারিশ-১. জঙ্গিবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টি একটি বড় কাজ। এ কাজটি সরকার একা পারবে না। তাকে সঙ্গে নিতে হবে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ছাত্রশিক্ষককে, সিভিল সমাজের চিন্তাবিদদের, গণমাধ্যম, উদার ধর্মীয় নেতা ও ব্যবসায়ী শ্রেণির মানুষদের। মনে রাখতে হবে, দেশে যে জঙ্গি তৎপরতা শুরু হয়েছে তাকে রাতারাতি দমন সম্ভব নয়। সে কারণে ধারাবাহিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। ২. শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন সময়ের দাবি। দেশে আগেও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক টানাপড়েনে তা কার্যকর করা যায়নি। আমাদের ছেলেমেয়েরা বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি জানবে, উন্নত প্রযুক্তিতে যুক্ত হবে কিন্তু শিকড়হীন হবে না। কাজেই সাহসী উদ্যোগ নেয়ার বিকল্প নেই। জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে বহুবিধ বড় সংকট বর্তমান। এ সবকে সামলেই সাহসিকতার সঙ্গে তাকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হচ্ছে। এসব সংকট কেবলই দেশজ নয়, বিদেশের মাটি থেকেও তা অনেকাংশে আরোপিত। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন করা না গেলে, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষার প্রবর্তন না হলে, অদূর ভবিষ্যতে দেশকে আরো বেশি সংকটে পড়তে হবে। আজ যতটা হয়তো তার থেকেও অনেক বেশি।

৩. সে কারণে দেশের সব প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠ বাধ্যতামূলক করতে হবে। সব ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠ শুরু করতে হবে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন বাধ্যতামূলক করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার বিকাশ ঘটাতে হবে। এ সব ব্যবস্থার প্রয়োজন এ কারণেই জরুরি যে, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা শিক্ষার নামে গড়ে উঠা বিস্তর প্রতিষ্ঠানে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা কিছুটা ইংরেজি বা আরবি বলতে বা পড়তে পারে বটে কিন্তু তারা দৃশ্যতই জাতীয় গৌরবগাথা থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে এরা আত্মসচেতন বা আত্মগর্বিত হতে পারে না, একচোখা দৃষ্টিভঙ্গিতে শেকড়শূন্য খড়কুটোর মতো সংস্কৃতিবিহীন বেড়ে ওঠে। সম্ভবত সে কারণেই, ধর্মকে পুঁজি করে দেশীয় ও বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী রাজনৈতিক ফায়দা লুটার সুযোগ পায় এবং ‘জিহাদি রোমান্টিসিজমে’ তরুণমতিদের প্রলুব্ধ করতে পারে।

৪. বিদ্যমান সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন ও তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সময়ের প্রয়োজনে পুনর্গঠিত হতে হবে। বিগত কয়েক বছরে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে এসব সংস্থার সাফল্য যথেষ্টই। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জঙ্গিদের ধ্যানধারণা বা কৌশল থেকে তাদের নতুনভাবে গড়তে হবে। একই সঙ্গে ‘অনলাইন’ কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি বর্তাতে হবে, যাতে পরিকল্পিত ও সস্তা প্রচারণায় তরুণমতিরা প্রলুব্ধ না হয়।

৫. তরুণমতিদের মনে জঙ্গিবাদী তত্ত্ব যাতে বাসা না বাঁধে, তারা যাতে সঠিক ও ভুল পথের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে, সে লক্ষ্যে জাতীয় ভিত্তিতে ‘মোটিভেশন’ কার্যক্রম চালু করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, এই ভূখণ্ড ধর্ম বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আত্মার সম্পদ। একে আঘাত করা, একই সঙ্গে অপব্যবহার করা অগ্রহণযোগ্য। সে কারণে দেশের সব মসজিদ ও মাদ্রাসায় সংসদ সদস্য বা জনপ্রতিনিধিদের নিরপেক্ষ নজরদারি বর্তাতে হবে, যাতে সাধারণ সরলমতি মানুষকে জঙ্গিবাদী প্রবক্তারা প্রলুব্ধ করতে না পারে। (সংক্ষেপ্তি)

হারুন হাবীব : মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও সাংবাদিক।