এই দুর্ভোগ-দুর্দশার শেষ কোথায়?

আগের সংবাদ

আওয়ামী লীগের গাজীপুর জয় : অতঃপর?

পরের সংবাদ

দেশের অগ্রযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩০, ২০১৮ , ৭:০৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩০, ২০১৮, ৭:১৪ অপরাহ্ণ

বাহালুল মজনুন চুন্নূ

সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

‘বিজয় একাত্তর’ হল, সুফিয়া কামাল হল, ৭ মার্চ ভবনসহ আরো নানা ভবন তৈরি করা হয়েছে। ব্যাপকহারে করা হয়েছে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। শিক্ষাঙ্গনে বিরাজ করছে সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ। ফলে ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সেই সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা। এবারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের প্রতিপাদ্য ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে উচ্চশিক্ষা’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সামগ্রিক কল্যাণে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে ভূমিকা রেখে আসছে।

উচ্চশিক্ষার প্রচলন হয়েছিল সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতার প্রশিক্ষণের নিমিত্তে। একদিকে উচ্চশিক্ষা জ্ঞানের জগতে বহু নতুন জ্ঞানের সংযোজনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছে বিশ্ব জ্ঞানভাণ্ডার অন্যদিকে পেশাগত দক্ষতা সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে আর্থ-সামাজিক দিক দিয়ে সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছে সামনের দিকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই দেশের উচ্চশিক্ষার জগতে অনন্য এক নাম। বিদ্যার সাধনার তীর্থভূমি, মুক্তচিন্তার পাদপীঠ, গণতন্ত্রের সূতিকাগার এবং সর্বোপরি জাতির বিবেক হিসেবে বিবেচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যার সাধনার মাধ্যমে মানুষের মাঝে মানবিক সত্তার উন্নয়ন ঘটিয়ে আদর্শ আলোকিত মানুষে পরিণত করার প্রয়াস চালিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠাকালীন থেকেই। এ ছাড়া পেশাগত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি আর মৌলিক গবেষণার মাধ্যমে দেশ ও জাতির অগ্রগতিতেও রেখে আসছে অনন্য অবদান। তবে এর সবচেয়ে বড় অবদান বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রধান প্রভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। যদি বাঙালি জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করা হয়, তবে দেখা যাবে তা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একই সূত্রে গাথা। বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের প্রতিটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে। এই বিশ্ববিদ্যালয় ব্যতীত পৃথিবীতে আর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে বিশ্ববিদ্যালয় তার জাতিকে একটি পতাকা উপহার দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল জ্ঞানার্জনের চর্চা হয় না, এখানে মুক্তবুদ্ধির চর্চাও হয়। শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা হয় সচেতন নাগরিক হিসেবে। তাই তো যে কোনো অন্যায়-অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সূচনাকেন্দ্র হয়ে আসছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মহান একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল নেতৃত্বের অগ্রভাগে। এ দেশের আশা-ভরসার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আপন ভূমিকায় সর্বদাই সমুজ্জ্বল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়, এর ইতিহাস এই বাংলার মানুষের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক বিবর্তনের ইতিহাস, পরাধীনতার শিকল ভেঙে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনার ইতিহাস। যখনই জাতির আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা দেখা দিয়েছে তখনই এই শিক্ষায়তনের ছাত্র-শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেই দুর্যোগের মোকাবেলায়। এর মূলে কাজ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও শিক্ষা। তাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিলেন, গ্রহণ করেছিলেন নানা উদ্যোগ। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও অগ্রগতির বিষয়ে সদা সজাগ থেকে গ্রহণ করে চলেছেন অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আলোকিত মানুষ তৈরি করার জন্য যা অদ্যাবধি অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গেই করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরুর পর থেকেই পূর্ব বাংলার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন আসতে থাকে। প্রতিষ্ঠাকালীন থেকেই এ বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, শিল্পকলা এবং রাজনীতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদান ও চর্চার ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে আসছে। একবার রবীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেসা করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংজ্ঞা কি? কবি ছোট্ট উত্তরে বলেছিলেন, যেখানে বিদ্যা উৎপন্ন হয়। বিশ^বিদ্যালয় হলো জ্ঞানচর্চার জায়গা। এখানে যুক্তি, তর্ক ও গবেষণার মধ্য দিয়ে নতুন কিছু বেরিয়ে আসবে। প্রচলিত জ্ঞানকে ভিত্তি করে নতুন নতুন জ্ঞান কিংবা উদ্ভাবনই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ। এই কাজ অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সূচনালগ্ন থেকে করে আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দক্ষ পেশাজীবী তৈরিতেও এর ভূমিকা অনন্য। তবে পেশাগত জীবনের ভিত্তিই কেবল নয়, মুক্তবুদ্ধি চর্চার মধ্য দিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক চেতনাবোধ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। এখানেই রোপিত হয়েছে জাতীয় সমৃদ্ধির শেকড়। ড. অমলেন্দু বসু তাঁর ‘স্মৃতির ধূসর সরণিতে’ লেখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নিরন্তর অগ্রসরমান, এখানে ব্যক্তিত্বের সংযত বিকাশের অমূল্য সুযোগ, এখানে জ্ঞান পথিক যুবজনচিত্ত ক্রমেই এগিয়ে যায়, তার জীবনের মন্ত্র, উপনিষদের ভাষায় ‘চরৈবেতি’ এগিয়ে চলো, এগিয়ে চলো…’। সহসা বোধ করলাম যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি কতগুলো সুদৃশ্য ও বিশাল কর্মে বিচরণ করার জন্য নয়, এসেছি এক অন্তহীন আলোকিত মনোজগতে বিচরণ করার জন্য। সহসা যেন আমার অনভিজ্ঞ আদর্শ সন্ধানী তরুণ সত্তায় অনুভব করলাম একটা বিরাট দায়িত্ব। এই দায়িত্বের চেতনা এবং দায়িত্ব পালনের অনির্বাণ সন্তোষ, দুইয়ের উৎস ছিল আমাদের শিক্ষায়তন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়।’ এভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা লগ্ন থেকে অদ্যাবধি এখান থেকে জ্ঞানের আলো নিয়ে নিজে আলোকিত হয়েছেন, দেশ ও দেশের মানুষকে আলোকিত করেছেন হাজারো মনীষী, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, কূটনীতিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিল্পপতিসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মশালবাহী কেউ না কেউ। এ দেশের অধিকাংশ রথী-মহারথীরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক একটা আলোকচ্ছটা। এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বুদ্ধদেব বসু, মুনীর চৌধুরী, স্যার এ এফ রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ড. মকসুদুল আলমসহ অসংখ্য বরেণ্য ব্যক্তিত্ব। সত্যেন বোস, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, শ্রীনিবাস কৃষ্ণান, কাজী মোতাহার হোসেন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক, সরদার ফজলুল করিম, আনিসুজ্জামানের মতো অগণিত কৃতী সন্তানের স্মৃতিধন্য এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এখান থেকেই রাজনীতির মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছেন দেশের অধিকাংশ প্রথিতযশা রাজনৈতিক নেতানেত্রী। দেশের প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাখছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর। বিসিএসসহ অন্য সব প্রতিযোগিতামূূলক চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং তারা কর্মক্ষেত্রে রাখছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। এতদসত্তে¡ও কিছু র‌্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালকে পেছনের সারিতে রাখা হয়। এর মূল কারণ সঠিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ না করা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনা করা। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চলে না। যদি এমন কোনো র‌্যাঙ্কিং করা হয় যে সবচেয়ে কম খরচে কোন বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে পারছে, তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের মধ্যে সর্বশীর্ষে থাকবে।

কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়েও যুগে যুগে কলুষতার বীজ বপনের চেষ্টা চালিয়ে এসেছে কুচক্রী মহল, এখনো চালাচ্ছে। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কলুষতা বৃদ্ধি পায় দুই স্বৈরশাসক জিয়া ও এরশাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর শ্যেনদৃষ্টি পড়ায়। কারণ তারা জানত ক্ষমতার মসনদকে টিকিয়ে রাখতে হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালকে তার অতীত গৌরব, ঐতিহ্য থেকে ভিন্নমুখী করতে হবে। এ জন্য অস্ত্র হিসেবে তারা দুজনেই ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতিকে কলুষিত করার নোংরা খেলায় মেতে উঠেছিল। অনেকেই তাদের প্রলোভনের ফাঁদে ধরা দেয়। কিছুসংখ্যক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিদ্যাচর্চা, গবেষণার পরিবর্তে লেজুড়েপনা আর তাঁবেদারিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজেদের অর্থ-বিত্ত-বৈভবে পরিপূর্ণ করে তুলতে। ফলে ক্রমে পড়ে যেতে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান। তবে আশার কথা বিগত বছর দশেক ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়েছে। আধুনিক পঠন-পাঠন অনুসৃত হচ্ছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাক্রমেও নিয়ে আসা হয়েছে পরিবর্তন। খোলা হয়েছে নতুন নতুন সাবজেক্ট। সেমিস্টার সিস্টেমে কমিয়ে আনা হয়েছে সেশনজট। আগে যেখানে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করতে দশ থেকে বারো বছর লেগে যেত সেখানে এখন মাত্র পাঁচ বছরেও শিক্ষার্থীরা পাস করে বেরিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ঊনচল্লিশটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গবেষণা খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ ইনোভেশন এন্ড ইনকিউবেশন ল্যাব প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন অবকাঠামোগত উন্নয়নের জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সিনেট ও সিন্ডিকেটে সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘বিজয় একাত্তর’ হল, সুফিয়া কামাল হল, ৭ মার্চ ভবনসহ আরো নানা ভবন তৈরি করা হয়েছে। ব্যাপকহারে করা হয়েছে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। শিক্ষাঙ্গনে বিরাজ করছে সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ। ফলে ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সেই সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা। এবারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের প্রতিপাদ্য ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে উচ্চশিক্ষা’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সামগ্রিক কল্যাণে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে ভূমিকা রেখে আসছে, আগামীতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে দেশের অগ্রযাত্রার অন্যতম সারথী হবে এটাই প্রত্যাশা।

বাহালুল মজনুন চুন্নূ : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা