কাল জুমাতুল বিদা : মানবিক বিশ্ব গড়ার শপথ ধ্বনিত হোক

আগের সংবাদ

শিক্ষায় বাজেট : কোয়ান্টিটি নয় কোয়ালিটি নিশ্চিত করতে হবে

পরের সংবাদ

হতাশার মাঝে আশার আলো নারী ক্রিকেট দল

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১৩, ২০১৮ , ৮:২৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ১৩, ২০১৮, ৮:২৯ অপরাহ্ণ

এশিয়া ক্রিকেটে বাংলাদেশের নারীদের এই শিরোপা অর্জন নেহাতই খেলার সফলতা নয়, বাংলাদেশের নারীদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়। এটা নমুনা কণ্টকপথ পেরুনোর। আত্মবিশ্বাস আর সাহসের বারতা। আমি বিশ্বাস করতে চাই, এই সফলতা বাংলার প্রতি নারীকে সাহসী করে তুলবে, নিজেদের রক্ষার মন্ত্র শেখাবে।

মাদকবিরোধী, ভেজালবিরোধী অভিযান ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট যখন ভাবিয়ে তুলছিল, কিছু লিখতে বারবার তাড়া দিচ্ছিল ঠিক তখনই আমার ভাবনার পথ বেঁকে গেল। বেঁকে যেখানে ঠেকল, সেখানে কেবলই আলোর উচ্ছ্বাস, ঝলকানি। একটুও অন্ধকার নেই, ফাঁকফোকর নেই। পুরোটাই শান্তি। পুরোটাই সত্যি। পুরোটাই মর্যাদার, পুরোটাই নিখাদ অর্জনের। আমি এশিয়া কাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দলের জয় এবং চাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জনের কথা বলছি। ভেজালবিরোধী অভিযান কেন ঈদের আগে এতটা তৎপরতায়, সব সময় নয়, এমন প্রশ্ন যখন করতে মন চাইছে এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে যখন কষ্টের কথা বলব বলে ভাবছি, ঠিক এমন সময় বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দলের অভাবনীয় সাফল্য সব ভালোমন্দ অনুভ‚তিকে পেছনে ঠেলে দিল। কষ্টের কথা ভুলিয়ে দিল। সুখী হলাম। নিখাদ আনন্দ পেলাম। আনন্দের মাত্রা ছাড়িয়েছে তখন, যখন এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ছয়বারের এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন ভারতকে আমাদের নারী ক্রিকেট দল হারিয়েছে অবলীলায়। শিরোপা প্রবেশ করেছে আমাদের দেশে স্বাচ্ছন্দ্যে। সম্ভব করেছে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। অভিনন্দন বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল! সোনার মেয়ে আমাদের!

এই অসাধারণ ভালোলাগার ভেতরেও এক কষ্ট আবিষ্কৃত হলো, কষ্ট খুঁজে পেলাম। যেন কষ্ট পেতেই হবে কোনো না কোনোভাবে আমাদের। না, নারী ক্রিকেট দলের কোনো সদস্য এই কষ্টের কারণ নয়। প্রশ্নই আসে না। এত বড় সম্মান অতি অল্প পারিশ্রমিকে ইতোপূর্বে আমাদের কে এনে দিয়েছে? দেয়নি তো। কষ্ট পেলাম, এই দল ও তার বিজয়কে নিয়ে আমাদের জাতীয় পর্যায়ে নির্লিপ্ততা, নিষ্ক্রিয়তা ভাব দেখে। উচ্ছ্বাসের বন্যা দেখা গেল না, শব্দ নেই, আওয়াজ নেই! পটকা ফাটার শব্দ কানে পৌঁছাল না! আতশবাজি জ্বলল না! তেমনই তো লাগল। একদম আশা করিনি এমনটি। মনে সংশয় উঁকি দেয়, এই নিষ্ক্রিয়তার কারণ এমন নয়তো যে, এই দলের সদস্যরা নারী। তারা আবার ক্রিকেট কী বুঝে, কী খেলে, আর খেলইবা কেন? তারা ঘরে থাকুক। তাদের বিজয় গোপন থাক। চটে যেতে পারে ধর্মান্ধরা। নতুবা আনন্দ প্রকাশে এত কার্পণ্য, কৃপণতা কেন! একুশ বছর আগে এই কুয়ালালামপুর শহরে অনুষ্ঠিত আইসিসি কাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আকরামের নেতৃত্বে যখন আইসিসি ট্রফি জয় করে দেশে ফিরল, তখন দেখলাম এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে সারা দেশব্যাপী আনন্দের মিছিল, বিজয় উৎসব। ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের মহাউন্মাদনা। দেখেছিলাম পত্রপত্রিকার পৃষ্ঠাজুড়ে সে কি আনন্দের বন্যা।

খেলোয়াড়দের বড় বড় ছবি ছাপিয়ে কত শত কথা বলার চেষ্টা। যিনি স্বচক্ষে কোনোদিন খেলা দেখেননি, খেলোয়াড় চেনেননি, তিনি সহজে বুঝে নিলেন খেলা, চিনে নিলেন খেলোয়াড়দের। আর টিভি চ্যানেলগুলোতে দেখেছিলাম, ঘুরে ফিরে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমকে অভিনন্দন জানানোর ব্যতিব্যস্ততা। বিজয়ের আনন্দ প্রকাশ ও বিজয়ীদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের কোনো কমতি ছিল না সেইদিন। একুশ বছর পর সেই একই শহর কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ ক্রিকেটে সালমার নেতৃত্বে যখন তার টিম এশিয়া ক্রিকেট কাপ জয় করে দেশে ফিরল, কোনো উচ্ছ্বসিত আনন্দ মিছিল, ফুলের পাপড়ি ছিটানো, পত্রিকার পাতাজুড়ে বড় বড় ছবি ছাপিয়ে খেলোয়াড়দের পরিচিত করার দায়িত্ববোধ কিংবা টিভি চ্যানেলগুলোতে ঘুরেফিরে অভিনন্দিত করার কোনোকিছুই চোখে পড়ল না! দুঃখ নিয়ে বলতে হয় যে, নির্লিপ্ততা, নিরুৎসাহিত বোধের বিষয়টি দৃশ্যমান হলো। মনে হলো সালমার বিজয়টা যেন আকরামের বিজয়ের মতন নয়। কিংবা এই বিজয় আদৌ বিজয় নয় কিংবা নারীর বিজয় নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই। উচ্ছ্বসিত হলে বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। কেননা ধর্মান্ধরা নারীর সীমা প্রতিনিয়ত নির্ধারণ করে চলেছে। নারীদের জয় নিয়ে বাড়াবাড়ি হলে না জানি আবার ধর্মান্ধরা চটে যায়। সামনে তো আবার নির্বাচন। কাজেই শান্ত পরিবেশ রাখা জরুরি। এমনটি আদৌ ভেবে কাজ করা হয়েছে কিনা জানা নেই। অভিজ্ঞতার আলোকেই আমার এই ভাবনা, বলা।

কিছুটা সুখ পেলাম তখন, যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড চেয়ারম্যানকে বলতে শুনলাম, সালমার টিম যে বিজয় এনে দেখালেন, তা এর আগে কেউ দেখাতে পারেননি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের বিজয় আনন্দে তাদের সংবর্ধনা দিলেন, সঙ্গে ২ কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা দিলেন। বিসিবির এমন আচরণে আনন্দিত না হয়ে পারা যায় না। ধন্যবাদ বিসিবিকে। তবে সারাদেশে আনন্দের মিছিল হতে দেখলে, পত্রপত্রিকায়, মিডিয়ায় সালমাদের বড় বড় ছবি দেখলে বেশি আনন্দিত হতাম। যা হয়নি। আর এই না হওয়া অনেক প্রশ্ন, অনেক সংশয়ের জন্ম দিয়েছে। কারণ এ দেশে নারীরা এখনো ধর্মীয় উগ্রবাদে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনো এ দেশ থেকে নির্মূল হয়নি। নারীদের এগিয়ে চলাটা এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তি নারীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর সাহসের বলে। নারীবান্ধব সরকারের দাবি বর্তমান সরকারের থাকলেও গোটা প্রশাসন যন্ত্র নারীবান্ধব হতে পারেনি। নারীর নিরাপত্তাহীনতা, অধিকার বঞ্চনা, যোগ্য মূল্যায়ন না হওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো তারই দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের এশিয়া কাপ ঘরে নিয়ে আসার বদৌলতে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের আরো একটি খবর জানলাম। সেটা হলো, একজন পুরুষ ক্রিকেটারের চাইতে অনেক কম পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন একজন নারী ক্রিকেটার! এমন বিজয় অর্জন না হলে এই অনাকাক্সিক্ষত, অপ্রিয় সত্য জানা সম্ভব হতো না হয়তো। যৌক্তিকতা যাই থাকুক নীতি নির্ধারকের, কখনোই এমন বৈষম্য কাম্য নয়, মর্যাদাকর নয়। এটা নারীর প্রতি উদাসীনতাই কেবল নয়, কঠিন বৈষম্যমূলক নির্যাতন বটে এবং তা অন্যান্য নির্যাতনের সমতুল্য। জানতে ইচ্ছে করে যে, বিসিবিতে কোনো নারী সদস্য আছে কিনা। যেহেতু নারী ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশকে মর্যাদাকর অবস্থায় নিয়ে গেছে, আগামীতেও নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তাদের মাঝে প্রচুর, সেহেতু এই মেধা, যোগ্যতার পরিচর্যার জন্য তেমন গুণগত মান রক্ষার স্বার্থে বিসিবিতে যোগ্য নারী সদস্য থাকা বাঞ্ছনীয় এবং তা পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির নিরসনেই। আবার কমিটি বা বোর্ডে নারী সদস্য থাকলেই যে নারী ক্রিকেটারদের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে, তা নয়। এখানে সরকারের বিশেষ নজরদারি থাকা দরকার। আমি মনে করি স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেখভালের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

পরিশেষে বলি, সাফ ফুটবলে শিরোপা অর্জনের পর এশিয়া ক্রিকেটে বাংলাদেশের নারীদের এই শিরোপা অর্জন নেহাতই খেলার সফলতা নয়, বাংলাদেশের নারীদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়। এটা নমুনা কণ্টকপথ পেরুনোর। আত্মবিশ্বাস আর সাহসের বারতা। ধর্মান্ধতার প্রবল বিরোধিতা। আমি বিশ্বাস করতে চাই, এই সফলতা বাংলার প্রতি নারীকে সাহসী করে তুলবে, নিজেদের রক্ষার মন্ত্র শেখাবে। বাসে, ট্রেনে, পথেঘাটে, অফিস-আদালতে, শিক্ষাঙ্গনে কোথাও আর আমাদের মেয়েরা নিপীড়িত হবে না, নিগ্রহ হবে না, হবে না ধর্ষণের শিকার। তারা প্রতিবাদী হবে, প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করবে এবং নিজেরা সুরক্ষিত হবে। আমার স্লোগান- মেয়ে জিতে গেলে বাংলাদেশ জিতে যায়!

স্বপ্না রেজা : লেখক।