ট্রাম্প-কিম বৈঠক, শান্তির এই আবহ ইতিবাচক

আগের সংবাদ

হতাশার মাঝে আশার আলো নারী ক্রিকেট দল

পরের সংবাদ

কাল জুমাতুল বিদা : মানবিক বিশ্ব গড়ার শপথ ধ্বনিত হোক

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১৩, ২০১৮ , ৮:২৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ১৩, ২০১৮, ৮:২৪ অপরাহ্ণ

আ ব ম খোরশিদ আলম খান

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার কথা বলে যারা সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিচ্ছে, সামাজিক শান্তি বিনষ্ট করছে, হিংস্রতার জাল ফেলেছে তাদের ব্যাপারে সতর্ক করতে হবে সর্বস্তরের মুসলমানদের। কোনোভাবেই এদের প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। কাল জুমাতুল বিদায় মসজিদে মসজিদে সম্মানিত খতিবরা সন্ত্রাস, জঙ্গি তৎপরতা ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ক্ষতিকর অপতৎপরতার বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক ও সচেতন হওয়ার ডাক দেবেন এবং জাতীয় ঐক্য ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তোলার শিক্ষায় উজ্জীবিত করবেন তাই আজ দেশবাসীর প্রত্যাশা।

রোজাদার মুসলিম জনতার মাঝে এবার বাড়তি ইবাদত বন্দেগির সুযোগ এসেছে। এই বছর জুমার দিন থেকে রোজার শুরু হয়েছে শুধু তাই নয়, সম্ভবত জুমার দিনেই রোজার সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। ২৯ রমজান দিন শেষে সন্ধ্যায় যদি ঈদের চাঁদ দেখা যায় তাহলে আগামীকাল জুমাতুল বিদার দিনেই পবিত্র রমজান মাসের সমাপ্তি ঘটবে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। জুমা দিয়ে শুরু এবং জুমা দিয়ে শেষ এমন সৌভাগ্য রোজাদার মুসলমানদের মাঝে খুব কমই আসে। রোজার মাসে ৫টি জুমার সৌভাগ্য সাধারণত মেলে না। কিন্তু এবার মাহে রমজান অফুরন্ত সৌভাগ্যের ডালা নিয়ে হাজির হয়েছে আমাদের মাঝে। রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতির সওগাত নিয়ে আসা মাহে রমজান এক বছরের জন্য আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছে। আগামীকাল জুমাতুল বিদার দিনে আল বিদা মাহে রমজান, আল বিদা মাহে রমজান এই বিরহী খুৎবা দেবেন মসজিদে মসজিদে ইমাম খতিবরা। তখন রোজার শোকে অশ্রুসিক্ত হবেন রোজাদাররা। তাদের দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়বে অশ্রুধারা। তখন গভীর শূন্যতা ও বেদনায় আবেগাপ্লুত হয়ে উঠবে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা। মাহে রমজান যাদের জীবনে রহমত ও কল্যাণের পরশ নিয়ে এসেছিল তা বিদায় নেয়ার প্রাক্কালে বেদনা, শূন্যতা ও হাহাকার ধ্বনি তো থাকবেই। রোজাদার মাত্রই কাল দলে দলে শামিল হবে জুমাতুল বিদায়। এমন রহমতের মাস কী আবারো পাবেন রোজাদাররা! মূলত শোক ও বিরহ এ জন্যই। আগামীকাল জুমাতুল বিদার দিনে মসজিদে মসজিদে মুসল্লিদের ঢল নামবে। একটি সম্প্রীতিপূর্ণ শান্তিময় মানবিক বৈষম্যমুক্ত বিশ্ব ও দেশ গড়ার শপথ নেবেন লাখো কোটি মুসল্লি।

কাল জুমাতুল বিদার দিনে মুসল্লিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে জুমার নামাজ শেষে তারা একে অপরের সঙ্গে হাত মিলাবে, মুসাফাহ-মুয়ানাকা করবে, করমর্দন ও কোলাকুলি করবে, বিগত দিনের সমস্ত বেদনা ও রেষারেষি ভুলে তারা পরম আনন্দে জান্নাতি খুশির আমেজে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের আলোয় ঝলসে উঠবে- এভাবে জয় হবে মানবতার। মানুষে মানুষে মিলনের মধ্য দিয়ে ভেদবুদ্ধি লুপ্ত হবে এবং বিনাশ ঘটবে অশুভ সাম্প্রদায়িকতার।

সারা বিশ্বে চলছে আজ মুসলমানদের ওপর নির্মম নির্যাতন ও নিপীড়ন। মানবতার শত্রুরা শান্তিকামী মুসলিম জনতার শান্তি ও স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। সন্ত্রাস ও জুলুমের থাবা মুসলিম জনপদে বিস্তৃত। সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক, লিবিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, কাশ্মির, আফগানিস্তানে মানবতার শত্রুদের শ্যোন দৃষ্টি পড়েছে। মুসলিম বিশ্বে সন্ত্রাস ও অরাজকতা জিইয়ে রাখা হয়েছে ওই দেশগুলোর সম্পদ গ্রাস ও জনগণকে পদানত করার অশুভ উদ্দেশ্যে। এই বৈরী সময়ে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে মুসলমানদের। আত্মকলহ ভেদাভেদ ও মতপার্থক্য ভুলে ইমানি চেতনা ও ভ্রাতৃত্ববোধে উজ্জীবিত হয়ে মানবতার শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে অহিংস পন্থায়। রাষ্ট্রীয় সংহতি ও বিশ্ব সমাজ গড়তে হবে মাহে রমজানের চেতনায়। জুমাতুল বিদার দিনে মুসলিম জনতার ইমানি চেতনা শাণিত হবে এবং নবোদ্যমে নতুন শপথে তারা জেগে উঠবেই- এই আশাবাদ সবার।

আমাদের দেশ আজ কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে সামনে এগুচ্ছে। সর্বগ্রাসী সর্বপ্লাবী মাদকের ছোবল আজ দেশের কোটি তারুণ্যকে সীমাহীন অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। মাদকের আগ্রাসন থেকে যুব তারুণ্যকে বাঁচাতে সরকার কঠোর দমন অভিযান চালাতে বাধ্য হয়েছে। তবে মাদকের উৎসমূলে সরকারকে হাত দিতে হবে। মাদককারবারী ও মাদকসেবী উভয়কে আইনের জালে আটকাতে হবে। তবে নিরপরাধ নিরীহ কোনো ব্যক্তি যাতে অবিচার ও হয়রানির শিকার না হয় সরকারকে তাও নিশ্চিত করতে হবে। ভুল টার্গেটে মাদকবিরোধী অভিযান যেন ব্যর্থ হয়ে না যায় দেশবাসীর এই প্রত্যাশা সরকার যেন আমলে নেয়। মাদকবিরোধী অভিযানে হতাহতদের কারণে অসহায় হয়ে পড়া পরিবারগুলোর অসহায়ত্ব ঘোচাতে সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। এভাবে সমাজ মাদকমুক্ত হবে আশা করা যায়। কাল জুমাতুল বিদায় মসজিদে মসজিদে সম্মানিত ইমাম খতিবরা মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দারিদ্র্য ও সর্বপ্লাবিত অবক্ষয় প্রবণতার বিরুদ্ধে মুসল্লি ও দেশবাসীকে সচেতন ও সজাগ করে তুলবেন আমাদের এই প্রত্যাশা থাকবে।

আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার কথা বলে যারা সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিচ্ছে, সামাজিক শান্তি বিনষ্ট করছে, হিংস্রতার জাল ফেলেছে তাদের ব্যাপারে সতর্ক করতে হবে সর্বস্তরের মুসলমানদের। কোনোভাবেই এদের প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। কাল জুমাতুল বিদায় মসজিদে মসজিদে সম্মানিত খতিবরা সন্ত্রাস, জঙ্গি তৎপরতা ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ক্ষতিকর অপতৎপরতার বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক ও সচেতন হওয়ার ডাক দেবেন এবং জাতীয় ঐক্য ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তোলার শিক্ষায় উজ্জীবিত করবেন তাই আজ দেশবাসীর প্রত্যাশা। নৈরাজ্য, হানাহানি, সুদ-ঘুষ-দুর্নীতি-অনাচার, শোষণ-নিপীড়ন, অভাব-ক্ষুধা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আল্লাহ পাক রহমতের মাসের উসিলায় যাতে আমাদের রক্ষা করেন- আজ জুমাতুল বিদার দিনে মসজিদে মসজিদে এই হোক মুসল্লিদের আর্জি ও ফরিয়াদ। আজ মসজিদ থেকে বেরিয়ে যথাসাধ্য গরিব দুঃখীদের দান খয়রাত প্রদান করে আল্লাহর রহমত অবারিত করুন। খতিবের দরদি কণ্ঠে মাহে রমজানের ফজিলত-মাহাত্ম্য আলোকপাতের পাশাপাশি আজকের সামাজিক বিশৃঙ্খলা, নৈতিকতার অবক্ষয় এবং অন্যায়-অরাজকতার বিরুদ্ধে লাখো কোটি মুসলিম জনতাকে সচেতন করে তোলার ডাক দেয়া হবে- এই প্রত্যাশা ইমাম এবং খতিবদের কাছে। একটি বিষয়ে সম্মানিত ইমাম-খতিব সাহেবদের আরেকটু জোরালো ভূমিকা কামনা করি। আর তা হলো, জুমার দিনে মসজিদে হাজার হাজার মানুষের সমাবেশ ঘটে। সমাজের, এলাকার সর্বস্তরের মানুষ মসজিদে জুমা পড়তে যান। জামাতে জুমার নামাজ আদায়ের আগে প্রায় প্রতিটি মসজিদে ইমাম-খতিব সাহেবরা আরবি খুতবার আলোকে কিছু বক্তব্য তুলে ধরেন। বর্তমানে সময় পাল্টেছে। মানুষের চিন্তাধারা, ভাবনা ও কর্মপরিধি ও বহুগুণ বেড়েছে। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাহিদা, সমস্যার চিত্র ও দৃষ্টিভঙ্গির তফাৎ লক্ষণীয়। দেশে এখন বহু সমস্যা। সব পর্যায়ের মানুষ নানাভাবে সমস্যা কবলিত। তাদের জীবনধারা হয়ে উঠছে আরো জটিল। নানামুখী অপরাধ প্রবণতা বাড়ছেই। সন্ত্রাস, মাদকের বিস্তার, নারী নির্যাতন, ইভটিজিং, দুর্নীতি, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও শোষণ-বৈষম্যে শান্তিকামী মানুষের প্রাণ-মান যায় যায় অবস্থা। সমাজের কেউ শান্তিতে-স্বস্তিতে নেই। এই যে, নাগরিক যন্ত্রণা, সমস্যার পাহাড় মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে, এই জট-সমস্যা থেকে নিষ্কৃতি তো পেতেই হবে। মানুষকে সুপথ, সুবুদ্ধি, সুপরামর্শ ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের পথ নির্দেশনা প্রদান করে যেতে হবে কাউকে না কাউকে। এ ক্ষেত্রেই সামনে নিয়ে আসা যায় মসজিদগুলোকে। ইমাম-খতিবদের যে প্রভাব ও মর্যাদা এখনো প্রতিটি এলাকায় দেখা যায়, তাই তাকে নিজ অবস্থান থেকে চারপাশের মানুষদের হেদায়েতের রাস্তা দেখিয়ে যেতে হবে। দুর্দশাগ্রস্ত, সমস্যাক্রান্ত, বিপথগামী মানুষকে নানাভাবে বুঝিয়ে-সুজিয়ে সঠিক কর্তব্যকর্মে, স্বাভাবিক জীবনধারায় নিয়ে আসার চেষ্টায় থাকবেন পাড়া-মহল্লার মসজিদের ইমাম-খতিব সাহেবরা। এই চেষ্টা অধিক ফলপ্রসূ হবে যদি সপ্তাহের জুমার সমাবেশে ইমাম-খতিব সাহেবরা। এই চেষ্টা অধিক ফলপ্রসূ হবে যদি সপ্তাহের জুমার সমাবেশে প্রদত্ত ভাষণে ওই বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। ঘণ্টা-দেড় ঘণ্টা একসঙ্গে এত মানুষ যে মসজিদে বসে থাকল, নামাজ পড়ে ও আরবি খুতবা শুনে অশেষ পুণ্যের ভাগিদার হলো- তাদের এ সময়টুকু আরো সার্থক হবে যদি বাংলা ভাষায় সহজভাবে যথার্থ ভাষণে বক্তব্যে মুসল্লিদের উদ্দীপ্ত, উজ্জীবিত ও কর্তব্যমুখী জীবনের গন্তব্যে ফেরানো যায়। মসজিদগুলোকে সমাজ সংশোধনের কেন্দ্র হিসেবে গড়তে হবে মদিনার মসজিদে নববীর আদলে। মহানবীর (দ.) প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করতে ইমাম-খতিব সাহেবদের। উগ্রতা, জঙ্গিবাদ, দলীয় স্বার্থনিষ্ঠ রাজনীতির পঙ্কিল হাতিয়ার হয়ে না থেকে ইসলাম নির্দেশিত গণমুখী পথ-মতকে গ্রহণ করে এর লালনে সযত্ন ও দায়িত্বশীল হওয়াই আজ জাতীয় প্রত্যাশা। মসজিদে মসজিদে আজ শপথ হোক সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার। আসুন কাল জুমাতুল বিদার দিনে সম্প্রীতিময় ও শান্তিময় দেশ ও বিশ্ব গড়ার শপথে সবাই উজ্জীবিত হই। আল্লাহতায়ালা আমাদের তাওফিক দিন।

আ ব ম খোরশিদ আলম খান : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।