হাওরাঞ্চলে জমে উঠেছে ঈদের কেনাকাটা

আগের সংবাদ

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তীব্র যানজট

পরের সংবাদ

কদমতলীতে চলে আসামি ধরা ও ছাড়ার খেলা

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১৩, ২০১৮ , ১২:৫২ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ১৩, ২০১৮, ১২:৫২ অপরাহ্ণ

১০ জুন রাত ৮টা। কদমতলী থানার সামনে অনেক লোকের জটলা। একেকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তারা। প্রতিটি গ্রুপ তাদের মধ্যে একজনের কথার দিকেই মনোযোগী। তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালে বোঝা যায়, ওই কথা বলা লোকগুলো আসলে থানার দালাল। তারাই আসামি গ্রেপ্তার করায়। আবার সেই আসামি ছাড়িয়ে দেয় বিভিন্ন অঙ্কের টাকার বিনিময়ে। অবশ্য টাকার অঙ্কটা নির্ভর করে যে পুলিশ অফিসার আটক করেছে তার ওপর। মোবাইল ফোনের লাউড স্পিকার চালু করে ওই পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা হয়। এরপর পুলিশ সদস্যের দাবি করা টাকার পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দেয় দালাল। এভাবেই চলে আসামি ধরা ও ছাড়ার খেলা। স্থানীয় সূত্র জানায়, কদমতলী থানায় যে কোনো কাজই করে দিতে পারে এই দালাল চক্র।
ওই দিন সকালে মাদক সেবনের অভিযোগে জুরাইন থেকে এক ভবঘুরে লোককে আটক করে পুলিশ। পরে তার স্ত্রী ও ভাই থানার সামনে আসেন তাকে ছাড়াতে। কিন্তু কারো কাছে গিয়েই কোনো কাজ হচ্ছিল না। পরে থানার পাশের এক দোকানির কাছ থেকে জানতে পারেন, কিছু দালালের হাতেই নির্ভর করে এ থানার সবকিছু। তাদের মধ্যে ইখতিয়ার জুরাইন এলাকার লোক ছাড়ানোর কাজ করে।
সন্ধ্যার পর তারা দেখা করেন দালাল ইখতিয়ারের সঙ্গে। ইখতিয়ার তাদের জিজ্ঞাসা করেন, আটকের সময় সঙ্গে কোনো মাদক পাওয়া গেছে কিনা। ‘না’ সূচক উত্তর দিলে ওই ভবঘুরে লোকটিকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করতে থাকেন তিনি। ফোন দেন সাগর নামে এক পুলিশ সদস্যকে। ওই পুলিশ সদস্য ৫ হাজার টাকা চাইলেও শেষ পর্যন্ত ৩ হাজার টাকায় দফারফা হয়। জানানো হয়, পরের দিন সকালে আসামি ছেড়ে দেয়া হবে।
সন্ধ্যার পর থানার সামনেই কান্না করছিলেন এক মহিলা। ইয়াবা সেবনের দায়ে তার ছেলেকে আটক করেছে পুলিশ। রাত ৯টার দিকে ওই মহিলার সঙ্গে ৫ হাজার টাকায় ছেলেকে ছাড়িয়ে দেয়ার চুক্তি করে দালাল জাকির। থানার পাশের একাধিক দোকানি ও বেশ কয়েকজন অভ্যাগতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দালাল চক্রের মূল হোতা এই জাকির। তাকে টাকা দিলে কাজ হয়নি এমন নজির নেই। জাকিরকে থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সব পুলিশ সদস্য চেনে। টাকা পেলে এমন কোনো কাজ নেই, যা সে করতে পারে না।
রাত ১০টার দিকে বাবুল ও খোকন নামে দুই দালালকে আলাদা আলাদা লোকের সঙ্গে ‘ডিলিংস’ করতে দেখা যায়। খোকন দুই যুবককে বলতে থাকেন, এই থানার কমপক্ষে ২০ জন দারোগার সঙ্গে আমার চলাফেরা। যে কোনো সমস্যার সমাধান করে দেব। শুধু আমাদের একটু সময় দিতে হবে।
অবশ্য সরেজমিন ব্যতিক্রম চিত্রও দেখা গেছে। রাত সাড়ে ৮টায় থানায় জিডি করতে আসেন এক মহিলা ও তার মেয়ে (৮)। জিডি শেষে ডিউটি অফিসার এএসআই ইখতিয়ারকে টাকা সাধলেও তিনি নেননি।
এদিকে কদমতলী থানা রাজধানীর মধ্যে অন্যতম মাদকের অভয়ারণ্য। জানা গেছে, পুলিশের অনেক সোর্সই মাদক ব্যবসায় জড়িত। এ ছাড়া পুলিশের বিরুদ্ধে ফুটপাত চাঁদাবাজি ও অবৈধ অটোরিকশা থেকে মাসোয়ারা নেয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। থানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অটোরিকশাচালক বলেন, প্রতিটি অটোস্ট্যান্ড ও গ্যারেজ থেকে পুলিশের নামে টাকা উঠানো হয়। টাকা না দিলে সেগুলো আটক করে ডাম্পিংয়ে পাঠায় পুলিশ। সুতরাং আমাদের টাকা দেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কদমতলী থানার ওসি এম এ জলিল ভোরের কাগজকে বলেন, থানার সামনে দালাল থাকার কোনো সুযোগ নেই। আর আশপাশে থেকেই বা লাভ কী। আমি তো কাউকে ছাড় দেই না। আমার অনুমতি ছাড়া কোনো আসামি যেহেতু ছাড়া পায় না সুতরাং দালালদের এ ধরনের কাজ করার প্রশ্নই আসে না। কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করলে তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে জানান।
অবৈধ অটোরিকশা ও চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, এই এলাকায় অটোরিকশাই একমাত্র যান। মানবিক দিক বিবেচনা করে এটি চলতে দেয়া হয়। তবে কোথাও থেকে কোনো চাঁদাবাজি করা হয় না। তিনি আরো বলেন, আমি আসার আগে এখানে মাদকের অভয়ারণ্য ছিল। কিন্তু এখন খোঁজ নিয়ে দেখেন, আগের অবস্থা আর নেই।
এদিকে ভাড়া বাসায় জোড়াতালি দিয়ে চলছে থানাটি। থানার ব্যারাকের অবস্থাও নাজুক। নেই গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা। গাড়ি সঙ্কটে সিএনজি দিয়ে টহল দিতে দেখা গেছে পুলিশ সদস্যদের।
থানা সূত্র জানায়, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক, ঢাকা ম্যাচ, কদমতলী, মাতুয়াইল, মেরাজনগর, মোহাম্মদবাগ, গিরিধারা, তুষারধারা, চিটাগাংরোড, শনিরআখড়া, দনিয়া রোড ও ধোলাইপাড় এলাকা নিয়ে থানাটি গঠিত। চলতি বছরের ৫ মাসে থানাটিতে ৪০৮টি মামলা হয়েছে। যার ৭০ শতাংশ মাদক ও ২০ শতাংশ নারী নির্যাতন মামলা।