মাথা না নোয়ালে ইরানের অবস্থা ইরাকের মতো হবে?

আগের সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর বিমানে ত্রুটি: তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সমন

পরের সংবাদ

কোটা পদ্ধতি : প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তবায়ন চাই

প্রকাশিত হয়েছে: মে ১৫, ২০১৮ , ৭:৫৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ১৫, ২০১৮, ৭:৫৬ অপরাহ্ণ

আবুল কাসেম ফজলুল হক

চিন্তাবিদ, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জাতীয় সংসদের নির্বাচন সামনে। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক- এটা চাই। সেই সঙ্গে চাই বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্র উন্নত হোক। জনগণ যদি ঘুমিয়েই থাকে এবং হীন-স্বার্থান্বেষীদের দ্বারা সৃষ্ট হুজুগে মেতে চলে, তা হলে রাজনীতির চরিত্র তো উন্নত হবে না। দূতাবাসমুখী রাজনীতির জায়গায় চাই গণমুখী রাজনীতি- জনগণের রাজনীতি। কোটা ব্যবস্থার বিলোপ সম্পর্কে জাতীয় সংসদে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তবায়ন চাই।

জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর কোটা পদ্ধতি বিলুপ্তির দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা সত্ত্বেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে থাকতে হচ্ছে, দেশবাসীর জন্য এটা কোনো প্রীতিকর ব্যাপার নয়। এই দীর্ঘসূত্রতার ফলে সরকারের যে বিশেষ লাভ হচ্ছে, তা আমার মনে হয় না। অবশ্য আমাদের মনে হওয়া না-হওয়া সরকারের বিবেচনার বিষয় নয়। সরকারের একান্ত অনুগত জ্ঞানী-গুণী বিশিষ্ট লোকের অভাব নেই। তবে এই চরিত্রের বিশিষ্ট জ্ঞানী-গুণীরা যে শেষ পর্যন্ত শেষ রক্ষা করতে পারেন, ইতিহাসে তার প্রমাণ পাওয়া যায় না।

কোটা সংস্কারের যে আন্দোলন ছাত্ররা চালিয়ে আসছে তাতে নানা বিষয় আলোচনায় এলেও আন্দোলনের মূলে আছে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার শতকরা ছাপ্পান্ন ভাগ নিয়োগের ব্যাপারটিই। জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাও বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই ৫৬% কোটা প্রসঙ্গেই। এর মধ্যে কোনো কোনো সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন যে, বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে আড়াইশোর বেশি রকমের কোটা প্রচলিত আছে। পূর্বোক্ত ৫৬%-এর বাইরে এসব ধরনের কোটার সংস্কারের বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করে একবারে সিদ্ধান্ত দিতে গেলে জটিলতা বাড়বে- আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা চলতে থাকবে। সেটা কাম্য নয়। যদি প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রথমবারে কেবল বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের প্রচলিত ৫৬% কোটা বিলুপ্ত করা হয় এবং প্রতিবন্ধী ও পশ্চাৎবর্তী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসমূহের উন্নয়নের জন্য বিকল্প কোনো সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে জাতি (nation) ও রাষ্ট্রের জন্য তা কল্যাণকর হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা ওকালতি পেঁচের মধ্যে পড়লে তা আন্দোলনকারীদের জন্য, সরকারি দল ও সরকারের জন্য এবং জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য বড় রকমের ক্ষতির কারণ হবে। অনেক সমস্যা আছে; সমাধানযোগ্য সব সমস্যার সমাধান পর্যায়ক্রমে করতে হবে। ব্যাপারটা আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের নয়- সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের।

দীর্ঘসূত্রতার ফলে সমস্যা জটিল হচ্ছে- জল ঘোলা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কী হবে কে জানে? কায়েমি স্বার্থবাদীরা জল ঘোলা করে স্বার্থ হাসিলে সক্রিয় আছে। বর্তমান অবস্থার মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞ উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহানের একটি বক্তব্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণের মতো। ঢাকার একটি বহুল প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতার বরাতে প্রকাশিত সংবাদটি এখানে উদ্ধৃত করছি :

RU VC calls FFs to counter quota agitators
Vice-Chancellor of Rajshali University Prof. M. Abdus Soblan on Saturday called upon the freedom fighters to counter the quota reform agitators on the campus as well as across the country. ÔThe students are continuing demostration against the existing quota systems for the children of freedom fighters. Who they are? Can’t you protest the demonstration?’ The v.c. asked while addressing as the special guest of a scholarship distribution programe on the campus in the movning. Organized by the ÔÔMukti-juddha Scholarship Scheme” the programme was presided over by Mr. Abhijit Chattopaddhyay, Assistant High Commissioner of India in Rajshahi…

গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের আরো কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি নানাভাবে কোটা পদ্ধতি পরিবর্তনের আন্দোলনের বিরোধিতা করছেন বলে প্রচারমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আন্দোলনের আহ্বান জানানোর অধিকার সবারই আছে। তবে সমস্যার সমাধানও কাম্য। বাংলাদেশে জাতীয় ঐক্য নেই। জনজীবনের সমস্যাবলি সমাধানের জন্য কাজ করার মতো কোনো রাজনৈতিক দলও নেই। রাষ্ট্র গঠন ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতনতাও নেই। ডানপন্থী-বামপন্থী দলগুলোর ক্ষমতার লড়াই লক্ষ করলে এটা বোঝা যায়। বাংলাদেশ গত প্রায় চার দশকের মধ্যে ফবঢ়ড়ষরঃরপরুবফ হয়ে গেছে। কোটা পদ্ধতির পরিবর্তনের জন্য যে আন্দোলন, তা ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন প্রভৃতি দলের যুক্ত প্রচেষ্টায় কোনো জোটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে না, নেতৃত্ব আত্মপ্রকাশ করেছে সাধারণ ছাত্রদের থেকে। যেসব খবর প্রচারমাধ্যম থেকে পাওয়া যায় তাতে বোঝা যায়, নেতৃত্বে যারা সক্রিয় তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুনজরে নেই। তারা হয়রানির শিকার। সমস্যাটির কোনো ঘোরানো-প্যাঁচানো নয়, সহজ-সরল পরিচ্ছন্ন সমাধান হলে তা সবার জন্যই কল্যাণকর হবে।

বিসিএস মৌখিক পরীক্ষায় ২০০ নম্বর করা হয়েছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে, জরুরি অবস্থা থাকাকালে এবং পরেও দু-তিন বছর এতে ১০০ নম্বর ছিল। তারপর ২০০ নম্বর করা হয়েছে। আমার মতে, অবিলম্বে এটা কমিয়ে ২০০ নম্বরের জায়গায় ৫০ নম্বর করা উচিত। যত মন্থরগতিতেই হোক সরকারের ও জাতির অভিযাত্রা দুর্নীতি থেকে সুনীতির দিকে হওয়া দরকার। উৎপাদন বৃদ্ধি ও সম্পদ বৃদ্ধি- তথা ‘উন্নয়ন’ যে পরিমাণে হয়, সেই পরিমাণেই যদি দুর্নীতি ও জুলুম-জবরদস্তি বাড়তে থাকে, তাহলে একটা সময়ে তার পরিণতি হয় সংঘাত, সংঘর্ষ, রক্তপাত, যুদ্ধ, গণবিদ্রোহ। বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ ও নৈতিক বিবেচনা এখন কোথায় রাজনীতিতে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে ১৯৮০-র দশকে। এনজিও ও সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনগুলোর ব্যাপক বিস্তার তখনই ঘটে। এদের প্রভাবে এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে বাংলাদেশের রাজনীতির অভ্যন্তরে ডেকে আনার কারণে এই পরিবর্তন ঘটে। বাংলাদেশ নিঃরাজনীতিকৃত হতে থাকে। রোনাল্ড রেগান ও মার্গারেট থেচারের সাম্রাজ্যবাদী বৈশ্বিক নীতির অনুসরণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের দলীয় কর্মনীতির ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’ গ্রহণ করে নেয়। তাতে পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনা আগের মতো রাখা হয়নি।

বিশ্বব্যাংক-নির্ভরতা অনেক বেড়ে যায় এবং অপরিকল্পিত অগ্রযাত্রার বহুত্ববাদীদের অবাধ প্রতিযোগিতাবাদের মধ্যে ধনী-গরিবের বৈষম্য ও সামাজিক অবিচার দ্রুততর গতিতে বেড়ে যেতে থাকে। উৎপাদন ও সম্পদ বৃদ্ধির সুফল থেকে জনগণ বঞ্চিত হয়ে চলে। বিবিসি রেডিও দ্বারা সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যে প্রচারিত উগ্র মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন, উগ্র নারীবাদী আন্দোলন, উগ্র দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, অবাধ নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য উগ্র সব আন্দোলন ইত্যাদি দ্বারা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর উদ্দেশ্যই হাসিল হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিকে করে তোলে দূতাবাসমুখী। ঢাকায় সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর দূতাবাসের কর্তাব্যক্তিরা এক সময় গড়ে তোলেন ঞবিংফধু এৎড়ঁঢ় এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদী দূতাবাসগুলো যুক্ত হয়ে পড়ে। গভীরভাবে দেখলে দেখা যায়, ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রধান দলগুলোর রাজনীতি গণমুখিতা ত্যাগ করে, স্বাধীনতা ত্যাগ করে হয়ে ওঠে বৃহৎ শক্তিগুলোর স্থানীয় দূতাবাস অভিমুখী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্ক অভিমুখী। আরো কিছু প্রবণতা বাংলাদেশের শাসক শ্রেণিতে (সরকারি ও সরকারবিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে) দেখা যাচ্ছে যাতে বলা যায়, ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের গতি ১৯৯১ সাল থেকেই গণতন্ত্রের দিকে নয়, পরাধীনতার দিকে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি- এই দুই দলের যেটি যখন ক্ষমতার বাইরে থাকে তখন সেটি দূতাবাসমুখী হয়ে ওয়াশিংটনের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্ক অভিমুখী হয়ে বাংলাদেশকে পরাধীনতার দিকে অগ্রসর করে নেয়। এর মধ্যে ভারতের সরকারকেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় করা হয়েছে। বিএনপি উগ্র ভারত-বিদ্বেষ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে থাকছে। আওয়ামী লীগ চলছে দিল্লির প্রতি প্রবল অনুরাগ নিয়ে। আওয়ামী লীগের ভারতপ্রীতি আর বিএনপির যুক্তরাষ্ট্রপ্রীতি- বাংলাদেশের জন্য কোনটা কল্যাণকর। আওয়ামী লীগে অতিকঠোর শাসনের মধ্যে গত বারো বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে বিএনপি আগের চেয়ে বেশি দূতাবাসমুখী হয়েছে। যারা বামপন্থী বলে আত্মপরিচয় দেয়, আগে যারা মার্কসবাদী বা কমিউনিস্ট দল বলে আত্মপরিচয় দিত, তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা এখন কী? জনসাধারণ? জনসাধারণ তো এখন ঘুমন্ত- গভীর নিদ্রায় মগ্ন! বঙ্কিমচন্দ্রের একটি উক্তি স্মরণ হয় :

‘যদি পৃথিবীর পুরাবৃত্তে কোনো কথা নিশ্চিত প্রতিপন্ন হইয়া থাকে তবে সে কথাটি এই যে, সাধারণ প্রজা সতেজ এবং রাজনিয়ন্তা না হইলে রাজপুরুষদিগের স্বভাবের উন্নতি হয় না, অবনতি হয়। যদি কেহ কিছু না বলে, রাজপুরুষেরা সহজেই স্বেচ্ছাচারী হবেন। স্বেচ্ছাচারী হইলেই আত্মসুখরত, কার্যে শিথিল এবং দুষ্ক্রিয়ান্বিত হইতে হয়। অতএব যে দেশের প্রজা নিস্তেজ, নম্র, অনুৎসাহী, অলস, সেইখানেই রাজপুরুষদিগের ওই রূপ স্বভাবগত অবনতি হইবে।’

বাংলাদেশে কি রাজা আছে? প্রজা আছে? বঙ্কিমের এই উক্তির কোনো প্রাসঙ্গিকতা আছে? একটু আগে উল্লেখ করেছি- ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশের যাত্রা গণতন্ত্রের দিকে নয়- পরাধীনতার দিকে। আমার ধারণা যদি ভুল হয়, বাংলাদেশের রাজনীতির প্রকৃতি উন্নত হয়, তাহলে আমি সবচেয়ে আনন্দিত হব।

জাতীয় সংসদের নির্বাচন সামনে। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক- এটা চাই। সেই সঙ্গে চাই বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্র উন্নত হোক। দূতাবাসমুখী রাজনীতির জায়গায় গণমুখী রাজনীতির উদ্ভব হোক- এটাই আমার মূল কামনা। জনগণ যদি ঘুমিয়েই থাকে এবং হীন-স্বার্থান্বেষীদের দ্বারা সৃষ্ট হুজুগে মেতে চলে, তা হলে রাজনীতির চরিত্র তো উন্নত হবে না। দূতাবাসমুখী রাজনীতির জায়গায় চাই গণমুখী রাজনীতি- জনগণের রাজনীতি। কোটা ব্যবস্থার বিলোপ সম্পর্কে জাতীয় সংসদে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তবায়ন চাই।

আবুল কাসেম ফজলুল হক : চিন্তাবিদ, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।