উত্তরণের পথ বের করতে হবে

আগের সংবাদ

তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে হবে: কাদের

পরের সংবাদ

পাহাড়ি আদিবাসীদের হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকলে খুন-খারাবি হতো না

প্রকাশিত হয়েছে: মে ১১, ২০১৮ , ৭:৫৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ২৭, ২০১৮, ৯:৪৬ অপরাহ্ণ

সঞ্জীব দ্রং

সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম

শক্তিমান চাকমাসহ ছয় খুনের ঘটনায় পাহাড় এখনো অশান্ত। পাহাড়ে প্রায়ই সংঘর্ষ, খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজির মতো ঘটনা ঘটছে। আঞ্চলিক রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারের কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। আবার অনেকে মনে করছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় এরূপ পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে। পাহাড়ের এই অশান্তি ও শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ নিয়ে ভোরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- সম্পাদকীয় সহকারী রিপন কর্মকার।

পাহাড়ে রাজনৈতিক দলগুলো ভাগ হয়ে গেছে। এর পেছনে নানান কারণ আছে, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় একটা হতাশা আছে, নানান ইন্ধন রয়েছে আবার প্রণোদনাও রয়েছে। একত্রিত সংগ্রামে একটা সুবিধা আছে। এটা নষ্ট করতে রাজনৈতিক নানান খেলা হয়, কিছু মদদ আছে। ডিভাইডেড রুল এখানেও আছে। কাউকে কিছু সুবিধা দিয়ে রাজনৈতিক বিভেদ সৃষ্টি করার বিষয়ও থাকতে পারে। বিভেদ সৃষ্টি করে দুর্বল করাও হতে পারে আবার চিন্তার কারণও থাকতে পারে।

ভোরের কাগজ : শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে বলে মনে করেন ?
সঞ্জীব দ্রং : প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে সশস্ত্র সংগ্রামের পর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বা শান্তি চুক্তি হয়। এই চুক্তিতে পাহাড়িদের কিছু অধিকার দেয়া হয়েছিল যা বাস্তবায়িত হয়নি। সেগুলোর মধ্যে মৌলিক হচ্ছে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ। আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হবে পাহাড়ি বা আদিবাসী তিন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হবে পাহাড়ি বা আদিবাসী। সদস্যের ক্ষেত্রেও তাই যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য হবে পাহাড়িদের মধ্য থেকে। পাহাড়ি আদিবাসীদের ভূমি রক্ষণে বা ভূমি সমস্যা সমাধানে ভূমি কমিশন গঠন করার কথা ছিল। মোট কথা এক ধরনের স্বশাসন ব্যবস্থা। কিন্তু বিশ বছর পার হয়ে গেলেও এ মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন হয়নি। যেমন আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হয়েছে কিন্তু তার বিধি হয়নি। বিধি বা নীতিমালা না হওয়ার কারণে পরিষদগুলোর কাজ নেই। এখানে বিধি করার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট সময়ও দেয়া হয়নি। এখানে একটা বড় সমস্যা রয়ে গেছে। নানান জটিলতা এবং রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে এখন পর্যন্ত বিধি বা নীতিমালা হয়নি।

ভোরের কাগজ : পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার মূল কারণ কি?
সঞ্জীব দ্রং : এর মূল কারণ হচ্ছে সরকার যতটা আন্তরিকতার সঙ্গে চুক্তি করেছিল, চুক্তি বাস্তবায়নে তারচেয়ে বেশি আন্তরিক হওয়ার দরকার ছিল আরো বেশি সাহস দেখানোর বিষয় ছিল কিন্তু সেটা দেখাতে পারেনি। এটা করা যে সহজ ব্যাপার তা কিন্তু না। শান্তি চুক্তির সময়ও অনেকের বিরোধিতা ছিল, রাজনৈতিক বিরোধিতাও ছিল আবার গুজবও ছিল যে, পাহাড় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। কিন্তু চুক্তিটি হওয়ায় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কারও পেয়েছেন। কাজেই আমি মনে করি, এখানে আন্তরিকতার অভাব রয়েছে।

ভোরের কাগজ : আমরা জানি যে, পাহাড়ি আদিবাসীদের ভূমি সংরক্ষণে ভ‚মি কমিশন গঠন হয়েছে। এই কমিশন কি কোনো ভ‚মিকা রাখতে পারছে না?
সঞ্জীব দ্রং : ভূমি সমস্যা পাহাড়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি ভ‚মি কমিশন গঠন করা হয়েছে এটি ইতিবাচক ব্যাপার কিন্তু এই ভূমি কমিশন আইনটি সংশোধিত হয়েছে মাত্র ২০১৬ সালে। এটি এখনো কোনো কাজই করতে পারেনি। কারণ এর আইনই ঠিক হয়নি। এর আগে যে আইনটি ছিল সেটার গঠন ছিল একপাক্ষিক, গণতান্ত্রিক নয়। কমিটির কাঠামোটি ছিল- অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হবেন চেয়ারম্যান, পদাধিকার বলে বিভাগীয় কমিশনার সদস্য এবং অন্য তিনজন সদস্য হবে পাহাড়ি। কিন্তু সমস্যা যেটা ছিল তা হচ্ছে কমিটির সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যদি পাঁচ জন ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারে তবে চেয়ারম্যান একক সিদ্ধান্ত দিবে। কাজেই কমিশন কাঠামোটা ছিল অগণতান্ত্রিক এবং আস্থার অভাব ছিল। এখানে অনেক চেষ্টার ফলে সরকার ও পাহাড়িরা ঐকমত্যে আসতে পেরেছে। সংশোধিত হওয়ার পর সব সদস্যের সমান অধিকার দেয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন নির্দিষ্ট নীতিমালা।

ভোরের কাগজ : বিভিন্ন সময় পাহাড়ে সংঘাত, খুন, অপহরণের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ নানিয়াচরের উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাসহ ছয়জন খুনের ঘটনাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
সঞ্জীব দ্রং : কোনো হত্যাকাণ্ডই সমর্থনযোগ্য না। সবার বেঁচে থাকার অধিকার আছে। এটা খুব দুঃখজনক ব্যাপার যে একজন জনপ্রতিনিধি নিহত হলেন। এবং আরো দুঃখজনক উদ্বেগের ব্যাপার হলো উপজেলা সদরে উনার অফিসের সামনে এবং থানার মাত্র ১০০ গজের মধ্যে প্রকাশ্যে তাকে হত্যার ঘটনা ঘটল। এ রকম ঘটনা প্রায় ঘটছে। পত্রপত্রিকায় দেখে থাকবেন গত ৫ মাসে ১৮ জনের মতো খুন হয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টাও উদ্বেগজনক। শান্তি চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এমনটা ঘটত না। প্রশাসনিক ক্ষমতা পাহাড়িদের দিলে তাদের দায়ী করতে পারত। কিন্তু প্রশাসনিক ক্ষমতা তো তাদের নেই। কাজেই আইনশৃঙ্খলার অবনতির জন্য প্রশাসনকেই দায় নিতে হবে।

ভোরের কাগজ : আঞ্চলিক রাজনীতিতে আধিপত্যের লড়াইয়ের জন্যই কি এমন ঘটনা ঘটছে?
সঞ্জীব দ্রং : প্রথমত, পাহাড়ে রাজনৈতিক দলগুলো ভাগ হয়ে গেছে। এর পেছনে নানান কারণ আছে, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় একটা হতাশা আছে, নানান ইন্ধন রয়েছে আবার প্রণোদনাও রয়েছে। একত্রিত সংগ্রামে একটা সুবিধা আছে। এটা নষ্ট করতে রাজনৈতিক নানান খেলা হয়, কিছু মদদ আছে। ডিভাইডেড রুল এখানেও আছে। কাউকে কিছু সুবিধা দিয়ে রাজনৈতিক বিভেদ সৃষ্টি করার বিষয়ও থাকতে পারে। বিভেদ সৃষ্টি করে দুর্বল করাও হতে পারে আবার চিন্তার কারণও থাকতে পারে। কাজেই বিভিন্ন গ্রুপের সৃষ্টি হচ্ছে। আর পাহাড়িদের একক প্রশাসনিক কাঠামো না থাকায় এবং শাসন করার ক্ষমতা না থাকায় গ্রুপগুলোর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রাখতে চেষ্টা করে তখন এরূপ বিশৃঙ্খলা ঘটে। পাহাড়িদের হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকলে এটা হতো না।

ভোরের কাগজ : গণমাধ্যমে প্রায় পহাড়ে চাঁদাবাজির খবর উঠে আসে। চাঁদাবাজি কারা করে?
সঞ্জীব দ্রং: এটা সারা দেশের অবস্থার মতোই এখানেও এটা আছে। এটা রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কোনো কর্মকাণ্ড না। ব্যক্তি স্বার্থ এবং নিয়ন্ত্রণ রাখতেই এসব হয়ে থাকে। সারা দেশে চাঁদাবাজির যে সিস্টেম এটা তার বাইরে না। চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এগুলো নিয়ন্ত্রণ হয়ে যেত।

ভোরের কাগজ : পাহাড়ি আদিবাসী ও বাঙালি সম্পর্ক কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
সঞ্জীব দ্রং : এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল প্রশ্ন। একটা দূরত্ব আছেই, সেতুবন্ধন রচনা হয়নি। এত বছরের একটা ভুল বোঝাবুঝি, একটা ধারণাগত বিষয় আছে। সংস্কৃতির ভিন্নতা আছে। এটা ইতিবাচকভাবে নিতে হবে।

এক সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একটা আতঙ্ক কাজ করত। একটা ভীতিকর ধারণা ছিল। একটু নেতিবাচকভাবেই দেখা হতো। কারণ পরস্পরের প্রতি বোঝাপড়ার দূরত্ব ছিল। কিন্তু তারা তো মানুষ এবং অনেকে আরো ভালো মানুষ তারা। পাহাড়ের মতোই বিশাল তাদের হৃদয়। উন্নত সংস্কৃতি, যূথবদ্ধতা, পরিশ্রমী কিন্তু পরিচয় ঘটেনি। এটা পৃথিবীর প্রায় সব দেশে এ রকম গ্যাপ আছে। এই দূরত্ব কমাতে হবে। আমি মনে করি দেশের প্রগতিশীল চিন্তার মানুষদের এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন দরকার ছিল। এটা হচ্ছে না, তা না। পাহাড়িরা এখন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে, বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে। আবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাঙালিরাই পাহাড়ি সংস্কৃতি তুলে ধরছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিশেষ করে পহেলা বৈশাখে পাহাড়ি ওড়না, পোশাক পরছে। একটু জানাজানি হচ্ছে। এটা আরো অনেক বেশি দরকার। পাহাড় দেশের সমৃদ্ধ অঞ্চল, সাংস্কৃতিক, পরিবেশ, প্রাকৃতিক, সৌন্দর্য সব দিক দিয়ে সমৃদ্ধ। এখানে তো দেশের দেশ-বিদেশের পর্যটকরা আসছেন তেমন কোনো সমস্যা তো নেই। কিন্তু এখানে যে ভিন্নতার একটা বৈচিত্র্য আছে তা স্বীকার করলে কোনো সমস্যা থাকে না। এই ভিন্নতা মানে সৌন্দর্য। আমাদের দেশ ভিন্নতায় সুন্দর। এখানে নানান ধর্মের গোষ্ঠীর বসবাস। এটাকে বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য হিসেবে দেখতে হবে। বৈচিত্র্যময়তাকে শক্তি হিসেবে নিতে হবে। বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠী বাংলাদেশে আছে এটা বাংলাদেশের জন্য গর্ব এবং শক্তি। এই শিক্ষাটা স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দিতে হবে। তবেই আমার একটা ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ পাব। আরেকটা বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।

ভোরের কাগজ : রোহিঙ্গারা পাহাড়ে সমস্যার সৃষ্টি করছে কিনা?
সঞ্জীব দ্রং : রোহিঙ্গা ইস্যু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা একটা অমানবিক ঘটনা। নির্যাতিত হয়ে তারা এ দেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগেও এসেছে। কিন্তু তারা এখানে নানাভাবে আশ্রয় পেয়ে তাদের অবস্থান পোক্ত করতে চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে তো সমস্যা সৃষ্টি হবেই।

ভোরের কাগজ : পাহাড়ে শান্তি ফেরাতে বা বাস্তবায়িত করতে আপনাদের ভ‚মিকা কি? এবং সরকারের প্রতি আপনাদের পরামর্শ-
সঞ্জীব দ্রং : আমরা কথা বলছি। মিডিয়া, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাদের কথাগুলো বলছি। পুস্তকের মাধ্যমে বলছি। সরকারের প্রতি বিনীত অনুরোধ থাকবে। যথেষ্ট সময় ব্যয় হয়েছে। আর না। সময়সূচিভিত্তিক একটা সুনির্দিষ্ট রোড ম্যাপ বা রূপরেখা আমরা চাচ্ছি। আর আশ্বাস চাচ্ছি না। প্রতীক্ষার প্রহর খুব কঠিন। চুক্তি বাস্তবায়নে পাহাড়িরা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছে বলে আমি মনে করি। সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। পাহাড়িদের পক্ষে থেকে আমার আপিল হচ্ছে – পাহাড়িসহ সব আদিবাসীর জন্য নীতিমালা থাকা দরকার। ভারত যেটা ১৯৫৯ সালে করেছে। স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করতে হবে। তারা যেভাবে উন্নয়ন করতে চায় সেভাবে করতে দিতে হবে। শুধু টাকা বরাদ্দ দেয়াই উন্নয়ন নয়। তাদের ভূমি রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। কংক্রিটের উন্নয়নই শুধু উন্নয়ন নয়। বনের, কৃষির, প্রকৃতির উন্নয়নও উন্নয়ন। অর্থাৎ তারা যেভাবে চায়। পাহাড়ের ওপর সংবেদনশীল হতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা। তাদের ওপর যেন কেউ আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। একটা আদিবাসী নীতিমালা করা হোক, সেখানে বলা থাকবে রাষ্ট্র তাদের জন্য কি কি করবে।

ভোরের কাগজ : আপনাকে ধন্যবাদ।
সঞ্জীব দ্রং : ধন্যবাদ।