নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান

আগের সংবাদ

পাহাড়ি আদিবাসীদের হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকলে খুন-খারাবি হতো না

পরের সংবাদ

নৃশংসতা বাড়ছে সমাজে

উত্তরণের পথ বের করতে হবে

প্রকাশিত হয়েছে: মে ১১, ২০১৮ , ৭:৩৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ১১, ২০১৮, ৭:৩৬ অপরাহ্ণ

রেজাউল করিম খোকন

লেখক ও ব্যাংকার

দেশ অবক্ষয়ের কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা প্রতিদিনের সংবাদপত্র পড়লেই উপলব্ধি করা যায়। দিন দিন দেশ, সমাজ, দেশের মানুষ এগিয়ে যাবে- এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যেন দিনের পর দিন পিছিয়েই যাচ্ছি। কোনোভাবেই আমাদের সমাজ যেন আলোর দিকে অগ্রসর হতে পারছে না। কূপমণ্ডূকতা যেমন আমাদের সমাজকে দিন দিন গ্রাস করছে, নারীর ক্ষেত্রে যেন সমাজ দিন দিন আরো নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে। নিষ্ঠুরতার বলি হচ্ছে নারী। কোনোভাবেই তা রোধ করা যাচ্ছে না।

আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মনের মধ্যে একটি প্রশ্ন কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে, আর তা হলো, আমরা সবাই কোথায় চলেছি? দিনে দিনে ভদ্র, সহনশীল, নম্র, সুশীল, সৎ, নীতি ও আদর্শে অটল হওয়ার বদলে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে ধাবিত হচ্ছি। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলে সহিংসতা, নির্মমতা, পাশবিকতা, অমানবিকতার শিকার নারী-পুরুষ ও শিশুর খবর চোখে পড়ছে। হতভাগ্যদের প্রতি তাদের আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, প্রতিপক্ষ, প্রতিদ্ব›দ্বীদের অমানবিকতার প্রকাশ দেখে আমরা শিউরে উঠছি। রাস্তাঘাট তো দূরে থাক, মানুষ তার ঘরেও নিরাপদে নেই। সামাজিক অস্থিরতার কারণে খুনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। পারিবারিক কলহ, ইভটিজিং, বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়া, আর্থিক লেনদেন, ব্যবসায়িক দ্বণ্দ্ব বা এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হাতে মানুষ খুন হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা অনুসন্ধানে দেখা যায় ক্ষমতার লড়াই, আধিপত্য বিস্তার, দখল বাণিজ্য, চুরি ডাকাতি ছিনতাই, চাঁদাবাজির টাকা ভাগবাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে একের পর এক নির্মমভাবে খুন হচ্ছেন বিভিন্ন জন।

দেশে পারিবারিক হত্যাকাণ্ড আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবার হলো মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু এখন পরিবারের মধ্যেও নিরাপত্তা খুঁজে পাওয়া দায় হয়ে পড়েছে। সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে পরিবারের সদস্যদের একের প্রতি অন্যের মমত্ববোধ হ্রাস পাওয়ায় ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বণ্দ্বে আপনজনের প্রাণ কেড়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটছে। নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দাম্পত্য কলহ, অর্থলিপ্সা, মাদকাসক্তি, অবাধ যৌনাচার ও অবৈধ দৈহিক সম্পর্কের কারণে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে, রাজধানীসহ সারা দেশে বাবা-মায়ের হাতে সন্তান হত্যার ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমনি সন্তানের হাতে জন্মদাতা বাবা-মায়ের প্রাণহানিও ঘটছে। পরকীয়ার কারণে স্বামীর হাতে স্ত্রী এবং স্ত্রীর হাতে স্বামীর খুন হওয়ার ঘটনাও কম নয়। এখন মানুষ আতঙ্ক এবং শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে বললে বেশি হবে না। স¤প্রতি খুনের ঘটনাগুলোর ধরন অন্য সময়ের সঙ্গে মিলছে না। মানুষ দিনে দিনে খুব অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। তুচ্ছ কারণে খুনের মতো ঘটনা ঘটছে হরদম। নিষ্ঠুরতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। মানুষ যেন ক্রমেই আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সুকুমার বৃত্তিগুলো কমে যাচ্ছে। মানুষ ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে প্রযুক্তি ও বিত্তবৈভব মানুষের আবেগ ও মূল্যবোধে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। এখন মানুষ যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ কারণে আপন মানুষটিকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। বর্তমানে একের পর এক অপরাধের পেছনে মানসিক বৈকল্য, বিষণ্ণতাও কম দায়ী নয়। পারিবারিক হত্যাকাণ্ড দেশের আইন শৃঙ্খলার জন্য যেমন অশনিসঙ্কেত হয়ে দেখা দিচ্ছে, তেমনি অবক্ষয়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ারও জানান দিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

এটা সত্যি, আমরা একটা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এই অস্থির সামাজিক পরিবর্তনে মানুষের জীবনধারা বদলে যাচ্ছে। অপরাধের ধরনের মধ্যেও বিচিত্রতা আসছে। এখন খুব তুচ্ছ ঘটনাতেও মানুষ খুন হচ্ছে। খুনের ক্ষেত্রে এমন অপরাধী পাওয়া যাচ্ছে, জীবনে যাদের এটাই প্রথম কোনো অপরাধ। এ ধরনের অপরাধ পুলিশের দ্বারা প্রতিরোধযোগ্য নয়। তবে বিচার প্রক্রিয়া আরেকটু ত্বরান্বিত হলে শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতো, অপরাধও কমে যেত। সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও বিবর্তনে মানুষ সংবেদনশীলতা হারাচ্ছে।

নারীকে অনেক পুরুষ সম্পত্তির মতো মনে করতে চান। প্রেম বা বিয়ের পথে সেই সম্পত্তি দখল করতে ব্যর্থ হলে তারা সহিংস হয়ে ওঠে। মেয়েটির ভালোলাগা ও মন্দলাগার হিসাব যারা করে না, তাদের আসক্তি প্রেম নয়, পাশবিকতা। এ ধরনের নরপশুর জন্ম এ সমাজেই হয়, এ প্রবণতা অনেক পুরুষেরই আছে। নারী উত্ত্যক্ত, হয়রানি, আক্রমণ, নির্যাতন, বর্বরতা, পাশবিকতা আর কতদিন দেখতে হবে আমাদের। সমাজের সর্বত্রই অসহিষ্ণুতা বাসা বেঁধেছে। কারো ভিন্নমত সহ্য হচ্ছে না। সমাজটা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার খেসারত দিতে হচ্ছে প্রাণের বিনিময়ে। কোন মানুষটি কখন পশুর আকার ধারণ করে পাশবিক হয়ে উঠবে আমরা কেউ জানি না। এক অসম্ভব মনোবৈকল্যের শিকার এখন দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষ। এখন প্রায় প্রতিদিন সারা দেশে অসংখ্য মানুষ খুন হচ্ছেন। খুনি মানেই সে কোনো না কোনোভাবে মানসিক ভারসাম্যহীন।

এখন স্বজনের বুকফাটা কান্না ও আহাজারিতে চারপাশের বাতাস ভারি হয়ে আসে। এমন ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। দেশের সুশীল সমাজ, মানবাধিকার সংস্থা, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এমনকি গণমাধ্যমও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার। কিন্তু এটা খুব উদ্বেগজনক ব্যাপার যে, হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, বর্তমান সময়ে চারপাশে যেসব ঘটনা ঘটছে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মতো নয়। এমনও ঘটনা ঘটছে যা আদিম বর্বরতাকেও হার মানায়। যখন একের পর এক খুন, অপহরণ, গুমসহ নানামুখী অপকর্মের শিকার হতে চলেছে মানুষ, তখন বিষয়টি আর কোনো ব্যক্তি বা পারিবারিক সমস্যা নয় বলেই আমরা মনে করি। দেশ অবক্ষয়ের কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা প্রতিদিনের সংবাদপত্র পড়লেই উপলব্ধি করা যায়। দিন দিন দেশ, সমাজ, দেশের মানুষ এগিয়ে যাবে- এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যেন দিনের পর দিন পিছিয়েই যাচ্ছি। কোনোভাবেই আমাদের সমাজ যেন আলোর দিকে অগ্রসর হতে পারছে না। কূপমণ্ডূকতা যেমন আমাদের সমাজকে দিন দিন গ্রাস করছে, নারীর ক্ষেত্রে যেন সমাজ দিন দিন আরো নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে। নিষ্ঠুরতার বলি হচ্ছে নারী।

কোনোভাবেই তা রোধ করা যাচ্ছে না। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নারীরা নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হতে থাকবেন এটাই যেখানে সমর্থনযোগ্য নয়, সেখানে দেখা যাচ্ছে শুধু মফস্বল বা গ্রামে নয় শিকার হচ্ছেন এমন নয় বরং রাজধানী ঢাকাতেই নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের হার ৭০ শতাংশ বেড়েছে। এ বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং সার্বিক অর্থেই আশঙ্কারও বটে।

মনে রাখতে হবে, জনগণের স্বাভাবিক জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারেরই দায়িত্ব। জনগন প্রত্যাশা করে, সরকার নারী নির্যাতনের মতো ঘৃণ্য প্রবণতাকে দমন করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে এবং এর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি প্রদানে কোনোরকম পিছপা হবে না। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা এই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র থেকে নির্মূল হোক এবং নিশ্চিত হোক নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা।

ক্ষয়িষ্ণু এই সামাজিক অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি দিনে দিনে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তাহলে সমাজ কী প্রতিদিন পেছনের দিকে যাচ্ছে? এ থেকে রক্ষা পেতে হলে এখনই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে না পারলে সমাজকে নিরাপদ করা যাবে না। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে তাই সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। অপরাধীচক্রকে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। সত্যিকার শিক্ষা, জনসচেতনতা ও সর্বোপরি মনুষত্ববোধ জাগ্রত করতে না পারলে অস্বাভাবিক মৃত্যু, হিংস্র মনোভাব কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব হবে না।

রেজাউল করিম খোকন : লেখক ও ব্যাংকার।