বজ্রপাতে প্রাণহানি, প্রয়োজন সচেতনতা

আগের সংবাদ

মুক্ত গণমাধ্যম : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

পরের সংবাদ

সৌন্দর্য বিপন্ন সুন্দরবন

প্রকাশিত হয়েছে: মে ৩, ২০১৮ , ৭:৪১ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ৩, ২০১৮, ৭:৪১ অপরাহ্ণ

সুন্দরবনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশ্ব ঐতিহ্য এই বনের সব ধরনের সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। বনের স্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও সুন্দরবনের অভ্যন্তর নদীগুলোয় বারবার জাহাজডুবির ঘটনা এই বনাঞ্চলের দীর্ঘ বিপদ ডেকে আনছে কিনা সেটি ভেবে দেখার যথেষ্ট প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন রক্ষায় বনের মধ্য দিয়ে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধের সুপারিশ জানানো হয়েছিল। নৌচলাচল বন্ধের এমন আর্জি বারবারই জানিয়ে আসছিল সুন্দরবন গবেষক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। এক সময় ভারতের অংশের সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে নৌপথ চালু ছিল। কিন্তু সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নৌপথটি ঘুরিয়ে নেয় ভারত। অথচ বাংলাদেশ সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চালু রেখেছে নৌপথ। বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারকে জরুরিভিত্তিতে সুন্দরবন সহায়ক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যাতে করে সুন্দরবনের জীবন্ত বৈচিত্র্য অটুট থাকে।

২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনে জন্ম হয়েছিল একটি তেল কাহিনী। ওইদিন ভোরে পূর্ব সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে জ্বালানি তেলবাহী একটি জাহাজ ডুবে গিয়ে সাড়ে তিন লাখ লিটারের বেশি ফার্নেস তেল সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়েছিল। ঘটনার শুরু থেকেই তেলের বিরক্তিকর ঝাঁজ সেখান থেকে পালাতে বাধ্য করেছিল বিভিন্ন জলজ প্রাণীকে। দৌড়াতে ব্যর্থ কিছুসংখ্যক কুমির, ডলফিন ও মাছ মরে ভেসে ওঠে পানির উপরিভাগে। আর বনের উদ্ভিদ প্রজাতির গায়ে লাগে দীর্ঘ কালো ছাপ। সেথায় বাস করা বন্যপ্রাণীরাও হয়ে পড়ে নিরুপায়। এসব অশনি সংকেত দেশে ঢাকঢোল পিটিয়ে কড়া নেড়েছিল জাতিসংঘ কপাটে। তখন চলে দৌড়ঝাঁপ, আলোচনা-সমালোচনা এবং গণমাধ্যম ঝড়। এর স্থায়িত্বকাল ছিল মাসখানেক। তারপর সুনসান নীরবতা। একের পর এক কয়লা, তেল, সিমেন্ট ও বিষাক্ত রাসায়নিক বহনকারী জাহাজ ডুবি ও আগুনে পুড়ে ছারখার সুন্দরবন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশ তথা বিশ্বের বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বারবার আক্রান্ত হলেও নেই কোনো বন সুরক্ষিত পদক্ষেপ। বন বিপন্ন ধারাবাহিকতা কি এভাবে চলতে থাকবে।

সর্বশেষ দুর্ঘটনাটি ঘটে গেল ১৪ এপ্রিল রাতে। সেই রাতে সুন্দরবনের পশুর চ্যানেলের হাড়বাড়িয়া এলাকায় ডুবে যায় ৭৭৫ টন কয়লা বোঝাই কার্গো জাহাজ এমভি বিলাস। সুন্দরবনের ভেতর ও বাইরে রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য নদীনালা-খাল। বনের ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে পশুর ও শ্যালা নদী। যে নদীতে প্রতিনিয়তই চলাচল করছে অসংখ্য পণ্যবাহী জাহাজ ও নৌকা। মাল বহনকারী এ সব নৌযান মাঝেমধ্যে যে দুর্ঘটনায় পতিত হবে না তার নিশ্চয়তা কি কেউ দিতে পারবে।

সম্প্রতি একটি দৈনিক সুন্দরবনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সময়ে জাহাজডুবি নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে জানা যায়, গত ৩০ বছরে অন্তত ১৬টি জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে সুন্দরবনে। তার মধ্যে কেবল গত তিন বছরেই তলা ফেটে ডুবেছে পণ্যবোঝাই ১০টি লাইটার জাহাজ। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো, সুন্দরবন ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারের মতো কোনো উদ্ধারকারী জলযান নেই। ফলে সহজে উদ্ধার করা সম্ভব হয় না ডুবে যাওয়া জাহাজ ও পণ্য। আর এর ফলেই প্রতিটি জাহাজডুবির ঘটনায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে খাদ্যশৃঙ্খল হতে শুরু করে সুন্দরবনের জটিল বাস্তুসংস্থান। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনের জলজপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য। কেবল তাই নয়, ডুবে যাওয়া অনেক লাইটার জাহাজ উত্তোলন না করার কারণে দ্রুত পলি পড়ে ভরাট হচ্ছে সংশ্লিষ্ট অংশের নদ-নদী। এতে হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবনের গাছের শ্বাসমূলসহ জীববৈচিত্র্য, বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতিসহ ছয় প্রজাতির ডলফিন, কয়েকশ প্রজাতির মাছসহ জলজপ্রাণীর প্রজনন।

১৯৯৯ সালে সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্ররিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে সুন্দরবন পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী প্ররিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার জলাভূমির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন বা নষ্ট করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। পাশাপাশি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ অনুযায়ী সংরক্ষিত বনে নৌপথসহ সব ধরনের কর্মকাণ্ডই আইনত নিষিদ্ধ। ২০১১ সালে সুন্দরবনে ঘোষিত হয়েছে তিনটি ডলফিন অভয়াশ্রম। কিন্তু এ সব আইনকে তোয়াক্কা না করে প্রতিনিয়ত বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন নিয়ে দাঁড় করানো হচ্ছে সুন্দরবনকে। এ ব্যাপারে কারো কোনো গরজ নেই।

বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের অন্যতম যোগানদাতা হলো সুন্দরবন। ঐতিহ্য ও প্রকৃতি লাবণ্যে ভরপুর সুন্দরবন অনন্য উদাহরণ হিসেবে পৃথিবীর দৃষ্টি কাড়তে সমর্থ হয়েছে। পৃথিবীতে আর কোনো বন নেই, যেখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে বৃক্ষ ও জীববৈচিত্র্য রয়েছে। এমন কোনো বন নেই, যেখানে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। আমাজনের পরই প্রতি বর্গমিটারে সবচেয়ে বেশি জীববৈচিত্র্য রয়েছে সুন্দরবনে। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের মোহনা বা সংযোগস্থলেই সুন্দরবনের সৃষ্টি।

সুন্দরবনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশ্ব ঐতিহ্য এই বনের সব ধরনের সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। বনের স্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও সুন্দরবনের অভ্যন্তর নদীগুলোয় বারবার জাহাজডুবির ঘটনা এই বনাঞ্চলের দীর্ঘ বিপদ ডেকে আনছে কিনা সেটি ভেবে দেখার যথেষ্ট প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন রক্ষায় বনের মধ্য দিয়ে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধের সুপারিশ জানানো হয়েছিল। নৌচলাচল বন্ধের এমন আর্জি বারবারই জানিয়ে আসছিল সুন্দরবন গবেষক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। এক সময় ভারতের অংশের সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে নৌপথ চালু ছিল। কিন্তু সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নৌপথটি ঘুরিয়ে নেয় ভারত। অথচ বাংলাদেশ সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চালু রেখেছে নৌপথ। বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারকে জরুরিভিত্তিতে সুন্দরবন সহায়ক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যাতে করে সুন্দরবনের জীবন্ত বৈচিত্র্য অটুট থাকে।

বিশ্বজিত রায় : লেখক।