সৌন্দর্য বিপন্ন সুন্দরবন

আগের সংবাদ

পরিকল্পিত নগরায়নে বড় ধরনের নৈতিক পরিবর্তন আনা দরকার

পরের সংবাদ

মুক্ত গণমাধ্যম : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

প্রকাশিত হয়েছে: মে ৩, ২০১৮ , ৮:০২ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ৩, ২০১৮, ৮:০২ অপরাহ্ণ

মুহম্মদ শফিকুর রহমান

সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব

মুক্ত গণমাধ্যম পৃথিবীর কোথায় আছে আমি জানি না। আদৌ এর কোনো মূর্ত অস্তিত্ব আছে বা থাকতে পারে এমন বিশ্বাসও কোনোদিন আমার জন্ম নিয়েছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশে এটি রাজনৈতিক স্লোগান মাত্র। মুক্ত সাংবাদিকতা সাংবাদিক কমিউনিটি আদৌ চায় কিনা, চাইলে যে আমাদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা রাজউকের জমি, বিদেশে চাকরি, দেশাভ্যন্তরে চাকরি এবং সর্বোপরি দলীয় নমিনেশন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। চাকরি বা বাইরে পোস্টিংয়ের ব্যাপারে লেখাপড়া থাক বা না থাক সেটা বড় কথা নয় বড় কথা হলো দলীয় আনুগত্য বা প্রভাবশালী মহলে লবির জোর আছে কিনা।

মুক্ত সাংবাদিকতা বলতে সাধারণ জ্ঞানে যা বুঝি তা হলো ‘আমি মুক্ত বাতাসে ঘুরে ঘুরে সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য খবর সংগ্রহ করব, প্রকাশ করব, বেতন গুনব।’ ক্ষেত্রবিশেষ বেতনেরও দরকার পড়বে না। বাংলাদেশ এখন আর্থসামাজিকভাবে স্বল্পোন্নত অবস্থা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উপনীত। ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ যত বাড়বে সাংবাদিকদের আয়-রোজগারও দিন দিন ততই বাড়তে থাকবে। কোনো একটি মাধ্যমের একটা পরিচয়পত্র থাকলেই হলো।

একটা সময় ছিল যখন বলা হতো ‘বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা’। এখন ‘মুক্ত গণমাধ্যম’। দেশ যখন এগোচ্ছে সংবাদ মাধ্যমের সংজ্ঞাও পাল্টাবে এটাই স্বাভাবিক। বস্তুনিষ্ঠ মানে আমি যা দেখছি বা দেখেছি তাই কাগজে ছেপে দিয়েছি বা টিভির স্ক্রলে বলে দিয়েছি। যেমন আমি আড়ালে থেকে কোনো এক বখাটে যুবক স্কুলগামী একটি ছাত্রীকে জবরদস্তি রেপ করতে দেখলাম। বখাটে যুবক তার সাথীকেও ডাকল। অসহায় মেয়েটি ওদের শক্ত বাহু থেকে নড়তেও পারছে না, বেরিয়ে যাওয়াতো অনেক বড় ব্যাপার। কষ্টের ব্যাপার হলো ক্যামেরাম্যান সাহেব বা সোস্যাল মিডিয়ার ভদ্রলোক তার সেল ফোন বা ট্যাব চালিয়ে আড়ালে দাঁড়িয়ে রইলেন শেষ সিনটি যাতে ক্যামেরাবন্দি বা মোবাইলবন্দি করা যায়। তাহলে সচিত্র প্রতিবেদনটি খুব গুরুত্বসহকারে প্রচার করা যাবে। বাহবা কুড়াতে পারবে, একটা-দুইটা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পাওয়া যেতে পারে।

প্রিয় পাঠক, এই কেস স্টাডিটা কাল্পনিক হলেও আমাদের সমাজে যে ঘটছে না তা নয়। অথচ সেই ক্যামেরাম্যান ইচ্ছা করলে হয়তো রেপ ঠেকাতে পারত। ঠেকায়নি কারণ তার সচিত্র প্রতিবেদনটি বেশি দরকার। কথা হলো একটি কিশোরী কন্যাকে রেপ থেকে বাঁচানো আগে, না রেপের লাইভ ছবি তুলে টু-পাইস কামানো আগে, না মিডিয়ার কাটতিটি বেশি ইম্পর্টেন্ট বড় বিষয়টি সব পক্ষকে বিবেচনা করে দেখতে হবে। মুক্ত গণমাধ্যম কি এ ক্ষেত্রে নীরব থাকবে?

এ প্রশ্নের উত্তর এভাবে হতে পারে। এ দেশটা আমার। আমি এ দেশের একজন সচেতন নাগরিক। আমার নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা সার্বভৌম আছে, আমার লাল সবুজের পতাকা আছে, আমার জাতীয় সঙ্গীত আছে, আমার সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় সীমানা আছে এবং এ দেশের জন্য গর্বিত। এসব ভুলে মুক্ত গণমাধ্যমের নামে রেপের চেয়ে ক্যামেরা বা সেল ফোনের কার্যক্রমকে প্রাধান্য দেব সেটা হবে আত্মঘাতী। ইস্যুটি রাজনৈতিক হলে দেশদ্রোহিতা।

গত কয়েক বছরে খুলনার মানিক সাহা, বালু, যশোরের শামসুল রহমান ক্যাবল, ঢাকায় সাগর-রুনীসহ এমনি কয়েকজন সাংবাদিককে দুর্বৃত্তরা হত্যা করেছে। একটি হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হয়নি। এ ক্ষেত্রে বক্তব্য হলো, আমাদের সাংবাদিক ইউনিয়ন (ঝড় পধষষবফ) ওয়েজবোর্ডের জন্য সারা বছর আন্দোলন করে, প্রেসক্লাবের ভেতরে-বাইরে, ব্যানার টানিয়ে রাখে মাসের পর মাস। কিন্তু শামসুল রহমান ক্যাবল, হুমায়ুন কবীর বালু, মানিক সাহা, সাগর-রুনীর জন্য তো তেমনটি দেখা গেল না। এমনকি দেখলাম ওয়েজবোর্ডের জন্য তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর পদত্যাগ চেয়ে প্রথমে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভেতরে বড় বড় ব্যানার লাগানো হয়েছিল। জাতীয় প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের দাবি-দাওয়া সমর্থন করে, তবে কোনোভাবে কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করতে পারে না। তাই আমি ব্যানারগুলো দারোয়ান দিয়ে নামিয়ে ফেলি। দ্বিতীয় দিনও একই ঘটনা ঘটালে আমি একই অ্যাকশন নেই। আমি মনে করি এই ইস্যুর সঙ্গে মুক্ত গণমাধ্যমের কোনো যোগসাজশ নেই।

যে কথাটি আমি আগেই বলেছিলাম। সাংবাদিক কমিউনিটি আদৌ সাগর-রুনী হত্যার বিচার চায় কিনা? নইলে এত সাংবাদিক বাংলাদেশে রয়েছে কেউ কি একটি হত্যাকাণ্ডের, বিশেষ করে সাগর-রুনীকে কারা হত্যা করল এর ওপর কি একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট কেউ প্রকাশ করেছে, কেউ কেউ দেখেছে? যতদূর জানি এই মুহূর্তে বাংলাদেশে দৈনিক পত্রিকা প্রায় ৮৫০টি এবং অনলাইন ২৫০০টি। তাহলে কেন আজ পর্যন্ত একটি ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট হলো না। যে রিপোর্টার-নেতা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গলা ফাটিয়ে স্লোগান দেয় ‘সাগর-রুনী হত্যার বিচার চাই- নইলে এবার রক্ষা নেই’ ইত্যাদি ইত্যাদি। তাকে যদি প্রশ্ন করা হয় বন্ধু আপনি হত্যাকাণ্ডের কোনো অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছেন? জবাব দেবেন এটা আমার কাজ নয়, আমি তো নেতা। শুনেছি রিপোর্টার্স ইউনিটিতে দেড় হাজার সদস্য। তারা এ প্রশ্নে দেড় হাজার ওয়ার্ড লিখেছেন কিনা জানি না।

বাংলাদেশ মুক্ত গণমাধ্যম যদি না-ই থাকবে তবে ২টি মামলায় ১৭ বছরের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক ফেরারি আসামির ছবি কি করে ৩/৪ কলম হেডিং দিয়ে বাংলাদেশের কাগজে ছাপা হয়। টিভি টক শোতে কি করে যা তা ভাষায় প্রধানমন্ত্রীর বিষোদগার করা হয়। তারেক রহমান, দুর্নীতির দায়ে কারান্তরীণ খালেদা জিয়ার পুত্র। তারেক যেমন দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে তেমনি খালেদা জিয়াও দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হচ্ছে সাজাপ্রাপ্ত আসামি কারাগারেই থাকবে। এখানে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, বিএনপি নেতানেত্রীরা খালেদার কারাভোগ বা তারেকের দেশান্তরের জন্য সরকারকে দায়ী করছে। অথচ তাদের আইনি লড়াই করার কথা কেউ বলছে না কেননা আইন বা কোর্টেই তাদের জেলে পাঠিয়েছে ও সাজা দিয়েছে। কিন্তু তারা তা করছে না, বরং এ থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাচ্ছে- এ কথাগুলোও গণমাধ্যম খুব একটা প্রকাশ করছে না।

তবে একটা ব্যাপার জানি। সাগর-রুনী হত্যার বিচারের জন্য একটা সময় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্রায়ই মানববন্ধন হতো। তাতে আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে এবং স্বাধীনতার বিরোধী অনুপ্রবেশকারীরও ছিল এবং ছিল চিহ্নিত রাজাকার ও রাজাকার-আলবদর। তাতে এমন বক্তৃতাও হয়েছে যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে স্বাধীনতার পক্ষের নেতাদের সামনে এবং তারা কোনো প্রতিবাদ করেনি। আমি তাদের সঙ্গে দাঁড়াইনি। বলেছি আমি সাগর-রুনী হত্যার বিচার চাই, কিন্তু যারা গোলাম আযমের নাগরিকত্ব সাক্ষ্য করে বা যারা রাজাকার-আলবদর তাদের সঙ্গে আমি দাঁড়াব না। ইন্টাররেস্টিং ব্যাপার হলো সাগর-রুনীসহ প্রতিটি গুপ্তহত্যার জন্য সরকারকে দায়ী করা হতো। এরই মধ্যে এক মানববন্ধনে বক্তৃতা থামিয়ে সাংবাদিকদের তথাকথিত এক বড় নেতা চলে গেলেন কোনো এক অদৃশ্য স্থানে। সেখানে থেকে একখানা চিঠি নিয়ে এলেন তিনি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা। এই চিঠি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে সাংবাদিকদের সাগর-রুনীর হত্যার বিচারের আন্দোলন থেমে যায়। আজো থেমে আছে।

মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য ৫৭ ধারা একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সরকার এটি অনুধাবন করে বাতিল করে দিয়েছেন। কিন্তু আইনের ক্ষেত্রে কোনো রকম ফাঁক-ফোকর থাকা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। সে জন্য শোনা যাচ্ছে সরকার ৩২ ধারা আরোপ করতে যাচ্ছেন। বলা হচ্ছে এই ৩২ ধারার একটি ধারা আছে রিপোর্টারের ইনভেস্টিগেটিভ-রিপোর্টিংয়ের প্রচেষ্টাকে কর্তৃপক্ষ ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ আখ্যা দিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারবে। এ বিষয়টি আরেকবার ভাবা দরকার। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সাংবাদিকবান্ধব প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশে বিদ্যমান সাংবাদিকতার স্বাধীনতা বা মুক্ত গণমাধ্যম প্রশ্নে কেবল দেশে নয়, সারা বিশ্বেও সুনাম আছে। যে কারণে শেখ হাসিনাকে Champions of the earth & Star of the east উপাধিতে সম্মানিত করা হয়েছে। কোনো একটি আইনের ছোট একটি বিধান যাতে সম্মান ম্লান করতে না পারে আমরা সেই কামনাই করি।

মুহম্মদ শফিকুর রহমান : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব।