মুক্ত গণমাধ্যম : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

আগের সংবাদ

কতবার জেলে দেবেন, কতজনকে মারবেন, গুম করবেন?

পরের সংবাদ

পরিকল্পিত নগরায়নে বড় ধরনের নৈতিক পরিবর্তন আনা দরকার

প্রকাশিত হয়েছে: মে ৩, ২০১৮ , ৮:১৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: মে ২৭, ২০১৮, ৯:৪৭ অপরাহ্ণ

ইকবাল হাবিব

স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিধ

ইকবাল হাবিব দেশের একজন খ্যাতিমান স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিধ। তার জন্ম ১৯৬৩ সালে। ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। হাতিরঝিল প্রকল্পের এরিয়া ডেভেলপমেন্ট এন্ড বিল্ডিং ডিজাইন প্রকল্প এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবন নকশার সঙ্গে জড়িত থাকার পাশাপাশি তিনি পরিবেশ ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। ভোরের কাগজের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন ঢাকার বর্তমান অবস্থা ও নগর পরিকল্পনা বিষয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রিপন কর্মকার।

ভোরের কাগজ : ঢাকা শহরে পরিকল্পিত নগরায়নের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে?

ইকবাল হাবিব : ১৯১৭ সালে প্রথম পেশাজীবীদের দ্বারা পরিকল্পিত নগরায়নের নকশা করা হয়। প্যাট্রিক গেডিস নামের এক ভদ্রলোক ঢাকার নগরায়ন নিয়ে প্রথম কাজ করেছিলেন। সেই পরিকল্পনার পুরো বাস্তবায়ন হয়নি। কিন্তু তার ধারাবাহিকতায় ১৯৫৯ সালে একটা মাস্টার প্ল্যান করা হয়েছিল। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ১৯৫৯ সালে মাস্টার প্ল্যানের আদলে পরিকল্পিত যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। এর আগে বঙ্গবন্ধু সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি উদ্যোগ নিচ্ছিলেন পরিকল্পিত নগরায়নের। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেমে যায়। ১৯৯০-এর গণআন্দোলনের পর আবার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আসায় পুনরায় পরিকল্পিত যাত্রা শুরু করতে পেরেছিলাম। একটি পরিকল্পিত নগরায়ন ব্যবস্থার মাস্টার প্ল্যান নামে পরিচিত যে ধারণা তৎকালীন সারা পৃথিবীতে গ্রহণযোগ্য ছিল তার আদলে ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন’ নামে স্ট্রাকচার প্ল্যান তৈরি করা হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে আরবান এরিয়া প্ল্যান বা ইউএপি তৈরি করা হয়। তাতে ঢাকা শহরের আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষা, যোগাযোগ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ইত্যাদি কেমন হবে তার কাঠামোগত একটা পরিকল্পনা করা হয়। এই পরিকল্পনাকে বিষম অঞ্চল পরিকল্পনায় পরিণত করার কথা ছিল।

ভোরের কাগজ : ঢাকা নগরায়নের সেই মাস্টার প্ল্যান এতদিনেও বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ?

ইকবাল হাবিব : প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশে সত্যিকারের অনুশাসন ব্যবস্থা বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অনুকূল পরিবেশ ছিল না। যে পরিকল্পনাটা করা হয়েছিল তা বিষম অঞ্চল পরিকল্পনায় পরিণত করার জন্য সময়ে প্রয়োজন ছিল মাত্র দুই থেকে তিন বছর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ধীরে চলা নীতির কারণে এবং অভ্যন্তরীণ নানান জটিলতা সৃষ্টি করে তা দীর্ঘায়িত করা হয়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০১০ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৩ বছর সময় চলে গেছে। এরপর এটাকে নানাভাবে পরিশিলিত, পরিমার্জিত এবং আরো নানান পরিকল্পনা ঢুকিয়ে রাজউককে পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়ে এর সম্ভাবনাকে এক প্রকার রোধ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যেন নির্বিকার, একনিষ্টতার অভাব, কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। এভাবে তো পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

ভোরের কাগজ : ঢাকায় জলাবদ্ধতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে এতে মানুষের দুর্ভোগও চরম পর্যায়ে। এক্ষেত্রে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং খাল, ঝিল দখল কি দায়ী নয়?

ইকবাল হাবিব : মূলত একটি নগরীতে জলের নিষ্কাশন ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইনফ্রাস্ট্রাকচার। এই নগরীতে সুন্দর একটা প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল। অসংখ্য খাল, পুকুর, ঝিল ইত্যাদি ছিল। এ ছাড়াও সবুজ প্রকৃতিতে ভরে ছিল। তখন একটা প্রাকৃতিক লু নেটওয়ার্ক, গ্রিন নেটওয়ার্ক ছিল। সেগুলো নগর ব্যবস্থার সঙ্গে আবরিত ছিল। লু নেটওয়ার্ক যদি চিন্তা করি, ওপর থেকে বৃষ্টি হবে সে বৃষ্টির কিছু পানি উদ্যান, গাছপালা বা সবুজ প্রকৃতির মধ্য দিয়ে সিঞ্চিত হয়ে মাটির তলায় যাবে, আর বাকি পানি গুঁড়িয়ে প্রাথমিকভাবে পুকুর, খাল, ঝিলগুলোতে স্থিতি হবে তারপর ধীরে ধীরে নদীতে মিশে যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে শহরকে শুধু রোডভিত্তিক করে গড়ে তোলার একটা ভ্রান্ত বিলাসে আমরা চলে গেছি। যার ফলে আমাদের যে ঐশ্চর্য ছিল তা নষ্ট করেছি। আর বাংলাদেশের সমস্ত উন্নয়নের কেন্দবিন্দুতে পরিণত করা হয়েছে ঢাকাকে। শিক্ষা, বাণিজ্য, সরকার, রাজনীতি ইত্যাদি সব কিছুতেই তা করা হয়েছে। এই কেন্দ্রিভ‚ততার কারণে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বাড়ছে। এই নগরমুখিতা এমন একটা অবস্থা তৈরি করছে যে ঢাকার জমির উচ্চমূল্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি। আবার জমির মালিকানার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতা ফলে পুরো বিনিয়োগ ব্যবস্থায় জমি হয়ে গেছে বিনিয়োগের ক্ষেত্র এবং জমিগুলো একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে বদ্ধ হয়ে গেছে। কাজেই জমিগুলো অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার হতে থাকল এবং বিভিন্ন উন্নয়নের তকমায় খাল, ঝিলগুলো দখল হতে থাকল। নদীর প্লাবনভ‚মি যেখানে চাষাবাদ হতো তাও দখল হতে থাকল। আবার প্লাবন ভূমিতে বাঁধ দিয়ে তার মধ্যে সবকিছু করে এক বিরাট অর্থযজ্ঞ চালানোর যে বড় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সেটার মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে পরিকল্পিত নগরায়নের সম্ভাবনাকে গলা টিপে ধরা হয়েছে। ডিএনডি বাঁধ এলাকার মধ্য দিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত ভুল হিসেবে প্রতিভাত হওয়ার পরও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত অটল থাকল। এবং আমরা এক ধরনের নিজেদের তৈরি ফাঁদে পড়ে গেলাম। সমস্যা সৃষ্টি হতে থাকল, জলজট মহামারী আকার ধারণ করল।

ভোরের কাগজ : আমরা দেখছি যে, জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন সংস্থা যে কাজ করছে কিন্তু তার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে। সমন্বয়হীনতার কারণ কি?

ইকবাল হাবিব : জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী একক কোনো কাঠামো করা হয়নি। কাউকে খাল দেখতে, কাউকে বাঁধ দেখতে, কাউকে পানি সরাতে মোটকথা একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা হয়ে গেছে। ফলে পরস্পরের ওপর দোষারোপের একটা কালচার বা সুযোগ তৈরি হয়েছে। কেই দায়িত্ববোধ থেকে কাজ না করে একে অন্যের মুখাপেক্ষি হয়ে আছে। কাজেই ভয়াবহ জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। গত বছর যখন আমরা জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রয়াত আনিসুল হকের সমন্বয়ে আলাপ আলোচনা করি, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মূল দায়িত্ব নিয়ে ঘোষণা করেছিলেন যে, আর জলাবদ্ধতা হবে না। কিন্তু সেই কার্যক্রমে ওয়াসার ৫৫ কোটি টাকা চাহিদার বিপরীতে মাত্র সাড়ে চার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আসলে প্রচণ্ড রকমের অনীহা, নির্বিকার ভাব, প্রত্যয়ের অভাব, কথা এবং কাজের সমদৃশ্যের অভাব রয়েছে। যার কারণে জলজট থেকে যানজট, যানজট থেকে নগরবাসী নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ভোরের কাগজ : নগরীতে গণপরিবহনে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে এটা আপনি কীভাবে দেখছেন?

ইকবাল হাবিব : পুরো পরিবহন ব্যবস্থাটি একটি সেবা খাত। সরকার চারটি প্রণোদিত সেবা খাতের একটি হচ্ছে জনগণের চলাচল নিশ্চিত করা। কিন্তু পরিবহন ব্যবস্থা একটি স্বার্থান্বেষী মহলের শুধু লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মানুষকে সবচেয়ে কম খরচে এবং নিরাপদে দ্রুত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোই গণপরিবহনের কাজ। সেটা হতে পারে রেলপথে, সড়কপথে বা নৌপথে। সড়ক হবে পথচারীবান্ধব। মানুষ হেঁটেই চলে যেতে পারে দুই-তিন কিলোমিটার।

তার জন্য যথোপযুক্ত চলাচল ব্যবস্থা থাকবে। হাঁটার জন্য পরিচ্ছন্ন ফুটপাত থাকবে, মাঝে মাঝে পাবলিক টয়লেট থাকবে, শৃঙ্খলিতভাবে ছোট ছোট দোকান থাকবে। সরকার সেটাও করতে পাছে না। নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ নেই, যাত্রীর দাঁড়ানোর জায়গা নেই। চালকদের বেতন না দিয়ে দিন চুক্তিতে বাস চালাতে দিচ্ছে এতে রেষারেষি বাড়ছে, দুর্ঘটনা ঘটছে। আবার মালিকপক্ষ এবং রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য পরিবহন শ্রমিকদের একত্রিত করে তাদের নানা অন্যায় মেনে নিচ্ছে, অনৈতিক আবদার পূরণ করছে। পরিবহন পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য যে সব সংস্থা আছে সেখানে পেশাদারি জনবলের অভাব, যথোপযুক্ত কারিগরি দক্ষতার অভাব রয়েছে। তাদের দিয়ে কীভাবে সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা সম্ভব?

সমস্যা সমাধানের কাঠামোগুলো মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক পক্ষ। সেখানে যাত্রীপক্ষ থাকছে না। জনদুর্ভোগকে পুঁজি করে তারা ব্যবসা করছে। তারা এমন শক্তি অর্জন করেছে যে, সরকারকেও অমান্য করছে। আমি মনে করি, অঙ্গীকার যদি থাকে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা যদি থাকে তবে গণপরিবহনে দুর্ভোগ, নৈরাজ্য, যানজট নিরসন সম্ভব। হাতিরঝিলে ওয়াটার বাস, ঢাকা চাকা প্রমাণ করে দিয়েছে যে আমরা পরিবহনে একটা শৃঙ্খলা আনতে সক্ষম। আমরা চাইলেই সমস্যার সমাধান করতে পারি। রাজনীতি যদি জনবান্ধব না হয়, রাজনীতি যদি শুধু ক্ষমতা দখলের রাজনীতি হয় তবে যানজট, জলজটসহ নাগরিক সমস্যাদির সমাধান আসবে না।

ভোরের কাগজ : ঢাকা শহরে আবাসন সংকট নিয়ে আপনার মতামত কি?

ইকবাল হাবিব : ফ্ল্যাট বাণিজ্য চলছে সর্বত্র। ফ্ল্যাটগুলো উচ্চবিত্তদের হাতে চলে যাচ্ছে। এদিকে বস্তিবাসীরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। অথচ তারা ভাড়া হিসেবে উচ্চমূল্য দিচ্ছে। নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত মানুষদের আবাসনের ব্যাপারে একটা ব্যাপক শূন্যতা তৈরি করা হয়েছে। আমি মনে করি, এই মুহ‚র্তে আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের বড় ধরনের নৈতিক পরিবর্তন আনা দরকার। যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে খেলার মাঠ দিতে পারবে না, কিন্ডার গার্টেন দিতে পারবে না, বৃদ্ধদের বা যারা শরীরচর্চা করে তাদের জায়গা দিতে পারবে না। এ সমস্যার সমাধান সরকারকে অবশ্যই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কয়েকশ প্লট একীভ‚ত করে একেকটা কমপ্লেক্স তৈরি করতে হবে। যার মধ্যে খেলার মাঠ থাকবে, জলাশয় থাকবে, ছোট বাগান থাকবে, শরীরচর্চার জায়গা ইত্যাদি থাকবে। এটা করতে আন্তরিক হতে হবে এবং বিনিয়োগ করতে হবে। বিনিয়োগ সরকারি বা বেসরকারি হতে পারে কিন্তু পরিকল্পনাটা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যেই একটা আমূল পরিবেশবান্ধব আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

ভোরের কাগজ : আপনাকে ধন্যবাদ।

ইকবাল হাবিব : ধন্যবাদ।