আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা

আগের সংবাদ

আইপিএলের শীর্ষে সাকিবরা

পরের সংবাদ

বিশ্বব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা : ভিন্ন দৃষ্টিতে

প্রকাশিত হয়েছে: এপ্রিল ২৯, ২০১৮ , ৮:২০ অপরাহ্ণ | আপডেট: এপ্রিল ২৯, ২০১৮, ৮:২০ অপরাহ্ণ

আবুল কাসেম ফজলুল হক

সৃষ্টিশীল চিন্তাবিদ, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

আমাদের রাজনীতির বিকার-বিকৃতি, রুগ্ণতা ও দুর্গতি সম্পর্কে সামান্য আলোচনা আমি করেছিলাম ‘আমাদের রাজনীতি : ভিন্ন দৃষ্টিতে’ শীর্ষক লেখাটিতে (ভোরের কাগজ, ২৩ এপ্রিল, ২০১৮)। আলোচনা সামান্য হলেও অসামান্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ের উল্লেখ তাতে আছে। যদি এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিরা মতবিনিময় করেন, স্মৃতি-সত্তা-ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দেশবাসীকে সচেতন ও জাগ্রত করে তোলেন এবং রাজনীতির উন্নতিতে মনোযোগী ও সক্রিয় হন, দেশে প্রয়োজনীয় নতুন রাজনীতি গড়ে ওঠে, তাহলে অবশ্যই বাংলাদেশে আমরা এক গৌরবোজ্জ্বল ভবিষ্যতের অধিকারী হব। তা যদি না হয় তাহলে আমরা পৌঁছব এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতে। এ দু‘য়ের মাঝামাঝি কোনো অবস্থা আমরা পাব না। যে অবস্থা চলছে, তা আলোকোজ্জ্বল না অন্ধকারাচ্ছন্ন? রাজনীতি? অর্থনীতি? সংস্কৃতি? যে অর্থনৈতিক উন্নতির কথা এত করে কীর্তিত হচ্ছে, তার প্রকৃতি কী? সমৃদ্ধিমান অর্থনীতি নিয়ে আমরা সভ্যতার দিকে চলছি না বর্বরতার দিকে? জাতিসংঘ, জি-সেভেন, ন্যাটো, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের পরিচালনায় বিশ্বায়নের নীতি নিয়ে মানবজাতি সভ্যতার পথে চলছে না বর্বরতার?

সভ্যতার ধারায় বর্বরতার উপাদানও থাকে আর বর্বরতার ধারায় সভ্যতার উপাদানও থাকে। পরিমাণ-ভেদ আছে। কর্তৃত্ব-বর্বরতার- সেটাই মূল। ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ‘মানুষের প্রতি’ বিশ্বাস রাখতে বলেছিলেন, অমানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখতে কি বলেছিলেন? মানবজাতির জন্য প্রতীচ্যের নেতৃত্বে আস্থা হারিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্য থেকে নতুন নেতৃত্ব আশা করেছিলেন। ভালো ইংরেজ, খারাপ ইংরেজ তাঁর দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল। ভালো ইংরেজের স্থলাভিষিক্ত তিনি দেখেছিলেন খারাপ ইংরেজকে। খারাপ ইংরেজের প্রতি তিনি বিশ্বাস রাখতে পারেননি। ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটবেই ঘটবে- মৃত্যুর আগে এ উপলব্ধি তাঁর হয়েছিল। দুই বিশ্বযুদ্ধ, পরাধীন জাতিগুলোর স্বাধীনতা সংগ্রামকে দমন করার জন্য ইউরোপের প্রবল জাতিগুলোর নির্মম দমননীতি, শিল্প-সাহিত্যে আধুনিকতাবাদীদের চরম নৈরাশ্যবাদ, অশুভ বুদ্ধির কর্তৃত্ব ও শুভ বুদ্ধির দুর্বলতা দেখে ইউরোপের নেতৃত্বে তিনি আস্থা হারিয়েছিলেন এবং মানবজাতির জন্য ‘প্রাচী ধরিত্রির বুক থেকে’ নতুন নেতৃত্বের উত্থান- নতুন মহামানবের আত্মপ্রকাশ- তিনি সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে আশা করেছিলেন, কামনা করেছিলেন। প্রসঙ্গত মনে রাখতে হবে যে, NATIONALISIM বইতে রবীন্দ্রনাথ IMPERIALISM ও COLO NIALISM-কে NATIONALISM বলে অভিহিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ NATIONALISM বলে সমস্ত অন্তরের ঘৃণা ব্যক্ত করেছেন IMPERIALISM ও COLO NIALISM-এর প্রতি; স্বাধীনতাকামী স্বরাষ্ট্রকামী NATIONALISM-এর প্রতি কি রবীন্দ্রনাথের ঘৃণা ছিল? রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বর্ণিত feudalism- বিরোধী, colonialism-বিরোধী, imperialism- বিরোধী জাতিরাষ্ট্রকামী nationalism-এর প্রতি কি রবীন্দ্রনাথের ঘৃণা ছিল? আমার ধারণা, NATIONALISM গ্রন্থে nationalism সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ধারণা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের এবং জাতীয়তাবাদী-গণআন্দোলনের ধারণা থেকে ভিন্ন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে internationalism nationalism-এর বিরোধী নয়, সম্পূরক। উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাদ, জাতীয়তাবাদের বিকার, স্বাভাবিক বিকাশ নয়।

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধকালে যে সভ্যতার সংকট স্পেংলার, সুয়েটজার, ক্লাইভ বেল, রবীন্দ্রনাথ ও আরো অনেক মনীষী তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন, মার্কসবাদ অবলম্বন করে তা কাটিয়ে ওঠার এবং মানবজাতির জন্য আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সৃষ্টির প্রচেষ্টা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু মার্কসবাদ ১৯৮০-র দশক থেকে আবেদনহীন হয়ে পড়তে থাকে এবং মার্কসবাদের এখন আর কোনো আবেদন নেই। বিশ্বায়নের আবর্তের মধ্যে কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণাকেও আর কার্যকর রাখা হচ্ছে না। এখন দুনিয়া চলছে Liberalism, free competition, pluralism, dipoliticization, civil society organization (c.s.o), N.G.O., anti-fundamentalist movement, feminist movement, anti-coruption movement ইত্যাদি নিয়ে। উৎপাদন বাড়ছে, সম্পদ বাড়ছে, সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য অন্যায়-অবিচার জুলুম-জবরদস্তি দুর্নীতি ও অসামাজিক কার্যকলাপ বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক আক্রমণ, যুদ্ধ ও গণহত্যা চালানো হচ্ছে, কিছু রাষ্ট্রে জঙ্গিবাদের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, অনেক রাষ্ট্রেই সন্ত্রাসবাদ দেখা যাচ্ছে। অপরদিকে রাষ্ট্রপর্যায়ে চলছে বিভিন্ন মাত্রার অস্বাভাবিক অবস্থা। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ- সবই বিকারপ্রাপ্ত। ধর্মের ও পুরাতন সংস্কার-বিশ্বাসের পুনরুজ্জীবন ঘটছে- তবে তার বিরুদ্ধে শিবিরের কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়াজাত। উৎপাদন বৃদ্ধি ও সম্পদের প্রাচুর্য নিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা কোনোটাই স্বাভাবিক নেই- সবকিছুই বিকারপ্রাপ্ত। প্রত্যেক জাতির এবং গোটা মানবজাতির সুস্থ, স্বাভাবিক, প্রগতিশীল অবস্থায় উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থার আমূল পুনর্গঠন দরকার। এই পুনর্গঠনের জন্য প্রথমে দরকার বৌদ্ধিক আন্দোলন। বৌদ্ধিক আন্দোলনের মাধ্যমে আদর্শগত ও তাত্ত্বিক বিষয়গুলো ঠিক করতে হবে। তারপর রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে। আদর্শ, কর্মসূচি, নেতৃত্বও কাজ লাগবে।

নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়েও জাতি, জাতীয় সংস্কৃতি, জাতীয় ভাষা, জাতীয় রাজনীতি, জাতীয় অর্থনীতি থাকবে এবং সেগুলোর স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ অবারিত রাখতে হবে। জাতি এবং জাতিরাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম নীতি হবে ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ কিংবা ‘বহুত্বমূলক ঐক্য’। বৈচিত্র্যে কিংবা বহুত্বে যথোচিত গুরুত্ব দিতে হবে, ঐক্যেও যথোচিত গুরুত্ব দিতে হবে। প্রত্যেক রাষ্ট্র, প্রত্যেক জাতি সময়ে সময়ে এই নীতি পুনর্গঠন করবে। ‘বহুত্ববাদ’ পরিহার করতে হবে। বৈচিত্র্য বা বহুত্ব এবং ঐক্য গ্রহণ করতে হবে। জাতি ও জাতিরাষ্ট্রসমূহের মধ্যকার পারস্পরিক বিরোধ মীমাংসার, পারস্পরিক লেনদেন ও সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাষ্ট্রীক সংস্থা বা বিশ্বসরকার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। জাতিসংঘকে পুনর্গঠন করার সুযোগ আছে। বর্তমান জাতিসংঘ প্রয়োজনীয় কাজ অল্পই করছে না। বর্তমান জাতিসংঘ কার্যত হয়ে আছে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর সংঘ।

আমাদের প্রস্তাব অনুযায়ী জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদ অবলম্বন করে বিশ্বব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো দ্বারা পরিচালিত বর্তমান বিশ্বায়ন পরিহার্য। প্রথমে বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদের মতবিনিময় ও আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে ধারণাকে স্পষ্ট করতে হবে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো যে যুদ্ধ, গণহত্যা, আগ্রাসন, শোষণ-পীড়ন চালাচ্ছে এবং দুনিয়াব্যাপী যে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে, তার অবসানকল্পে গড়ে তোলা দরকার একটি আন্তর্জাতিক শান্তিবাদী আন্দোলন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নৈতিক জাগরণ সৃষ্টির জন্যও আন্দোলন দরকার। এসব আন্দোলন পরিচালনার জন্য সংগঠন ও সাংগঠনিক প্রচেষ্টা দরকার।

জাতীয়তাবাদের চেতনা বিকারপ্রাপ্ত হয়ে সৃষ্টি হয় উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাদ। এসবের মোকাবেলা করে জাতিরাষ্ট্র গঠনের জন্য জাতীয়তাবাদ অবলম্বন করতে হবে। আন্তর্জাতিকতাবাদকে গড়ে তুলতে হবে জাতীয়তাবাদের সম্পূরক রূপে। গণতন্ত্র কিংবা সমাজতন্ত্রকে অবলম্বন করে জাতিরাষ্ট্র গঠিত হয়। তা ছাড়া শুধু জাতীয়তাবাদ অবলম্বন করে রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তানকালের পূর্ব বাংলার বাঙালি-জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। কিন্তু রাষ্ট্র গঠনের আদর্শ গণতন্ত্র কিংবা সমাজতন্ত্র অবলম্বন না করার ফলে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ গড়ে ওঠেনি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দেশের রাজনীতি নিয়ে যেভাবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর স্থানীয় দূতাবাসগুলোতে ছোটাছুটি করে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ভেঙে ছোটাছুটি করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে দেশের রাজনীতিতে টেনে আনে তা জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং তা দ্বারা রাষ্ট্রগঠন দুরূহতর হয়ে পড়ে। তা ছাড়া গত প্রায় চার দশক ধরে সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও মার্কসবাদকে এমন রূপ দেয়া হয়েছে যে, এগুলো জনগণের কাছে সম্পূর্ণ আকর্ষণহীন হয়ে পড়েছে এবং ধর্মের ও পুরাতন সংস্কার বিশ্বাসের পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে প্রচলিত এসব আদর্শ নিয়ে দুর্বল জাতিগুলো নিজেদের রাষ্ট্র গঠন করতে পারবে না। আর প্রবল জাতিগুলো বিশ্বায়নের নামে সাম্রাজ্যবাদী মুক্ত বাজার অর্থনীতি নিয়ে চলবে। এ অবস্থায় মানবজাতিকে সুস্থ, স্বাভাবিক, প্রগতিশীল ধারায় চলতে হলে প্রচলিত আদর্শসমূহের জায়গায় সর্বজনীন গণতন্ত্রের আদর্শ উদ্ভাবন বা বিকশিত করতে হবে। তাতে সমাজতন্ত্র সমন্বিত হয়ে যাবে সর্বজননীন গণতন্ত্রে বা শতভাগ মানুষের গণতন্ত্রে।

অভিপ্রেত নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য রাজনৈতিক দলকে রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গরূপে গড়ে তুলতে হবে। দল গঠনে দলের অভ্যন্তরে আদর্শ, কর্মসূচি, নৈতিক শিক্ষা, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব গঠন, জনগণের সঙ্গে দলের সম্পৃক্তি ইত্যাদির অনুশীলন করতে হবে। দল গঠন সম্পর্কে চিন্তাভাবনা বিকশিত করতে হবে। দল সব সময় সর্বজনীন গণতন্ত্রের লক্ষ্যে আর্থসামাজিক-রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের কর্মসূচি জনগণের মধ্যে প্রচার করবে এবং জনসাধারণকে প্রগতির লক্ষ্যে সচেতন ও জাগ্রত রাখবে। সর্বজনীন গণতন্ত্রের লক্ষ্যে সরকার গঠিত হবে নির্বাচনের মাধ্যমে, দলভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দ্বারা। দলভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের সরকার গঠনের নীতি ও পদ্ধতি উদ্ভাবন করে নিতে হবে। সভ্যতা, সংস্কৃতি, প্রগতি ইত্যাদি বিষয়ে চর্চার মাধ্যমে ধারণা স্পষ্ট করে নিতে হবে। দলে এবং সরকারি সব বিভাগে ও সংস্থায় জ্ঞানের ও সাহিত্যের চর্চাকে উৎসাহিত করা হবে। পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক চিন্তার ও কর্মপদ্ধতির বিকাশ ঘটিয়ে এগোতে হবে। দলে এবং রাষ্ট্রব্যবস্থায় চিন্তার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। তবে রাষ্ট্রবিরোধী, ক্ষমতাবিরোধী, সংবিধানবিরোধী চিন্তা প্রকাশে ও কাজে স্বার্থের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটি সংবিধানে স্পষ্টভাবে নির্দেশিত থাকবে।

মানবজাতিকে এবং বাংলাদেশকেও আজ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে যে, গ্রেকো-রোমান-ইউরো-আমেরিকান সভ্যতা প্রথম বিশ^যুদ্ধের পর্যায় থেকেই গভীর সভ্যতার সংকটে পড়েছে। এই সভ্যতায় যে নেতৃত্ব চলছে, তাতে শুভবুদ্ধি পরাজিত এবং অশুভ বুুদ্ধির কর্তৃত চলছে। অন্ধভাবে পশ্চিমা সভ্যতাকে অনুসরণ করে চলা আজ একেবারেই ভুল- অনুচিত। মানবজাতিকে নতুন সভ্যতার জন্ম দিতে হবে।

তার জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ^ব্যবস্থা নিয়ে যে ধারায় আমি আমার চিন্তা প্রকাশ করলাম সেই ধারায় বিবেকবান, চিন্তাশীল, প্রগতি প্রয়াসী সবাইকে চিন্তা করতে ও মত প্রকাশ করতে হবে। কেবল বাংলাদেশেই নয়- গোটা পৃথিবীতেই এ ধারায় চিন্তা দরকার। যত দীর্ঘ সময়ই লাগুক, এই ধারার চিন্তা অবলম্বন করেই মানবজাতি একদিন সুস্থ স্বাভাবিক প্রগতির ধারায় উত্তীর্ণ হবে। গতানুগতিক যে সব চিন্তা আজ বিশ্বব্যাপী চলছে- মার্কবাদী, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, ধর্মীয়- সে সব চিন্তা ও কাজ নিয়ে মানবজাতি এক অন্ধ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় আবর্তিত হবে মাত্র। এই আবর্ত থেকে মুক্তির জন্য সাধনা দরকার, সংগ্রাম দরকার। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ২০০৫ সাল থেকে আমি ‘আটাশ দফা : আমাদের মুক্তি ও উন্নতির কর্মসূচি নামে’ একটি পুস্তিকা প্রচার করে আসছি। এই পুস্তিকায় বাংলাদেশে উন্নত নতুন প্রগতিশীল ভবিষ্যৎ সৃষ্টির লক্ষ্যে বক্তব্য আছে, সেইসঙ্গে গোটা মানবজাতির প্রগতিশীল নতুন ভবিষ্যৎ সৃষ্টি সম্পর্কেও বক্তব্য আছে। আমার বর্তমান বক্তব্য সেই ধারাতেই। আমার মনে হয়, বাংলাদেশকে এবং মানবজাতিকে সভ্যতার দিক দিয়ে পতনশীলতা থেকে উত্থানশীলতায় উত্তীর্ণ হতে হলে এই ধারায় চিন্তা ও কাজ করতে হবে। আমার চিন্তা কি ভুল। সামাজিক আন্দোলনের দ্বারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে বক্তব্য ১৯৮০-র দশক থেকে বিশিষ্ট নাগরিকরা প্রচার করে আসছেন তা কি ঠিক?

আবুল কাসেম ফজলুল হক : সৃষ্টিশীল চিন্তাবিদ, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।